২০১৯ এর পদার্থবিদ্যার নোবেল মহাবিশ্ব গবেষণায়

1
668

এই বছরের পদার্থবিদ্যার নোবেল দেওয়া হয়েছে মহাবিশ্বের দুটি পৃথক বিষয় নিয়ে গবেষণার জন্য। প্রথম বিষয়টি হলো বিগব্যাং এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরবর্তী অবস্থার ব্যাখ্যাকরণ। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কসমোলজিস্ট জেমস পিবলস নোবেল পুরষ্কারের অর্ধেকটা পেয়েছেন। আর বাকী অর্ধেক ভাগ করে নিয়েছেন মাইকেল মেয়র এবং দিদিয়ের কোয়েলজ। এঁরা দু’জন যথাক্রমে ইউনিভার্সিটি অফ জেনোভা এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যামব্রিজের জ্যোতির্বিদ। সৌরজগতের সূর্যের বাইরে অন্য নক্ষত্রকে অবর্তনকারী গ্রহ তথা বাহ্যগ্রহ বা exoplanet আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এ পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে।

শুরুতে প্রথম অর্ধেকটা নিয়ে আলোকপাত করা যাক। মাইক পেবলস গতশতাব্দীর ষাটের দশকে তাত্ত্বিক কসমোলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা আগ্রহ ছিল বিগব্যাংয়ের ঠিক পর-পরই মহাবিশ্বের কী অবস্থা হয়েছিলো সেই বিষয়ে সুত্র অনুসন্ধান করা। মহাজাগতিক পটভৌমিক বিকিরণে (cosmic background radiation) বিকিরণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি তেমন কিছু সুত্র খুঁজে পেলেন। এই বিকিরণ হতে স্থানের তাপমাত্রার পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। নোবেল কমিটি জানিয়েছে, পুরষ্কার প্রদানের জন্য তারা পিবলসের ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র বিবেচনায় নিয়েছে। সেই গবেষণাপত্রে পিবলস মহাবিশ্বের উৎপত্তির পরে গ্যালাক্সি তৈরির জন্য ডার্কম্যাটার তথা কৃষ্ণবস্তুর ভুমিকা ব্যাখ্যা করেছেন।

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি বিষয়ক গবেষকগণ নোবেল কমিটির বিবেচনা রয়েছেন। এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামটি ছিলো জ্যোতির্বিদ ভেরা রুবিনের যিনি ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিলেন। ভেরা রুবিন ২০১৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং মরনোত্তর নোবেল দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। জীবদ্দশায় তিনি নোবেলের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তোবা একক ভাবে কিংবা পিবলসের সাথে যৌথভাবে নোবেলের জন্য বিবেচিত হতেন। ভেরা রুবিন নারী জ্যোতির্বিদ ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় ডার্ক এনার্জী নিয়ে গবেষণার জন্য নোবেল দেওয়া হয়েছে এবং সেই সময়ে তাঁকে নোবেল না দেওয়ায় অনেকেই এবার নোবেল কমিটির প্রতি নারীর প্রতি বৈষম্য এবং পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ এনে সমালোচনামুখর হয়েছেন।

অপর দুই বিজ্ঞানী মেয়র এবং কোয়েলজ 51 Pegasi b নামের একটি গ্রহ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেয়েছেন। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে তাঁরা তাঁদের এই আবিষ্কারের বিষয়টি প্রকাশ করেন। গ্রহটির আবিষ্কার খুব সহজ কিছু ছিলো না। সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য নক্ষত্রগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাদের উজ্জলতার কারণে। কিন্তু গ্রহগুলো নিষ্প্রভ, তারা আলো বিকিরণ করে না তাই সরাসরি তাদের অস্তিত্বও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি গ্রহ যখন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে তখন নক্ষত্রটিও কিছুটা দোদুল্যমান হয় সেই গ্রহের আকর্ষনে। গ্রহের ভর যত বেশী হবে নক্ষত্রও তত বেশী দুলবে। একটি বস্তু যদি আলোকরশ্মি বিকিরণ করতে করতে পর্যবেক্ষকের দিকে আসতে থাকে তাহলে তার বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম মনে হবে আর পর্যবেক্ষক হতে দূরে সরে যেতে থাকলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশী পরিলক্ষিত হবে (ডপলার প্রভাব বলা হয় একে)। ফলে দোদুল্যমান একটি নক্ষত্রের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যেও একধরনের নিয়মিত হ্রাসবৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তবে এর পরিমান হবে খুব সামান্য। কারণ পৃথিবীর একজন পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে দোদুল্যমান একটি নক্ষত্রের অবস্থানের পরিবর্তন খুবই সামান্য। কিন্তু মেয়র এবং কোয়েলজ সেই দুঃসাধ্য কাজটি করে প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ সনাক্ত করেছেন। বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্য পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা আবিষ্কার করেছেন গ্রহটি বৃহস্পতি গ্রহের মতোই প্রচন্ড ভারী তবে নক্ষত্রটির খুব কাছাকাছি অবস্থান করে আবর্তিত হয় এবং মাত্র চারদিনে নক্ষত্রটিকে একবার প্রদক্ষিণ করে। তাঁদের গবেষণার রেশ ধরে পরবর্তীতে প্রায় ৪০০০ বাহ্যগ্রহ আবিষ্কৃত হয়।

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.