যেভাবে করা হয় ডিএনএ টেস্ট

0
540

টিভিতে,খবরের কাগজে কিংবা থ্রিলার সিনেমাতে আমরা প্রায়ই শুনে থাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো পদস্থ কর্মকর্তা বলছেন “ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমেই আমরা আসল খুনিকে ধরতে পারবো।” সেখান থেকে ধরে নিতে পারি ডিএনএ টেস্টের নাম শোনে নি,এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। ডিএনএ টেস্টিং আধুনিক জীবপ্রযুক্তি এবং আণবিক জীববিদ্যার এক তাৎপর্যপূর্ণ ফসল। এই ব্লগে আমরা জানতে চেষ্টা করবো কীভাবে করা হয় এই ডিএনএ টেস্টিং।

ডিএনএ’কে বলা হয় জীবনের ব্লুপ্রিন্ট। আমাদের দেহ কীভাবে গঠিত হবে,কীভাবে এর ভেতরের কাজকর্ম সংঘটিত হবে এর সব লেখা আছে আমাদের ডিএনএ’তে। এই ব্যাপারগুলো আমরা জেনেছি গত শতকের মাঝামাঝিতে,অর্থাৎ ১৯৫০ কিংবা ‘৬০-এর দশকে। কিন্তু ডিএনএ ব্যবহার করে মানুষকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা,কিংবা আণবিক পর্যায়ে ব্যক্তিভেদে ডিএনএর পার্থক্য নিরূপণ করে রীতিমতো অপরাধী খুঁজে বের করা—এই ব্যাপারগুলো জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে বেশ নতুনই বলা চলে। ১৯৮৪ সালে অ্যালেক জেফ্রিস বলে এক জিনতত্ত্ববিদ ডিএনএ টেস্টিং পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নেতৃত্বে একটি গবেষক দল চেষ্টা করছিলেন ডিএনএ ব্যবহার করে দু’জন মানুষের সম্পর্কের নৈকট্য-দূরত্ব বোঝা যায় কি না। সুদীর্ঘ সাত বছর কাজ করার পর তারা এই পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সমর্থ হন। এরকম একটা যুগান্তকারী আবিষ্কারের পর জেফ্রিসের গবেষণাগারটির মূল্য বেড়ে যায় বহুগুণে; সারাবিশ্ব থেকে আসতে থাকে ডিএনএ নমুনা। ১৯৮৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত জেফ্রিসের গবেষণাগারটিই ছিলো ডিএনএ টেস্টের একমাত্র জায়গা। বলে রাখা ভালো ডিএনএ টেস্টিং—এর আরো কয়েকটি বিকল্প নাম আছে,যেমন ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং,ডিএনএ টাইপিং ইত্যাদি।

Advertisement
স্যার অ্যালেক জেফ্রিস; ছবি: University of Leicester

ইতোপূর্বে আঙুলের ছাপ দেখে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে শনাক্ত করার চল ছিলো,এমনকি এখনও জমিজমা হস্তান্তর,কাবিননামা রেজিস্ট্রি,মোবাইল সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ রাখা হয় বৈ কি! কিন্তু ডিএনএ টেস্টিং পদ্ধতি এরচে’ ঢের বেশি সূক্ষ্মভাবে কাজ করে থাকে। আবিষ্কারের পর থেকে খুনি-ধর্ষক-চোর প্রভৃতি অপরাধী শনাক্তকরণে,অভিভাবকত্ব নির্ণয়ে,দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তি শনাক্তকরণে এই পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বের সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ডিএনএ টেস্টিং এর মূল পদ্ধতিতে ঢোকার আগে এর মূলনীতিটা উল্লেখ করা প্রয়োজন। ডিএনএ’র কথা বললেই তার সাথে সাথে আর যে শব্দটা এসে যায়,সেটি হলো জিন। জিনের সঙ্গা মোটামুটি এভাবে দেওয়া হয় যে জিন হলো ডিএনএর কিছু বিশেষ খণ্ড বা অংশ যারা প্রোটিন তৈরি করতে পারে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই কথাটিকেই এভাবে বলা হয়,বিশেষ জিন বিশেষ প্রোটিন ‘কোড’ করতে পারে। খেয়াল করুন,সঙ্গায় বলা হচ্ছে ‘কিছু বিশেষ খণ্ড’। তার মানে ডিএনএর পুরোটা জুড়েই জিন থাকে না। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন মানব জিনোমে শতকরা ২ ভাগ অংশ বিভিন্ন প্রোটিন তৈরিতে অংশ নেয়। এই শতকরা ২ ভাগকে বলা হয় ‘কোডিং রিজিওন’ বা কোডিং অঞ্চল, বাকি ৯৮ভাগই হলো ননকোডিং অঞ্চল,অর্থাৎ এই অঞ্চল থেকে কোনো প্রোটিন তৈরি হয় না। ডিএনএ’র ননকোডিং অঞ্চলের ভেতর আবার কিছু বিশেষ উপ-অঞ্চল চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা,যার নাম Short Tandem Repeat। এই জায়গাগুলোতে ছোটো-ছোটো(৩,৪ বা ৫ ক্ষারকের) সিকুয়েন্সের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। এরকম একটা পুনরাবৃত্তি হতে পারে ….AGCAGCAGC….। এখানে  AGC এই তিনটি ক্ষারের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এই পুনরাবৃত্তিকেই বলা হয় Short Tandem Repeat। বিশেষ সিকুয়েন্সের পুনরাবৃত্তির সংখ্যা ডিএনএর একেক জায়গায় একেকরকম হতে পারে। ডিএনএ টেস্টিং এই STR-এর ওপর ভিত্তি করেই করা হয়ে থাকে।

প্রথমে উপযুক্ত জৈবিক নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। জৈবিক নমুনা হতে পারে রক্ত,বীর্য,চুলের ফলিকল,লালা,অশ্রু ইত্যাদি। সংগৃহীত এই ডিএনএ’টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ,যেহেতু এর ওপরই সামনে পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালানো হবে। কোনো পরীক্ষা ভেস্তে গেলে নমুনা ডিএনএটি যাতে হারিয়ে না যায়,তাই সেটির অনেকগুলো কপি তৈরি করে রাখা হয়। আধুনিক পিসিআর(PCR—Polymerase Chain Reaction) প্রযুক্তির সাহায্যে এই কাজটি খুব সহজেই করা যায়। এবার ডিএনএ নমুনাকে ‘বায়োলজিকাল নাইফ’ বা ‘জৈবিক কাঁচি’ বলে পরিচিত রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে কেটে টুকরা করা হয়। এই এনজাইমের বিশেষত্ব হলো এনজাইমটি ডিএনএ’কে এলোপাথাড়ি কাটবে না,বরং কিছু বিশেষ জায়গাতেই কাটবে। এই বিশেষ জায়গাগুলোকে বলা হয় ‘রেস্ট্রিকশন সাইট’। একেক রেস্ট্রিকশন এনজাইমের রেস্ট্রিকশন সাইট একেকরকম হয়ে থাকে। যাহোক,এই এনজাইম ব্যবহার করে নমুনা ডিএনএ’কে কতোগুলো ছোটোবড়ো খণ্ডে ভাগ করা হয়। খণ্ডগুলো বিভিন্ন সংখ্যায় STR তথা পুনরাবৃত্তি ধারণ করে থাকে। এবার এই খণ্ডগুলোকে মুখোমুখি হতে হয় ‘জেল ইলেকট্রোফোরেসিস’ নামে এক প্রক্রিয়ার।

জেল ইলেকটকরোফোরেসিসের প্রাথমিক সজ্জা; ছবি: Fuse school(ইউটিউব)

এই প্রক্রিয়ায় এগারোজ জেল দিয়ে তৈরি একটি বেড ওপর দিয়ে ডিএনএ খণ্ডগুলোকে চালনা করা হয়‌। বেড’টির দুই প্রান্ত যুক্ত থাকে তড়িৎ উৎসের সাথে। বেডের যে প্রান্ত তড়িৎ উৎসের ঋণাত্মক প্রান্তের সাথে সংযুক্ত,সেখানে আড়াআড়ি কিছু গর্ত করে সেই গর্তগুলোতে ডিএনএ টুকরোগুলোকে দিয়ে দেওয়া হয়। একেক নমুনার ডিএনএ টুকরোগুলো একেকটি গর্তে থাকে। তড়িৎ উৎস চালু করা হলে বাহ্যিক তড়িৎক্ষেত্রের সৃষ্টি হয় এবং এই তড়িৎক্ষেত্রের প্রভাবে ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত ডিএনএ খণ্ডগুলো (ডিএনএ-সূত্রকদুটি আসলে অসংখ্য রাইবোজ শর্করা আর অজৈব ফসফেটের সংযোগ-শিকল। এদের মধ্যে ফসফেট গ্রুপ PO43- ঋণাত্মকভাবে চার্জিত) বেডের ঋণাত্মক প্রান্ত থেকে ধনাত্মক প্রান্তের দিকে চলতে শুরু করে। এখানে জীববিজ্ঞান কিছু নেই,পুরোটাই পদার্থবিজ্ঞানের কারিশমা। কর্তিত ডিএনএ খণ্ডগুলো সব সমান আকৃতির হয় না—কোনোটার বেসপেয়ার বা ক্ষারকসংখ্যা থাকে বেশি,কোনোটার কম। যার ক্ষারকসংখ্যা বেশি তার আণবিক ওজন হয় বেশি,ফলে সেই খণ্ডের চলন হয় ধীর প্রকৃতির। একই কারণে ক্ষুদ্রাকৃতির ডিএনএ খণ্ডগুলোর চলন হয় দ্রুত। একসময় এই চলন শেষ হবে। কিন্তু আমরা এই চলন মোটেও দেখতে পাবো না,কারণ ডিএনএ এমনিতেই ক্ষুদ্র,তার ওপর বর্ণহীন। বিশেষ ডাই বা স্টেইনিং পদ্ধতি ব্যবহার করে অতিবেগুনী আলোর নিচে পর্যবেক্ষণ করলে তখন দেখা যায় ডিএনএ খণ্ডগুলো চমৎকার রঙিন পুরু লাইন বা ব্যান্ড আকারে আলাদা হয়ে গেছে। ডাই ব্যবহার করা ছাড়াও আরেকটা উপায় আছে,যার নাম সাদার্ন ব্লটিং। আলাদা হয়ে যাওয়া ডিএন ব্যান্ডগুলোকে এই পদ্ধতিতে একটা নাইট্রোসেলুলোজ ফিল্টার কাগজে স্থানান্তর করা হয় এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ব্যবহার করে ব্যান্ডের দৃশ্যমান সারি পাওয়া যায়। ডিএনএ ব্যান্ডের এই সারি বা সজ্জাকেই বলা হয় ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ প্রোফাইল,যা পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যক্তির জন‌্য স্বকীয়!

জেল ইলেকট্রোফোরেসিস প্রক্রিয়ায় ডিএনএ খণ্ডগুলো আলাদা হয়ে যাচ্ছে; ছবি : এটাই সায়েন্স(ইউটিউব)

আমার এবং আপনার ডিএনএ’তে প্রায় ৯৯ ভাগ মিল (কারণ আমরা দু’জনেই এক সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছি!),কিন্তু ও দুটো পুরোপুরি এক নয়। বিশেষত ননকোডিং এলাকাতেই বেশি অমিল। তাই আমি যদি আমার এবং আপনার ডিএনএ নমুনা নিয়ে তাতে রেস্ট্রিকশন এনজাইম যোগ করি,তাহলে দেখা যাবে আমাদের দু’জনের ডিএনএতে রেস্ট্রিকশন সাইট ঠিক একই জায়গায় নেই। একই জায়গায় নেই বলেই রেস্ট্রিকশন এনজাইমের কাজ শেষ হলে যে খণ্ডগুলো পাওয়া যাবে,তা আমাদের দুজনের ক্ষেত্রে সমান হবে না—না খণ্ডের দৈর্ঘ্যে,না খণ্ডের সংখ্যায়। শেষমেশ ডিএনএ ব্যান্ডের যে প্যাটার্ন পাওয়া যায়,তাতেও বিশেষ মিল থাকবে না। নিকট-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিএনএর সদৃশ খণ্ডে নির্দিষ্ট সিকুয়েন্সের পুনরাবৃত্তির সংখ্যায় মিল পাওয়া যায়,যেখানে দূরসম্পর্কীয় ব্যক্তির মিল থাকবে সামান্যই। আবার একই ব্যক্তি হলে পুনরাবৃত্তি সংখ্যা তথা ডিএনএ প্রোফাইল হুবহু মিলে যাবে।

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি

বাংলাদেশে ডিএনএ পরীক্ষার মূল কেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি’ (এনএফডিপিএল)। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাগার হত্যা, খুন, ধর্ষণ, পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নির্ণয়, অজ্ঞাত লাশের পরিচয় নির্ধারণসহ বিভিন্ন কাজে ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে থাকে। আলোচিত সাভারের রানা প্লাজা ধস,ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কারখানায় আগুনে নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণের পাশাপাশি বিডিআর বিদ্রোহসহ অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার প্রয়োজনে ডিএনএ টেস্ট করা হয়েছে এখান থেকে৷ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় ২০১৩ সালে ‘ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (ডিএনএ) আইন’ নামে একটি নতুন আইন অনুমোদিত হয়েছে বাংলাদেশে। ডিএনএ নমুনা ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট,পরিবর্তন বা জাল করা হলে; কারো দায়িত্বে অবহেলার কারণে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা না গেলে বা নমুনা নষ্ট হলেও বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে এই আইনে। সামনের দিনগুলোতে ডিএনএ আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং দেশের সর্বত্র সুলভে ডিএনএ টেস্টের ব‌্যবস্থা করা গেলে দেশ ও জনসাধারণ বিশেষভাবে উপকৃত হবে,সে কথা বলাই বাহুল্য!

পুনশ্চ, ডিএনএ টেস্ট করে কীভাবে অপরাধী শনাক্ত করা যায় তা তো জানলেন। কেমন হয় যদি আপনি নিজেই হয়ে ওঠেন একজন শার্লক হোমস আর সমাধান করেন চুরির রহস্য? নিচের ছবিটা দেখুন। একটা সোনার দোকান থেকে খোয়া গেছে কিছু মূল্যবান গহনা। চোর কোনো চিহ্ন রেখে যায় নি,শুধু একফোঁটা রক্ত ছাড়া। সন্দেহভাজন চারজনের ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে সেই রক্ত থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইল নিচে দেখানো হয়েছে। বলুন তো,কে আসল অপরাধী? 

DNA পরীক্ষায় অপরাধী কে ?ছবি কৃতজ্ঞতা: Fuse school(ইউটিউব)

অনির্বাণ মৈত্র

শিক্ষার্থী,নটরডেম কলেজ

তথ্যসূত্রঃ

•জেল ইলেকট্রোফোরেসিস:

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.