সংশয়বাদীর কাঠগড়ায় জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্ব

0
493

আমরা অনেকেই জৈব-বিবর্তন বা অভিব্যক্তির ধারণা মেনে নিতে পারি না। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা বিজ্ঞানীরা বুঝি সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে আমাদের এই তত্ত্ব দিয়ে বোকা বানাচ্ছেন! তাই অনেক ক্ষেত্রে বিষয়-বিশেষজ্ঞ নন এমন লেখক বা বক্তার উপর ভরসা করি। এটা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা বলাবাহুল্য! তবে একটা ব্যাপার ঠিক যে শুধু জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্ব নয়, সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ক্ষেত্রেই সংশয়বাদী হওয়া উচিত। শুধু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, অর্থনীতি-রাজনীতি-সমাজনীতি কোনোকিছুই সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মূলে রয়েছে সংশয়বাদ। তাই সংশয়ী থাকাটা ভালো। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে দুটি জিনিসের মধ্যকার আকর্ষণ বল সত্যিই তাদের ভরের গুণফলের সমানুপাতিক কিনা এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক কিনা – সেটা যাচাই না করে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। অর্থনীতিবিদরা যে বলেন যোগান বাড়লে দাম কমে এবং চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে – সেটাও যতই বিশ্বাসযোগ্য মনে হোক না কেন, যাচাই করে সন্তুষ্ট হলে তবেই মানা উচিত। জৈব অভিব্যক্তির তত্ত্বও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই বিজ্ঞান সহ সকল বিষয়ে ব্যবহারিকের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা ব্যবহারিক ক্লাশেই (বা মাঠে) কেবল তত্ত্বগুলো হাতেকলমে যাচাই করে দেখা যায়। তাহলে চলুন জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্বকে আজ যাচাই-বাছাই-এর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাক।

পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অনুমান (Hypothesis) ও গবেষণা লব্ধ জ্ঞান বা তত্ত্ব (Theory)

বলে রাখা ভালো, দৈনন্দিন জীবনে থিওরি বা তত্ত্ব শব্দটি খুবই স্থূল অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আজকে ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশ কেন জিতে (বা হেরে) গেলো তা নিয়ে অমুকের অমুক থিওরি আছে। কিংবা এতো থিওরি কপচিও না, ভালো লাগে না, পারলে কাজের কাজ করে দেখাও! বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বললে উপরের বাক্যদুটিতে থিওরি শব্দটি অনুকল্প বা হাইপোথিসিস এবং/অথবা মতামত বোঝাচ্ছে। মতামত হলো কারো নিজস্ব বক্তব্য। সেটা কোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেওয়া হতে পারে, না-ও হতে পারে। আর হাইপোথিসিস বলতে বোঝায় সীমিত পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কোনো একটা অনুমান যেটা মিথ্যা কিনা যাচাই করা সম্ভব। তাই বৈজ্ঞানিক পরিভাষার যথার্থ ব্যবহার সাপেক্ষে উল্লিখিত বাক্যদুটি এরকম হবে: 

Advertisement
  • আজকে বাংলাদেশ কেন জিতে (বা হেরে) গেলো তা নিয়ে অমুকের অমুক হাইপোথিসিস আছে। 
  • এতো মতামত কপচিও না, ভালো লাগে না, পারলে কাজের কাজ করে দেখাও!

কোনো তত্ত্বকে যাচাই করতে গেলে আগে সেই তত্ত্বটা কী তা জেনে নিতে হয়। না মানুন, কিন্তু যা যাচাই করবেন সেটা তো আগে ঠিক করে নিতে হবে, তাই না? আগে দেখা যাক, জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্ব বলতে কী কী বোঝায় না:

  • এটি বানর থেকে মানুষ হওয়াকে বোঝায় না, ওরকম কোনো ঘটনাই কখনো ঘটেনি!
  • এটি এক প্রজন্মের মধ্যে এক জীবের অন্য জীবে পরিণত হওয়াকে বোঝায় না, সেটা কার্যত অসম্ভব।
  • এটি জীবের ইচ্ছেমাফিক বৈশিষ্ট্য অর্জন বা বর্জনকে বোঝায় না, জিরাফের পূর্বপুরুষ গলা লম্বা করার চেষ্টা বা ইচ্ছা করেছিল বলে জিরাফের গলা লম্বা হয়নি; কারণটা ভিন্ন।
  • এটি ডারউইনের আবিষ্কৃত কোনো তত্ত্ব নয়; ডারউইনের বহুকাল আগে থেকেই মানুষ জানতো যে জীবকূল সময়ের সাথে পাল্টে যেতে পারে। ডারউইন (এবং ওয়ালেস) সর্বপ্রথম এই বাস্তব ঘটনার একটা বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দেন।

… ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাহলে জৈব অভিব্যক্তি জিনিসটা কী? কার্টিস-বার্নস (১৯৮৯) প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে, 

“…evolution can be precisely defined as any change in the frequency of alleles within a gene pool from one generation to the next.” 

  • Helena Curtis and N. Sue Barnes, Biology, 5th ed. 1989 Worth Publishers, p.974

অর্থাৎ জৈব অভিব্যক্তি হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জিন পুলে অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তন। ভয় নেই! কথাগুলো কাঠখোট্টা হলেও ব্যাপারটা খুব সহজ। 

জিন পুল হলো একটি পপ্যুলেশনের বিভিন্ন জিনের সংগ্রহ

পারস্পরিক মেলামেশা করা সম্ভব এমন ভৌগলিক এলাকায় বসবাসকারী একই বা কাছাকাছি প্রজাতির জীবের এক একটি দল হলো এক একটি পপুলেশন। ধরা যাক, সুন্দরবনের সমস্ত বাঘ (অর্থাৎ পপুলেশন) থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পুরো পপুলেশনে কোন জিনের কোন অ্যালিল কতগুলো করে আছে (অর্থাৎ অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি) সেগুলো আপনি একটা তালিকায় উঠিয়ে রাখলেন। এটা ঐ পপুলেশনের উল্লিখিত প্রজন্মের জিন পুল। তারপর এক বা একাধিক প্রজন্ম বেড়ে ওঠার সময় দিন। আবার গিয়ে একইভাবে নমুনা সংগ্রহ করুন এবং জিন পুলের তালিকা প্রস্তুত করুন। আগের তালিকার সাথে বর্তমান তালিকা মিলিয়ে দেখুন। যদি দেখেন, পুরো পপুলেশনের সাপেক্ষে কোনো জিনের কোনো অ্যালিলের অনুপাত কমবেশি হয়েছে কিংবা নতুন কোনো জিন বা অ্যালিলের আবির্ভাব ঘটেছে কিংবা কোনো জিন বা অ্যালিল পুরো পপুলেশন থেকে হারিয়ে গেছে, তাহলে সংজ্ঞা অনুসারে বলা যায় যে সেই পপুলেশনে জৈব অভিব্যক্তি ঘটেছে।

খেয়াল করুন, প্রজাতির পরিবর্তন এক ধরণের অভিব্যক্তি তবে সবসময় যে সেটা হতেই হবে এমন নয়। প্রজাতি না পাল্টেও জৈব অভিব্যক্তি হতে পারে। প্রজাতির জৈবনিক সংজ্ঞা অনুসারে, যদি দুই দলের জীব এমন হয় যে এক দলের জীব অপর দলের সাথে মিলিত হতে পারে না, পারলেও বাচ্চা হয় না, হলেও সেই বাচ্চা আজীবন বন্ধ্যা থাকে, তাহলে সেই দুটি দলকে দুটি ভিন্ন প্রজাতি বলে গণ্য করতে হয়। কিন্তু সব জীব তো যৌন জনন করেনা, আবার গাধা-ঘোড়ার মিলনে যে খচ্চর হয় সেটা তো কোনো প্রজাতিতে পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে প্রজাতির অন্যান্য সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়। সেসব জটিলতা এড়াতে এবং প্রজাতির পরিবর্তন ছাড়াও অন্যান্য পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিতে জৈব অভিব্যক্তির সংজ্ঞায় প্রজাতি সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। যাহোক, এবার প্রশ্ন হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে অ্যালিল ফ্রিকোয়েন্সি পাল্টে যাচ্ছে সেটা কেন হয়? মোটা দাগে বললে, সেটা নির্বাচনের মাধ্যমে হতে পারে কিংবা নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনোভাবে হতে পারে।

করোনাভাইরাসের কথা ধরা যাক। ভাইরাস কীভাবে বোঝে যে তার কোন মিউটেশন করতে হবে যাতে করে সে সফলভাবে ছড়াতে পারে? আসলে কাউকে এজন্য বুঝে-শুনে কিছু করতে হয় না। আপনা-আপনি হয়ে যায়। জেনেটিক তথ্য অনুলিপি হওয়ার প্রক্রিয়াটি পারফেক্ট নয়। মিউটেশন নামক ভুল সেখানে প্রায়শই ঘটে। ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির বেলায় সেই ভুলের হার আরও বেশি কেননা একটি ভাইরাস পোষক কোষে ঢুকে লক্ষাধিক নতুন ভাইরাস-কণা বানাতে পারে, যেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা প্রতি প্রজন্মে সর্বোচ্চ দ্বিগুণ হারে বাড়ে। যত বেশি কপি তত বেশি ভুল। ডিএনএ ভাইরাসের তুলনায় আরএনএ ভাইরাস (যেমন: করোনাভাইরাস) এক্ষেত্রে ভুল আরো বেশি করে। কেন সেই আলোচনায় আপাতত না যাই! যাহোক, এসব মিউটেশনের মধ্যে বেশিরভাগই কোনো কাজের না, ভাইরাসের কোনো সুবিধাও হয় না অসুবিধাও হয় না। কিছু মিউটেশন ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়। সেগুলো সনাক্ত করা খুব কঠিন কেননা সেই মিউটেশনধারী ভাইরাস তার পরবর্তী প্রজন্ম রেখে যেতে পারে না। ফলে ছড়ায় না। আর অল্প কিছু মিউটেশন রয়েছে যেগুলো ভাইরাসের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই সেগুলোই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা তা সনাক্ত করতে পারি। তাই বলা যায়, ভাইরাস বেছে বেছে অধিক সংক্রমণক্ষম মিউটেশন ঘটায় না; বরং র‍্যান্ডমভাবে হতে থাকা মিউটেশনগুলোর মধ্যে যেগুলো অধিক হারে সংক্রমণ ঘটায় সেগুলোই বেশি বেশি পাওয়া যায়। সেই ভ্যারিয়েন্ট বা প্রকরণগুলো বেশি করে সনাক্ত হয়। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন করোনাভাইরাসের অমিক্রন  (Omicron) ভ্যারিয়েন্ট অনেক বেশি হারে পাওয়া যাচ্ছে। এর নাম প্রাকৃতিক নির্বাচন।

নির্বাচনের মাধ্যমে অভিব্যক্তি ঘটলে সেটাকে বলে ডারউইনীয় বিবর্তন কেননা ডারউইনের গবেষণায় এটা বলা আছে। আর অন্য কোনো উপায়ে হলে তাকে বলে অ-ডারউইনীয় বিবর্তন কেননা ডারউইন সে ব্যাপারে কিছু বলে যাননি। সেটা আবার কেমন? 

লক্ষ্য করুন, করোনাভাইরাসের মধ্যে এমন মিউটেশন হতে পারে যেটার তেমন কোনো গুরুত্ব নেই কিন্তু তাতে করে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধিতে সমস্যা হয় না বিধায় বংশপরম্পরায় সেই মিউটেশনগুলো টিকে যাচ্ছে। তখনও কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জিন পুলের পরিবর্তন হবে। সংজ্ঞা অনুসারে এটাও জৈব অভিব্যক্তি। এরকম র‍্যান্ডম ভাবে পরিবর্তন ঘটে বলে অভিব্যক্তির এই প্রক্রিয়াটির নাম র‍্যান্ডম জেনেটিক ড্রিফট। 

আবার আক্রান্ত এক ব্যক্তি ধরা যাক কঠোর লকডাউনের মধ্যেও এক জায়গা থেকে কোনো একটা প্রকরণ বয়ে নিয়ে অন্য কোথাও গেলেন। তখন তার থেকে সেই নতুন জায়গায় ঐ প্রকরণটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এক্ষেত্রে নির্বাচন এবং র‍্যান্ডম জেনেটিক ড্রিফট এর পাশাপাশি আরেকটি জিনিস দায়ী, যাকে বলে মাইগ্রেশন বা পরিযান, মানে এক জায়গা থেকে জিনগতভাবে ভিন্ন কিছু সদস্য অন্য কোনো জায়গায় যাওয়া।

জৈব অভিব্যক্তি যেভাবেই ঘটুক না কেন, শেষ পর্যন্ত সেটা পপুলেশনে পরিবর্তন ঘটায়। ব্যক্তিতে নয়, পুরো পপুলেশনে, এটা খেয়াল রাখতে হবে। এক প্রজন্মে নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, এটাও খেয়াল রাখতে হবে। এখন আমরা তত্ত্বটি যাচাই-বাছাই করার কাজে নেমে পড়তে পারি।

আমরা শুধু যাচাই করা স্বার্থে তত্ত্বটা এতক্ষণ বুঝে নিয়েছি। বুঝে নিতে হলে বিশ্বাস করতে হবে এমন নয়। বিজ্ঞানে বিশ্বাস বলে কিছু নেই। তাহলে এবার ঠিক করে নিই যে কীরকম ভাবে এটা যাচাই করবো। কেমন ফলাফল এলে আমরা তা প্রমাণ হিসেবে মেনে নেবো আর কী পেলে আমরা মানবো না। যাতে করে পরে “বিচার মানি কিন্তু তালগাছটা আমার” এই পরিস্থিতি না হয়।

আজকে যেটা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায়নি কালকে যে সেটা মিথ্যা হয়ে যাবে না – একথা বলা যায় না। তাই ক্রমাগত মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টার মধ্যেই রয়েছে বিজ্ঞানের শক্তি। এভাবেই সে নতুনকে আবিষ্কার করতে পারে। সবসময় কোনো একটা কিছু সত্যি প্রমাণ করার চেষ্টা করলে নতুন কিছু আবিষ্কারের সুযোগ থাকে না। পুরোনো ত্রুটি শুধরানোরও উপায় থাকে না। এজন্য বিজ্ঞানে কোনো কিছুকে মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব কিনা সেটা খুব গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। কোনো কিছু মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব, অথচ তা মিথ্যা প্রমাণ করা যাচ্ছে না – তার মানে আপাতত সেটা সত্য বলে মেনে নিতে হবে। একারণে সব সত্যই আসলে আপাতসত্য। ঠিক একই কারণে মিথ্যাও আসলে আপাতমিথ্যা। গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি ব্যাখ্যা করার জন্য কেপলারের মডেলের চেয়ে নিউটনের মডেল বেশি কার্যকর এবং আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা আরও বেশি কার্যকর। তার মানে এই নয় যে আইনস্টাইনেরটাই সঠিক আর আগের সব মডেল মিথ্যা। আসলে প্রতিটি মডেল তার আগের মডেলের চেয়ে অধিকতর সত্য। একারণে সত্য-মিথ্যার ব্যাপারটি ঠিক সাদাকালো নয়। বাস্তবতার সাথে মডেলটির সিদ্ধান্ত কতখানি মিলছে সেই সম্ভাব্যতার নিরীখে তা বিচার করতে হয়।

এবার চলুন একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়ে সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা চালাই। আমরা জানি যে আমাদের (এবং সকল স্তন্যপায়ীর) দেহে এমন কিছু শ্বেত রক্তকোষ (যেমন: নিউট্রোফিল) আছে যেগুলো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে চলাফেরা করতে পারে। আবার অ্যামিবার মতো এককোষী কিছু জীবও সেটা পারে। তাহলে জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্ব যদি যথাযথ হয় তাহলে অ্যামিবা থেকে স্তন্যপায়ী জীব পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এরকম অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে চলার মতো কোষ থাকা উচিত। জৈব অভিব্যক্তি ক ⇨ খ ⇨গ ⇨ ঘ এরকম সরলরেখায় হয় না। বরং তা অনেকটা এমন: ক অনেক প্রজন্ম ধরে খ১, খ২ ও খ৩ এ পরিবর্তিত হতে পারে যেখানে ক এর কিছু সদস্য আগের মতো ক-ই থাকবে। আবার সেই খ২ এর একটি অংশ বহু প্রজন্ম পরে দেখা যাবে গ১ ও গ২ তে ভাগ হয়ে গেছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ অভিব্যক্তি হয় শাখা-প্রশাখায় বিস্তার লাভ করার মতো করে। 

চিত্র-১: জৈব অভিব্যক্তির শাখা-প্রশাখা কেমন হয় তার উদাহরণ।

 

চিত্র-১ লক্ষ্য করুন। এখন যদি দেখা যায় যে গ ও ঘ এর সবার মধ্যে (শেড দেওয়া অংশ) কোনো একটা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, তাহলে জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্ব অনুসারে সেটা খ২ তেও থাকা উচিত। তার মানে, অ্যামিবার মতো এককোষী জীব থেকে থেকে যে শাখা-প্রশাখা অনুসারে স্তন্যপায়ী পর্যন্ত অভিব্যক্তি ঘটেছে তার সবটা জুড়ে ওরকম ক্ষণপদ চলন আছে কিনা সেটা যাচাই করতে হলে সবচেয়ে সরল বহুকোষী জীবে ওরকম কোষ আছে কিনা সেটা খুঁজে দেখতে হবে। কেননা সবচেয়ে সরল বহুকোষী জীব (এক্ষেত্রে খ২) এসেছে এককোষী জীব (এক্ষেত্রে ক) থেকে। যে বৈশিষ্ট্য ক তে আছে এবং গ ও ঘ গুলোতেও আছে সেটা খ২ তে না থেকে পারে না, মানে যদি জৈব অভিব্যক্তি সঠিক হয় তাহলে। যদি তা সঠিক না হয় তাহলে সম্ভবত জৈব অভিব্যক্তির ঐ চিত্রটাই ভুল। 

সবচেয়ে সরল বহুকোষী জীব কোনটা? স্পঞ্জ। এটাই এক্ষেত্রে খ২ এর (চিত্র-১) সমতুল্য। সুতরাং আমাদের হাইপোথিসিস: জৈব অভিব্যক্তি সঠিক হলে স্পঞ্জে এমন কোষ থাকবে যেগুলো অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে চলাচল করতে পারে। 

এই হাইপোথিসিস ন্যায্যভাবে যাচাই করতে গেলে একটি নিয়ম মানতে হবে। কোনো গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত কোনো খবরকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। শুধুমাত্র পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালকে আমলে নেওয়া যাবে (চিত্র-২)। নতুবা কারো ব্যক্তিগত মতামতকে বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে গ্রহণ করে ফেলার ঝুঁকি থাকে। সবচেয়ে ভালো হতো যদি আমরা নিজে হাতে পরীক্ষাগুলো করে দেখতে পারতাম। সেটা যেহেতু এখন সম্ভব হচ্ছে না সেহেতু দ্বিতীয় সর্বোত্তম বিকল্প হিসেবে পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালকে ব্যবহার করছি।

 

চিত্র-২: বৈজ্ঞানিক জার্নালের ক্ষেত্রে পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া।

ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নাল খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে। গুগল করে দেখা যাচ্ছে অ্যামিবার মতো কোষ সত্যিই স্পঞ্জের দেহে আছে (চিত্র-৩)।

চিত্র-৩: গুগল করে দেখি স্পঞ্জ জাতীয় জীবের কোনো কোষ অ্যামিবার মতো চলাচল করতে পারে কিনা।

কিন্তু এটা তো কোনো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নাল নয়। আরেকটু ঘাঁটাঘাটি করে এরকম একটি জার্নালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ পেলাম যেখানে গবেষক দেখিয়েছেন যে স্পঞ্জের বিশেষ ধরণের কোষ আছে যেটা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ সৃষ্টি করে চলাফেরা করতে পারে। এখানে জৈব অভিব্যক্তি সম্পর্কে কিছু উল্লেখ নেই। তার মানে এই গবেষণা করার সময় গবেষক সেটা নিয়ে ভাবেননি, শুধু বিষয়টা তাঁর কাছে কৌতুহলোদ্দীপক ছিল বলে সম্ভবত গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন (চিত্র-৪)। কিন্তু এটাই এখন আমাদের জৈব অভিব্যক্তির হাইপোথিসিস যাচাই করতে কাজে লাগছে।

চিত্র-৪: স্পঞ্জের উপর একটি গবেষণাপত্রের অংশবিশেষ।

এখানে গবেষক আরো দেখিয়েছেন যে স্পঞ্জের যেসব কোষ তার দেহে যুক্ত থাকা অবস্থায় মোটেও অ্যামিবার মতো নয় সেগুলোকে যখন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় তখন তারা অ্যামিবার মতো আকার নেয় এবং ক্ষণপদ সৃষ্টি করে একে অপরের কাছে আসতে থাকে। একটা পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন কোষগুলো একত্রিত হয়ে পুনরায় স্পঞ্জের দেহ গঠন করে ফেলে এবং আগের মতো ক্ষণপদবিহীন হয়ে যায়।

তাহলে বলা যায়, আমরা আমাদের হাইপোথিসিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারিনি। স্পঞ্জের কোষে অ্যামিবার বৈশিষ্ট্য আছে, যা জৈব অভিব্যক্তি তত্ত্বকে সমর্থন করে। এখান থেকে আরেকটি হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়। অ্যামিবার মতো নয় এমন কোষ পরিবর্তিত হয়ে অ্যামিবার মতো বৈশিষ্ট্য ধারণ করে – এমনটা স্পঞ্জের ক্ষেত্রে দেখা গেল। তার মানে, জৈব অভিব্যক্তি সঠিক হলে এই বৈশিষ্ট্যটি স্পঞ্জেরও আগে উদ্ভুত কোনো এককোষী জীবে দেখতে পাওয়ার কথা। চলুন আবার গুগল মামার শরণাপন্ন হই।

 

চিত্র-৫: এককোষী জীবে ফ্ল্যাজেলা থেকে অ্যামিবা সদৃশ বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর সংক্রান্ত গবেষণাপত্রের অংশবিশেষ

একটু খোঁজাখুঁজি করে আরেকটা গবেষণাপত্র পাওয়া গেল। এটাও পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে। এখানে গবেষক দেখিয়েছেন কীভাবে কোয়ানোফ্ল্যাজেলেট নামক একজাতীয় এককোষী জীবে চলন অঙ্গ ফ্ল্যাজেলা পরিবর্তিত হয়ে অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ হয়ে যেতে পারে। আবার বিপরীত রূপান্তরও সম্ভব। মজার ব্যাপার হলো, স্পঞ্জের বেলায় যেসব কোষ অ্যামিবাতে রূপান্তরিত হতে পারে সেগুলোতেও ফ্ল্যাজেলা থাকে। সেগুলোও উভয় দিকে রূপান্তর হতে পারে। কোয়ানোফ্ল্যাজেলেটগুলো আবার কখনও কখনও একত্রে জড়ো হয়ে বহুকোষী জীবের মতো কাঠামো তৈরি করতে পারে যেটা দেখলে স্পঞ্জের কথা মনে পড়ে যায়।

অর্থাৎ এই হাইপোথিসিসটিও মিথ্যা প্রমাণ করা গেল না। তাই জৈব অভিব্যক্তিকে আপাতসত্য হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছে। পাঠকের জন্য আরো কিছু হাইপোথিসিস দিয়ে শেষ করবো। সেগুলো নির্মোহভাবে এবং পক্ষপাতবিহীনভাবে যাচাই করে দেখার অনুরোধ রইলো।

  • চারপাওয়ালা (কিংবা দুইহাত দুইপাওয়ালা) জীব তথা টেট্রাপডদের হাত (বা পা) এর হাড়গুলোর একটি নির্দিষ্ট সজ্জা আছে: একটা লম্বা হাড় ⇨ একজোড়া লম্বা হাড় ⇨ কিছু ছোট ছোট হাড়ের জটলা ⇨ পাঁচটা লম্বা হাড় ⇨ তুলনামূলকভাবে খাটো কিছু হাড় দৈর্ঘ্য বরাবর। তাহলে সকল টেট্রাপডের পূর্বসুরী প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই সজ্জা থাকা উচিত।
  • পশ্চাদ্দেশে হুল আছে এমন পোকা যে সবসময় হুলটি শত্রুকে আক্রমণ করতে ব্যবহার করে তা নয়। কোনো কোনো পোকা সেটা দিয়ে ডিম পাড়ে (তখন হুলটাকে ওভিপোজিটর বলে)। এদের মধ্যে যদি অভিব্যক্তিক সম্পর্ক থেকে থাকে তাহলে বলা যায়, সম্ভবত প্রজনন অঙ্গ ওভিপোজিটর ক্রমে আত্মরক্ষার্থে আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। এটা সঠিক হলে শুধু মেয়ে পোকার পশ্চাদ্দেশে হুল থাকার কথা, পুরুষের নয়, এমনকী সেই হুল যদি ডিম না পেড়ে শুধু শত্রুর গায়ে ফোটাতে ব্যবহৃত হয় তবুও।

এরকম আরও হাইপোথিসিস তৈরি করুন। যাচাই-বাছাই শেষে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিন। বিনা প্রশ্নে কারো কথা মানবেন না। আমার কথাও না।

 

সৌমিত্র চক্রবর্তী

 

বি.দ্র: এই লেখাটি Stated Clearly Project এর প্রতিষ্ঠাতা Jon Perry এর কর্মকাণ্ড হতে অনুপ্রাণিত।

 

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.