Sunday, September 25, 2022
বাড়িফিচারনীল তিমির ক্যান্সার হয় না কেন?

নীল তিমির ক্যান্সার হয় না কেন?

- Advertisement -

শুধু নীল তিমি নয়, হাতিরও ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা অতিবিরল। জগতের বড় বড় প্রানীগুলোর ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতা অপেক্ষাকৃত কম দেখা যায়। অথচ হওয়ার কথা এর উল্টো। কেন?

প্রথমে দেখা যাক ক্যান্সার কেন হয়? ক্যান্সার হয় কোষের অনিয়মিত ও নিয়ন্ত্রণহীন বিভাজনের ফলে।জীবদেহের অধিকাংশ কোষের স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রিত বিভাজন ঘটে যার ফলে কোষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে, পুরাতন কোষ প্রতিস্থাপিত হয় এবং জীবের আকার বৃদ্ধি পায়। কোনো কারণে এই নিয়ন্ত্রন নষ্ট হয়ে কোনো কোনো টিস্যুর কিছুকিছু কোষ অস্বাভাবিক হারে বিভাজিত হতে শুরু করতে পারে এবং অন্যান্য কোষকে বঞ্চিত করে জীবের পুষ্টিউপাদানসহ নানাবিধ সুযোগসুবিধা নিজেরা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ শরীরটিকে ধীরে ধীরে অকেজো করে দিতে পারে। এভাবেই প্রথমে সৃষ্টি হয় টিউমার এবং এই টিউমারগুলো পরবর্তীতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে হয় ক্যান্সার। তবে জীবের আকারের সাথে কোষের আকারের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো প্রজাতির জীব আকারে বড় হলে তার কোষগুলো আকারে বড় হয় না বরং কোষ সংখ্যায় বেশি হয়। ছোট প্রানী যেমন ইঁদুরের শরীরের কোষের পরিমান মানুষের শরীরের কোষের তুলনায় পরিমানে অনেক কম। একই কারণে হাতি বা নীল তিমির শরীরে কোষের পরিমান সেই তুলনায় অনেক বেশি।

জীবদেহের কোষগুলোতে নিয়ন্ত্রিত বিভাজিত হলেও অনেক সময় এই নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেটা পরিবেশগত কারণেও হতে পারে। যেমন: তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আমাদের কোষের ডিএনএ’র বন্ধন ভেঙে দিয়ে এর কার্যকারিতায় ব্যঘাত সৃষ্টি করতে পারে। ডিএনএ ভেঙে যাওয়ার একটি ফলাফল হতে পারে কোষ বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে যাওয়া। কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবেও এধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। জীবের ডিএনএতে সর্বদাই বিক্ষিপ্তভাবে মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটছে, কেননা শারীরবৃত্তীয় কর্মকান্ড অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এই জটিল প্রক্রিয়াটি যে সবসময় সূচারুভাবে ঘটবে তা নয় বরং মাঝেমাঝে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এইধরনের দুর্ঘটনার ফলে ডিএনএতে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে কোষের ভেতরে জিনের এক্সপ্রেশন বদলে যেতে পারে। এর ফলে দেখা দিতে পারে ক্যান্সার কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকরণ উপসর্গ। তবে মিউটেশনের ফলে যে সর্বদা ক্ষতিই হয় তা নয়। কখনো কখনো ডিএনএতে আকস্মিক পরিবর্তনে জিনের বৈশিষ্ট্যের উন্নতিও ঘটতে পারে। এধরনের মিউটেশনের সামষ্টিক ফলাফলই মূলতঃ জীবের বিবর্তন এবং নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য এমনকি নতুন নতুন প্রজাতি সৃষ্টির জন্য দায়ী।

জীবের কোষের ভেতরে এধরনের মিউটেশন যেন না ঘটে সেজন্য কোষের নিজেরও কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা আছে। তবে সমসময় এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজে নাও আসতে পারে। একটি জীবকোষ যেহেতু কোটি কোটি কোষের সমন্বয়ে তৈরি সেহেতু প্রতিনিয়ত খুব সামান্য পরিমানে হলেও কিছু কিছু কোষে মিউটেশন ঘটে যাওয়াও খুবই স্বাভাবিক। তবে মিউটেশন ঘটলেও তার ফলে কোষ বিভাজনের নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হবে আরো অতি বিরল ক্ষেত্রে, কেননা সব মিউটেশনের ফলাফল একই রকম নয়। যদি অহরহ ক্যান্সার সৃষ্টির মত মিউটেশন হতো তাহলে প্রত্যেক মানুষই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যেত। কিন্তু যত বেশি কোষ, তত বেশি মিউটেশনের সম্ভাবনা, আর সেই সাথে ক্যান্সার সৃষ্টিরও সম্ভাবনা।

শুধু তাই নয় আয়ুষ্কালও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যত দীর্ঘ জীবন একটি প্রানী যাপন করবে ততই তার মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে মিউটেশনের কারণে এবং জীবদ্দশায় কোনো না কোনো সময় তার মধ্যে ক্যান্সার সৃষ্টির মত একটি দুর্ঘটনা অবধারিতভাবে ঘটে যাবে যা হতে পারে কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই, স্রেফ দুর্ঘটনা বশতঃ। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখা যায় যে মানুষের শরীরে ইঁদুরের চেয়ে কোষের পরিমান ১০০০ গুণ বেশি হলেও এবং মানুষের আয়ুষ্কালও ইঁদুরের চেয়ে ৫০ গুণ বেশি হলেও ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় সমান। আবার মানুষের চেয়ে অনেক বেশি কোষ সম্পন্ন হাতি বা তিমির শরীরে ক্যান্সার হয় না বললেই চলে। এই পরষ্পর বিরোধী বিষয়টিকে ডাকা হয় পিটোর প্যারাডক্স (Peto’s paradox) নামে। কিন্তু কেন এমন হয়?

এর দুটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। প্রথম ব্যাখ্যাটি পরোক্ষভাবে ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। কোটি কোটি বছর আগে যখন পৃথিবীতে বড়সড় প্রানীর আবির্ভাব হতে শুরু করেছিল তখন তাদের মধ্যে ক্যান্সার হওয়ার প্রবণতাও বাড়তে শুরু করেছিল। ফলে মিউটেশনের মাধ্যমে এদের শরীরে ক্যান্সারবিরোধী জিনের সৃষ্টি হতে শুরু করল। যাদের মধ্যে সেই জিন ছিল না তারা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল এবং বাকিরা সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল। যতবড় প্রানী ততই যেহেতু ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা, তাই ততোই বেশি এদের শরীরে ক্যান্সার প্রতিরোধের ব্যবস্থা তৈরি হতে লাগল বিবর্তনের ধারায়। এই কারণে বড় প্রানীর দেহে ক্যান্সার সৃষ্টির প্রবণতা কম দেখা যেতে লাগল।

তবে এর এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য উত্তরটি খুবই মজার। স্বাভবিক কোষের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়ে ক্যান্সার কোষগুলো যেমন খুব দ্রুত বাড়ে তেমনটি ক্যান্সার কোষ সংখ্যায় অনেক বৃদ্ধি পেলে সেই ক্যান্সারেরও ক্যান্সার হতে পারে (হাইপারটিউমার)! এই ক্যান্সারের ক্যান্সার সেই ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করে দিতে পারে ফলে ক্যান্সার আর এগোতে পারে না। যত বেশী ক্যান্সারাক্রান্ত কোষ থাকবে আগের বর্ণনাকৃত নিয়মে ততোই বেশি ‘ক্যান্সারের ক্যান্সার’ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই কারণে কারণে ইঁদুরের শরীরে ক্যান্সার হলেও সেই ‘ক্যান্সারের ক্যান্সার’ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কমে যায়, কারণ খুব বেশি ক্যান্সার কোষ সৃষ্টি হওয়ার আগেই ইঁদুর মরে যায়। মানুষের শরীরে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা ইঁদুরের চেয়ে বেশি কিন্তু ‘ক্যান্সারের ক্যান্সার’ হওয়ার সম্ভাবনা ইঁদুরের চেয়ে অনেক বেশি। তাই এই দুই প্রভাব নাকচ হয়ে গিয়ে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ইঁদুরের কাছাকাছি থাকে। কিন্তু তিমির ঘটনা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এর শরীরে এত বেশি কোষ এবং তাতে এতো বেশী ক্যান্সার হওয়ার সম্ভবনা যে অহরহই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তিমি। কিন্তু অনেক বেশি কোষ হওয়াতে সে শরীরে অনেক বেশি ক্যান্সার কোষের উপস্থিতিও সহ্য করতে পারে। আর ক্যান্সার কোষ অনেক বেশি হয়ে গেলে কোনো না কোনো সময় অবধারিত ভাবে সেই ক্যান্সারেরও ক্যান্সার হয়ে যাবে যা সৃষ্ট ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেবে। যখন একটি প্রানীর ক্যান্সার হয় তখন ক্যান্সারকোষগুলো খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তার প্রচুর পুষ্টির প্রয়োজন হয়। তাই কোষগুলো শরীরকে প্রভাবিত করে সরাসরি নিজেদের মধ্যে রক্তনালী সৃষ্টি করে নেয়। হাইপারটিউমারগুলো তৈরি হলে তা সাধারণ টিউমারের শত্রু হয়ে ওঠে এবং এই রক্ত প্রবাহ ধ্বংস করে দেয়। এই হাইপারটিউমারের সাপেক্ষে আবারও হাইপারটিউমার হতে পারে এবং তা একই ভাবে আবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

কাজেই বলা যায় তিমির শরীরে ক্যান্সার হলেও তা ধ্বংস হয়ে যায় এবং তার শরীরে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কেননা, এদের শরীর এত বড় যে অল্প কিছু ছোটখাটো টিউমার তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। একটি ২ গ্রাম ভরের টিউমার ইঁদুরের শরীরের দশ শতাংশ, তাই এটি ইঁদুরের জন্য বিশেষ কিছু। কিন্তু মানুষের জন্য তা ০.০০২ শতাংশ, আর তিমির জন্য কেবল ০.০০০০০২ শতাংশ। কাজেই তিমির শরীরে একটি টিউমারের প্রভাব অত্যন্ত নগন্য। এবং এটি বিশেষ প্রভাব রাখার আগেই হাইপার টিউমার সৃষ্টি হয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়াতে ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ পায় না।

ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
(লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল)

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

300,593ভক্তমত
1,030গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -