Sunday, September 25, 2022
বাড়িমহাবিশ্বজেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ: ছায়াপথের ফটোগ্রাফার

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ: ছায়াপথের ফটোগ্রাফার

- Advertisement -

একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল ১৯টি ছায়াপথের নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জ এবং ধূলিকণার জরিপ করবে।

ছায়াপথ বোঝার জন্যে প্রথমে বুঝতে হবে কিভাবে নক্ষত্রের জন্ম হয়। পৃথিবীর একশ’ জনেরও বেশি গবেষক বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ, দৃশ্যমান টেলিস্কোপ, এবং অতিবেগুনী টেলিস্কোপগুলির সাহায্যে নিকটবর্তী সর্পিল ছায়াপথগুলোর চিত্রগুলোকে একত্রিত করেছেন এবং শীঘ্রই নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে উচ্চ-রেজোলিউশনের অবলোহিত চিত্রগুলির একটি সম্পূর্ণ সেট যুক্ত করতে যাচ্ছেন৷ এই যুগান্তকারী তথ্য সন্নিবেশনের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত বিশ্লেষণ করতে পারবেন কিভাবে সর্পিলাকার ছায়াপথে অন্ধকার, ধূলিময় গ্যাসের মেঘ থেকে নক্ষত্রের সৃষ্টি হয়, এবং কিভাবে নতুন নক্ষত্রগুলি সেই গ্যাস এবং ধূলিকণাকে উড়িয়ে দেয়। এছাড়াও বিজ্ঞানীরা সেইসব পরিণত নক্ষত্রগুলিকে শনাক্ত করতে পারবেন যেগুলো এখনো গ্যাস ও ধূলিকণার স্তর উড়িয়ে চলেছে।

সর্পিল ছায়াপথ NGC 3351-এর এই চিত্রটিতে বেশ কয়েকটি মানমন্দিরের পর্যবেক্ষণকে একত্রিত করা হয়েছে যাতে করে এই ছায়াপথের নক্ষত্র এবং গ্যাস সম্পর্কে বিশদ ধারণা পাওয়া যায়। চিলিতে অবস্থিত অ্যাটাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাবমিলিমিটার অ্যারে (ALMA) মানমন্দিরের রেডিও পর্যবেক্ষণ থেকে ম্যাজেন্টা রঙে ঘন আণবিক গ্যাস দেখা যাচ্ছে। খুব বড় এই টেলিস্কোপের বহু বর্ণালী পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটির তোলা ছবির লাল রঙ তরুণ বৃহদায়তন নক্ষত্রদের অলোকিত অংশ নির্দেশ করে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের চিত্রগুলি সাদা রঙ দিয়ে ধূলিকণা এবং নীল রঙ দিয়ে নবগঠিত তারাগুলিকে নির্দেশ করে৷ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে পাওয়া উচ্চ-রেজোলিউশনের ইনফ্রারেড চিত্রগুলি গবেষকদের ধূলিকণার আড়ালে কোথায় নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে তা সনাক্ত করতে এবং এই ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের প্রাথমিক স্তরগুলি অনুধাবনে সহায়তা করবে। সৌজন্যে: Science: NASA, ESA, ESO-Chile, ALMA, NAOJ, NRAO; ছবি প্রক্রিয়াকরণ: জোসেফ ডিপাসকুয়েল (STScI)

 

মহাবিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষনীয় আকৃতি হল সর্পিলাকার কোনকিছু। এগুলো জটিল ঝিনুক আকৃতির, খুব যত্ন নিয়ে গড়া মাকড়সার জাল এবং এমনকি সমুদ্রের ঢেউয়ের আকৃতির মতও হতে পারে। মহাজাগতিক মাত্রায় ছায়াপথের এই চক্রগুলি কেবল তাদের সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং তাদের মধ্যে থাকা অকল্পনীয় পরিমাণ তথ্যের জন্যে আরও অনেক বেশি আকর্ষনীয় হয়ে থাকে৷ নক্ষত্র এবং নক্ষত্রপুঞ্জ কিভাবে গঠিত হয়? কিছুদিন আগে পর্যন্ত গ্যাস এবং ধুলোর কারণে এই প্রশ্নের একটি সম্পূর্ণ উত্তর আমাদের নাগালের বাইরে ছিল। কার্যক্রম শুরুর প্রথম বছরের মধ্যে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ গবেষকদের ১৯টি ছায়াপথের উচ্চরেজোলিউশনের অবলোহিতআলোকচিত্রের সাহায্যে নাক্ষত্রিক জীবন চক্রের আরও বিশদ বিবরণ সম্পূর্ণ করতে সাহায্য করবে।

টেলিস্কোপটি এখন পর্যন্ত অনুপস্থিত বেশ কয়েকটি ধাঁধার যোগসূত্রও প্রদান করবে। অ্যারিজোনার টাকসন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের NOIRLab-এর জেমিনি অবজারভেটরির প্রধান বিজ্ঞানী জেনিস লি বলেন, টেলিস্কোপটি অসাধারণ রেজোলিউশনে নাক্ষত্রিক জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি তুলতে সক্ষম৷ এটি খুব প্রাথমিক পর্যায়ে নক্ষত্রের গঠন প্রকাশ করবে, ঠিক যে সময় গ্যাস ধসে নক্ষত্র তৈরি হয় এবং আশেপাশের ধুলো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

জেনিস লি এর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড থিলকার, জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাথরিন ক্রেকেল এবং PHANGS (Physics at High Angular resolution in Nearby GalaxieS) নামে পরিচিত বহুতরঙ্গদৈর্ঘ্য জরিপ অনুষ্ঠানের চল্লিশ জন অতিরিক্ত সদস্য। তাদের উদ্দেশ্য হল, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের উচ্চরেজোলিউশনের অবলোহিত চিত্রগুলির সাহায্যে নক্ষত্র গঠনের রহস্য উন্মোচন করার পাশাপাশি সমগ্র জ্যোতির্বিদ্যা গবেষকদলের সঙ্গে তথ্য বন্টন করে নেওয়া যাতে করে ভবিষ্যতে মহাজাগতিক আবিষ্কার ত্বরান্বিত করা যায়।

নক্ষত্র গঠনের ছন্দ

PHANGS এর উদ্যোগটি বেশ অভিনব, কারণ এটি ১০০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞকে নক্ষত্র গঠনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত  পর্যবেক্ষণের জন্য একত্রিত করেছে। তাঁরা গড়ে ৫০ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের সেইসব ছায়াপথগুলোকে লক্ষ্য করছেন যেগুলো পৃথিবী থেকে দেখা যায়। চিলির ALMA মানমন্দির থেকে ৯০টি ছায়াপথের ক্ষুদ্র-তরঙ্গবিশিষ্ট আলোর ছবি দিয়ে এই বৃহৎ সহযোগিতা শুরু হয়েছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্র গঠনের কাঁচামাল অধ্যয়ন করার জন্যে আণবিক গ্যাসের মানচিত্র তৈরি করতে এই উপাত্ত ব্যবহার করেন। চিলিতে অবস্থিত খুব বড় টেলিস্কোপের MUSE যন্ত্রটি যখন অনলাইনে এসেছিল, তখন তারা স্পেকট্রা নামে পরিচিত উপাত্ত পেয়েছিলেন। এই উপাত্তগুলো ১৯টি ছায়াপথের তারকা গঠনের পর্যায়গুলি এবং বিশেষ করে নক্ষত্রপুঞ্জগুলোর কাছাকাছি গ্যাস এবং ধুলো পরিষ্কার করার পরবর্তী দশা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। মহাকাশভিত্তিক হাবল স্পেস টেলিস্কোপ ৩৮টি ছায়াপথের দৃশ্যমান এবং অতিবেগুনী আলোকচিত্র সরবরাহের মাধ্যমে স্বতন্ত্র নক্ষত্র এবং নক্ষত্রপুঞ্জগুলোর উচ্চরেজোলিউশনের চিত্র গঠনে সাহায্য করেছে।

একাধিক পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে গঠিত সর্পিলাকার গ্যালাক্সি NGC 1300-এর এই চিত্রটি নক্ষত্রের সংখ্যা এবং গ্যাসের অবস্থান নির্ণয় করতে সহায়তা করে। ALMA মানমন্দিরের টেলস্কোপের বেতার আলোকের সাহায্যে দেখা এই চিত্রের হলুদ রঙ ঠান্ডা আণবিক গ্যাসের মেঘগুলিকে নির্দেশ করে। এই মেঘমালাই নক্ষত্র তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ করে থাকে। নতুন বিশাল নক্ষত্রেরা তাদের পাশবর্তী গ্যাসের উপর যে প্রভাব ফেলে তা খুব বড় টেলিস্কোপের MUSE যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত চিত্রে লাল এবং ম্যাজেন্টা রঙে ধরা পড়েছে। হাবল স্পেস টেলিস্কোপের দৃশ্যমান এবং অতিবেগুনী আলোর সাহায্যে তোলা ছবিতে সোনালী রঙ ধূলিকণা এবং নীল রঙ খুব অল্প বয়স্ক উষ্ণ নক্ষত্রগুলোকে নির্দেশ করে৷ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ থেকে উচ্চ-রেজোলিউশনের অবলোহিত চিত্রগুলি গবেষকদের ধূলিকণার পিছনে কোথায় নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে তা সনাক্ত করতে এবং এই ছায়াপথে নক্ষত্র গঠনের প্রাথমিক স্তরগুলি অনুধাবন করতে সহায়তা করবে।
সৌজন্যে: Science: NASA, ESA, ESO- Chile, ALMA, NAOJ, NRAO; ছবি প্রক্রিয়াকরণ: অ্যালিসা প্যাগান (STScI)

 

অনুপস্থিত উপাদানগুলি মূলত ছায়াপথগুলোর এমন জায়গায় অবস্থিত যেগুলো ধুলোয় ঢাকা। এমন অঞ্চলগুলোতেই নক্ষত্রগুলোর সক্রিয় গঠন শুরু হয়। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের কাজই হচ্ছে এই অনুপস্থিত উপাদানগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরা। থিলকার বলেন, আমরা এই ঘন আণবিক মেঘের মধ্যে নক্ষত্রপুঞ্জগুলো পরিষ্কারভাবে দেখতে যাচ্ছি। আগে আমাদের কাছে এগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে কেবল পরোক্ষ প্রমাণ ছিল। ওয়েব আমাদেরকে এইসব নক্ষত্রের কারখানার ভিতরে দেখার একটি উপায় করে দিতে যাচ্ছে যার ফলে আমরা নতুনভাবে একত্রিত নক্ষত্রপুঞ্জগুলোকে দেখতে এবং বিবর্তনের আগে তাদের বৈশিষ্ট্যগুলি পরিমাপ করতে সক্ষম হব।

নতুন তথ্য উপাত্ত গবেষক দলটিকে ছায়াপথের নক্ষত্রগুলোর বয়স নির্ণয় করতে সাহায্য করবে। এর ফলে গবেষকেরা আরও সঠিক পরিসংখ্যানগত নমুনা তৈরি করতে সক্ষম হবে। ক্রেকেল বলেন, আমরা সবসময় ছোট পরিসরের নমুনা দিয়ে বিশাল ছায়াপথকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে এসেছি। ওয়েবের সাহায্যে আমরা প্রতিটি ছায়াপথের নক্ষত্রদের এবং নক্ষত্রপুঞ্জগুলোর ক্রমবিবর্তনকে অনুসরণ করব।

বিজ্ঞানীরা আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের মধ্যে নক্ষত্রের চারপাশের ধুলো নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ওয়েব তাদের নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে কোন অঞ্চলের গ্যাস এবং ধূলিকণা নির্দিষ্ট নক্ষত্র গঠনের জন্যে দায়ী এবং কোন অঞ্চলের গ্যাস এবং ধূলিকণা মুক্তভাসমান আন্তঃনাক্ষত্রিক উপাদান। থিলকার আরো বলেন, “এটি নিকটতম ছায়াপথের বাইরে আগে করা যায়নি। এই অনুসন্ধান হতে যাচ্ছে যুগান্তকারী।”

গবেষক দলটি নক্ষত্র গঠন চক্রের সময় বোঝার জন্যও কাজ করছে। জেনিস লি বলেন, জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যায় সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। তারা গঠনের প্রতিটি পর্যায় কতক্ষণ স্থায়ী হয়? বিভিন্ন ছায়াপথের পরিবেশে সেই সময়রেখাগুলি কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে? নক্ষত্র গঠন কিভাবে ব্যাহত হয় তা বোঝার জন্যে আমরা নক্ষত্রগুলি তাদের গ্যাসের মেঘ থেকে কত সময় পর মুক্ত হয় তা পরিমাপ করতে চাই।

সবার জন্যে বিজ্ঞান

এই ওয়েব পর্যবেক্ষণগুলি নগদ প্রাপ্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হবে, যার অর্থ এগুলোকে জনসাধারণের কাছে অবিলম্বে প্রকাশ করা হবে, এবং এগুলো বৈজ্ঞানিক মূল্যও সুবিস্তৃত এবং স্থায়ী হবে৷ দলটি ALMA, MUSE এবং Hubble এর প্রতিটি পরিপূরক তথ্য সেটের সাথে Webb-এর তথ্য উপাত্ত সারিবদ্ধ করে এমন তথ্য উপাত্ত সেট তৈরি এবং প্রকাশ করার জন্য কাজ করবে, যাতে করে ভবিষ্যতে গবেষকরা প্রতিটি ছায়াপথ এবং তাদের নক্ষত্রের সংখ্যার মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে তুলনা করতে পারে। তারা নক্ষত্র গঠন চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের তালিকা প্রদান করবে, যার মধ্যে নক্ষত্র গঠনের অঞ্চল, তরুণ নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জ এবং স্থানীয় ধূলিকণার বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এই গবেষণাটি ওয়েবের সাধারণ পর্যবেক্ষণ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে পরিচালিত হবে, যেগুলো ডুয়াল এনোনিমাস রিভিউ সিস্টেম ব্যবহার করে নির্বাচিত হয়। এই একই সিস্টেম হাবল স্পেস টেলিস্কোপে সময় বরাদ্দ করতে ব্যবহৃত হয়।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ হল বিশ্বের প্রধান মহাকাশ বিজ্ঞান মানমন্দির। ওয়েব আমাদের সৌরজগতের রহস্য সমাধান করবে, অন্যান্য নক্ষত্রের চারপাশে দূরবর্তী বিশ্বের দিকে তাকাবে এবং আমাদের মহাবিশ্বের রহস্যময় কাঠামো উৎস এবং এতে আমাদের অবস্থান অনুসন্ধান করবে। ওয়েব একটি আন্তর্জাতিক প্রোগ্রাম যার নেতৃত্বে রয়েছে নাসা এবং এর অংশীদার হিসেবে রয়েছে ESA (ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি) এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি।

-পুলক বড়ুয়া।

[SciTechDaily অবলম্বনে।]

 

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

300,591ভক্তমত
1,030গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -