5G প্রযুক্তিতে বাঙালির দাবী

0
889

 

৫জি আসছে!!!

Advertisement

 

সুতরাং এর একটা হোম টাস্ক করে রাখা  ভালো। কারণ এর বেশ কিছু খটমটে শব্দ  আছে, তাদের সাথে একটু পরিচয় করা দরকার।  

 

তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ সম্প্রচার করা হয় বাহক তরঙ্গের সাথে তথ্য সংকেত মিশিয়ে। এটা ৩ ধরনের। 

 

সেগুলোঃ

        ➤  ভূমি তরঙ্গ

        ➤ দেশ তরঙ্গ

        ➤ নভো তরঙ্গ

 

৩জি, ৪জি, ৫জি সবাই মাইক্রোওয়েভ এবং দেশ তরঙ্গ। টাওয়ার ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ব্রডকাস্ট ‘৫জি সফটওয়ার ভিত্তিক ক্লাউড নেটওয়ার্ক ‘ যাতে কোন তার লাগে না। 

 

আলো থেকে আরম্ভ করে তাপ তরঙ্গ, সবাই তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ। তফাৎ শুধু কম্পাঙ্কের। এদের কতগুলো চওড়া পট্টি বা ব্যান্ডউইথে ভাগ করা হয়। 

 

☞  VHF(very high frequency), 

☞  UHF(ultra high frequency)

☞ SHF(super high frequency)। 

 

৫জি SHF ব্যান্ডউইধে রয়েছে, কম্পাংক মোটামুটি 24GHz থেকে 86GHz। যার ক্যাপাসিটি ৪জি থেকে ১০০গুণ বেশি। 

 

ধরা যাক, আপনি অমিতাভ বচ্চনের বিখ্যাত  ‘শোলে (SHOLEY)’ সিনেমাটি ডাউনলোড করছেন। ৩জিতে ২৬ঘন্টা সময় নিলে ৪জিতে লাগবে ৬মিনিট। আর ৫জিতে মাত্র ৩.৬ সেকেন্ড। শুধু তাই নয় প্রতিক্রিয়ার সময়ও খুবই কম। ৪জিতে যেখানে ৫০মিলি সেকেন্ড ৫জিতে ১মিলি সেকেন্ড। চোখের পলকের ৪০০গুণ বেশি ফাস্ট। এটা এক ধরনের ❝ক্লাউড নেটওয়ার্ক অবনমন❞ পদ্ধতি ব্যবহার করে। ফলে অতিদ্রুত নিরবিচ্ছিন্ন ডাটার ধারা বজায় রাখতে  পারে। যা মানব কল্যাণে বিপ্লব ঘটিয়ে দেবে। ডাক্তারিতে রিমোট অপারেশন এক্কেবারে সহজলভ্য করে তুলবে। লন্ডনের কোন ডাক্তার সহজেই অশোকনগরে আপনার কিডনির পাথর অপারেশন করে বের করে দেবে। গাড়ি কোম্পানিগুলির এর সাহায্যে চালকহীন গাড়ি তৈরির আর কোন বাধা থাকবে না। ৫জির অতিদ্রুত তথ্যধারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বাস্তবোচিত করে তুলবে। 

 

অবশ্য মানব ধ্বংসের কাজে কেউ কেউ একে ব্যবহার করবে। আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমানবহর ও ট্যাঙ্ক বাহিনী নির্ধারক ভূমিকা নিয়েছিল। যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে তাহলে প্রধান হয়ে উঠবে নেটওয়ার্ক কেন্দ্রিক ড্রোন, সোয়ার্ম ড্রোন ও চালকহীন যান (UAV or UCAV)। ৫জি নেটওয়ার্কের কল্যাণে।

জ্যামস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল  (1831-1879)

এ প্রসঙ্গে দুজন পথিকৃতের নাম করতেই হবে। একজন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। তাঁর সূত্র, ত্বরণযুক্ত আহিত কণা শক্তির বিকিরণ করবেই। আর সেটা তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গরূপে। এই ভবিষ্যৎবাণীর সফলতা তিনি দেখে যেতে পারেননি। মারা যান ১৮৮৯সালে। আসলে সমস্ত তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি তাঁর সূত্র ধরে। মোবাইল কথ্য তরঙ্গকে তড়িৎ পালসসে পরিণত করা হয়। যার ফলে ত্বরিত আধান থেকে শক্তি তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গাকারে নিসৃত হয়। অবশ্য এরমধ্যে বাহক তরঙ্গের মিশ্রণ ঘটানো হয়। 

ম্যাক্সওয়েলের এই গণনাকে বাস্তবরূপ দেন দ্বিতীয় জন, জগদীশ চন্দ্র বসু। ১৮৯৪ সালের নভেম্বরে কোলকাতা টাইন হলে বোস তাঁর বিখ্যাত পরীক্ষাটি জনসমক্ষে দেখান। সাক্ষী ছিলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর সার উইলিয়াম মেকেঞ্জী। বিশ্ব দেখলো তাঁর অদৃশ্য আলো বা তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গের সৃষ্টি এবং সনাক্তকরণ। যুগান্তকারী বিষয় ছিল তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গের সনাক্ত। তিনি ব্যবহার করেছিলেন গ্যালেনা কেলাস ডিটেক্টর, তরঙ্গ গ্রাহক যন্ত্র কোহেরার। বিশ্বে প্রথম সেমি কন্ডাকটর ভিত্তিক যন্ত্র। ভাবুন তো, এই শতাব্দীতে আপনি বাড়িতে এই কদিন আগে কেনা যে LED টিউবে পড়ছেন তাতে আছে গ্যালিয়াম আরসেনাইড(GaAs)এর মতো p-n সংযোগ ডায়োড। অথবা ভারতের ডিফেন্স গবেষকেরা যে বিশেষ ধরনের AESA( active electronically scanned arrayরেডার “উত্তম” বানাতে চলেছে সেখনেও সেই অবিশুদ্ধ অর্ধপরিবাহী। আর সে সময়, শতাব্দীররও আগে তিনি ব্যবহার করেন অর্ধপরিবাহীভিত্তক গ্যালেনা ডিটেক্টর। জগদীশ চন্দ্র বসু তখন ইঙ্গিত করেছিলেন p-type এবং n-type অবিশুদ্ধ সেমি কন্ডাকটরের। প্রতিদিন আপনি মোবাইল চর্জারে এই p-n সংযোগ ডায়োডের সাহায্যে a.c থেকে d.c রুপান্তর করেন।  নবেল লরিয়েট নেভেলি মোট্ বলেন ” জে সি বোস তাঁর সময় থেকে ৬০বছর এগিয়ে ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই প্রথম p-type n-type অর্ধপরিবাহীর অস্তিত্ব ধরতে পেরেছিলেন।” এই ডিজিটাল বিশ্বটার সৃষ্টির প্রধান উপাদান ট্রানজিস্টর আসলে যেন দুটো  p-n সংযোগ ডায়োড পিঠোপিঠি যুক্ত। এর আবিষ্কারে বেল লেবরেটরির তিন বিজ্ঞানী ১৯৪৮ সালে নবেল পুরষ্কার পান। অথচ এসবের পথিকৃৎ হলেন জগদীশ চন্দ্র বসু। দু’দুটো নোবেল পুরষ্কার তিনি অবশ্যই পেতে পারতেন।

◑ ১. p-type n-type সেমি কন্ডাকটরের আবিষ্কার এবং তার প্রথম প্রয়োগ।

 

◑ ২. রেডিও তরঙ্গের প্রথম সৃষ্টি ও সনাক্ত। যেখানে মার্কনি নবেল পেয়ে গেলেন। 

 

স্রেফ পেটেন্ট নিতে অস্বীকার করার জন্য । নীতিগত ভাবে জগদীশ চন্দ্র বসু মনে করতেন বিজ্ঞান আবিষ্কারে পেটেন্ট নেওয়া উচিত নয়, কারণ এটা মানব কল্যানমূলক সৃষ্টি। বাঙালি এ আফসোস কোথায় রাখবে? যদি হতো তাহলে বাঙালি কিন্তু দাবি করতে পারত ৫জি আমাদের সৃষ্টি, আমরা সারা বিশ্বকে ৫জি নেটওয়ার্কে এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছি। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের দোরগোড়া থেকে তিনি ফিরে এসে অন্য এক পথ ধরেন। উদ্ভিদবিদ্যা। দেখান উত্তেজনায় উদ্ভিদ সাড়া দেয়। সুতরাং সমস্ত মোবাইল কোম্পানির কাছে আবেদন আপনারা ৫জি যে সেটগুলি মার্কেটে আনছেন তার একটা অন্তত জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে করুন। 

 

আবার মূল আলোচনায় ফেরা যাক। 

 

 

❝৫জি জনস্বাস্থ্যের পক্ষে আসলে কতটা ক্ষতিকর?❞

 

নেদারল্যান্ডসের রাজধানী হেগের রাস্তায় বহু পাখি মরে পড়ে থাকার একটা ছবি সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। চারিদিক থেকে প্রচার হতে থাকে ৫জি সম্প্রচারের পরীক্ষা নিরীক্ষার বিকিরণের ফলে এমনটা হয়েছে। ভারতের বলিউড অভিনেত্রী ও সোশাল ওয়ার্কার ‘জুহি চাওলা ও তার বন্ধুরা’ মিলে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন যে, ৫জি বিকিরণ মানুষসহ সমস্ত প্রাণীজগতের উপর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করবে।

 

কোর্ট এই পিটিশন নাকচ করে দেয় এবং জুহি চাওলাদের ২০ লক্ষ টাকা জরিমানা করে।

 

কোর্টে প্রাধান্য পায় কোন ধরনের রশ্মি জীবকোষে ক্ষতি করে। বিজ্ঞান বলে আহিতকারক(ionizing) রশ্মি যেমন X রশ্মি, গামা রশ্মি ও কসমিক রশ্মি জীবকোষে ক্ষতি করে। কিন্তু অনআহিতকারক(non-ionizing) রশ্মি যেমন রেডিও am/fm, TV, মোবাইলের ৩জি,৪জি বা ৫জি এবং সূর্যের বিকিরণ জীবকোষে সদ্য কোন খারাপ প্রতিক্রিয়া ঘটায় না। তবে এর দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া এখনই বলা যাচ্ছে না।

 

৪জি চালুর সময়েও একটা গুজব বেশ চলেছিলো। মেবাইল বিকিরণের জন্য নারকেল শুকিয়ে যাচ্ছে। পরে বিজ্ঞানীরা দেখান এটা একটা ভাইরাসঘটিত রোগ এর সাথে মোবাইলের কোন সম্পর্ক নেই। 

 

পরিশেষে এটাই বলবো, ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে গবেষণা চলুক, কিন্তু ৫জি স্বাগতম।

 

টীকাঃ –

দেশ তরঙ্গঃ এই তরঙ্গ(৩০ মেগা হার্জের বেশি কম্পাঙ্কের বেশি) বায়ুমন্ডলের মধ্যে দিয়ে প্রায় ৫০ কিলোমিটার যেতে পারে। টিভির প্রথম যুগে লম্বা লম্বা রডের এন্টেনায় তখন এই তরঙ্গ ধরে আমরা ছবি দেখতাম। বর্তমানের কেবল্ বা ডিস্ক টিভিও এই দেশ তরঙ্গের মাইক্রোওয়েভের (১থেকে ৩০০ জিগা হার্জ) খেলা। মুম্বাইয়ের কোন স্টুডিও থেকে দেশ তরঙ্গের বা মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে কৃত্রিম উপগ্রহে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রতিফলিত তরঙ্গ কেবলে বা ডিস্কের সাহায্য বাড়িতে আসে 

 

সুবীর বিশ্বাস 

বিএসসি (পদার্থবিজ্ঞান)

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.