Saturday, November 27, 2021
বাড়িজীবজগৎ❝ক্যাটলফিশ–সাগরতলের এক অনন্য জাদুকর ❞

❝ক্যাটলফিশ–সাগরতলের এক অনন্য জাদুকর ❞

- Advertisement -

এটি মূলত এক সমুদ্র জাদুকরের গল্প–যাকে চোরের উপর বাটপার বললেও ভুল হবে না।

সমুদ্রতটে দাড়িয়ে সমুদ্রের বিশালতা আমাদের যতটুকু অবাক করে, তার চেয়েও বেশ কয়েকগুণ আশ্চর্যরূপ গভীর সমুদ্রের দৃশ্য।

এই অন্ধকার জগতে যেখানে আলোর তীব্র অভাব, তখন কোথা থেকে যেন আলোকবর্তিকার মতো ভেসে যাচ্ছে এংলার ফিস না হয় জেলি ফিস। এখানে রয়েছে সমুদ্র সিংহ আবার সমুদ্র ঘোড়াও। তিমি, ডলফিন সহ অজস্র প্রাণীর সমারোহে একটি অভাবনীয় বুদ্ধিমান প্রাণীর নাম হলো ক্যাটলফিস।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

চিত্রে- Flamboyant cuttlefish

যদি আপনি ভেবে থাকেন যে, অক্টোপাসই একমাত্র বাকিদের ফাঁকি দিয়ে ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে, তাহলে আপনার ধারণা ভুল। কারণ ক্যাটলফিসও কোন অংশে অক্টোপাসের চেয়ে কম নয়।

তাহলে, আজ আমরা জানবো সমুদ্রের এই জাদুকর সম্পর্কে।

যদি মানুষ মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সব চেয়ে বুদ্ধিমান হয়, তাহলে অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান হলো ক্যাটেল ফিস। শরীরের আকার অনুসারে, যার মস্তিষ্কের আকার বাকি অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের তুলনায় বড়। আটটি বাহু, দুটি কর্ষিকা, সাথে রংবেরঙের চামরা, 360 ডিগ্রীতে দেখার ক্ষমতা আর নীলচে রক্ত নিয়ে ভেসে যাওয়া এই প্রাণীকে দেখতে মনে হয় যেন, ভিনগ্রহের একটি প্রাণী ।

তবে, সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে সে তার রুপ বদলানোর ক্ষমতা নিয়ে।
বিশেষত ৩ টি ক্ষেত্রে এরা ছদ্মবেশ ধারণ করে।

খাদ্য সংগ্রহ ও শিকারেঃ

খাবার হিসেবে এরা সাধারণত কাঁকড়া, চিংড়ি খেয়ে থাকে।যখন তারা শিকার ধরে,তখন শিকারকে কাবু করার জন্য তারা ক্রমাগত তাদের শরীরের রং পাল্টাতে থাকে। একসময় শিকার তাদের রঙ বদলের কারিশমাতে হিপনোটাইজড হয়ে পালাতেই ভুলে যায়। আর তখনই ক্যাটল ফিস তার কর্ষিকা দিয়ে তাকে মুখে পুড়ে নেয়।

আত্মরক্ষায়ঃ

যখন তিমি বা ডলফিনের মত বড় প্রাণীরা ক্যাটেল ফিসকে যখন শিকার করতে আসে, সে মুহূর্তের মধ্যে নিজের রং পাল্টে তার আশে পাশের পরিবেশের সাথে মিলিয়ে যায়, এমন কি শরীরের আকারও পরিবর্তন করে। আর শিকারীরা তাকে পাথর খন্ড বা প্রবাল ভেবে আক্রমণ না করে চলে আসে। আবার কখনো কখনো সে শিকারীর দিকে কালি ছুড়ে দেয়। কালিগুলো মেঘের মত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে আর মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে চতুর ম্যাজিশিয়ান।

(চিত্রে- ক্যাটলফিসের ক্যামোফ্লেজ
সোর্স- Common.Wikimedia)

প্রজননেঃ

প্রজননের সময় পুরুষ ক্যাটেল ফিস নারীদের আকর্ষণ করার জন্য রং পরিবর্তন করে থাকে। এমনকি অনেক পুরুষ তখন নিজেরা নারীদের ছদ্মবেশ ধারণ করে যেন ক্ষমতাশীল পুরুষরা মনে করে, সেও একটা নারী। তারপর এই নারীভেশী পুরুষ তার পছন্দের নারীর সাথে গিয়ে মেলামেশা করে। ক্ষমতাশালীরা ভাবতে থাকে নারী নারীর সাথে মেলামেশা করছে, এতে তাদের কোন সমস্যা নেই। যদি সেই সঙ্গীটা ছেলে হতো তবেই না সমস্যা। কিন্তু তাদেরকে বোকা বানিয়ে ক্ষীণ দেহী পুরুষ ক্যাটলপুরুষ ঠিকই তার পছন্দের নারীর সাথে সঙ্গমে মিলীত হয়ে যায়। এবং নারীরাও এক্ষেত্রে সম্মতি দেয়। কিছু রিসার্চে দেখা গেছে নারীরা ক্ষমতাশীল পুরষদের চেয়েও চতুর পুরুষদেরকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহন করতে বেশী আগ্রহী। প্রায় ৬০% ক্ষেত্রেই ক্ষীণদেহী পুরুষদের এই অনবদ্য কৌশল সফল হয়।

ক্যাটলফিশের প্রজনন

(চিত্রে- পুরুষ ক্যাটলফিসের নারীর ছদ্মবেশে প্রজননের চেষ্টা, সোর্স Wikipedia)

যাইহোক,

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো-
কালার চেঞ্জ করার জন্য এই জাদুকরকে পরিবেশের দিকে তাকাতে হয় না।

অর্থাৎ এদের ব্রেইন অচেতন থাকলেও এই অবস্থায় তারা ক্যামোফ্লেজ করতে পারে। কিন্তু না তাকিয়ে তারা বুঝতে পারে কি করে যে পরিবেশের রং কি রকম? এটা বুঝার জন্য Stanford University র গবেষকেরা স্কুইডের উপর একটি পরীক্ষা চালিয়ে ছিলেন। বলে রাখি, স্কুইড, অক্টোপাস আর ক্যাটেল ফিস কিন্তু একই শ্রেণির প্রাণী। সবাই ক্যামোফ্লেজ করে।

সেই পরীক্ষায় স্কুইডটিকে এনেসথেসিয়া দিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হলো এবং মস্তিষ্কের যে অংশ টি রং পরিবর্তনের সিগনাল দেয় তা অপসারিত করলেও কিছুদিন পর দেখা যায় স্কুইডটির শরীর তখনও রং পাল্টাচ্ছে। এর থেকে বোঝা যায়, এদের রং পরিবর্তনে ব্রেইনের সিগনালের প্রয়োজন নেই, তাদের স্কিন দিয়েই তারা পরিবেশকে অবজার্ভ করতে পারে।

(চিত্রে- ক্যাটলফিশের রঙ বদল করে ছদ্মবেশ ধারণ , সোর্স-asknature)

প্রতিটি প্রাণীর মতো ক্যাটেল ফিসেরও বংশবৃদ্ধি করার তাড়না রয়েছে।
এই তাড়ণা থেকে স্ত্রী ক্যাটেলফিস অনেক পুরুষের সাথে মিলিত হয়। এর কারণ হলো ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সন্তান জন্ম দিয়ে প্রজাতির বৈচিত্র্যতা বৃদ্ধিকরা।

ক্যাটলফিশের প্রজনন

(ক্যাটলফিসের মুখের মাধ্যমে প্রজনন
Image credit – www.flickr.com)

এদের প্রজনন হয় মুখের মাধ্যমে। সংগ্রহকৃত স্পার্মগুলো নারীরা তাদের মুখের গহ্বরে জমা করে। মজার বিষয় হলো- পুরুষদের কাছে এটি অজানা নয় যে, নারীরা বহুগামী। প্রতিটি নারীর জন্য গড়ে ৫-৬ জন পুরুষ থাকে।
তাই প্রজননের সময় মিলিত পুরুষটি সর্বাত্মক চেষ্টা করে যেন মুখের গহ্বর থেকে বাকি পুরুষদের স্পার্ম গুলো সরিয়ে দিয়ে শুধু নিজের অংশটুকু জমা রাখতে যেন, শুধু তারই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জন্ম নিতে পারে।

কিন্তু সংগ্রহকৃত স্পার্মগুলো থেকে কোন গুলোকে নতুন প্রজন্মের জন্য সিলেক্ট করবে তার সম্পুর্ন সিদ্ধান্ত নারীটিই নিয়ে থাকে।। সময় হলে সে ডিমগুলোকে কোন প্রবাল বা পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাচ্চাগুলো জন্ম নেই অনাথ হয়ে।

(চিত্র- ক্যাটল ফিসের লুকিয়ে রাখা ডিম,
সোর্স www.flickr.com)

এতো বুদ্ধিমান ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীগুলো তাদের নবাগত সন্তানের জন্ম দেখার আগেই মারা যায়। কারণ তাদের প্রজননে পর আর বেশি দিন তারা বাঁচতে পারেনা। আস্তে আস্তে তাদের শরীরে পঁচন ধরে। প্রতিরক্ষা ক্ষমতা হারিয়ে যায়।

এমনও দেখা গেছে, তাদের বার্ধক্যের সময় কাঁকড়া তাদের খাওয়া শুরু করলেও তারা কিছু করতে পারেনা, যদিও তখনো তারা জীবিত। এভাবেই প্রায় ১ থেকে আড়াই বছরের আয়ু নিয়ে শেষ হয় ক্যাটলফিসদের জীবন। আর ডিমের ভেতর বড় হতে থাকে মিষ্টি ছানাগুলো। সময় হলে তারা থেকে বেরিয়ে আসে। তবে কিউট বাচ্চাগুলো ভালো ছদ্মবেশ ধরতে না জানলেও গর্তের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে বা দৌড়ে পালিয়ে শত্রুকে ঠিকই ফাঁকি দিতে পারে।

গল্পে গল্পে তো প্রায় সবটা শোনা শেষ। একটু বোরিং কথা বার্তা শুনে শেষ করা যাক তবে।

ক্যাটলফিস অনেক দেশে মানুষের শৌখিন খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।তার তার শরীরের কালচে নীল কালিগুলোও ব্যবহৃত হয় অনেক খাবার রং ও স্বাদের ফ্লেভার হিসেবে।

(চিত্রে- নুডলসের সাথে সস হিসেবে ক্যাটলফিসের কালির ফ্লেভার, সোর্স-Wikipedia)

ক্যাটলফিসকে ফিস বলা হলেও বাস্তবে এটি কোন মাছ না। এটি একটি অমেরুদণ্ডীপ্রাণী। তবে আপনি ভাবতে পারেন তার শরীরের ভেতর তো একটা হাঁড় থাকে, যা Cuttlebone নামে পরিচিত। তবে bone বা হাঁড় বলা হলেও এটি আসলে shell বা একধরনের খোলস, যা শামুখ, ঝিনুকেরও থাকে।

( চিত্রে- ক্যাটলফিসের একমাত্র হাড় , সোর্স- Pixabay.com)

কিন্তু মজার বিষয় হলো, যখন সব প্রাণী আত্মরক্ষার জন্য খোলস শরীরের বাইরে থাকে তখন ক্যাটলফিসের খোলস ভেতরে থাকে কেন?

এর প্রধান কারণ প্লবতা বেলেন্স করতে।

আত্মরক্ষার জন্য তার ক্যামোফ্লেজ করার ক্ষমতা, কালি ছুড়ে দেওয়ায় শত্রুকে বোকা বানানোর জন্য যথেষ্ট। সেক্ষেত্রে তার খোলসের প্রয়োজন পরে না।

কিন্তু cuttlebone শরীরের ভেতরে থাকলে সেই bone এ থাকা ছোট ছোট ছিদ্রগুলো দিয়ে তরল আর গ্যাস আসা যাওয়া করতে পারে৷ ফলে যখন ক্যাটলফিস ডুব দিতে চায়, সেই হাড়টিতে তরলের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর যখন ভেসে উঠতে চায় তখন সেই হাড়টি গ্যাস দিয়ে ভর্তি হয়ে যায়। এভাবে cuttlebone এই প্রাণীটিকে সমুদ্রের তলদেশের এক দারুণ সাঁতারু করে তোলে।

যাইহোক, এই cuttleboneও কিন্তু মানুষের হাত থেকে রক্ষা পায়না।

 

এটি আগে ব্যবহৃত হতো পলিশিং পাইডার হিসেবে স্বর্ণ বা দামী ধাতু পরিষ্কারের কাজে।
এছাড়া টুথপেষ্টে, এন্টাসিড হিসেবে মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে, আর এবসরবেন্ট হিসেবে কেমিস্ট্রি ল্যাবেও ব্যবহৃত হতো।

বর্তমানে বিশেষত পোষা পাখির ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার হিসেবে এটির বাজারে প্রচলন রয়েছে।

ক্যাটলফিসের শ্রেণিবিন্যাসঃ

Kingdom: Animalia
Phylum: Mollusca
Class: Cephalopoda
Order: Sepiida
Family: Sepiidae
Genus: Sepia
Subgenus: Sepia
Species: S. officinalis

এরকম বিচিত্র প্রাণীদের রহস্য নিয়ে ভরপুর সাগরের তলদেশ। বিজ্ঞানীদের ধারণা প্রায় ৮০% প্রাণী এখনো আবিষ্কার করা হয়নি। সাথে থাকুন। আশা করি, সামনে আরো দারুণ দারুন সব টপিক নিয়ে আলোচনা করবো।

wikkipedia , scholarsblog,Britanica , Asknature , Oceanoculus, And more.

লিখেছেনঃ অর্পিতা দাস

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

301,563ভক্তমত
788গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -