Tuesday, October 12, 2021
বাড়িগণিতগণিতের সৌন্দর্য- গোল্ডেন র‌্যাশিও

গণিতের সৌন্দর্য- গোল্ডেন র‌্যাশিও

- Advertisement -

গণিতের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্য হচ্ছে একই জিনিসের বারবার ঘুরে ফিরে আসা। যেমন: ত্রিকোনমিতির সূত্রপাত হয়েছিলো ভূমি পরিমাপ সংক্রান্ত কাজে। কিন্তু আজ ত্রিকোণমিতির অনুপাতগুলো ক্যালকুলাস থেকে শুরু করে বীজগণিত এবং এমনকি পদার্থ বিজ্ঞানের অধিকাংশ গণনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে! একই কথা পাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বৃত্তের পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত থেকে পাইয়ের সূত্রপাত। কিন্তু গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের এমন কোনো ধারা নেই যেখানে পাইয়ের ব্যাবহার নেই। তেমনই একটি রাশি হলো গোল্ডেন র‌্যাশিও বা সোনালী অনুপাত (φ)

গোল্ডেন র‌্যাশিওর (golden ratio) কথা আলোচনা না করে সম্ভবত গণিতের সৌন্দর্য্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়। যদি দুটি সংখ্যার অনুপাত, সংখ্যাদুটির যোগফল এবং তাদের মধ্যে বড় সংখ্যাটির অনুপাতের সমান হয় তাহলে সেই অনুপাতটি হলো গোল্ডেন র‌্যাশিও। এর মান: (1 + √5)/2 বা  1.6180339887498948482… এবং এটি একটি অমূলদ সংখ্যা। অর্থাৎ এর মানকে কখনো দুটি পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতরূপে দেখানো যাবে না কিংবা দশমিকের পর যতই লিখি না কেন লিখে শেষ করা যাবে না। গাণিতিক ভাবে গোল্ডেন র‌্যাশিওকে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে:

যদি  a এবং b দুটি বাস্তব সংখ্যা হয় এবং a < b হয় তাহলে,

গোল্ডেন র‌্যাশিও φ = b/a = (a + b)/b (নিচের চিত্র দ্রষ্টব্য)

ফাইয়ের সংজ্ঞা থেকে অবশ্য এর সৌন্দর্য্যটুকু পুরোপুরি ধরা যাচ্ছে না। এটাকে যদি একটু অন্যভাবে ব্যখ্যা করি তাহলে আরো চমক তৈরি হবে। যেমন বলা যেতে পারে যেই সংখ্যার সাথে এক যোগ করলে ঐ সংখ্যার বর্গ পাওয়া যায় সেটাই হচ্ছে গোল্ডেন র‌্যাশিও বা φ। এই দ্বিতীয় সংজ্ঞাটিকে প্রথম সংজ্ঞা থেকেই পাওয়া যায়। কিভাবে সেটা এখন ব্যাখ্যা করা যাক:

যেহেতু, b/a = (a + b) = φ সেহেতু b : a = φ : 1 = (φ + 1) : φ

অর্থাৎ, φ/1 = (φ + 1)/1

বা, φ2 = φ + 1

অর্থাৎ সোনালী অনুপাতের সাথে এক যোগ করলে তা তার বর্গের সমান হয়।

তো শুরুতেই যে কথা বলছিলাম, গণিতের কোন একটি রাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে আসে এবং চাইলেই তা উপেক্ষা করা যায় না এটাই গণিতের আসল সৌন্দর্য্য। সোনালী অনুপাতও ছড়িয়ে আছে গণিতে, প্রকৃতিতে, আমাদের চিন্তায়, ধ্যান-ধারনায়! একে একে সবগুলোতেই আসছি।

দুই রেখাংশের দৈর্ঘ্য যদি গোল্ডেন র‌্যাশিওর অনুপাতে নেওয়া হয় এবং তাদেরকে বাহু ধরে যদি একটি আয়তক্ষেত্র অংকন করা হয় তাহলে সেটা সবচেয়ে সুন্দর দেখায়! এই তথ্যটি অতিপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জানা ছিলো। প্রাচীনস্থাপত্যকলার সর্বত্রই গোল্ডেন র‌্যাশিওর ছাড়াছড়ি দেখা যায়। প্রাচীন গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে অবস্থিত Acropolis of Athens দূর্গের অনেক স্থাপত্যকর্মই গোল্ডেন র‌্যাশিও বজায় রেখে করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুবিখ্যাত ও দৃষ্টিনন্দন পার্থেনন। নিচের চিত্র থেকে দেখা যাবে কিভাবে পার্থেননের বিভিন্ন অংশের মধ্যে গোল্ডেন র‌্যাশিও উঠে এসেছে।

ইসলামী স্থাপত্যশৈলী, অতিপ্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য নিদর্শন কিংবা বৃটিশ প্রাসাদ সমূহতেও গোল্ডেন র‌্যাশিওর ব্যবহার পাওয়া যায়।

শুধ স্থাপত্য নয় সঙ্গীতের কম্পোজিশনে্ও গোল্ডেন র‌্যাশিওর ছাপ রয়েছে। বলা হয়ে থাকে সঙ্গীতের বিভিন্ন নোটের মাঝে যে স্বরবিরাম থাকে সেগুলো গোল্ডেন র‌্যাশিও অনুযায়ী তৈরি করা হলে তা সবচেয়ে শ্রুতিমধুর হয়। Pon Knott নাম এক ব্যক্তি কিভাবে বিভিন্ন বিখ্যাত সঙ্গীতের কম্পোজিশনে গোল্ডেন র‌্যাশিও ব্যাবহৃত হয়ে এসেছে তা উদঘাটন করে দেখিয়েছেন। সপ্তদশ শতকে ইউরোপের রেনেঁসার সময়কালে যেসব চিত্রকর্ম তৈরি হয় তাতে গোল্ডেন র‌্যাশিও ব্যবহারের হিড়িক দেখা যায়।সেই সময় নানা আঙ্গিকে, নানা মাত্রায় গোল্ডেন র‌্যাশিও ব্যবহার করে চিত্র তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া প্রকৃতিতেও রয়েছে গোল্ডেন র‌্যাশিওর ছড়াছড়ি। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তাঁর বিভিন্ন ছবিতে মানবশরীরের বিভিন্ন অংশের পরিমান চিত্রিত করে দেখিয়েছেন এবং নির্ণয় করে দেখিয়েছেন। প্রকৃতিতে গোল্ডেন র‌্যাশিওর প্রভাব নিয়ে এই লেখার শেষের দিকে বিস্তারিত থাকছে।

যা হোক, আমরা আবার গণিতের মাঝে ফিরে আসি। গোল্ডেন র‌্যাশিওর মান কিভাবে গাণিতিক ভাবে বের করতে হবে সেটা আমরা ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছি।

φ2 = φ + 1

বা, φ2 – φ  – 1 = 0, এই বহুপদীটিকে সমাধান করে φ এর মান বের করলে সেটিই হবে গোল্ডেন র‌্যাশিওর মান। এই সমীকরনের দুটি সমাধানের একটি হচ্ছে, (1 + √5)/2

এই সমীকরণটি দিয়ে বেশ মজার মজার ধারাও তৈরি করা যায়।

যেমন:

φ2 = φ + 1

বা, φ = √(φ + 1)

বা φ = √(√(φ + 1) + 1) [φ এর মান বসিয়ে (φ = √(φ + 1))]

বা φ = √(√(√(φ + 1) + 1) + 1)

এভাবে চলতে চলতে আমরা পাই,

φ = √(√(√(√(…. + 1) + 1) + 1) + 1)

কিংবা,

φ2 = φ + 1

বা,

বা,

বা,

বা,

এভাবে আরো অনেকরকম ধারা তৈরি করা যায়। গোল্ডেন র‌্যাশিওর চমৎকারিত্ব বর্ণনা মাত্র শুরু হলো। ১২০২ সালে Liber Abaci নামের একটি বই লেখা হয় যার লেখকের নাম Leonardo Da Pisa ওরফে Leonardo Bonacci ওরফে Leonardo Fibonacci। ফিবোনাচ্চিকে মধ্যযুগের সবচেয়ে প্রতিভাবান পশ্চিমা গণিতবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি বইতে একটি গাণিতিক ধারা লিপিবদ্ধ করেন যা পরবর্তীতে বহুল আলোচিত ও সমাদৃত হয় এবং ফিবোনাচ্চি ধারা হিসেবে পরিচিতি পায়। ধারাটির সূত্রপাত হয় একটি প্রাকৃতিক ঘটনা সংশ্লিষ্ট সমস্যা থেকে। সমস্যাটি ছিলো এমন:

যদি একজোড়া খরগোশ প্রতিমাসে একজোড়া বাচ্ছা উৎপাদন করে যারা দ্বিতীয় মাস থেকে নিজেরা প্রজননক্ষম হয় তাহলে বছর শেষে মোট কতজোড়া খরগোশ থাকবে। এই সমস্যাটির সমাধানের গ্রাফ নিন্মোক্তভাবে চিত্রায়িত করা যায়। ধরা যাক, A দিয়ে adult বা পুর্ণবয়ষ্ক খরগোশ এবং B দিয়ে baby বা বাচ্চা খরগোশ বোঝানো হয়। তাহলে প্রত্যেক মাস শেষে খরগোশের সংখ্যা হবে নিচের প্রতি লাইনে অবস্থিত A ও B এর পরিমান।

চিত্র অনুযায়ী, ১ম মাসে একটি বাচ্চা খরগোশ দিয়ে শুরু হলো। দ্বিতীয় মাসে একটি বাচ্চাসহ খরগোশের সংখ্যা দুই। তৃতীয় মাসে একটি নতুন বাচ্চা জন্ম নেবে এবং আগের মাসের বাচ্চাটি পূর্ণবয়ষ্ক হবে। মোট সংখ্যা দাঁড়াবে তিন। চতুর্থ মাসে দুটি বাচ্চা জন্ম নেবে এবং মোট খরগোশের সংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচে। তারপরের মাসে আটৈ। তাহলে আমরা ধারাটি পেয়ে যাচ্ছি নিন্মরূপ:

০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮,১৩, ২১ ……..

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতিটি সদস্যকে পাওয়া যায় তার আগের দুটি সদস্যের যোগফল থেকে।  যেমন:

প্রথম সদস্য, ƒ1 = 1

দ্বিতীয় সদস্য, ƒ2 = 1

তৃতীয় সদস্য, ƒ3 = ƒ1 + ƒ2  = 2

চতুর্থ সদস্য, ƒ4 = ƒ2 + ƒ3  = 5

পঞ্চম সদস্য, ƒ5 = ƒ3 + ƒ4  = 8

ষষ্ঠ সদস্য, ƒ6 = ƒ4 + ƒ5  = 13

এভাবে n-তম সদস্য হবে, ƒn = ƒn-2 + ƒn-1

পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এই ধারার তাৎপর্য কী কিংবা এর সাথে এই অধ্যায়ের সম্পর্ক কী? পাঠকের কৌতুহলকে বিষ্ময় দিয়ে প্রতিস্থাপন করে বলছি, ফিবোনাচ্চি ধারার পরপর দুটি সদস্যের অনুপাতই হচ্ছে গোল্ডেন র‌্যাশিও।

তবে যারা গণিত নিয়ে মাথা খাটাতে ভালোবাসেন তাঁরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে ধরে ফেলেছেন যে গোল্ডেন র‌্যাশিও যেহেতু একটি অমূলদ সংখ্যা সেহেতু এটিকে এভাবে ফিবোনাচ্চি ধারার দুটি পূর্ণসংখ্যার অনুপাতের সমান কীভাবে বলা যেতে পারে যেখানে অমূলদ সংখ্যার সংজ্ঞাই হচ্ছে এগুলোকে দুটি পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতের মাধ্যমে লেখা যাবে না। পাঠকের প্রশ্নটি অবশ্যই অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। যদিও এই ধারার পরপর দুটি রাশির অনুপাত অমূলদ নয় তথাপি অনুপাতটি গোল্ডেন র‌্যাশিওর বেশ কাছাকাছি থাকে। আমরা এই ধারায় যতই সামনের দিকে এগোতে থাকব ততই অনুপাতের মান গোল্ডেন র‌্যাশিওর কাছাকাছি যেতে থাকবে এবং একেবারে অসীমে গিয়ে এই অনুপাত গোল্ডেন র‌্যাশিওর সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে।

“গণিতের সৌন্দর্য” বই হতে নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ বইটি পড়া যাবে বিজ্ঞান পত্রিকায়।
বইয়ের সূচীপত্র ও সব অধ্যায়র লিংকের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

302,204ভক্তমত
780গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -