Thursday, October 14, 2021
বাড়িগণিতগণিতের সৌন্দর্য- নাপিত প্যারাডক্স

গণিতের সৌন্দর্য- নাপিত প্যারাডক্স

- Advertisement -

প্যারাডক্স (paradox) হচ্ছে সেই সমস্ত কথা যেগুলো পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয় কিন্তু তথাপী সেগুলোর সত্যতাও উপেক্ষা করা যায় না। যুক্তিবিদ্যায় প্যারাডক্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয় (পর‌্যাডক্সের যথোপযুক্ত বাংলা পরিভাষাটি জানা নেই বিধায় প্যারডক্স শব্দটি দিয়েই চালিয়ে দিচ্ছি)। গণিতেরও বেশ কিছু সমস্যা প্যারাডক্সিয়াল হয়ে যাওয়ায় এই বিষয়ে গণিতের একটি শাখা চালু হয়েছে। অদ্ভুতভাবে তিনি শব্দে গঠিত বাক্যেও প্যারাডক্স গঠন করা যায় এবং এগুলোই হচ্ছে প্যারাডক্সের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সহজ উদাহরণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় “আমি মিথ্যা বলেছি” কিংবা “এই বাক্যটি ভুল”। “এই বাক্যটি ভুল” এটা যদি সঠিক হয় তাহলে বলতে হয় বাক্যটি ভুল! সেই একই কারনে আবার বাক্যটি সঠিক! এটা স্বয়ং রেফারেন্সের (self reference) একটি উদাহরণ। কোনো একটি বিষয়ের প্রমাণ বা সাক্ষী হিসেবে যদি সেই বিষয়টিকেই তুলে ধরা হয় তাহলে এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।

অনেক সময় আপাত সরল এবং সুস্পষ্ট বক্তব্যের মধ্যেও প্যারাডক্স লুকিয়ে থাকে। “বারবার প্যারডক্স (Barber paradox)” বা নাপিত প্যারাডক্স এরকমই একটি প্যারাডক্স যা প্রখ্যাত গণিতবিদ ও দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেলের “রাসেল প্যারাডক্স” থেকে উদ্ভুত। এটাকে এভাবে বর্ণনা করা যায়:

প্যারাডক্স শুরু:

—————————————

ধরা যাক, কোনো এক শহরে একজন পুরুষ নাপিত আছে। সেই শহরে প্রত্যেক পুরুষই দাড়ি কামায় এবং এই কাজের জন্য তাদের দুইধরনের সুযোগ আছে। এই দুটি অপশনের যেকোনো একটি তাদের গ্রহণ করতে হবে।

১. নিজে নিজেই দাড়ি কামানো

২. নাপিতের কাছে গিয়ে দাড়ি কামানো।

—————————————

প্যারাডক্স শেষ।

পাঠক, এখানে লুকিয়ে থাকা প্যারাডক্সটি ধরতে পারছেন? যদি না পেরে থাকেন তাহলে এটাকে আরেকটু ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করা যাক।

“নাপিত হচ্ছে সেই পুরুষ যে এই শহরের সেই সব পুরুষের দাড়ি কামায় যারা নিজেরা নিজেদের দাড়ি কামায় না”।

এই তথ্য থেকে যদি প্রশ্ন করা হয় নাপিতের দাড়ি কে কামায় তাহলেই আমাদের প্যারাডক্সের মধ্যে পড়তে হবে। নাপিতকে দাড়ি কামানোর জন্য দুটি অপশনের একটি বেছে নিতে হবে। প্রথম অপশন হচ্ছে, নিজেই নিজের দাড়ি কামানো। কিন্তু নাপিত যদি নিজেই নিজের দাড়ি কামায় তাহলে সে আসলে নাপিতের মাধ্যমেই দাড়ি কামিয়েছে। আর দ্বিতীয় অপশনটি হচ্ছে নাপিতের মাধ্যমে দাড়ি কামানো। কিন্তু এই ক্ষেত্রে নাপিতের মাধ্যমে দাড়ি কামানো মানে হচ্ছে নাপিত নিজেই নিজের দাড়ি কামানো। কিন্তু নাপিত কেবল তাদের দাড়িই কামায় যারা নিজেরা নিজেদেরর দাড়ি কামায় না। কাজেই শর্ত ভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের পরিস্থিতি স্বয়ং রেফারেন্সিং এর একটি প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। বাট্রান্ড রাসেলের এই সমস্যাটি পরবর্তীতে এতটাই সাড়া ফেলেছিলো যে তার প্রভাব গিয়ে পড়েছিলো গণিতের উপর এবং সেট তত্ত্ব (set theory) নিয়ে গণিতবিদদের পুনরায় চিন্তা করতে এবং এর পরিবর্তন করে ফেলতে হয়েছিলো।

সাধারণ সেট তত্ত্ব অনুযায়ী একটি সেট হচ্ছে কয়েকটি জিনিসের সমাবেশ যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট শর্ত পালন করে। যেমন: আমি যদি বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেট তাহলে এই সেটের একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যক উপাদান থাকবে এবং কারা সেই সেটের উপাদান হবে সেই শর্ত উল্ল্যেখ করে দেয়া হয়েছে।

কিছু কিছু সেট নিজেদের উপাদান নয়। যেমন উপরোক্ত সেটটি। গণিতের শিক্ষার্থীদের সেটের সেট নিয়ে কোনো সেট তৈরি করা হয় নি তাই এই সেটটি নিজেই নিজের কোনো উপাদান নয়। কিন্তু আমি যদি বলি সব ‘অছাত্র’ এর সেট তাহলে সেটটি নিজেও নিজের একটি উপাদান হবে। কেননা এই অছাত্রের সেটটি নিজেও ‘অছাত্র’ (সেটতো আর কোনো ছাত্র হতে পারে না!) অতএব, এই সেটটি নিজেই নিজের একটি উপাদান। কিন্তু যদি একটি সেট গঠনের শর্ত দেয়া হয় এমন: সেই সব সেট নিয়ে গঠিত একটি সেট যারা নিজেরা নিজেদের উপাদান নয়। এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, এই সেটটি কি নিজেই নিজের একটি উপাদান? যদি না হয় তাহলেতো শর্তানুযায়ী এই সেটটি এই সেটের একটি উপাদান তার তাহলে এই সেটটি নিজে আসলে নিজের একটি উপাদান নয়, তাহলে আবার শর্তানুযায়ী এই সেটটি নিজেও নিজের একটি উপাদন!

এই আলোচনা থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে রাসেলের নাপিত প্যারাডক্স এর মত আমাদের সাধারণ সেট তত্ত্বেও প্যারাডক্স আছে। যদিও সেট তত্ত্বের গড়মিল পাওয়া গেলো খুবই সুনির্দষ্ট একটি ক্ষেত্রে। তবে যতই বিরল হোক না কেন গণিতে যখন কোনো তত্ত্ব দেওয়া হয় তা হতে হয় সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত তা না হলে সেসব ত্রুটি ব্যবহার করে যেকোন কিছুকে যেকোনো কিছু প্রমাণ করে দেওয়া যায়। এবং এই ঝামেলা প্রতিরোধ করার জন্য পরবর্তীতে সেট তত্ত্ব সংশোধন করা হয়।

“গণিতের সৌন্দর্য” বই হতে নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ বইটি পড়া যাবে বিজ্ঞান পত্রিকায়।
বইয়ের সূচীপত্র ও সব অধ্যায়র লিংকের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

302,170ভক্তমত
780গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -