Sunday, September 19, 2021
বাড়িফিচারপুলক বড়ুয়াসান দিয়েগোতে বন্যা সৃষ্টি এবং ৫০ জনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত “দ্য রেইনমেকার”

সান দিয়েগোতে বন্যা সৃষ্টি এবং ৫০ জনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত “দ্য রেইনমেকার”

বৃষ্টি সৃষ্টিকারী দ্যা রেইনমেকার

- Advertisement -

১৯১৫ সালে সান দিয়েগো বেশ খরার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল এবং জলাশয়গুলো ক্রমে শুকিয়ে আসছিল। যখন কৃষিকাজের পানি পর্যন্ত শেষ হয়ে যাওয়ার দশা, তখন মিউনিসিপ্যাল অফিস নিরুপায় হয়ে সর্বশেষ একটি সিদ্ধান্ত নিল। তারা একজন সেলাই মেশিন বিক্রয়কর্মীকে নিয়োগ করল। তিনি দাবী করেছিলেন যে, তার আকাশ থেকে বৃষ্টি নামানোর ক্ষমতা রয়েছে।

 

সান দিয়েগো ইউনিয়ন ১৯১৫ সালের ১৪ই ডিসেম্বর জানায়, “সিটি কাউন্সিল গতকাল বৃষ্টি সৃষ্টিকারী হ্যাটফিল্ডের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, দশ হাজার ডলারের বিনিময়ে ১৯১৬ সালের ২০শে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি মোরেনা জলাশয় জলে পরিপূর্ণ করে দিবেন। শুধুমাত্র একজন ছাড়া বাদবাকি সকল সভাসদ ঐ চুক্তিটি সমর্থন করেন।

 

চার্লস ম্যালরি হ্যাটফিল্ডের বৃষ্টি প্রস্তুতকারক হিসাবে মিশ্র খ্যাতি ছিল। একেবারে সেই ক্লাউড বীজ বপনের প্রাথমিক প্রচেষ্টার সময় থেকেই। এই ক্লাউড বীজ বপনের ব্যপারটি সত্যিই কতটা কার্যকর তা নিয়ে আজো বিতর্ক চলমান। তিনি নিজের রান্নাঘরে তার প্রথম পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তিনি এমনভাবে রাসায়নিক দ্রব্যগুলি মিশ্রিত করেছিলেন যে, সম্ভবত এখন কেউ এই কাজ করলে নির্ঘাত এফবিআই এসে তাকে পাকড়াও করবে। তিনি দাবী করেছিলেন, তার ২৩ টি রাসায়নিকের সংমিশ্রণটি কেটলি থেকে নির্গত বাষ্প নিজের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে তিনি বৃষ্টি সৃষ্টিকারী মেঘ আকর্ষনের চেষ্টা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি বলেন,আমি বৃষ্টি তৈরি করি না। এটি একটি অযৌক্তিক দাবি। আমি কেবল মেঘ আকর্ষণ করি এবং তারা বাকী কাজগুলি করে”।

 

রাসায়নিকগুলি লম্বা টাওয়ারের শীর্ষে স্থাপন করে ছেড়ে দেওয়া হত। তখন তারা লিমবার্গার পনির কারখানা থেকে নির্গত গন্ধের কাছাকাছি একটি তীব্র গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। এবং এতে করে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হত।

চার্লস ম্যালরি হ্যাটফিল্ড
বৃষ্টি সৃজনকারী চার্লস ম্যালরি হ্যাটফিল্ড, টুপি মাথায় দিয়ে মাঠে দাঁড়ানো। ছবি: পাবলিক ডোমেইনঃ দ্য রেইনমেকার: এমেরিকান ‘প্লুভিকালচার’ টু ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু।

লস এঞ্জেলসের আবহাওয়াবিদেরা হ্যাটফিল্ডের দাবী হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তাই ১৯০৪ সালে সে বাজি ধরে বলেছিল যে, ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে এপ্রিলের শেষের মধ্যে কমপক্ষে ৪৬ সেন্টিমিটার (১৮ ইঞ্চি) বৃষ্টিপাতের নিশ্চয়তা সে দিতে পারবে। যদি সে সফল হয়, তবে তাকে ১০০০ ডলার দিতে হবে, নতুবা সে তার পারিশ্রমিকের এক পয়সাও নিবে না।

 

বৃষ্টিপাত ঘটাতে সক্ষম এমন একজন মানুষের ধারণা সংবাদপত্রগুলো লুফে নিল এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন ঠাট্টা মশকরা শুরু করল। তারা হ্যাটফিল্ডকে নির্দিষ্ট কিছু ছুটির দিনে এবং প্যারেডে বৃষ্টি না ফেলার জন্য অনুরোধ করে ফোঁড়ন কাটতে লাগল। কিন্তু যখন বৃষ্টিপাত তার প্রতিশ্রুত ১৮ ইঞ্চি ছাড়িয়ে গেল, তখন জনসাধারণ হ্যাটফিল্ডের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিতে বাধ্য হল।

 

চারিদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি লন্ডন শহরের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার সম্পর্কে গল্প ছাপা শুরু হল। আবহাওয়াবিদেরা অবশ্য তাকে পছন্দ করেনি এবং তার দাবিগুলি অযৌক্তিক বলে হেসে উড়িয়ে দিল। তারা হ্যাটফিল্ডের দাবী ছাপানো চিঠিপত্র বিভিন্ন সংবাদপত্রে পাঠাতে শুরু করল। কিছু কিছু সংবাদপত্র ঐ দাবিগুলো তাদের পত্রিকায় ছাপিয়েছিল। এবং এরই মধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেল। তার নিজের শহরে, কিছু ব্যবসায়ী ছাতার উপর হ্যাটফিল্ডের নাম ছাপিয়ে বিক্রি করা শুরু করল।

 

হ্যাটফিল্ড আরো আরো দুঃসাহসী কিছু দাবী করা শুরু করল, যেমনঃ সে সাহারা মরুভূমিতে জল দেওয়ার মত অবিশ্বাস্য রকমের সব চুক্তি করতে চায়। এইসব কথার ফুলঝুরির কারণে সে বেশ ভাল ভাল কাজ পেতে লাগল। কিছু কিছু চুক্তি ছিল খুব লোভনীয়। তার সময়ের জন্যে তাকে পারিশ্রমিক দেয়া হত এবং বৃষ্টি শুরু হলে তাকে বোনাস দেয়া হত। একজন সংশয়বাদী ব্যক্তি অবশ্য বলতে পারেন যে, যাদুকরী রাসায়নিকগুলির কথা যখন সে কোনভাবেই প্রকাশ করবে না, তখন যেকোনও ব্যক্তির পক্ষে সেই চুক্তির টাকায় বসে বসে খাওয়া এবং বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করা খুব সহজ কাজ। তারপর যখন বৃষ্টি শুরু হবে, তখন শুধু নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে হবে!

তার পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন সময় লোকেরা যেমন খুশি ছিল, তেমনি অনেক সময় অনেকে তার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছিল। বৃষ্টিপাত করাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অনেকবার সে তার পারিশ্রমিক পায়নি। ১৯০৭ সালের শীতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পরে তা থামাতে অস্বীকার করায় কৃষকেরা হ্যাটফিল্ডের উপর ভীষণ চটে যায়। একজন বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে তার পরিষেবাগুলি আবহাওয়ার মতো অনিশ্চিত বলে মনে হতে পারে। তবে মজার ব্যপার হল, তার কাছে এমন কাজের চুক্তি আসতেই থাকল।

সান দিয়েগো শহরে এই ধরণের বাজি ধরার সময় হ্যাটফিল্ড কিছুটা গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি নিয়েছিল। চুক্তিটি ছিল তার অন্যসব স্বাভাবিক চুক্তির মত,কোন বৃষ্টি নেইতো কোন টাকা নেই তার প্রতিশ্রুতি ছিল যে, সে এপ্রিলের আগে জলাশয়টি উপচে ফেলবে। যথারীতি নতুন বছরের প্রথম দিকে বৃষ্টি শুরু হল। তখন পত্রিকার সংবাদ শিরোনামগুলো এই ঘটনাকে রেইনমেকারের সাফল্য বলে প্রচার করল।

কিন্তু বৃষ্টি হতেই থাকল। এমন ধারায় বৃষ্টি পড়তে থাকল যে, কেউ আর সেই বৃষ্টি আনার কৃতিত্ব নিতে চাইবে না। এমন মুষল ধারার বৃষ্টি যেন কোন ক্রোধান্বিত দেবতার কাজ বলে মনে হচ্ছিল। বন্যার পানিতে বিভিন্ন স্থানে ভূমিধ্বস ও বাঁধ ভেঙ্গে ঘরবাড়ি ভেসে প্রায় ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে শুধু বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ভেসে প্রাণ হারাল এক ডজনেরও বেশি মানুষ।

 

এই বন্যা “হ্যাটফিল্ড বন্যা” নামে পরিচিতি লাভ করল, যেটি কিছুটা হলেও “জনসংযোগ দূর্যোগ” এর কারণে হয়েছিল। তবুও হ্যাটফিল্ড তার পারিশ্রমিক দাবি করেছিল, কারণ তার বিশ্বাস, তার দাবী যৌক্তিক। বন্যার ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল তার দায়ভার গ্রহণ করতে রাজী হলে নগর কর্তৃপক্ষ সানন্দে তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দেয়ার কথা জানাল। পারিশ্রমিক পেতে হ্যাটফিল্ডের জন্য সমস্যাটি ছিল যে তাকে প্রমাণ করতে হবে ঐ প্রতিকূল আবহাওয়া কেবল ঈশ্বরের কাজ ছিল না। তবে এটি করার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে সান দিয়েগোকে লন্ডভন্ড করে ফেলা এবং ৫০ মানুষের মৃত্যুর জন্যে সে নিজে দায়ী। অর্থ আদায়ের জন্যে মামলা করে সে ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ সে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি যে, সে ঐ আবহাওয়া তৈরি করেছিল। কারণ সে কখনোই তার রাসায়নিক মিশ্রনের ফর্মূলাটি কারো কাছে প্রকাশ করতে রাজী ছিল না। অবশেষে ঐ বৈরী আবহাওয়া এবং এর ধ্বংসলীলা ঈশ্বরের কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছিল।

 

হ্যাটফিল্ড অবশ্য তার সমসাময়িক অন্যান্য রেইনমেকার বা বৃষ্টি সৃজনকারীদের চেয়ে বেশি সফল ছিল। তার সাফল্যের সম্ভাব্য কারণ তার রাসায়নিক মিশ্রণ নয়। হ্যাটফিল্ড সম্ভবত তার চুক্তিগুলো খুব সাবধানতার সাথে নির্বাচন করত। তদুপরি, তার বৃষ্টি নামানোর ব্যর্থতার চেয়ে তার সাফল্যের ব্যাপক প্রচার তাকে এই সুনাম অর্জনে সহায়তা করেছিল। সে আবহাওয়ার তথ্য-উপাত্তগুলো খুব ভালভাবে অধ্যয়ন করত এবং বৃষ্টি শীঘ্রই আসবে কিনা তার একটি সম্ভাব্য ধারণা নিয়ে কোন নির্দিষ্ট এলাকায় বৃষ্টিপাত ঘটানোর চুক্তিভিত্তিক কাজ নেয়ার ঝুঁকি নিয়ে থাকত।

 

সে নিজেই নিজেকে ময়েশ্চার এক্সিলেটর বা আর্দ্রতা বৃদ্ধিকারী নাম দেয়। তার এই নামকরণ তার কাজের সত্যতার কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দেয়।

 

-পুলক বড়ুয়া

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

302,509ভক্তমত
779গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -