Wednesday, October 13, 2021
বাড়িজীবজগৎদশ লক্ষ বছরেরও বেশি পূর্বের ম্যামথের ডিএনএ বিশ্লেষণ

দশ লক্ষ বছরেরও বেশি পূর্বের ম্যামথের ডিএনএ বিশ্লেষণ

সবচেয়ে পুরোনো ডিএনএ বিশ্লেষণ

- Advertisement -
ছবি: রাশিয়ার রেংগেল দ্বীপে ম্যামথের দাঁত হাতে গবেষণাপত্রের মূল লেখক, লাভ ড্যালেন এবং সহকারী লেখিকা, পেট্রিসিয়া প্যাকনেরোভা।

দশ লক্ষ বছরেরও আগে সাইবেরিয়ার সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে চরে বেড়ানো এক ম্যামথের বিশাল দাঁত হতে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই প্রথমবারের দশ লক্ষ বছরেরও বেশি পুরানো কোন প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ পুনরুদ্ধার করা হল। এর আগে সবচেয়ে প্রাচীন ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল পাঁচ লক্ষ ষাট হাজার হতে সাত লক্ষ আশি হাজার বছর আগের একটি ঘোড়া হতে।

বরফ যুগের এই দৈত্যাকার প্রাণীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায় কীভাবে ম্যামথেরা বিবর্তিত হয়েছিল এবং হিমশীতল জলবায়ুতে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। এর মাধ্যমে ম্যামথ-পূর্ব অজানা প্রজাতিগুলি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

ছবি: নবলব্ধ জিনগত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে পশমী ম্যামথের পূর্ববর্তী সাইবেরিয়ার সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে চরে বেড়ানো ম্যামথগুলির এই চিত্র পুনর্গঠন করা হয়েছে। ছবি: বেথ জায়কেন / পেলিওজেনেটিক্স কেন্দ্র।

স্টকহোমের সেন্টার ফর পেলিওজেনেটিক্স এর বিবর্তনীয় জেনেটিক্সের অধ্যাপক লাভ ড্যালেনের মতে,
এই ডিএনএ অবিশ্বাস্য রকমের পুরনো। এই নমুনাগুলি ভাইকিংয়ের থেকে হাজার গুণ বেশি পুরনো, এমনকি মানব এবং নিয়ান্ডারথালদের সময়ের চেয়েও পুরনো।

নেচার জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে, গবেষকদের একটি আন্তর্জাতিক দল, ১৯৭০ এর দশকে সাইবেরিয়ান পারমাফ্রস্ট থেকে সংগ্রহ করা, পৃথক তিনটি ম্যামথের আক্কেল দাঁত থেকে ডিএনএকে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা ভূতাত্ত্বিক তথ্য ব্যবহার করে এবং ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দাঁতগুলির বয়স নির্ধারণ করেন।

সবচেয়ে প্রাচীনতম ম্যামথের দাঁতটি বার লক্ষ হতে ষোল লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছর আগের। বার লক্ষ বছরের হিসেবটি করা হচ্ছে বায়োস্ট্রেটগ্রাফি নামে পরিচিত একটি পদ্ধতি অনুসারে যেখানে মাটির স্তরগুলিতে ঐ সময়ে প্রাপ্ত ছোট ছোট ইঁদুরের উপস্থিতির সাপেক্ষে বয়স নির্ধারণ করা হয়।

গবেষকেরা ঐ এলাকার পাথর এবং স্তরীভূত মাটিও পরীক্ষা করেন, যা পেলিওম্যাগনেটিজম নামে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের অবস্থান ব্যবহার করা হয়, যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে এবং পাথরে চৌম্বকীয় খনিজের নিশানা রেখে গেছে। এই পদ্ধতির দ্বারা পাথরের গায়ে খনিজ পদার্থের নিশানা দেখে জীবাশ্ম এবং শিলার জন্য বয়স নির্ধারণ করা হয়।

গবেষকরা সবচেয়ে পুরনো অর্থ্যাৎ ষোল লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বছর আগের অনুমানটি করছেন ঐ ম্যামথের জিনোম থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে।

ড্যালেন আরো বলেন,
“ফসিলের বয়সের অনুমানগুলি ভিন্ন হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সম্ভবত ক্রেস্তভকা নমুনাটি মূলত একটি পুরানো স্তর থেকে এসেছে। তবে কোন এক পর্যায়ে এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং পুনরায় নতুন একটি স্তরে জমা হয়।” “তবে খুব সম্ভবত, আমাদের আণবিক ঘড়ির হিসেবে কিছুটা গরমিল হতে পারে,” তিনি বোঝাতে চাইছিলেন যে ফসিলের দিন-তারিখ একেবারে নিখুঁতভাবে নির্নয় করা বিজ্ঞানের কাজ নয়। “তবে যেভাবেই হোক, উভয় ধরণের পদ্ধতি অনুযায়ী ফসিলগুলো দশ লক্ষ বছরেরও বেশি পুরনো বলে প্রমাণিত।”

আরো চমকপ্রদ ঘটনা:

ক্রেস্তভকা ম্যামথের নামকরণ করা হয়েছিল এর ফসিল প্রাপ্তিস্থলের নাম অনুযায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে যে এই বিশেষ ধরণের ম্যামথ প্রায় কুড়ি লক্ষ বছর আগে অন্যান্য সাইবেরিয়ান ম্যামথ থেকে বিবর্তনের ধারায় ভিন্ন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়েছিল।

ছবি: বিশাল দাঁতগুলির নমুনা, যার মধ্যে দুটি দশ লক্ষ বছরেরও বেশি পুরনো বলে প্রমাণিত হয়েছে।

গবেষণাপত্রের সহ-লেখক টম ভ্যান ডের ভাল্ক, যিনি সুইডিশ মিউজিয়াম অভ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’র একজন পোস্টডক্টোরাল গবেষক, বলেছেন যে, “এটি আমাদের একেবারেই বিস্মিত করে দিয়েছিল। পূর্ববর্তী সমস্ত গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে সাইবেরিয়ায় সেই সময়ে একটিমাত্র প্রজাতির ম্যামথ ছিল, যেটাকে steppe mammoth বা সাইবেরিয়ার সুবিস্তীর্ণ তৃণভূমিচারী ম্যামথ বলা হয়”।

তিনি আরো বলেন, প্রাপ্ত ফসিলগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ম্যামথের দুটি ভিন্ন জিনগত বংশ ছিল, যা দু’টি ভিন্ন প্রজাতির ম্যামথের হয়ে থাকতে পারে। তারা আরও ধারণা করেন যে, এই ম্যামথটি সেই অজানা বংশের অন্তর্গত যেগুলি প্রায় পনের লক্ষ বছর আগে উত্তর আমেরিকায় বসবাস করত।

দ্বিতীয় প্রাচীনতম ম্যামথটি প্রায় তের লক্ষ চল্লিশ হাজার বছর আগে বাস করত এবং পশমযুক্ত ম্যামথের পূর্বপুরুষ ছিল। পশমযুক্ত ম্যামথেরা প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া সর্বশেষ ম্যামথ। গবেষকেরা এর জিনোমকে প্রায় সত্তর লক্ষ বছর আগে বেঁচে থাকা পশমযুক্ত ম্যামথের সঙ্গে এবং তাদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কিছু আগের ম্যামথের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এদের আর্কটিক অঞ্চলে বসবাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত জীব বৈশিষ্ট্যগুলি যেমনঃ পশম, চর্বি এবং শীত সহ্য করাদশ লক্ষ বছর আগে উপস্থিত ছিল এবং সময়ের সাপেক্ষে ধীরে ধীরে এগুলো বিকশিত হয়েছে। তাদের খুঁজে পাওয়া এবং বিশ্লেষণ করা সবচেয়ে নবীনতম ফসিলটি ছিল আজ থেকে ছয় লক্ষ আশি হাজার বছরের পুরনো প্রথম দিককার এক পশমযুক্ত ম্যামথের দাঁত।

আরো পুরনো ডিএনএ:

গবেষকরা বলেন, যদিও পারমাফ্রস্ট ডিএনএ সংরক্ষণে সহায়তা করেছিল, তবুও নমুনাগুলি থেকে তা সংগ্রহ করা খুব একটি কঠিন ব্যপার ছিল। ডিএনএগুলো খুব ছোট ছোট টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়েছিল যা গবেষকরা এক বিলিয়নেরও বেশি টুকরোর একটি জিগস ধাঁধার সঙ্গে তুলনা করেন। প্রক্রিয়াটি সহজসাধ্য করার জন্য, তারা একটি জীবিত আফ্রিকান হাতির বিশদ জিনোম ব্যবহার করেন, যা এই জিগস ধাঁধা সমাধানে বেশ সাহায্য করেছিল।

ড্যালেন বলেন,
জিগস ধাঁধার মোড়কের ছবি যেভাবে ধাঁধার সমাধানে সহায়তা করে, আমরাও হাতির নমুনা জিনোমকে একইভাবে ব্যবহার করেছি।

লক্ষ-লক্ষ বছরের পুরানো ডিএনএ সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হওয়ায় আশা করা যায় বিজ্ঞানীরা অদূর ভবিষ্যতে আমাদের নিজেদের সহ আরও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব এবং বিবর্তনের ধারাগুলি সনাক্ত করতে সক্ষম হবেন। গবেষকেরা বলেন যে, তাত্ত্বিক পর্যায়ে ছাব্বিশ লক্ষ বছরের পুরনো নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা সম্ভব।

সুপ্রাচীনতম পারমাফ্রস্টের ধরণই এমন যে এটি মাটিকে বছরের পর বছর ধরে প্রচন্ড ঠান্ডায় জমিয়ে রাখে এবং ডিএনএ এর পঁচনরোধে সহায়তা করে। পারমাফ্রস্ট অঞ্চলের বাইরে প্রাচীন ডিএনএ এর এমন নিখুঁত সংরক্ষণ আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয় বলে তারা জানিয়েছেন।

২০১৪ সালে সাইবেরিয়ার ইয়াকুটিয়ায় আবিষ্কৃত হিমশীতল ঠান্ডায় জমাট বাঁধা ইউকা নামের তরুন এক ম্যামথের মূল দেহাবশেষ।

পারমাফ্রস্ট মাটির স্তর দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে। গ্রীষ্মকালে এর বরফ গলে যায় এবং কখনও কখনও এতে করে সুসংরক্ষিত অবস্থায় ম্যামথ এবং গুহা ভাল্লুক ও পশমযুক্ত গন্ডারের মতো বরফযুগের প্রাণীদের দেহাবশেষ বেরিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে এদের নরম টিস্যুগুলোও অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়।

ড্যালেন বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাম্প্রতিক দশকগুলিতে এই বরফ গলার সময় দীর্ঘতর হয়ে উঠেছে এবং এই অঞ্চলে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রাচীন ফসিল সন্ধানের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে”।

সিএনএন অবলম্বনে
-পুলক বড়ুয়া

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

302,192ভক্তমত
780গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -