দু’চোখ ভরে এই নাদুসনুদুস শুকরটি দেখে নিন। ধারণা করা হচ্ছে, এটিই মানুষের আঁকা পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন শিল্পকর্ম।

চুনাপাথরের আস্তরের উপর লালচে-বেগুনী রঙে আঁকা এই পেটমোটা শুকরের চিত্রকর্মটি আবিষ্কার করা হয় ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের মারোস-পেংকেপে। ঐ গুহায় মূল শুকর চিত্রকর্মটির পাশাপাশি মুখোমুখি অবস্থানরত আরো দু’টি শুকরের আংশিক ছবি পাওয়া গেছে। এছাড়া সেখানে মানুষের হাতের চারটি ছাপচিত্রও পাওয়া গেছে। নতুন একটি গবেষণায় প্রত্নতত্ত্ববিদেরা কার্বন-ডেটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই চিত্রকর্মটি নিদেনপক্ষে ৪৫,৫০০ বছরের পুরনো। বর্তমানে এটিই হচ্ছে আধুনিক মানুষের আবিষ্কৃত সর্বপ্রাচীন গুহাচিত্র।

অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের শীর্ষস্থানীয় লেখক এবং প্রফেসর অ্যাডাম ব্রুম বলেন, “আমি যখন প্রথমবারের মতো এই শিল্পটি দেখলাম, তখন আমার কাছে পুরো ব্যপারটিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছিল। শিল্পকর্মটি দেখে মনে হয়, ঐ বন্য শুকর তিনটি কোন সামাজিক কাজে সেখানে অবস্থান করছে। প্রত্যেকটি শুকরের ছবির একটি স্বতন্ত্র গল্প বা দৃশ্য আছে বলে মনে হওয়ার পুরো ব্যপারটি প্রাচীন গুহাচিত্রের মধ্যে খুবই অপ্রতুল। এই চিত্রকর্মটি দেখে আমি মুগ্ধ।”

ব্রুম্ আরো বলেন, ২০১৭ এর ডিসেম্বরে ঐ জায়গাটির প্রথম সন্ধান পেয়েছিলেন দক্ষিণ সুলাওসির কোঞ্জো-ভাষী সম্প্রদায়ের ইন্দোনেশিয়ান প্রত্নতাত্ত্বিক বসরান বুরহান। গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং এই গবেষণাপত্রের সহ-লেখক বরসান বুরহানকে ঐ উপত্যকায় বাস করা স্থানীয় বুগিস কৃষকরা সেই গুহায় প্রথমবারের মত নিয়ে যায়। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, স্থানীয় কৃষকেরা গুহার শিল্পটি আগে কখনও খেয়াল করেনি। গুহাচিত্রের নতুন এই আবিষ্কার “সায়েন্স অ্যাডভান্সেস” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

ছবিতে আঁকা শুকরটি একটি জীবিত শুকরের আকারের প্রায় সমান। ছবি: এ এ অক্টাভিয়ানা

লেয়াং টেডংঞ্জ পেইন্টিং” নামে পরিচিত এই চিত্রকর্মটিতে একটি সুলাওয়েসি অঞ্চলের আঁচিলওয়ালা শুকরের (Sus celebensis) ছবি আঁকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঁচিলওয়ালা মুখের জন্য সুপরিচিত এই শুকরটি এই দ্বীপে পাওয়া এক প্রজাতির বুনো শুকর। চিত্রকর্মটি আকারে প্রায় ১৩৬ সেন্টিমিটার X ৫৪ সেন্টিমিটার (৫৪ ইঞ্চি X ২১ইঞ্চি), যা প্রাণীটির প্রকৃত আকারের প্রায় সমান।

এই চিত্রকর্মটিকে একটি রূপক শিল্পকর্ম হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে কারণ এটি বিমূর্ত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত, বাস্তব জগতের একটি বাস্তব বস্তুর স্পষ্ট চিত্রায়ন। এর আগে বোর্নিওর একটি গুহায় পাওয়া প্রায় ৪০,০০০ বছরের পুরানো বন্য গবাদি পশুর চিত্রকে পৃথিবীর সুপ্রাচীন রুপক শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হত। লেয়াং টেডংঞ্জ চিত্রকর্মটি এখন সবচেয়ে প্রাচীন হিসাবে বিবেচিত হলেও গবেষকরা মনে করেন না যে এটিই এ ধরণের একমাত্র শিল্পকর্ম। তারা ধারণা করেন, আরো অনেক অনুরূপ শিল্পকর্ম এই বিস্তৃত অঞ্চলে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।

শিল্পকর্ম তৈরির দক্ষতা মানবজাতির ইতিহাসে একটি প্রধান মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে কারণ শিল্পকর্ম মানুষের জটিল এবং বিমূর্ত চিন্তার অসাধারণ ক্ষমতা প্রদর্শন করে। অতীতে মানুষের এই আচরণগত ও জ্ঞানভিত্তিক বৈশিষ্ট্যগুলির উদ্ভবের ব্যাখ্যা মূলত ইউরোপ কেন্দ্রিক ছিল। ইউরোপে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ছিল প্রায় ৪০,০০০ বছর বা তাঁর পরবর্তী সময়ের আবিষ্কৃত চিত্তাকর্ষক গুহা শিল্প। এই নতুন আবিষ্কারটি এই পুরানো ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে নতুনভাবে শিল্পকর্মের ইতিহাস লিখতে সহায়তা করবে। নতুন আবিষ্কৃত এই শিল্পকর্মটি এটিই প্রমাণ করে যে, সম্ভবত ইউরোপের বাইরে বহু আগেই মানুষের অসাধারণ শৈল্পিক স্বত্বা ও ঐতিহ্য বিকশিত হয়েছিল।

ব্রুম বলেন, “আমাদের নতুন এই আবিষ্কার অনুযায়ী মনুষ্যসৃষ্ট গুহা শিল্পের ঐতিহ্য সম্ভবত সর্বপ্রথম ইউরোপে বিকশিত হয়নি। খুব সম্ভবত এশিয়া বা আফ্রিকার কোন অঞ্চলে হোমো সেপিয়েনের বিবর্তনের পথে এই শিল্প ঐতিহ্যের সূচনা ঘটে”।

iflscience.com অবলম্বনে
পুলক বড়ুয়া