উৎক্ষেপণের ছয় বছর তিন দিন পর জাপানি মহাকাশ সংস্থা (JAXA) হায়াবুসা২, সাফল্যের সঙ্গে রিয়ুগু নামক গ্রহাণু বিশদভাবে পর্যবেক্ষণ শেষে এর পৃষ্ঠদেশে চারটি ছোট রোভার স্থাপন করে এবং প্রথমবারের মত একটি গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। এখন সেই নমুনাগুলি নিরাপদে পৃথিবীতে নিয়ে আসা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ পে-লোডটি অস্ট্রেলিয়ার ওয়ুমেরা মরুভূমিতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫:৪৭ থেকে ৫:৫৭ এর মধ্যে অবতরণ করে। এটি সেই একই স্থান যেখানে এর পূর্বসূরি হায়াবুসা তার গ্রহাণু নমুনা ফেলেছিল। JAXA এর একটি দল গত মাস থেকেই (মূলত কোভিড বিধিনিষেধের কারণে) এই বদ্ধ আধারটি সংগ্রহ করার জন্য দেশটির দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

এই গ্রহাণুর পৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠের নমুনাগুলির বাছাই ও শ্রেণিবদ্ধ করণের কাজটি করবে JAXA এর একস্ট্রাটেরেস্ট্রিয়াল স্যাম্পল কিউরেশন সেন্টার। নমুনাটি দূষণমুক্ত নিশ্চিত করার পর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের পক্ষে তাদের গবেষণার জন্য এটির অংশ বিশেষের জন্য অনুরোধ করা সম্ভব হবে। নমুনার আধারটিকে “তমতেবাকো” নামে উল্লেখ করা হচ্ছে, যার মানে দাঁড়ায় “মূল্যবান সম্পত্তির বাক্স“।

হায়াবুসার ফিরিয়ে নিয়ে আসা আধারের প্রতিকৃতি।

আজ আমরা অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উদযাপন করি যার ফলে এই নমুনাগুলি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। রিয়ুগু গ্রহাণুর পৃষ্ঠদেশে হায়াবুসা২ এর খুব সংক্ষিপ্ত স্পর্শকালীন সময়ে এই নমুনাগুলি সংগ্রহ করা হয়েছিল। নমুনা মাটি উত্তোলনের উদ্দেশ্যে গ্রহাণুটির পৃষ্ঠদেশে হায়াবুসা২ থেকে একটি ছোট প্রক্ষেপক ছোড়া হয়। এরপর একটি নলের মাধ্যমে শোষণ করে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। উপপৃষ্ঠদেশের নমুনা ও একইভাবে একটি প্রক্ষেপ্ক ব্যবহার করে সংগ্রহ করা হয়, তবে এটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। মাহাকাশযান হায়াবুসা২, রিয়ুগু গ্রহাণুর উপপৃষ্ঠের নমুনা সংগ্রহের জন্য একটি ২.৫ কিলোগ্রাম (৫.৫ পাউন্ড) ওজনের বুলেট ঐ গ্রহাণুটিতে ছোড়ে। বুলেটের আঘাতে উৎক্ষিপ্ত ধ্বংসাবশেষ মহাকাশযানের ক্ষতি করতে পারে এই আশঙ্কায় নমুনা সংগ্রহের কাজটি তৎক্ষণাৎ সম্ভব হয়নি। সুতরাং ধূলিকণা স্থির হয়ে যাওয়া পর্যন্ত হায়াবুসা২ কে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ধূলিকণা স্থির হওয়ার পর তা সংগ্রহ করার জন্যে মহাকাশযানটি গ্রহাণুর কাছে নেমে এসেছিল। এমনকি নমুনা ছাড়াই মহাকাশযানটি ইতিমধ্যে রেকর্ড ভঙ্গ করেছিল এবং গ্রহাণু সম্পর্কে আরও ভাল বোঝার জন্য অবদান রেখেছিল। মহাকাশযানটি প্রথমবারের মতো সফলভাবে একটি গ্রহাণুতে রোভার অবতরণ করাতে পেরেছিল, যা গ্রহাণুর পৃষ্ঠে তোলা চিত্রগুলি প্রথমবারের মত পৃথিবীতে ফেরত পাঠিয়েছিল।

আজ JAXA এবং হায়াবুসা২ দলের জন্য একটি অবিস্মরণীয় দিন, তবে এটিই শেষ নয়। মহাকাশযানটি আরো একটি বর্ধিত মিশনে যাত্রা করতে যাচ্ছে। এটির অতিরিক্ত চালিকা শক্তিকে ধন্যবাদ। মহাকাশযানটি এর অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। এটি এখন ১৯৯৮ কেওয়াই২৬ নামে পরিচিত একটি অদ্ভুত গ্রহাণুর কক্ষপথে চলেছে। আশা করা হচ্ছে, ২০৩১ সাল নাগাদ হায়াবুসা২ এই গ্রহাণুতে পৌঁছাবে। গ্রহাণুটি মাত্র ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) ব্যাসের এবং এটি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে নিজ অক্ষে আবর্তন করছে।

পরের দশকে ও হায়াবুসা২ নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকবে না। এটি ঊষা ও গোধূলি সময়ের আলো, সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা সৌরজগতের ধূলিকণা এবং একই সাথে আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোকেও পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়াও এটি ২০২৬ সালে পাশ ঘেঁষে চলে যাওয়া মাঝারি আকারের গ্রহাণু ২০০১ সিসি২১ কে পর্যবেক্ষণ করবে। JAXA এর গবেষক দলটি অবশ্য নিশ্চিত নয় যে তারা এই পর্যবেক্ষণ থেকে যথেষ্ট পরিমানে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবে কিনা কারণ এই অভিযানটি এত দ্রুততার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রস্তুত নয়।

এই অভিযানের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হল ১৯৯৮ কেওয়াই২৬, যা পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়তে পারে এরকম সম্ভাব্য অন্যান্য গ্রহাণুগুলির মত। সুতরাং এটির নিবিড় পর্যবেক্ষণ আমাদের এই গ্রহাণুগুলোর বিরুদ্ধে আরও ভালভাবে প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে।

iflscience অবলম্বনে
পুলক বড়ুয়া