কেমন করে গবেষণাগার হতে জীবাণু ছড়িয়ে পড়া রোধ করা হয়

0
978

আপনি যদি গুগলে খোঁজ করেন করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি কোথায়, তাহলে একটি উত্তর পাবেন, এটি একটি গবেষণাগার হতে ছড়িয়ে পড়েছে (যদিও তথ্যটি ঠিক নয়)। গবেষণাগার হতে জীবাণু ছড়িয়ে মহামারী ছড়িয়ে দিয়েছে এই পটভুমিতে প্রচুর মুভি, বই এবং ভিডিও গেম তৈরি হয়েছে। কিন্তু যখন জৈবনিরাপত্তা গবেষক এ্যালেন হেমকে গবেষণাগার হতে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার একটি ঘটনা উল্লেখ করতে বলা হলো তখন তাঁর চোখে-মুখে শূন্যতা বিরাজ করে। কারণ এধরনের ঘটনা আজ পর্যন্ত ঘটেনি!

রোগ নিয়ন্ত্রন এবং প্রতিরোধ কেন্দ্রগুলো জৈবনিরাপত্তা ঝুঁকিগুলোকে ভয়াবহতা অনুসারে এক থেকে চার পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেনীতে ভাগ করে থাকেন। একমাত্রার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে একজন সুস্থ্য মানুষের শরীর হতে রক্ত নিয়ে কাজ করা, আর চারমাত্রায় রয়েছে উচ্চ মৃত্যুর হার এবং তীব্র সংক্রামক বিষয় বস্তু, যেমন: ইবোলা ভাইরাস ইত্যাদির গবেষণা।

মাত্রা অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা পোষাক পরা এবং সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্নতার চর্চা করা। অ্যালকোহল ও ব্লিচং এজেন্ট দিয়ে জীবানু নাশ করা এবং গবেষণাগারের বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা। তবে জৈব নিরাপত্তার নানাবিধ প্রক্রিয়া গবেষকগণ গবেষণাগারে প্রবেশের অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়।

এ্যালেন জানান, অণুজীব গবেষণায় অর্থবরাদ্দ পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারগুলোকে জৈবনিরাপত্তা কমিটি গঠন করতে হয়। জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিদর্শকগণ প্রতিবছর গবেষণাগার, যন্ত্রপাতি, মূলনীতি এবং কর্মপদ্ধতিগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণাগারে ঢোকার এবং বের হওয়ার সময় নানাবিধ নিরপত্তা তল্লাশি করা হয়। আঙ্গুলের ছাপ সনাক্তকরণ, ক্যামেরা প্রভৃতির ব্যবস্থা রাখা হয় যেন কোনো অনুজীব ভুল হাতে না পৌঁছায়।

গবেষণাগারের মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে নিরাপত্তাব্যাবস্থা জোরদার করতে হয়। তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণাগারে গবেষকদের Tyvek suit এবং রেসপিরেটর ব্যবহার করতে হয় এবং গবেষণাগার ত্যাগ করার পূর্বে গোসল করতে হয়। কোনো জীবাণু অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হলে আরো কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।

এ্যালেন বলেন, চতুর্থ পর্যায়ের গবেষণাগারে কাজ করতে হলে ‘চাঁদের’ স্যুট পরতে হয়। এগুলো অনেকটা মহাকাশভ্রমনের সময় যেমন স্যুট পড়তে হয়, তেমন। একটি HEPA ফিল্টারের মাধ্যমে এগুলোকে উচ্চচাপে রাখা হয়। উচ্চচাপের কারণ হলো, যদি কখনো এই পোষাক ছিঁড়ে যায় তাহলে যে বায়ু বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে এবং জীবাণু স্যুটের ভেতরের দিকে প্রবেশ করতে না পারে। এধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুটো কারণে নেওয়া হয়: গবেষকের নিজের সুরক্ষার জন্য এবং গবেষণাগারের বাইরে সংক্রমণ রোধে।

দুর্ঘটনাবশতঃ সংক্রমণ

যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক, জীবাণু আক্রমণ করবে না এই গ্যারান্টি দেওয়া যায় কেবলমাত্র জীবাণুর কাছ থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে। সেটা কেবল জীবানু নিয়ে গবেষণা না করলেই সম্ভব। তাই দু’একটি ছোট-খাট দুর্ঘটনা কখনো কখনো ঘটেছে। এ্যালেন হেম জীবাণু সংক্রমণের এধরনের কিছু ঘটনার কথা শুনেছেন। যেমন: একজন বিজ্ঞানী টাইফয়েডের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হন এবং সেটি বাড়িতে নিয়ে যান। যদিও বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার কথা কয়েক দশকে শোনা যায়নি কিন্তু ছোটখাট ঘটনায় গবেষকগণ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারেন।

ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অনুজীববিদ ডোমিনিক মিসিয়াকাক প্লেগ, এনথ্রাক্স এবং এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সুপারবাগ MRSA নিয়ে কাজ করেন। তিনি জানান সর্বদাই তিনি এই জীবাণুগুলোর দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার উৎকণ্ঠায় থাকেন। বছর দশেক আগে তাঁর একজন সহকর্মী প্লেগের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।

যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এই ধরনের জীবাণু নিয়ে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই জীবাণুগুলোর বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করে জয়ী হওয়া সম্ভব তা আমরা জানতে পারি। এ্যালেন হেম বলেন, “আমরা পৃথিবী হতে দুটি জীবাণু নির্মূল করেছি, একটি হলো গুটি বসন্ত আর অপরটি রিনডারপেস্ট (গবাদিপশুর মড়ক)। খুব শিঘ্রই পোলিও-ও নির্মূল হতে যাচ্ছে। এবং গবেষণাগারে জীবাণুর কাছাকাছি না এসে এগুলোকে নির্মূল করাও সম্ভব নয়। যখনই কোনো টিকা বাজারে আসে তার মানে হলো কেউ গবেষণাগারে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে সেই রোগের জীবাণু নিয়ে কাজ করেছে।” [discovermagazine.com অবলম্বনে]

-বিজ্ঞান পত্রিকা ডেস্ক

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.