কেন এই নতুন করোনাভাইরাস গবেষণাগারে বানানো নয়

1
13510
ইলেকট্রন স্ক্যানিং অণুবীক্ষণ যন্ত্রে করোনা ভাইরাস। ভাইরাসের ওপরে অস্পষ্টভাবে গজাল S প্রোটিন দেখা যাচ্ছে

এমন একটি রটনা চলছে যে করোনা ভাইরাসটি (যাকে এখন SARS-CoV-2 বলা হচ্ছে) সেটি চীন দেশের জৈবিক মারণাস্ত্রগারে তৈরি হয়েছে। এই গুজবটি আরো প্রাণ পেয়েছে এই কারণে যে, চীনের উহান শহরে ভাইরাস নিয়ে একটি গবেষণাগার আছে। কিন্তু বর্তমানের বিভিন্ন গবেষণা বলছে এই ভাইরাসটি প্রকৃতি থেকে এসেছে, সম্ভবত কোনো প্রাণী থেকে যা কিনা বাদুড় বা বনরুই (প্যাংগোলিন) নামে একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ক্রিপস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের যৌথ একটি কাজে এটির প্রাকৃতিক অস্তিত্বের সম্ভাব্যতা প্রমাণিত হয়েছে (Anderson et al. 2020, The Proximal Origin of SARS-CoV-2, Nature Medicine)। এর আগে চীনা বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসটির পূর্ণ জিনোম তথ্য প্রকাশ করেছিলেন (Ren et al. 2020, Identification of a Novel Coronavirus Casuing Severe Pneumonia in Humans, Chinese Medical Journal) যেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করতে পেরেছেন। [আমি এই বিষয়ের গবেষক নই, তবু নেটে এত জল্পনা দেখে এটি লিখলাম কিছুটা নিজের জন্যই। ]

SARS-CoV-2টি অন্যান্য ভাইরাসের মতই খুবই ক্ষুদ্র এবং সেটি সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়বে না। ইলেকট্রন স্ক্যানিং অনুবীক্ষণ যন্ত্রে ধারিত এর ছবিটি নিচে দেয়া হল। এদের ব্যাস ৫০ ন্যানোমিটারের মত।

প্রতিটি ভাইরাসের ভেতরে DNA ও RNAর মত বংশীয় নিউক্লিওটাইড থাকে যা কিনা একটি প্রোটিনের আবরণে মোড়া থাকে। এর মধ্যে কিছু প্রোটিন গজালের মত ভাইরাসের দেহ থেকে বের হয়ে থাকে। করোনা ভাইরাসের ভেতরে রয়েছে একটা RNA ফিতা। আর বাইরে S প্রোটিন নামে একটি গজাল বা spike রয়েছে। নিচের ছবিটিতে S প্রোটিনটি খেয়াল করুন। এই S গজালটি মানবদেহের কোষের বাইরে ACE2 নামে একটি গ্রাহক প্রোটিন (receptor) এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়। ACE2 বস্তুটি আমাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত।

করোনা ভাইরাসের নক্সা। ভেতরে RNA ফিতা, বাইরে S গজাল প্রোটিন

S গজালটির (spikeটির) মানবকোষে যুক্ত হবার দক্ষতার মধ্যেই নিহিত আছে এই ভাইরাসটির সাফল্য। বিজ্ঞানীরা এই প্রোটিনটির জিনোম কী দিয়ে তৈরি তা বের করেছেন। এই S গজাল বা spike প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক আণবিক রূপটি বিজ্ঞানীরা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। নিচে সেই ছবিটি দেয়া হল।

S গজাল প্রোটিনটির ত্রিমাত্রিক রূপ [3]

বিভিন্ন ভাইরাস বিভিন্ন ধরণের spike প্রোটিন দিয়ে মানবকোষে আবদ্ধ হয়। নিচের ছবিতে লাল গজালগুলো হল S spike প্রোটিন ও রেঞ্চ দিয়ে ACE2 গ্রাহককে বোঝানো হয়েছে। আগেই বলেছি ACE2র সাথে S কতখানি সফলভাবে যুক্ত হতে পারবে তার ওপর এই ভাইরাসের সফলতা নির্ভর করছে।

লাল S গজাল প্রোটিন আঁকশি দিয়ে কোষের ACE2 গ্রাহকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে (ছবি The New York Times)

এক্ষেত্রে মনে হচ্ছে S গজালের যে Recptor Binding Domain (RBD) র এমিনো এসিডগুলো আছে তারা সফল। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার স্ক্রিপ্স গবেষণাগারের কাজটি বলছে যে এই RBDর বঁড়শি ACE2তে আটকানোর জন্য এতটাই সফল যে (পূর্বতন SARS ভাইরাস থেকে ১০ গুণ বেশী) সেটার প্রকৃতিতে অসংখ্য পরিব্যপ্তির (mutation) মধ্যেই সৃষ্টি হবার সম্ভাবনাই বেশি, গবেষণাগারে নয়।এই গবেষকরা আরো বলছেন যদি এটাকে কৃত্রিম উপায়ে ল্যাবেই তৈরি করা হত তাহলে তারা এমন একটা ভাইরাসকে কাজ করার জন্য বেছে নিতেন যাকে কিনা তারা আগে থেকেই চিনতেন, তারা বাছতেন এমন ভাইরাসকে যা মানুষকে রোগাক্রান্ত করে। যেমন SARS ভাইরাস। যদি তারা SARS-Covকে বেছে নিতেন তাদের জৈবিক অস্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, তাহলে দেখা যাচ্ছে কম্পিউটার সিমুলেশনে যে ধরনের গজালের (spike) সফল হবার কথা – যেমন SARS-Cov-2র গজাল – সেটা তারা পাচ্ছেন না। অর্থাৎ ল্যাবে যদি তারা সেই S spike সৃষ্টি করতে চাইতেন সেটা SARS-Cov-2র S প্রোটিনের থেকে অসফল হত। এক্ষেত্রে প্রকৃতি অসংখ্য মিউটেশনের ফলে এমন S গজাল সৃষ্টি করেছে তা – বিজ্ঞানীরা যা সিমুলেট করতে পারছেন – সেটার থেকে অনেক বেশী দক্ষ। আরো দেখা গেল SARS-Cov-2-এর আণবিক গঠন SARS-Covএর মত নয়, বরং বাদুড় ও বনরুইএর মধ্যে পাওয়া করোনা ভাইরাসের মত। এখন মনে হয় এটি খুব অধুনাকালে প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করেছে। অবশ্য ‘পাওয়া গেছে’ ও ‘প্রবেশ করেছে’ এই দুটি বিষয় আসলে এত সহজ নয়, কিন্তু আপাতত আমরা তার মধ্যে যাচ্ছি না। এবার আসি এই নতুন ভাইরাসটির আর একটি দক্ষ বৈশিষ্টের ব্যাপারে। S গজালকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায় S1 এবং S2। নীচের অন্য এক ধরনের করোনা ভাইরাস থেকে এই দুটি অংশকে দেখানো হচ্ছে। S1 এবং S2র মধ্যের অংশকে বলা হয়ে cleavage site বা ভাগ করে দেবার স্থান, আমরা একে খন্ডন অংশ বলে অভিহিত করব। এই খন্ডন অংশে ফুরিন (Furin) নামে প্রোটিন কাজ করে S গজালকে দুভাগে ভাগ করে ফেলা যায়। এটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ মানবকোষে ভাইরাসটিকে প্রবেশ করতে হলে ACE2 গ্রাহক থেকে তাকে (Sকে) মুক্ত হতে হবে, ফুরিন দিয়ে দ্বিখন্ডিত হয়ে S2সহ ভাইরাসের দেহটি কোষের দেহর সঙ্গে বিলীন হয়ে যেতে পারে ভেতরের RNA ফিতাটিকে অক্ষয় রেখে। বিজ্ঞানীরা বলছেন ঠিক এই ধরণের খন্ডন অংশ অন্য ধরণের করোনা ভাইরাসে পাওয়া যাই নি। এবং এটিকেও গবেষণাগারে সৃষ্টি করা কঠিন।

S প্রোটিনের আবার দুটি ভাগ S1 ebong S2। S1 oo S2ke লাদা করে ফেলার ওপরে নির্ভর করছে ভাইরাসের সাফল্য

আপাতত এখানে শেষ করছি। ভবিষ্যতে ভাইরাসটি কোষের মধ্যে প্রবেশ করে কীভাবে নিজের প্রতিলিপি বানায়, কোষটিকে ধ্বংস করে, ভাইরাসটিকে শণাক্তকরণের কী উপায় এবং প্রতিষেধক সৃষ্টির গবেষণা কী পথে তা নিয়ে লেখার ইচ্ছে রাখি।

দীপেন ভট্টাচার্য
বিজ্ঞানী ও গল্পকার
(লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পাবেন এখানে)

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.