চীনের তৈরি ‘কৃত্রিম নক্ষত্র’-ই হতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ

0
104

ভেবে দেখুন আমরা যদি আমাদের পৃথিবীর সব প্রয়োজনীয় শক্তি জীবাষ্ম জ্বালানির পরিবর্তনে আমাদের নিজেদের নক্ষত্র হতে সংগ্রহ করতে পারতাম! না, সৌর শক্তির কথা এখানে বলা হচ্ছে না, বরং বলা হচ্ছে নিউক্লিয় ফিউশনের কথা এবং বর্তমান প্রযুক্তির হাত ধরে সেই পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চীনের হেফাইতে EAST নামের একটি ফিউশন রিএ্যাক্টর তৈরি করা হয়েছে যাতে সূর্যের কেন্দ্রের চেয়ে ছয়গুন বেশী তাপমাত্রা তৈরি করা যায়। এই রিএ্যাক্টরে একাধিক পরমানুর মধ্যে ফিউশন ঘটানো হয়। দুটি হালকা ভরের পরমানুর নিউক্লিয়াস পরষ্পর একীভূত হয়ে যখন অপেক্ষাকৃত ভারী পরমাণুর নিউক্লিয়াস তৈরি করে সেই প্রক্রিয়াটিকে ফিউশন বলা হয় (ফিউশন অর্থ গলন)। এই প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমান শক্তি নির্গত হয়। প্রক্রিয়াটিকে খুব সহজ দেখালেও বাস্তবে প্রয়োগ করা দুঃসাধ্য কেননা পরমানুর নিউক্লিয়াসগুলো ধনাত্বক আধান বিশিষ্ট এবং সমমেরুর চৌম্বক বিকর্ষণের মতোই এরা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে।

আমাদের সূর্যের মত নক্ষত্র তথা তারাগুলোতে এই প্রক্রিয়াতেই শক্তি উৎপন্ন হয়। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে পরমানুসমূহের এই বিকর্ষণ কাটানোর ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। নক্ষত্রগুলোর প্রচন্ড ভর মধ্যাকর্ষণের ফলে কেন্দ্রের দিকে প্রচন্ড চাপ তৈরি করে। এই প্রচন্ড চাপে পরমানুসমূহের নিউক্লিয়াসগুলো কাছাকাছি এসে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। কিন্তু সূর্যের কেন্দ্রের মতো চাপ সৃষ্টি করার মত প্রযুক্তি ক্ষুদ্র পৃথিবীতে নেই।

তবে অন্য উপায় আছে। প্রচন্ড চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে প্রচন্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধি করেও ফিউশন সৃষ্টি করা যায়। এবং EAST ফিউশন রিএ্যাক্টরে এই ঘটনাটিই ঘটানো হয়। তাপমাত্রা যত বৃদ্ধি করা যায় পরমানুসমূহ তত প্রবলভাবে কম্পিত হয় এবং এই কম্পন এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। তবে তাপমাত্রা খুব বেশী হয়ে গেলেও সমস্যা আছে। এতে পরমানুগুলো এত দ্রুত ছোটে যে পরস্পরের পাশ কাটিয়ে চলে যায় আবার তাপমাত্রা কম হলেও পরমানুগুলো যথেষ্ট গতিশীল হয় না। তাই ফিউশন ঘটানোর জন্য অত্যানুকুল তাপমাত্রা হলো ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা আমাদের সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার চেয়ে ছয়গুন বেশী।

পৃথিবীর খুব কম রিএ্যাক্টরই তাপমাত্রার এই মাইল ফলক অতিক্রম করতে পেরেছে। চীনের EAST রিএ্যাক্টরটি আকারে খুব ছোট। এটি কেবলমাত্র ১০ সেকেন্ডের জন্য একটি ফিউশন বিক্রিয়া চালিতে যেতে পারে এবং এর পরপরই এটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এখানকার গবেষকদের কাজ হলো এই ফিউশনের সময়টিকে আরো বাড়িয়ে তোলার প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সাহায্য করা যার ফলে ভবিষ্যতে ফিউশন অনির্দিষ্ট সময় ধরে চলতে পারে এবং সম্পূর্ণ শহরে শক্তি সরবরাহ করতে পারে।

বর্তমানে প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ফিশন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই প্রক্রিয়া ফিউশন প্রক্রিয়ার বিপরীত, অর্থাৎ একটি ভারী পরমানু ভেঙ্গে গিয়ে অপেক্ষাকৃত হালকা ভরের একাধিক নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং এতে বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়। ফিশন বিক্রিয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিভিন্ন সময় এধরনের চুল্লিতে দুর্ঘটনা ঘটে সারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া এতে তেজষ্ক্রিয় পারমানবিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় যা হাজার হাজার বছর ধরে তেজষ্ক্রিয়তা ছড়ায়। কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটি চেইন বিক্রিয়া দেয় না তাই বিস্ফোরণের আশঙ্কা নেই। অপরদিকে এর কাঁচামাল হলো হাইড্রোজেন ও ডিউটেরিয়ামের মতো অত্যন্ত হালকা আইসোটোপ। এই আইসোটোপগুলো নিজেরাও তেজস্ক্রিয় বিকিরণ দেয় না তাই দীর্ঘদিন সঞ্চয় করে রাখালেও কোনো সমস্যা নেই। উৎপন্ন বর্জের তেজস্ক্রিয়তা, ফিশনের ফলে উৎপন্ন বর্জের চেয়ে দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয় তাই ঝুঁকিও কম। তাছাড়া ডিউটেরিয়াম জাতীয় আইসোটোপগুলো সমুদ্রের পানি নিশ্কাশন করে খুব সহজেই সংগ্রহ করা যায়। যদিও পানিতে ডিউটেরিয়ামের পরিমাণ অত্যন্ত নগন্য, কিন্তু খুব অল্প পরিমান জ্বালানী থেকেই যেহেতু বিপুল পরিমান শক্তি উৎপাদন করা যাবে তাই খুব অল্প পরিমান ডিউটেরিয়াম নিষ্কাশন করলেই চলবে। আর ইউরেনিয়ামের মতো এই জ্বালানীর উৎস কখনো নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ফিউশনের এত এত সুবিধার কারণে ভবিষ্যতের শক্তির উৎস হিসেবে ফিউশনকেই ভাবা হচ্ছে। এখন শুধু অপেক্ষা একটি যথাযথ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। (আগ্রহীরা ফিউশন সম্বন্ধে আরো জানতে পাবেন “ফিউশন পারমাণবিক শক্তি” আর্টিকেলে।)

-বিজ্ঞান পত্রিকা ডেস্ক

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.