করোনাভাইরাস পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আপনারা হয়তো শুনেছেন শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী থাকলে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় সহজ হয় এবং মৃত্যুর আশংকা কমে যায়। বিশেষ করে করোনায় বৃদ্ধ এবং শারীরিক জটিলতা সম্পন্ন রোগীরাই বেশী মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন। তাহলে কেমন করে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায়? নিচের কিছু পরামর্শ মেনে চললে জীবন-যাপন রীতি তেমন একটা না বদলিয়েও আপনি রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন।

প্রথমত, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কোনো সোজা সাপ্টা পদ্ধতি নেই এটা মেনে নিতে হবে। ইন্টারনেট বা লোকমুখে আপনি হয়ত অনেক কিছুর কথা শুনেছেন বা কোনো যাদুকরী খাবার বা ওষুধের খোঁজ পেয়েছেন যেটা অনেকে আপনার প্রতিরোধ ক্ষমতাবাড়াবে বলে দাবী করছে, কিন্তু এসব দাবী মূলতঃ ফাঁকা বুলি। করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়ানোর জন্য এমন বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট কোনো দাওয়াই নেই।

তবে কিছু কিছু আশাপ্রদ খবরও আছে। বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিলে আমার শরীর ভালো থাকবে, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অটুট থাকবে । এর মধ্যে রয়েছে যথাযথভাবে হাত ধোয়া, সুষমভাবে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা, মানসিক চাপ হ্রাস করা এবং পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুমানো।

প্রথমতঃ খাবারের প্রসঙ্গে আসা যাক। বিশেষ বিশেষ পুষ্টি উপাদান সরাসরি শরীরের রোগ প্রতিরোধের সাথে জড়িত। এই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খেলে শরীর ভাইরাসের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত ভালো কাজ করবে। এই লক্ষ্যে আপনাকে ভিটামিন, মিনারেল ও এন্টিঅক্সিডেন্ট সম্পন্ন খাবার খেতে হবে। সেই ক্ষেত্রে প্লেটের অর্ধেকটা শাকসবজি এবং ফলমূলের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। ভিটামিন এ আপনার প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাহায্য করে। এ’র উৎস হিসেবে খেতে পারেন গাজর, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, ব্রোকোলি, লাল মিষ্টিআলু। ভিটামিন সি রক্তের এন্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং শ্বেতরক্ত কণিকার কর্ম ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভিটামিন সি’র উৎসের মধ্যে রয়েছে কমলা, স্ট্রবেরি, মরিচ, ফুলকপি ও বাঁধা কপি।

শরীরের বাইরে থেকে কিছু শরীরে প্রবেশ করলে এক বিশেষ শ্রেণীর প্রোটিন সেগুলো সনাক্ত করে দূর করতে সাহায্য করে। এই ধরনের প্রোটিনের উৎপাদন নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রয়োজন ভিটামিন-ডি। সূর্যের আলোর মাধ্যমে আমাদের ত্বকের নিচে ভিটামিন-ডি তৈরি হয়। কিন্তু লকডাউনের সময় ঘরে বসে থাকলে ভিটামিন-ডি উৎপাদন ব্যহত হবে তাই খাবারের মাধ্যমে সেই চাহিদা পূরণ করতে হবে। প্রাণিজ খাবার ভিটামিন-ডি’র উৎস হিসেবে ভালো। এর মধ্যে সবচেয়ে সহজলভ্য হলো ডিম। আপনার খাবারে যথাসম্ভব ডিম রাখুন। এতে আরো অনেক পুষ্টি উপাদানও বিদ্যমান। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে সপ্তাহে দু’তিনটি করে ভিটামিন-ডি পিল সেবন করতে পারেন।

জিংক আপনার প্রতিরোধ ব্যবস্থা বৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রাখে। শিম, বাদাম এবং সামুদ্রিক খাবার জিংকের ভালো উৎস। আর শরীরের ক্ষয় পূরণের জন্য প্রোটিন তৈরি করতে হয় দেহে। প্রোটিন তৈরির হার বাড়াতে খেতে হবে দুধ, ডিম, বাদাম, মুরগীর মাংস ইত্যাদি। ডালও প্রোটিনের ভালো উৎস। আপনার পরিপাক তন্ত্রের জৈবমন্ডলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খেতে পারেন কলা, শিম ও দই।

এসবের বাইরে বেশকিছু মশলাজাতীয় খাবার রোধপ্রতিরোধ বৃদ্ধিতে কার্যকর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রসুন, হলুদ, লবঙ্গ, দারচিনি প্রভৃতি।

সবশেষে শরীরে পানির ভারসাম্য রাখা অতন্ত জরুরি। পানির পরিমান সামান্য হ্রাস পেলেও তা নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করে। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করুন। একজন নারী প্রতিদিন তিন লিটার এবং পুরুষ প্রতিদিন ৪ লিটার পানি পান করুন। পানির উৎস হিসেবে ফল, স্যুপ ও শরবত খেতে পারেন।

খাবার খাওয়ার বাইরেও রোগ প্রতিরোধ বৃদ্ধির জন্য আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমতঃ বলা যেতে পারে শরীরকে সচল রাখুন। আপনি যত বেশী শরীরচর্চা করবেন তত আপনার বিপাকীয় কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাবে এবং শরীর জীবানুর বিরুদ্ধে ততোই বেশী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। যত নিয়মিত শরীর চর্চা করবেন ততোই বেশী কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠবে।

মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ হালনাগাদ রাখতে পারেন। লাগাতার মানসিক চাপ রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাকে চাপিয়ে রাখে এবং এর ফলে শরীর রোগজীবানুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্ক মাত্রাতিরিক্ত হারে মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।

পর্যাপ্ত পরিমান ঘুমানো রোগ-প্রতিরোধ বৃদ্ধির জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয়। গবেষণায় দেখা যায় আপনি যখন ঘুমিয়ে থাকেন তখন কিছু কিছু প্রতিরোধ কোষ আপনার লসিকা গ্রন্থিতে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে সংক্রমন প্রতিহত করার জন্য কাজ শুরু করে। তাছাড়া জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সঠিক প্রতিরোধ কোষগুলো তৈরি জন্য ঘুম উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে।

-বিজ্ঞান পত্রিকা ডেস্ক