মেধাবী দুই বাঙালি জীববিজ্ঞানী

0
664

[অতনু চক্রবর্ত্তী রচিত জীববিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা বইটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞান পত্রিকায়। আজ রইল এর তৃতীয় অধ্যায়। বইয়ের সূচীপত্র (সবগুলো অধ্যায়ের লিংক পেতে), উৎসর্গপত্র, ভূমিকা ও বিষয়বস্তুর জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন। ]

জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালি বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁরা তাঁদের ব্যতিক্রমধর্মী কাজের মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে আছেন বিশ্বের ইতিহাসে। এরকমই দুজন বিজ্ঞানী সম্বন্ধে আমরা আজ জানব। এদের মধ্যে একজন হলেন শম্ভুনাথ দে। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত অণুজীববিজ্ঞানী। কলেরা রোগের গতিপ্রকৃতির সঠিক দিক বুঝতে যার গবেষণা মানবজাতিকে সাহায্য করেছিল ভীষণভাবে। অপরজন হলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী যার হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়েছিল কালাজ্বর নামক একটি রোগের ওষুধ। যে রোগে তৎকালীন সময়ে অসংখ্য মানুষ যথার্থ প্রতিষেধকের অভাবে মৃত্যুবরণ করত।

অণুজীববিজ্ঞানী শম্ভুনাথ দে

পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে এক সময় কলেরা ছিল ভীষণ আতঙ্কের একটি নাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কলেরা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে প্রচুর মানুষ মারা গেছেন এরকম ঘটনা ইতিহাসে খুব বিরল নয়। সঠিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ধারণ পদ্ধতি মানুষের জানা না থাকায় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কলেরা নিয়ে নানা ধরণের গল্প গাথা প্রচলিত ছিল। তাই কলেরা রোগের জন্যে দায়ী কথিত অপশক্তি “ওলা বিবি” র হাত থেকে বাঁচতে কুসংস্কারাছন্ন মানুষেরা শরণাপন্ন হত ওঝার ঝাড়ফুঁকের। এতে অবশ্য কোন কাজ হত না। কলেরা রোগের জীবাণুর আক্রমণ কৌশল ও জানা না থাকায় চিকিৎসকেরাও কোন কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারতেন না। এই ভয়ানক রোগটির হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে এর মারণ কৌশলের স্বরূপ উন্মোচনের অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন একজন বাঙালি চিকিৎসা বিজ্ঞানী। তিনি শম্ভুনাথ দে।

শম্ভুনাথ দে জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের পহেলা ফেব্রুয়ারি হুগলী জেলার গরিবাটি গ্রামে। তার পিতা দাশুরথি দে ও মা চট্টেশ্বরী। দাশুরথি তার পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান হওয়ার ফলে অকালে পিতৃহারা হওয়ার সাথে সাথে শৈশবেই সংসারের সমস্ত ব্যয়ভার তার ওপর এসে পড়েছিল। এজন্য পড়ালেখা বাদ দিয়ে গ্রামের এক মুদি দোকানেই তিনি দোকান সহকারীর কাজ করা আরম্ভ করেছিলেন। পরবর্তীতে দাশুরথি যদিও নিজে একটা ছোটখাট ব্যবসা আরম্ভ করেন। কিন্তু তাতে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। এজন্য শম্ভুনাথের জন্মের পরেও তাকে এই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারটিতে বিভিন্ন অভাব অনটনের মধ্যে বড় হতে হয়েছিল। কিন্তু বংশের সবচেয়ে বড় সন্তান হওয়ায়  সকলের আদর এবং মমতায় পরিপূর্ণ ছিল তার শৈশব।

সেই সময় পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন তার কাকা। এ কাকাই তার ভেতরে প্রথম পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন। কাকার অনুপ্রেরণাতে মূলত শম্ভুনাথ স্কুলে ভর্তি হন। গরিবাটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি ডিস্টিংশন সহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। মাধ্যমিকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি হুগলী মহসিন কলেজে পড়বার জন্যে বৃত্তি পান। উচ্চ মাধ্যমিকেও তিনি তার কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন এবং ফলস্বরূপ কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়বার সুযোগ পান। পাশাপাশি তিনি ডি পি আই বৃত্তি লাভ করেন। ইতোমধ্যে তার কাকা, তার পড়াশোনায় অবিরাম অনুপ্রেরণা জোগানো মানুষটি, মৃত্যুবরণ করায় আর্থিক ও মানসিক প্রতিকূলতা তাকে গ্রাস করে।

এই সময়ে সেই সময়কার কলকাতার একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কে সি শেঠ এগিয়ে আসেন তার পাশে। মূলত তার আর্থিক সাহায্যেই শম্ভুনাথ কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে সক্ষম হন। পাশাপাশি নিজের বাসভবনেরই একটা অংশে তিনি শম্ভুনাথের থাকার ব্যবস্থা করে দেন।

মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথম থেকেই মেধাবী ও স্থিতধী শম্ভুনাথ শিক্ষকদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। সেই সময় প্যাথলজি বিভাগে ব্যাকটেরিওলজির অধ্যাপক ও শিক্ষক মণীন্দ্রনাথ দে’র বিশেষ স্নেহের পাত্রে পরিণত হন তিনি। তাই দুই পরিবারের মধ্যে পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিস্তর ফারাক সত্ত্বেও কন্যা তরুবালার সাথে তিনি শম্ভুনাথের বিয়ে দেন। ১৯৩৯ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে শম্ভুনাথ এম বি এবং ১৯৪২ সালে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিকিৎসাবিদ্যায় (Tropical Medicine) ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

১৯৪২ সালেই তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে প্রদর্শক পদে নিযুক্ত হন। এই সময় অধ্যাপক বি পি ত্রিবেদীর অধীনে তিনি তার গবেষণা কার্য চালাতে থাকেন। সমসাময়িক সময়ে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসাসেবা প্রদানও অব্যাহত রাখতে হয়। এছাড়া গ্রামে থাকা নিজের একান্নবর্তী পরিবারের ব্যয়ভার সংকুলান তার দ্বারা সম্ভব ছিল না। অধ্যাপক বি পি ত্রিবেদীর অধীনে গবেষণাকালে তারা যুগ্মভাবে বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

মণীন্দ্রনাথ দে শম্ভুনাথের জীবনে একটি বড় ভূমিকা পালন করেন। তিনি অধ্যাপক জি আর ক্যামেরন ( যিনি পরবর্তীতে নাইটহুড উপাধিও পেয়েছিলেন) এর অধীনে হাইড্রোসেফালাস রোগের দ্বারা মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন হয় সেই সম্পর্কিত গবেষণার জন্য শম্ভুনাথকে ১৯৪৭ সালে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে প্রেরণ করেন। হাইড্রোসেফালাস একধরনের স্নায়ুতন্ত্র সংক্রান্ত রোগ, যেখানে মস্তিষ্কে সেরেব্রো স্পাইনাল রস (CSF) এসে জমা হওয়ার ফলে বিভিন্ন উপসর্গের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

গবেষণা করতে গিয়ে শম্ভুনাথ একটি অন্যরকম বাধার সম্মুখীন হন। তিনি দেখেন যে, ইঁদুরটি নিয়েই তিনি গবেষণা করতে যাচ্ছেন সেটিই দুর্ভাগ্যজনকভাবে পালমোনারী রক্তসঞ্চালনে বাধার কারণে ফুসফুস স্ফীত হয়ে মারা যাচ্ছে। এই বিষয়টি তাকে হাইড্রোসেফালাস ও পালমোনারী রক্তসঞ্চালন এর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় নিয়ে গবেষণা করতে উৎসাহী করে তোলে। তিনি “Pulmonary edema and experimental hydrocephalus” বিষয়ে তার অভিসন্দর্ভ রচনা করেন এবং ১৯৪৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। এরপরে তিনি কলকাতায় ফিরে আসলেও অধ্যাপক ক্যামেরনের সাথে তার আমৃত্যু যোগাযোগ ছিল।

কলকাতায় ফিরে কলেরা রোগের সংক্রমণ নিয়ে তিনি গবেষণা শুরু করলেন। এই সময়ে তিনি যোগ দিলেন নীল রতন সরকার মেডিকেল কলেজে। রবার্ট কখ একসময় একটা কথা বলেছিলেন-

“কলেরা নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের দেশে কলেরা নেই বললেই চলে। অথচ ভারতের মতো দেশে যেখানে প্রচুর কলেরা রোগী সেখানে কলেরা নিয়ে তেমন কেউই গবেষণা করেন না।”

শম্ভুনাথ দে যখন ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনে ছিলেন তখনই কলেরা নিয়ে গবেষণা করবার কথা তার মাথায় আসে। এজন্য যখন তিনি দেশে ফিরে নীলরতন মেডিকেল কলেজে প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন তখন গবেষণার প্রধান বিষয় হিসেবে তিনি কলেরা রোগ এবং এর জীবাণুর সংক্রমণকে বেছে নেন। শম্ভুনাথের কলেরা নিয়ে গবেষণার বহু আগে ১৮৮৩ সালে বিজ্ঞানী রবার্ট কখ কলেরা জীবাণু নিয়ে কাজ করতে কলকাতাতে আসেন। কারণ কলেরা রোগটির মূল প্রাদুর্ভাব ক্ষেত্র ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলো। বিশেষত এই বাঙলায় কলেরা রোগের সংক্রমণ এত ভয়াবহ রূপ ধারণ করত যে পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলাতে কলেরার মহামারীতে গ্রামের পর গ্রাম খুব অল্প দিনেই উজাড় হয়ে যেত- এমন নজিরও ছিল। কলকাতাতে এসে কখ কলেরার জীবাণুকে আলাদা করতে পারলেন এবং ১৮৮৪ সালে এই বিষয়ে তার গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। কিন্তু এই জীবাণুটিকে কলেরা রোগের জন্যে দায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই কখ তার নিজের তত্ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ালেন।

খুব সহজভাবে বলতে গেলে, সংক্রমণ অণুজীববিদ্যার ভিত্তি হিসেবে কখ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, যার মাধ্যমে কোনো রোগাক্রান্ত জীবের শরীরে থাকা অনেক জীবাণুর মধ্যে কোন জীবাণুটিই যে ঐ রোগের জন্যে দায়ী সেটি নিশ্চিতভাবে বলা যেত।

প্রথমত, রোগাক্রান্ত জীবের শরীর থেকে সেই জীবাণুটিকে পৃথক করে জীবাণুটিকে আলাদাভাবে বাড়তে দিয়ে তার বিশুদ্ধ সমষ্টি সংগ্রহ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কোনো সুস্থ প্রাণীর শরীরে সেই বিশুদ্ধ জীবাণু সমষ্টি কোনোভাবে প্রবেশ করিয়ে দেখতে হবে সেই শরীরেও একই রোগ দেখা দিচ্ছে কিনা।

তৃতীয়ত, এই প্রাণীটির শরীর থেকে রোগের জীবাণু সংগ্রহ করে আগের মতোই আরেকটি সুস্থ প্রাণীর দেহে তা প্রবেশ করিয়ে দেখতে হবে রোগ সৃষ্টি করা যায় কিনা।

এই ধাপগুলোর শেষে যদি সবক’টি ক্ষেত্রেই রোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হয় তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে ওই জীবাণুটিই সেই নির্দিষ্ট রোগের কারণ।

কখ কলেরা রোগের জীবাণুটি পৃথক করলেন (Vibrio cholerae)। জীবাণুর বিশুদ্ধ সমষ্টিও তৈরি করলেন। কিন্তু কোনোভাবেই এই জীবাণু দিয়ে অন্য কোনো সুস্থ প্রাণীর দেহে কলেরা রোগ সৃষ্টি করতে পারলেন না। তারপরেও কলেরা রোগ সৃষ্টিতে এই জীবাণুটির ভূমিকা সম্বন্ধে কখ এতখানিই নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি এই জীবাণুর সংক্রমণের ব্যাপারটিকে তার তত্ত্বের একটি ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং বললেন এই জীবাণুই কলেরা রোগের জন্য দায়ী।

কখ জীবাণুটিকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত ও পৃথক করেছিলেন- এ কথা অবশ্যই সত্য। কিন্তু কখের তত্ত্বানুযায়ী এই জীবাণু কীভাবে তার সংক্রমণ ঘটাচ্ছে এবং তার বিষক্রিয়ার মাধ্যমে কিভাবে মৃত্যু ঘটাচ্ছে সে সম্বন্ধে কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় না। কখের কথা অনুযায়ী, এই জীবাণুটি দ্বারা নিঃসৃত বিষ হলো একধরনের এন্ডোটক্সিন, যা কিনা ব্যাকটেরিয়াটির কোষপ্রাচীরের সাথে যুক্ত থাকে এবং এটি কোষকে পুরোপুরি মেরে ফেলে। অথচ এই প্রক্রিয়ারও কোনো সঠিক বর্ণনা দিতে তিনি ব্যর্থ হন।

এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৯০৫ সালে কখ যক্ষ্মা রোগের ক্ষেত্রে তার অনবদ্য অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়ে যান আর কখের কথাই কলেরা রোগের সংক্রমণের ক্ষেত্রে ধ্রুব সত্য মেনে নিয়ে এই বিষয়ে মানুষের আগ্রহও কমতে থাকে। এরপরে যদিও কলেরা রোগের আক্রমণের বিরুদ্ধে কিছু টিকা বা স্যালাইন ইনজেকশন চালু হয়, তবুও আসলে তেমন কার্যকরী ছিল না। কারণ যে জীবাণুর সংক্রমণক্রিয়াই ভালভাবে জানা যায় নি, সেই জীবাণুর সংক্রমণক্রিয়া ঠিকমতো প্রতিরোধ করাটা খানিকটা “আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া”র মতো ছিল। শম্ভুনাথ তাই এই সংক্রমণক্রিয়া নিয়ে কখের মতবাদ অনুসারে চলতে থাকা পুরনো ধ্যান ধারণার উপরেই কুঠারাঘাত করলেন।

যেখানে সবাই মনে করতেন কলেরার ফলে অন্ত্রের দেওয়ালের উপর যে পিচ্ছিল পদার্থ দ্বারা আবৃত আবরণী আছে তা নষ্ট করে কলেরা জীবাণু সবখানে ছড়িয়ে পড়াটা একটি গৌণ উপসর্গ, শম্ভুনাথ দেখালেন এটিই আসলে জীবাণুর সংক্রমণের মূল মারণ প্রভাব। তার মতে, বিষটি এন্ডোটক্সিন নয়, এক্সোটক্সিন। বছরের পর বছর চলতে থাকা এই মূল ধারণাটিই শম্ভুনাথ পাল্টে দিয়েছিলেন।

এই মত প্রমাণের জন্যে শম্ভুনাথ বেছে নিয়েছিলেন, “বিচ্ছিন্ন আন্ত্রিক ফাঁস পরীক্ষণ (Ligated Intestinal Loop Experiment)”। অন্ত্রের উপর কলেরা জীবাণুর নিঃসৃত বিষের প্রভাব দেখার জন্যে খরগোশের ক্ষুদ্রান্ত্রের একটা অংশ নিয়ে তার একটা ছোট দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট করে প্রথমে দু’মাথা আটকে দেওয়া হল। এতে ছোট নলের মতো যে প্রকোষ্ঠ তৈরি হলো সেখানে নেওয়া হলো কেবল জীবাণুর নির্যাস (কোষপ্রাচীর ব্যতীত, কারণ কখের ধারণা মতে জীবাণুটির বিষ নিঃসৃত হয় কোষ প্রাচীর থেকে। তাই শম্ভুনাথ কোষপ্রাচীর পৃথক করে ফেলেছিলেন।) এভাবে পরীক্ষা সাজিয়ে রেখে দেওয়া হলো।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখা গেল অন্ত্রের ওই অংশটিতে এসে জমতে থাকল দেহনিঃসৃত তরল। এমনিতে দেহ থেকে অন্ত্রের মধ্যে দেহরসের প্রবেশ অসম্ভব। কিন্তু ওই নির্যাসে থাকা বিষ অন্ত্রের দেওয়ালে এমনভাবে পরিবর্তন ঘটায় যে তা দেহরসের কাছে ভেদ্যরূপে পরিণত হয়। ক্ষুদ্রান্ত্রের ওই অংশে বিচ্ছিন্ন বাধা না দেওয়া হলে তা অন্ত্র থেকে বের হয়ে পায়ুপথ দিয়ে দেহের বাইরে নির্গমণ হত, যেটি আসলে পাতলা পায়খানা হিসেবে বেরিয়ে আসত, যা কলেরার অন্যতম উপসর্গ ছিল। এভাবেই শরীর থেকে প্রয়োজনীয় জল নিঃশেষিত হবার মাধ্যমে রোগী আস্তে আস্তে দুর্বল ও পরিশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে বহুদিন ধরে চলে আসা একটি ত্রুটিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণাকে যে অধ্যাপক শম্ভুনাথ দে পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন শুধু তা-ই নয়। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি কলেরা গবেষণায় খরগোশকে সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। ১৯৫৯ সালে বিশ্বখ্যাত “নেচার” গবেষণা পত্রিকায় অধ্যাপক দে’র এই পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে ‘Enterotoxicity of bacteria-free culture-filtrate of Vibrio cholerae’ শিরোনামে গবেষণাপত্র বের হয়। কিন্তু তার এই আবিষ্কার সেই সময় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রচার পায়নি। অবহেলায়, বিনা স্বীকৃতিতে তার এই কাজ রয়ে গেছে এক বিরাট সময় পর্যন্ত। স্বীকৃতির অভাবে তার পরবর্তী গবেষণায় সাহায্যও মেলেনি। এভাবেই তার বহু গবেষণার কাজ অসম্পূর্ণ হিসেবে রয়ে গেছে। ১৯৬৬ সালে তার গবেষণা জগতের পথপ্রদর্শক ও গুণগ্রাহী অধ্যাপক ক্যামেরনের মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে ভীষণ আঘাত দেয়। তিনি বলেছিলেন,

His death put the last nail on my struggle against all these odds.

১৯৭৩ সালে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিজীবন থেকে অবসরে যান। কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি না পাওয়া, গবেষণা ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়া- সব মিলিয়ে তিনি হতাশ ছিলেন ভীষণভাবে। অবশেষে ১৯৭৮ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাকে কলেরা ও ডায়রিয়ার উপর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়ার জন্যে আমন্ত্রণ জানালে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা শক্তি ফিরে পান। সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,

I have been dead since the early 1960’s, I have been exhumed by the Nobel Symposium Committee and these two days with you make me feel that I am coming to life again.

এরপরে তিনি গবেষণায় আবার মনোনিবেশ করেন। অবশিষ্ট জীবন তিনি গবেষণাতেই নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাপত্রগুলো হলো-

  1. De, S. N., Sarkar, J. K., Tribedi, B. P. An experimental study of the action of cholera toxin. J. Pathol. Bacteriol. 63: 707–717, 1951.
  2. De, S. N. Cholera: its pathology and pathogenesis, Published by Oliver and Boyd, London, 1961.
  3. De, S. N. and Chatterje, D. N. An experimental study of the mechanism of action of Vibrio cholerae on the intestinal mucous membrane. J. Pathol. Bacteriol. 66: 559–562, 1953.
  4. De, S. N., Bhattacharya, K., Sarkar, J. K. A study of the pathogenicity of strains of Bacterium coli from acute and chronic enteritis. J. Pathol. Bacteriol. 71: 201–209, 1956.
  5. De, S. N. Enterotoxicity of bacteria-free culture-filtrate of Vibrio cholerae. Nature 183: 1533–1534, 1959.
  6. Garfield, E. Mapping cholera research and the impact of Shambu Nath De of Calcutta. Current Contents 14: 3–11, 1986. Reproduced in Essays of an information scientist, Vol:9, p.103-111, 1986; www.garfield.library.upenn.edu/essays/v9p103y1986.pdf.
  7. De S N, Ghose M L & Sen A. Activities of bacteria-free preparations from Vibrio cholerae. J. Patho/. Bacferiol. 79:373-80, 1960.

পাশ্চাত্যের বিদগ্ধ সমাজ তাকে সর্বদা শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও সেই সময়ের ভারতীয় উপমহাদেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানই তাকে সম্মাননা বা স্বীকৃতি কিছুই জানায়নি। কেবলমাত্র ১৯৫৭ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ তাকে কোটেশ পদক প্রদান করে। আরেক নোবেল বিজয়ী জোশুয়া লেডারবার্গ নোবেল পুরস্কারের জন্যে নোবেল কমিটিতে তার নাম উত্থাপন করেছেন বারংবার। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তিনি নোবেল পাননি। অথচ শম্ভুনাথের আবিষ্কারের আগে কেবলমাত্র জীবাণুর মারণপ্রকৃতি সঠিকরূপে না বোঝবার দরুণ প্রাণ হারিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। লেডারবার্গ তার জীবনে বিভিন্ন সময়ে শম্ভুনাথের প্রশংসা করতে দ্বিধা বোধ করেননি। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে শম্ভুনাথ দে’কে “Oral Rehydration Therapy” এর জনক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

যে রোগ এককালে মহামারী আকারে বাংলার গ্রামের পর গ্রাম নিমেষে মহাশ্মশানে পরিণত করত, যে কারণে ইউরোপ, মিশর কিংবা পৃথিবীর যেকোনো স্থানে আন্ত্রিক রোগে মারা যেত অসংখ্য মানুষ, সেই রোগের গতি-প্রকৃতি বুঝতে মূল সূত্রটিই এই মানুষটির হাত ধরে বিশ্ববাসী অবগত হয়েছিল। তার এই আবিষ্কারের সূত্র ধরেই আস্তে আস্তে কলেরা রোগের বিরুদ্ধে ওরস্যালাইনের মতো সহজ সরল বিভিন্ন ব্যবস্থা সম্ভব হয়েছে। জীবনে স্বীকৃতি না পেয়ে অবহেলায় গবেষণার কাজ ঠিকমত চালাতে না পেরেও এই মানুষটি দমে যাননি, জ্ঞানচর্চা করে গেছেন অবলীলায়। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ এপ্রিল অধ্যাপক শম্ভুনাথ দে মৃত্যুবরণ করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানী উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী

ম্যালেরিয়ার পরে প্রোটোজোয়ান পরজীবী ঘটিত সবচে প্রাণঘাতী রোগ হল কালাজ্বর। একটা সময় যথাযথ প্রতিষেধক না থাকার জন্যে কালাজ্বরের প্রকোপে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। শুধু তাই নয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ মতে বর্তমানেও প্রতি বছর দুই থেকে চার লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এই কালাজ্বরের তীব্রতা প্রশমিত করে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন একজন বাঙালি চিকিৎসাবিজ্ঞানী- তার নাম উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী।

১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন বর্ধমানে সারডাঙ্গা গ্রামে। বাবা নীলমণি ব্রহ্মচারী ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়েজের জেনারেল ফিজিশিয়ান। মা ছিলেন সৌরভ সুন্দরী দেবী। জামালপুর ইস্টার্ন রেলওয়ে বয়েজ স্কুল থেকে পড়াশুনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন হুগলী মহসিন কলেজে। ১৮৯৩ সালে তিনি সেখান থেকে বি এ পাশ করেন। এরপরে তিনি ১৮৯৯ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে মেডিসিন ও সার্জারিতে প্রথম স্থান নিয়ে এম বি  পাশ করেন। পড়াশুনোয় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রূপে তিনি গুডিভ ও ম্যাকলাউড পদক পান। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এম ডি ও ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরতত্ত্বে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার মূল আগ্রহ ছিল লোহিত কণিকার ভাঙন সম্পর্কে আলোকপাত করা।

১৮৯৯ সালেই তিনি প্রাদেশিক স্বাস্থ্যসেবায় যোগদান করেন। প্রথমে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল ( বর্তমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ) এবং পরবর্তীতে ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুল ( বর্তমান নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ) এ চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন। যেহেতু তিনি পি এইচ ডির সময় থেকেই লোহিত কণিকার ভাঙন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তাই চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষনাকার্যেও তিনি লোহিত কণিকার ভাঙন সংক্রান্ত জ্ঞান এর প্রতিফলন ঘটিয়ে কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কারে মনোনিবেশ করলেন।

ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলের এই ঘরটিতে ই গবেষণা করতেন উপেন্দ্রনাথ ছবি কৃতজ্ঞতাঃ www.asiaticsocietykolkata.org

১৯১৫ সাল থেকে উপেন্দ্রনাথ ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলের একটি ছোট্ট কক্ষে নিজের গবেষণা শুরু করলেন। ১৯২১ সাল পর্যন্ত ও আর্সেনিক , পারদ আর কুইনাইন আর সোডিয়াম এন্টিমনি ট্রাটেটের একটা মিশ্রণকে  কালাজ্বরের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হত। কিন্তু তা কালাজ্বর রোধে সম্পূর্ণ কার্যকরী ছিল না। এই ১৯২১ সালের ই জুলাই এ গবেষণার একটি পর্যায়ে সোডিয়াম এন্টিমনি থেকে সোডিয়াম পৃথক করে ইউরিয়া আর এন্টিমনি এর সংযোগে ইউরিয়া স্টিবামিন এর যৌগ তৈরি করতে সক্ষম হলেন।  তার গবেষণার ফলাফল দেখতে তিনি প্রথমে যৌগটি খরগোশের শরীরে প্রয়োগ করে দেখতে চাইলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তার গবেষণালব্ধ ইউরিয়া স্টিবামাইন যৌগটি কালাজ্বর এর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ রূপে কার্যকর। ১৯২১ সালের জুলাই মাসের কোন এক দিন প্রায়ান্ধকার ঘরে তিনি যে অসাধারণ আবিষ্কার করেছিলেন তা অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাসে যে এক অনন্য আলোকিত দিগন্তের সূচনা করেছিল – এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার এই আবিষ্কার নিয়ে বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি বলেছিলেন,

” ক্যাম্পবেল হাসপাতালের সেই রাত টার কথা মনে হলে এখনো আনন্দ পাই। রাত দশটায় লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় ধূমাচ্ছন্ন ঘরের মধ্যে আমার গবেষণার প্রথম ফল প্রত্যক্ষ করলাম। তখনও জানতাম না ঈশ্বর আমার হাতে কী এক অমোঘ অস্ত্র তুলে দিয়েছেন ! যা দিয়ে আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণ রক্ষা করা যাবে। যে ঘরটিতে আমি দিনের পর দিন মাসের পর মাস কাজ করেছি সে ঘরে না ছিল গ্যাস, না ছিল জলের ট্যাপ। তবুও সে ঘর আমার কাছে চিরদিন তীর্থস্থান হয়ে থাকবে “

তৎকালীন ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল, কলকাতা; ছবিঃ www.asiaticsocietykolkata.org

সত্যিকার অর্থেই, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর  পেনিসিলিন আবিষ্কারের অনেক আগেই উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর এন্টিমাইক্রোবায়াল ড্রাগ হিসেবে ইউরিয়া স্টিবামাইনের আবিষ্কার এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভারতীয় উপমহাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গবেষণা , কালাজ্বর ও লোহিত কণিকার ভাঙনের উপর তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলি নিচে দেওয়া হল-

  1. Studies in Haemolysis, University of Calcutta, 1909.
  2. Kala-Azar : Its treatment, Butterworth & Co. Ltd. Calcutta 1917.
  3. Kala-Azar in Doctor Carl Mense’s Handbuch der Tropenkrankheiten, vol. IV, 1926.
  4. Treatise on Kala-Azar, John Bale, Sons & Danielsson Ltd., London, 1928.
  5. Campaign against Kala-Azar in India in Jubilee Publication on the 80th birthday of Dr. Prof. Bernhard Nocht, Hamburg, 1937.
  6. Progress of Medical Research work in India during the last 25 years, and progress of Science in India, during the past 25 years, Indian Science Congress Association 1938.
  7. Gleanings from my Researchers Vol. I, University of Calcutta, 1940.
  8. Gleanings from my Researchers Vol. II, University of Calcutta, 1941.
  9. Infantile Biliary Cirrhosis in India in British Encyclopedia of Medical practice edited by Sir Humphrey Rolleston.
উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর কালাজ্বরের উপর প্রকাশিত গবেষণাপত্র (ছবি কৃতজ্ঞতাঃ পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি ই-জার্নাল আর্কাইভ

এক দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে উপেন্দ্রনাথ সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি গবেষণা কার্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবার লক্ষ্যে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে নিজের বাসভবনেই প্রতিষ্ঠা করেন “ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট”। একজন গবেষক হিসেবেই শুধু নন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা সারাজীবন মনে রেখেছেন উপেন্দ্রনাথ। তিনি ই বিশ্বের দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠাতা। কলকাতাতে তার হাত ধরেই জরুরি চিকিৎসা সেবায় অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। তাছাড়া তৎকালীন ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটির প্রশাসনিক দফতরের প্রশাসক হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয়।

তার অসামান্য গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯২৪ সালে তিনি রায়বাহাদুর ও ১৯৩৪ সালে নাইটহুড উপাধি লাভ করেন। কালাজ্বরের উপর তার কাজের জন্যে কলকাতা স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড হাইজিন তাকে মিন্টো পদকে ভূষিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পদকের জন্যে মনোনয়ন পান। পাশাপাশি তিনি রয়াল সোসাইটি অফ লন্ডন, ভারতীয় বিজ্ঞান একাডেমি কর্তৃক সম্মানিত হন। তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে কলকাতা পৌরসভা লাউডন স্ট্রিটকে ” উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী স্ট্রিট” নামকরণ করে।

১৮৯৮ সালে ননী বালা দেবীর সাথে উপেন্দ্রনাথ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর ভার অর্পিত হয় এই দুজনের উপর। ৭২ বছর বয়সে ১৯৪৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি উপেন্দ্রনাথ পরলোক গমন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই সময়ের সকল সংকীর্ণ বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পুরোধা এই বৈজ্ঞানিকের মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছিল পুরো বিশ্ব। প্রখ্যাত গবেষণা পত্রিকা নেচারে (২৭ এপ্রিল, ১৯৪৬) তার মৃত্যুতে শোক বার্তা প্রকাশ করে বলা হয়েছিল-

” WITH the death on February 6 of Sir Upendranath Brahmachari, India lost one of her most distinguished medical scientists. Sir Upendranath was best known to the world in general as the discoverer, and introducer as a therapeutic agent, of one of the most successful anti-leishmanial drugs, urea stibamine ; but those interested in medical research work in India knew him as an original and tireless investigator with a wide field of interest.”

 সহায়িকাঃ  

  1. Special issue on S N De and cholera enterotoxin. Current Science, 59: 623–714, 1990.
  2. Dutta S, Das S, Nandy A K, Dutta SK. Tribute: Dr. Sambhu Nath De: One of the Greatest Indian Scientists. Indian J Pathol Microbiol 2015;58:134-6
  3. Nair GB, Narain JP. From endotoxin to exotoxin: De’s rich legacy to cholera. Bull World Health Organ. 2010;88:237–40
  4. Garfield E. Mapping cholera research and the impact of Sambhu Nath De of Calcutta. Curr Contents. 1986;14:3–11
  5. Koley, S., & Sen, B. K. (2014). Biobibliometric study on Dr. Sambhu Nath De-A pioneer in cholera research. Library Herald, 52(1), 28.

সহায়িকাঃ  

  1. http://www.calcuttayellowpages.com/unbhrama.html
  2. Nature 157, 542–543 (27 April 1946)
  3. London Gazette, 1 June 1934
  4. www.asiaticsocietykolkata.org
  5. চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস – বিনয়ভূষণ রায়

যে গল্পের শেষ নেই

“Darwinian natural selection has put together on this planet – and I would conjecture, on rather a lot of other planets as well – something utterly extraordinary: the World of complexity which is unknown to physicists – the World of complexity which is the world of biology. And on this planet, it has produced the Human brain which is capable of understanding the process that gave rise to it and capable of making a model of the universe in which we stand.”

বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন এমন কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলি প্রচলিত ধ্যান ধারণা কিংবা চিন্তাকে ভীষণ ভাবে আলোড়িত করে মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই ঘটনাটির একটা গালভরা নাম আছে। এই বৈপ্লবিক ঘটনাগুলিকে বলা হয় “প্যারাডিম শিফট”। এই মুহুর্তে সেরকম একটা প্যারাডিম শিফট সম্বন্ধে তোমাদের বলতে বসেছি যার সূচনা হয়েছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদের মাধ্যমে। 

প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে বিস্তারিত জানবার আগে আমাদের জৈব বিবর্তন সম্পর্কে একটু জানা দরকার। তার আগে বলো তো বিবর্তন কি ? হ্যাঁ, বিবর্তন হচ্ছে পরিবর্তন বা বদলে যাওয়া। অনেক কিছুর ই বিবর্তন হয়। যেমন ধরো ভাষার বা শব্দের বিবর্তন। একটা উদাহরণ দিই তাহলে আরেকটু সহজে বুঝতে পারবে, যেমন ধরো “অরেঞ্জ” মানে কি জানো তো ? ঠিক ধরেছ, ইংরেজিতে এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে কমলালেবু। কিন্তু তোমাদের কি বিশ্বাস হয় সংস্কৃত “নবরঙ্গ” শব্দ থেকেই এই অরেঞ্জ শব্দটা এসেছে? বিশ্বাস না হওয়ার ই কথা। কিন্তু সংস্কৃতে কমলালেবু কে ডাকা হত “নবরঙ্গ” নামে। বার বার এত বড় শব্দ বলা যেহেতু বেশ কঠিন আর ঝক্কির। তাইএই নবরঙ্গ শব্দটিই পারস্যের বণিকদের মুখে মুখে হয়ে গেল “নরঙ্গ”। আরবের মানুষেরা কথায় কথায় এই নরঙ্গ কে ডাকা শুরু করল নরঞ্জ নামে। এবার যখন ইতালীয় কিংবা ফ্রেঞ্চ লোকজনের কাছে এই “নরঞ্জ” পৌঁছাল তখন তারা প্রথমের ন টাকে ফেলে দিল নিজেদের উচ্চারণের সুবিধের জন্য। এভাবে এক ভাষার নবরঙ্গ থেকে কমলালেবু বিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে উঠল আরেক ভাষার অরেঞ্জ। ঠিক এভাবেই জীবজগতে চলে বিবর্তনের খেলা। বিভিন্ন প্রজাতির পরিবর্তনের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে বিবর্তনের ধারায় চলে আসা জীবজগত।অর্থাৎ বিবর্তন বলতে আমরা বুঝি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জীবের গাঠনিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমপরির্তনকে। কিন্তু এই পরিবর্তনটা হয় কিভাবে ? কেউ কি এই পরিবর্তনের নকশা প্রণয়ন করে দেয় ? কিংবা কেউ কি ঠিক করে দেয় কোন জীবটি বিবর্তনের ধারায় জীবজগতের রঙ্গমঞ্চে টিকে থাকবে আবার কোনটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে ? বিজ্ঞানের ভাষায় এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে  “না”। তবে ? এই বিবর্তনের স্বরূপটা ঠিক কি রকম?  এই স্বরূপ নিয়ে সর্বপ্রথম যে মানুষটি স্পষ্ট একটা ধারণা আমাদের দেন তার নাম চার্লস রবার্ট ডারউইন। খুব সহজ করে যদি আমরা বলতে চাই তাহলে জীববিজ্ঞানে ডারউইনের মূল অবদান হচ্ছে দুটো যা “বিবর্তন” সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে আমাদের সবচে বেশি সাহায্য করেছে।ডারউইন ই সর্বপ্রথম পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করে দেখান যে, জীবজগত স্থিতিশীল নয়- এই জীবজগতের পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোটি কোটি বছর এর বিবর্তনের মাধ্যমেই জীবের পরিবর্তন ঘটেছে ও ঘটে চলেছে আর এই নিরন্তর পরিবর্তনটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। এই “প্রাকৃতিক নির্বাচন” আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটে চলছে। যেমন তোমরা দেখেছ তো যে আম গাছে মুকুল ধরে হাজার-হাজার। কিন্তু সেই সব মুকুল থেকে কি আম হয় ? না। কেননা সেই মুকুলের অনেকাংশ ঝরে পড়ে যায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে। আবার পোকার আক্রমণের কারণে মুকুলের পরিমাণ আরো কমে যায়। অবশিষ্ট যেসব মুকুল থেকে আম ধরে সেগুলোর একটা অংশ আবার ঝড়-বৃষ্টির কারণে বড় হবার আগেই ঝরে যায়, পোকার আক্রমণেও মরে যায় অনেকগুলো। এখন দেখো আম গাছে যে পরিমাণ মুকুল ধরে, সে তুলনায় গাছে আম হয় অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ। আবার এই নগণ্য পরিমাণ আমের বীজ থেকে নতুন আমের চারা হয় আরো অনেক কম পরিমাণ।অন্যদিকে দেখো মাছের পেটে যে পরিমাণ ডিম থাকে তার বেশিভাগই ডিম ছাড়ার পর শিকারী মাছের খাবারে পরিণত হয়, পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে অনেক ডিম উর্বর হতে পারে না। এমন কী স্রোতেও প্রচুর ডিম নষ্ট হয়ে যায়।অবশিষ্ট যে পরিমাণ ডিম থেকেও মাছের পোনা হয় তারও একটা অংশ আবার বড় মাছের খাদ্যের শিকার হয়। এই সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো  আঙুল দেখিয়ে মাছের যে পোনাগুলি শেষমেশ বেঁচে থাকে, তাদের মধ্যেও বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের সংগ্রহ করা কিংবা শত্রু মাছের নজর এড়িয়ে টিকে থাকার মত নানা ধরণের “জীবন সংগ্রাম” চলতে থাকে। তাহলে দেখো কোন জীব যদি অসংখ্য সন্তানের জন্ম দেয়ও শেষমেশ তাদের মধ্যে অল্প কয়েকটিই টিকে থাকে। অর্থাৎ কোন প্রজাতির প্রতিটি সদস্য যদি অনেকগুলি সন্তান করে জন্ম দেয়ও সার্বিকভাবে তাতে ওই প্রজাতিটির জীবসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে না। কারণ জন্মলাভের পর প্রতিটি জীবকে খাদ্যের জন্য, বসবাসের জন্য, শত্রুর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য কিংবা বংশরক্ষা করবার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হয়। এই সংগ্রামে যে বিভিন্ন সুবিধা তৈরির মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে ওই প্রাণীর তার নতুন বংশধরকেও রেখে যেতে পারে। ডারউইনের ভাষায় এটি ‘পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার’ (Descent with Modification)। ডারউইন বলেছিলেন দীর্ঘসময় ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই ‘পরিবর্তনযুক্ত উত্তরাধিকার’ থেকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়। নতুন প্রজাতির উৎপত্তি সহ জীবের বেঁচে থাকা, বিলুপ্তি কিংবা সংগ্রাম – এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে সার্বিকভাবে বলা হয় প্রাকৃতিক নির্বাচন।

জীবজগতের বিবর্তন নিয়ে আমরা আজকে যা জানি তা মূলত গড়ে উঠেছে এই “প্রাকৃতিক নির্বাচন” এর প্রক্রিয়ার উপরে ভিত্তি করে যাকে আমরা বলি জৈববিবর্তন তত্ত্ব বা Evolution Theory. এখানে “Theory” কথাটা কিন্তু ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।হয়ত অনেকে মনে করেন যে তত্ত্ব বা থিওরি শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ব্যাপারটা সত্য নয়। আসলে আমরা হয়ত অনেক সময় মুখে মুখে এমন অনেক কথা বলি যেগুলির প্রচলিত অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ রয়েছে। তাই থিওরি বা তত্ত্ব বলতে আমরা নিজেরা যা ই বুঝি না কেন বিজ্ঞানজগতে এর একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান পরিষদের মতে, “বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হল প্রাকৃতিক কোনো একটি ঘটনা বা বাস্তবতার (phenomenon) প্রতিপাদিত ব্যাখ্যা। তত্ত্ব, বাস্তবতা কিংবা প্রকৃতিকে যৌক্তিকভাবে বর্ণনা করার একটি সমীকরণ ছাড়া কিছুই না।” আর তাই যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই এমন কোনো কিছু নিয়ে বিজ্ঞানীরা কখনও তত্ত্ব প্রদান করেন না। কোন পর্যবেক্ষণ যখন বিভিন্ন ধাপে এবং বিভিন্ন রূপে প্রমাণিত হয় তখন তাকে বাস্তবতা বা সত্য (fact) বলে ধরে নেওয়া হয়। আর তত্ত্ব হচ্ছে সেই বাস্তবতাটি কিভাবে ঘটছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা। নিচের ছবিটা দেখলে কোন বাস্তবতা ব্যাখ্যা করবার জন্য কোন প্রস্তাবনা দেওয়া হলে তা কিভাবে ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাংগ বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হয়ে ওঠে সেটি বোঝা যেতে পারে। 

জীববিবর্তনের যে ধারা, এই ধারা শুরু হয়েছে প্রাণের উদ্ভবের শুরু থেকেই। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে বিবর্তন তত্ত্ব কখনও প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হল সেটা নিয়ে মাথা ঘামায় না। অবশ্যই প্রাণের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানের নানা শাখায় নানা ধরণের প্রকল্প , তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে কিন্তু  প্রাণের উৎপত্তি বিবর্তন তত্ত্বের আলোচ্য বিষয় নয়। বিবর্তন তত্ত্ব আলোচনা করে প্রজাতির উদ্ভব কিরূপে হয়। প্রজাতির উদ্ভব আর বিবর্তনের এই ধারা এমন এক গল্পের যে গল্পের শেষ নেই। এই গল্প অন্তহীন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে কালের পরিক্রমার সাথে সাথে। এই চলমান প্রক্রিয়ায় কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে আবার কোন প্রজাতি টিকে রয়েছে অসীম সংগ্রামের ফলে।

বিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটি চলে ভীষণ ধীর গতিতে। এত ধীরে এই প্রক্রিয়াটি চলে যে শাদা চোখে এই পরিবর্তন দেখাটা সম্ভব নয়। তবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবের বিবর্তন তুলনামূলক কম সময়ে হয় বলে মাইক্রো লেভেলে এই বিবর্তনটি কিভাবে হয় সে সম্বন্ধে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই বিবর্তনের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক বের করছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে , এই বইয়ের ই প্রথম দিকে বলা এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে। এই ব্যাকটেরিয়া গুলি নিজেদের পরিবেশে যেভাবে বিবর্তিত হয় তা বিবর্তন তত্ত্ব দ্বারা ব্যখ্যা করা যায়। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনের কৌশল জেনে বিজ্ঞানীরা তা প্রতিরোধ করবার উপায় সম্বন্ধে গবেষণা করে যাচ্ছেন। এর পরে বলা যায় এইডস রোগের জন্য দায়ী এইচ আই ভি ভাইরাসের কথা। এই ভাইরাসের প্রতিষেধক বের করবার জন্য বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক নিরন্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এখনো তারা খুব একটা ফলপ্রসূ উপায় বের করতে পারেন নি। কেন ? আসলে এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটানো এই ভাইরাসের ভয়ানক বিবর্তনের খেলা। আমাদের শরীরে বংশগতির ধারক ও বাহক রূপে যেরকম ডিএনএ রয়েছে এই ভাইরাসগুলির দেহে কিন্তু তা নেই। রয়েছে প্রাচীন আরএনএ যার মাধ্যমে তারা পরবর্তী প্রজন্মে তাদের জিন ছড়িয়ে দিতে পারে। যেহেতু তাদের ডিএনএ নেই তাই স্বাধীন ভাবে বংশবৃদ্ধি করবার জন্য তারা মানুষের কোষকে ব্যবহার করতে শুরু করে। মানুষের কোষে থাকা কিছু প্রোটিনকে ব্যবহার করে এরা মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে। মানুষের কোষে থাকা অবস্থাতেই ভাইরাসটির অসংখ্য প্রতিলিপি বা কপি সৃষ্টি হয়। মানুষের শরীরে ভাইরাস যখন আস্তে আস্তে বিস্তার লাভ করতে থাকে তখন এই ভাইরাসগুলির গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। এই পরিবর্তনগুলি হয় আকস্মিক আর একেবারেই বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলো ভাবে। এই ধরণের পরিবর্তনকে বলা হয় মিউটেশন।  শুধু এই ভাইরাস নয় যেকোন জীবে ই মিউটেশন ঘটতে পারে। এই মিউটেশন ঘটার কারণ কিন্তু প্রাণীকে বাড়তি সুবিধে দেওয়া এরকম নয়। অনেক সময় মিউটেশন জীবকে বাড়তি সুবিধা দেয় আবার অনেক সময় উদ্দেশ্যবিহীন ভাবেও ঘটে। যাই হোক, রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ নামের একটি এনজাইম রয়েছে যেটি এই ভাইরাসের দেহে থাকে। মানুষের শরীরে এই এনজাইমটি থাকে না। এই এনজাইমটিকে কাজে লাগিয়ে ভাইরাস অসংখ্য ধরণের মিউটেশন ঘটাতে পারে।যার ফলে পরবর্তী প্রজন্মের ভাইরাস গুলি অনবরতভাবে নতুন নতুন ধরণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন একই ভাইরাসের বিভিন্ন প্রকরণ তৈরি করতে পারে। তাহলে ব্যাপারটা খানিকটা এরকম আমরা যে শত্রুকে ধরাশায়ী করতে চাই সেই শত্রুর প্রকৃত রূপ ই আমরা ঠিকমত বুঝতে পারছি না। বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে সে নানাভাবে পরিবর্তিত করে ফেলছে আর রক্তবীজের বংশধরের মত ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিবর্তনগুলি ঘটছে আমাদের চোখের সামনে অতি দ্রুত মানুষের শরীরের ভিতর। যার ফল দাঁড়াচ্ছে এরকম যে, প্রত্যেক এইডস রোগীর পরিস্থিতি এবং তার দেহের ভিতরে থাকা এইচআইভি ভাইরাসের বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের ওষুধ বানাতে হবে যেটা ভীষণ কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার। তাই এই ভাইরাসের বিবর্তনের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটনের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কার্যকরী প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

বিবর্তন তত্ত্ব ব্যবহার করে অভয়ারণ্য নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ইদানীং গবেষকগণ নতুন ধরনের জীনতত্ত্ব বা ইভো ডেভো টেকনিক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া কিরূপে হবে তা বুঝতে করতে পারেন। এরকম একেকটি প্রায়োগিক ক্ষেত্রই হচ্ছে বিবর্তন তত্ত্বকে কষ্টই পাথর দিয়ে যাচাই করে নেওয়ার মত একেকটা পরীক্ষা। এই প্রত্যেকটি পরীক্ষাতেই বিবর্তন তত্ত্ব সফলভাবে পাশ করে গেছে। আর তাই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিবর্তন তত্ত্ব একটি শক্তিশালী এবং কার্যকরী তত্ত্ব হিসাবে বিজ্ঞানীদের কাছে পরিগণিত হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদ্যা, খণিজজীববিদ্যা, অণুজীববিজ্ঞান, জীনতত্ত্ব, প্রাণরসায়ন,অণুপ্রাণবিজ্ঞান, বাস্তুসংস্থানসহ জীববিজ্ঞানের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে বিবর্তন তত্ত্বকে উপেক্ষা করে কোন গবেষণা করা হয়। বিজ্ঞানী থিওডসিয়াস ডবঝনস্কি তো বলেইছিলেন ” জীব বিজ্ঞানকে বিবর্তনবাদের আলোকে না দেখলে কোনো কিছুই আর কোনো অর্থ বহন করে না। তাই যদি জীবনকে বুঝতে হয়, জানতে ইচ্ছে হয় প্রাণের-প্রকৃতির এই খেলা তাহলে বিবর্তনের গল্প সম্বন্ধে আমাদের জানতে হবে। সেই গল্প, যে গল্পের শেষ নেই। 

-অতনু চক্রবর্ত্তী
বুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিন কোরিয়া

[অতনু চক্রবর্ত্তী রচিত জীববিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা বইটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞান পত্রিকায়। আজ রইল এর তৃতীয় অধ্যায়। বইয়ের সূচীপত্র (সবগুলো অধ্যায়ের লিংক পেতে), উৎসর্গপত্র, ভূমিকা ও বিষয়বস্তুর জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন। ]

বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশিত ভিডিওগুলো দেখতে পাবেন ইউটিউবে। লিংক:
১. স্পেস এক্সের মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা
২. মাইক্রোস্কোপের নিচের দুনিয়া

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.