Saturday, October 23, 2021
বাড়িফিচারআব্দুল গাফফার রনিকৃষ্ণগহ্বর-৩ : নিউটনের মহাকর্ষে

কৃষ্ণগহ্বর-৩ : নিউটনের মহাকর্ষে

- Advertisement -

সেকালে গ্রিসে পৃথিবীকে সমতল মনে করত মানুষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই উপর-নিচ-এর ধারণাটা ছিল পরম। তখন মনে করা হতো যেসব বস্তু বা প্রাণী স্বর্গীয় তাদের অবস্থান উপরে, স্বর্গপুরিতে। যেসব বস্তু স্বর্গীয় নয় তাদের অবস্থান মাটিতে কিংবা পাতালপুরিতে। যেসব বস্তু স্বর্গীয় নয় সেগুলোকে ওপর দিকে ছুঁড়ে মারলে একটা সময় আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। তারপর এক সময় প্রমাণ হলো পৃথিবী সমতল নয়, গোলাকার। তখন উপর-নিচের অগের তত্ত্ব ভেঙে পড়ল। তাই পড়ন্ত বস্তু সম্পর্কে আগের ধারণা আর টিকল না। বস্তু কেন ওপর দিকে ছুঁড়ে মারলে তা আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে তার নতুন সমাধান দরকার হয়ে পড়ল।

 টলেমি

তখন অ্যারিস্টোটল জোড়াতালি দিয়ে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন। সেটা হলো,পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র। আকাশের সব গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সকল বস্তুর গতি তাই পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে। এজন্য বস্তুকে উপরের দিকে ছুঁড়ে মারলেও তা পৃথিবীতে ফিরে আসে। সে সময়ের জ্ঞান-বিজ্ঞানে অ্যারিস্টোটলের প্রভাব ব্যাপক। সবাই চোখ বুঁজে অ্যারিস্টোটলের থিওরি মেনে নিলেন। পরে খ্রিস্টিয় প্রথম শতকে টলেমি নামে এক দার্শনিক মহাবিশ্বের একটা মডেল দাঁড় করালেন। সেটা অ্যারিস্টোলের মতের সাথে মিল রেখেই। টলেমির মডেল মহাবিশ্ব বেশ কয়েকটি স্তরে ভাগ করা হয়। এর কেন্দ্রে আছে পৃথিবী। পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে যথাক্রমে চাঁদ, শুক্র, সূর্য ও মঙ্গল। এর সবাই আছে একই সরল রেখায়। অন্যগহগুলো তখনো আবিষ্কার হয়নি। তাই সেগুলোর স্থান হয়নি টলেমির মডেলে। একবারে বাইরের স্তরে পৃথিবীর চারপাশে ঘিরে আছে আকাশের অন্য তারাগুলো। টলেমির সেই মডেল দেখে এখনকার প্রথম শেণি পড়ুয়া একটা বাচ্চাও হাসবে। কিন্তু সেকালে গোটা পৃথিবীর লোক সেই মডেল মেনে নিয়েছিল।

টলেমির মডেল

ষোড়শ শতাব্দীতে এসে বাঁধল গোল। পোলিশ জৌতির্বিদ নিকোলাস কোপর্নিকাস বললেন, অ্যারিস্টোটলের মতবাদ ভুল। বললেন, সূর্য নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘোরে। বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে একটা বইও লিখলেন কোপার্নিকাস। বইটি ছাপা হলো তাঁর মৃত্যুর আগমুহূর্তে। কিন্তু কোপার্নিকাসের কথা কেউ বিশ্বাস করল না।
টাইকো ব্রাহে ছিলেন প্রাগের সম্রাট দ্বিতীয় রোদলফের গণিতজ্ঞ। সম্রাটের রাজ জ্যোতিষিও। তিনি মহাকাশের তারাদের নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। টাইকোর সহকারী ছিলেন জোহান কেপালার। টাইকোর মৃত্যুর পরে তাঁকেই বসানো হয় স¤্রাটের গণিতজ্ঞ ও প্রধান রাজ জ্যোতিষির পদে। সেকালে রাজ জ্যোতিষির প্রধান কাজই হলো সম্রাটের ভাগ্যের ভবিষ্যদ্বাণী করা, তারাদের গতিপথ দেখে রাজ্যের ভালোমন্দের আগাম খবর জানানো। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশে দেশে এসব রাজ জ্যোতিষিরাই ছিল রাজা-বাদশাহদের প্রধান মন্ত্রণাদাতা। তাঁরা বুজরুকি করে রাজাদের ভুল পথে চালাতেন। প্রজাদের ওপর অবর্ণনীয় নীপিড়ন নেমে আসত এসব রাজ জ্যোতিষিদের বুজুরুকির কারণে।
কেপলার ছিলেন একদম আলাদা। ভবিষ্যৎ গণনায় মোটেও আগ্রহ ছিল না তাঁর। তবুও সম্রাটের অনুরোধে কিছু কিছু গণানা করতেন। তবে তিনি স্বীকার করতেন এসবে কোনো অলৌকিকতা নেই। আবহাওয়ার মেজাজ-মর্জি বুঝেই করতেন কিছু কিছু ভবিষ্যদ্বাণী। রাজাকে বলতেন এরজন্য জ্যোতিষ হওয়ার দরকার নেই। একটু জ্ঞান থাকলে যে কেউই এ কাজ করতে পারে। রাজা রোদলফও কেপলারকে পীড়াপিড়ি করতেন না। কেপলার তাঁর শিক্ষক ছিলেন। যথেষ্ঠ সম্মান করতেন তিনি কেপলারকে। কেপলার কোপার্নিকাসের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেটা ক্যাথোলিক ধর্মমতের বিরোধি। তবু রাজা রোদালফ তাঁকে বাঁধা দেননি গবেষণায়। রোদলফ অন্ধ ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না। রাজ গণিতজ্ঞের পদে বসিয়ে কেপলারকে তিনি জ্ঞানচর্চার প্রসারেই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। কেপলারের স্বাধীনতা ছিল, তিনি জ্যোর্তিবদ্যার চর্চা করতেন। গ্রহ-নক্ষত্রদের চলার পথ নিয়েও করেছিলেন গবেষণা। কিন্তু তাঁর হাতে ভালো কোনো টেলিস্কোপ ছিল না।
সেই সময় ইতালিতে গ্যালিলিওর ব্যাপক নামডাক। নানা রকম যন্ত্রপাতি তৈরি করে তিনি সারা দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল টেলিস্কোপ। এর আগেও টেলিস্কোপ ছিল না তা নয়। তবে গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের ধারেকাছেও ছিল না আর কারও টেলিস্কোপ। গ্যালিলিও টেলিস্কোপ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আকাশ দেখেন। তারপর ঘোষণা করেন কোপার্নিকাসই ঠিক। কেপলারের মতো অতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না গ্যালিলিও। প্রাগের সম্রাটের মতো রোমান সম্রাট অতটা মহানুভব ছিলেন না। তাছাড়া রোমের ভেতরেই তো পোপোর ভ্যাটিকান। তাঁদের কথাই ইতালি তথা ইউরোপে দৈব বাণী। ভ্যাটিক্যানের বিরোধিতা করে এমন বুকের পাটা ইতালিতে কারও ছিল না। খ্রিস্টান ধর্ম আসলে অ্যারিস্টোটলের মতের বাইরে যেতে পারেনি। এজন্য তাঁকে অবর্নণীয় নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল। এরপর কেপলার দেখালেন কীভাবে, কোন পথে সূর্যের চারপাশে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহগুলো ঘুরছে। তিনি গ্রহগুলোর চলার পথের জন্য গাণিতিক সূত্রও আবিষ্কার করলেন।
কেনই বা সূর্যের চারপাশে গ্রহগুলো ঘুরছে। কেন ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে না অনন্ত মহাকাশের দিকে? এ প্রশ্নের সমাধান তিনি দিতে পারলেন না। সমাধান এলো সপ্তদশ শতাব্দীতে। নিউটনের হাত ধরে।


নিউটন দেখালেন, সূর্যের চারপাশে পৃথিবী এমনি এমনি ঘোরে না। এদের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য আকর্ষণ বল আছে। সেই আকর্ষণ বলের নাম মধ্যাকর্ষণ বা মহাকর্ষ বল। মহাকর্ষ বল শুধু সূর্য আর গ্রহগুলোর মধ্যেই নয়, বরং মহাবিশ্বের প্রতিটা বস্তুর ভেতর ক্রিয়া করে।
নিউটন মহাকর্ষ বলের জন্য একটা সূত্র দিলেন। সেটা হলো, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পরকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলের মান তত বেশি হবে যত বস্তুদুটোর ভর বেশি হবে। যেকোনো একটার ভর বাড়লেও মহাকর্ষ বলের মান বাড়ে। কিন্তু বস্তু দুটোর মধ্যে দূত্ব যত বাড়ে তাদের মধ্যে মহাকর্ষীয় টান তত কমে। এই কমা আবার সহজ-সরল ভাবে কমা নয়, বর্গাকারে। অর্থাৎ দূরত্ব যদি বেড়ে দ্বিগুণ হয় তবে মহকর্ষ বলের মান কমে আগের মানের এক চতুর্থাংশে নেমে আসবে।
পৃথিবীতে আমরা হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছি, কোনও বস্তু ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে মূহশূন্যে চলে যাচ্ছ না, এর কারণও ওই মহাকর্ষ বল। নিউটন দেখালেন মহাকর্ষ বল শুধু আকর্ষণই করে, বিকর্ষণ করে না কখনও।

চলবে…

আগের পর্ব :

 

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

বিজ্ঞান পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেল চালু হয়েছে।
এই লিংকে ক্লিক করে ইউটিউব চ্যানেল হতে ভিডিও দেখুন।
- Advertisement -

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সম্পর্কিত খবর

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -

Stay Connected

যুক্ত থাকুন

302,063ভক্তমত
783গ্রাহকদেরসাবস্ক্রাইব

Must Read

সম্পর্কিত পোস্ট

- Advertisement -
- Advertisement -

সবসময়ের জনপ্রিয়

সবচেয়ে আলোচিত

- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -
- Advertisement -