১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো বহিঃমহাজাগতিক শব্দ মানুষ প্রথম শুনতে পেয়েছে- কিংবা তৎকালীন মানুষ ভেবে নিয়েছিলো যে তারা শুনেছে। সেই সময় জ্যোতির্বিদ জেরি এহম্যান, ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির বিগ ইয়ার রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে ‘ওয়াও! (Wow!)’ সংকেত শনাক্ত করেন।

রেডিও সংকেত সনাক্তকারী এই যন্ত্রটিকে সেই সময়ে ধনু তারকামন্ডলীর একগুচ্ছ তারার দিকে তাক করা হয়েছিলো। নিশানা করা অবস্থায় এহম্যান যখন তারাসমূহের আশেপাশের আকাশ পর্যবেক্ষণ করছিলেন তখন তিনি ৭২ সেকেন্ডের একটি রেডিও তরঙ্গের দমকা ধারণ করেন। তিনি কাগজে সেই সংকেতটি বৃত্তাবৃত করেন এবং পাশে লিখে দেন “ওয়াও!” সেই থেকে এই সংকেতটি ‘ওয়াও!’ নামে পরিচিত।

গত ৪০ বছরব্যাপী এই সংকেতটিকে মহাবিশ্বে মানুষের পাশাপাশি আরো বুদ্ধিমান প্রানীর অস্তিত্ব থাকার প্রমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ এবং আমজনতা উভয়ই বিশ্বাস করে এসেছে ‘অবশেষে আমরা মহাজগতিক প্রানীর অস্তিত্বের আলামত পেয়েছি’।

তবে, সেন্ট পিটার্সবার্গ কলেজের এন্টনিও প্যারিস সম্প্রতি এই সংকেতের ব্যাখ্যা উদ্ঘাটন করেছেন: এক জোড়া ধুমকেতু। তাঁর এই কাজ Journal of Washington Academy Science জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই ধুমকেতু জোড়ার নাম যথাক্রমে 266P/Christensen এবং 335P/Gibbs যাদের ব্যসজুড়ে কয়েকমিলিয়ন কিলোমিটার ব্যাপী হাইড্রোজেন গ্যাস বিদ্যমান রয়েছে। ধুমকেতুগুলোর পারস্পরিক অবস্থানের কারণে এগুলোর নিঃসৃত সংকেত সুষম কোনো রেডিও সংকেত বলে ভ্রম হয়েছে।

ওয়াও! সংকেত সনাক্ত হয়েছিলো ১৪২০ মেগা হার্টজ তরঙ্গে যা হাইড্রোজেনের স্বাভাবিক নিঃসরণ তরঙ্গের সমান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেই সময়ে এই দুটি ধুমকেতু পরস্পরের সান্নিধ্যে ছিলো বলে গবেষকদলটি নিশ্চিত হয়েছে এবং তাঁরা রিপোর্ট করেছেন 226p/Christensen এর রেডিও তরঙ্গ ওয়াও! সংকেতের সাথে মিলে যায়।

যদিও এই আবিষ্কারটি মহাজাগতিক প্রানী অনুসন্ধিৎসুদের জন্য হতাশাজনক, কেননা ওয়াও! সংকেতটিই অদ্যাবধি মহাজাগতিক প্রানীর অস্তিত্বের পক্ষে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দলিল; তথাপি এই আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো যে আমরা ব্রাহ্মান্ডের নানাবিদ শব্দ ও সংকেত যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা অর্জন করেছি। এর মাধ্যমে আমরা আশা করতে পারি সম্প্রতি খুঁজে পাওয়া বিভিন্ন তারা থেকে আগত শতাধিক ‘অদ্ভুত মাহাজাগতিক প্রানীর’ সংকেত যথাযথভাবে পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হবে।

আমাদের মহাজাগতিক সনাক্তকরণ অস্ত্রাগারে ইতিমধ্যে বেশ কিছু অস্ত্র জমা হয়েছে যার অধিকাংশই ব্যবহার করে বহিঃমহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধান সংস্থা (Search for Extra-Terrestrial Intelligence Institute, SETI)। এই সংস্থার প্রধান সনাক্তকরণ মাধ্যম হলো তাদের রেডিও টেলিস্কোপগুলো, এবং এখন পর্যন্ত তাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হলো ‘প্রোজেক্ট ফিনিক্স’, যা বিশ্বের “সবচেয়ে সূক্ষ এবং গ্রহনযোগ্য বুদ্ধিমান প্রানী সনাক্তকরণ প্রকল্প”।

এই প্রকল্পের জন্য তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলোর তিনটি ব্যবহার করেন। এগুলো হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় স্থাপিত পার্কেস রেডিও টেলিস্কোপ (Parkes radio telescope), ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ন্যাশনাল রেডিও অ্যাস্ট্রনমি অবজারভেটরি (National Radio Astronomy Observatory ) এবং পুয়ের্তো রিকোর অ্যারেসিবো অবজারভেটরি (Arecibo Observatory)। একই সাথে পল অ্যালেনের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা স্থাপন করেছে অ্যালেন টেলিস্কোপ সজ্জা যা মূলতঃ বেশ কিছু ছোট টেলিস্কোপ নিয়ে গঠিত। [Science Alert অবলম্বনে]

-বিজ্ঞান পত্রিকা ডেস্ক