[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

১৯২৯ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ হারম্যান ভাইল এক ধরনের কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয় ভাইল ফার্মিয়ন। ভাইলের হিসাব মতে, এই কণার কোনো ভর থাকার কথা নয়। তবে এরা চার্জ বহন করতে পারবে। সাধারণত ফার্মিয়ন কণাগুলো ভরযুক্ত হয়। ভরহীন ভাইল তাই ব্যতিক্রমী চরিত্রের ফার্মিয়ন।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও আলাবর্ট আনস্টাইন একধরনের পরিসংখ্যানের জন্ম দেন। সেই পরিসংখ্যানকে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান বলে। এই পরিসংখ্যানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র কণাদের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা। উদ্দেশ্য সফল হলো। তবে আংশিক। অর্থাৎ সব ধরনের কণার বৈশিষ্ট্য বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যখ্যা করা যায় না। এসব কণার জন্য দরকার হলো আরেক ধরনের পরিসংখ্যান।

১৯২৬ সালে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান কিছুটা পরিমার্জন করে নতুন আরেক ধরনের পরিসংখ্যানের জন্ম দিলেন পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি ও পল ডিরাক। তাদের এই নতুন পরিসংখ্যানের নাম হলো ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান। তখন থেকেই মহাবিশ্বের সব ক্ষুদ্র কণিকাগুলো দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হলো। যেসব কণিকার আচরণ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তাদের ফেলা হলো বোসন শ্রেণীর কণার কাতারে।

আর যেসব কণার আচরণ ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় সেগুলোকে ফার্মিয়ন শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ফার্মিয়ন মূলত বস্তু কণা। এদের ভর আছে। যেমন, কোয়ার্ক, ইলেক্ট্রন, মিউওন। এদের দ্বারাই পদার্থ তৈরি হয়। অন্যদিকে বোসন হলো ভরহনী বলবাহী কণা। ফোট, গ্লুওন ইত্যাদি।

হারম্যান ভাইল

১৯৩০-এর দশকে উলফগ্যাঙ পাউলি নিউট্রনো কণার ভবীষ্যদ্বাণী করেন। নিউট্রনোকে এতদিন ভরহীন কণাই মনে করত সবাই।  বিজ্ঞানীর ভেবেছিলেন পাউলির নিউট্রনো আর ভাইলের কণা বুঝি একই। কিন্তু ১৯৯৮ সালে প্রমাণ হয় নিউট্রনো ভরহীন কণা নয়। অতি সম্প্রতি পদার্থবিদ জাপানি পদার্থবিদ তাকাআকি কাজিতা ও কানাডিয়ান বিজ্ঞানী আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ড নিউট্রনোর ভর মাপতেও সক্ষম হয়। সুতরাং ভাইল কণাকে আর কিছুতেই নিউট্রনো বলার উপায় রইল না।

ডিটেক্টরে পাওয়া ভাইল ফার্মিয়ন

অনেকদিন ধরে হিগস বোসন খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৩ সালে সার্নের বিজ্ঞানীরা হিগস বোসন খুঁজে পান। নড়েচড়ে বসেন বিজ্ঞানীরা। হিগস বোসন আবিষ্কাকারী বিজ্ঞানীরা একটা পরামর্শ দিলেন, যেনতেন ভাবে মিলবে না ভাইল ফার্মিয়ন। অর্থাৎ সরাসরি ভাইল কণা খুজে পাওয়া সম্ভব নয়। পাওয়া যেতে পারে বিশেষ এক ধরনের ক্রিস্টালের ভেতর। তবে এর জন্য ওই ক্রিস্টালের ভেতর বিশেষ একধরনের অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে।

আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাহিদ হাসান। বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। পরে সেখানেই গবেষণা শুরু করেন। হিগস বোসন আবিষ্কারের পর ভাইল কণা খুঁজে বের করার জন্য যে তত্ত্ব দিলেন বিজ্ঞানীরা সেই পথ অনুসরণ করলেন জাহিদ হাসান। তিনি তাঁর গবেষক দল নিয়ে লেগে পড়লেন ভাইলের খোঁজে।
গবেষণাগারে তাঁরা ট্যান্টালাম আর্সোনাইড ক্রিস্টালের ভেতর অতিবেগুনি রশ্মির বিম নিক্ষেপ করলেন। এর থেকেই বেরিয়ে এলো ভাইল ফার্মিয়ন।  ২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ একটি প্রবন্ধ লিখে ভাইল কণা আবিষ্কারের ঘোষণা দেন জাহিদ হাসান।

সহকর্মীদের সাথে দলনেতা জাহিদ হাসান (ডান দিক থেকে দ্বিতীয়)

কী দেবে পৃথিবীকে এই ভাইল কণা? ভাইল কণা দিয়ে ভাইল ইলেক্ট্রন আবিষ্কারের কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। দুটো ভাইলের সমন্বয়ে একটি ভাইল ইলেক্ট্রন তৈরি হতে পারে। বৈজ্ঞানিকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন সাধারণ ইলেক্ট্রনের চেয়ে ভাইল কণা দ্রুত গতিতে চার্জ বহন করতে পারে। আর এর বিষয়টিই ইলেক্ট্রনিক্স জগতে বৈপ্লাবিক পরিবর্তন আনতে পারে বলে দৃঢ় বিশ্বাস আবিষ্কারক জাহিদ হাসানের।

ভরহীন ভাইল ইলেক্ট্রন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলোর গতি বাড়িয়ে দেবে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। সাধারণ ইলেক্ট্রনের ভর আছে। তাই ইলেক্ট্রনিক সার্কিটের ভেতর দিয়ে চলার সময় এরা পরিবাহী পদার্থগুলোর সাথে নানা বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। ফলে তাপ উৎপন্ন হয়। এজন্য সার্কিটের তাপমাত্রাও যায় বেড়ে। আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে পরিবাহী মাধ্যমগুলোর রোধ বেড়ে যায়। সুতরাং চার্জ পরিবহনে বাধা সৃষ্টি। এসব কারণেই এখনকার ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রাদির কাজের গতি বেশ কম। ভাইল ইলেক্ট্রন ব্যবহার করতে পারলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে। কারণ ভরহীন বলে ভাইল কণা পবিবাহী মাধ্যমের সাথে বিক্রিয়া করবে না। চলবে অনেকটা নির্বিঘ্নে। তাপ উৎপন্ন হবে না বললেই চলে। ফলে বাধাহীন গতিতে ছুটবে চার্জবাহী ভাইল কণা।

এ ধরনের আবিষ্কারের যথাযোগ্য মর্যাদা হলো নোবেল প্রাইজ। আশা করাই যায়, জাহিদ হাসানের এই আবিষ্কারকেও সম্মান জানানো হবে নোবেল প্রদানের মাধ্যমে। সেটা যদি হয় তিনিই হবেন প্রথম বাঙালি ও বাংলাদেশি নোবেল বিজয়ী বৈজ্ঞানিক।

******** সমাপ্ত ********

[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]
বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্পূর্ণ বইটি পড়া যাবে। তবে কেউ সংগ্রহে রাখতে চাইলে অনলাইনে কেনা যাবে ০১৫৫ ৭৭৭ ৯৩২৩ নম্বরে ফোন করে।

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]