[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

কুকুর বিড়ালের বিখ্যাত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে কম নয়। লাইকা নামের কুকুরটার কথাই ভাবুন। মানুষের আগে সে মহাশূন্য ভ্রমণ করেছিল। যদিও বেঁচে ফিরতে পারেনি। তবু মহাকালের ইতিহাসে তার নাম লেখা হয়ে গেছে। এমন ভাগ্য কুকুর দূরে থাক, কজন মানুষের হয়? সিনেমায় অভিনয় করে, মালিককে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে অনেক পোষা প্রাণী অংশ হয়ে গেছে ইতিহাসের। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ইতিহাসেও তেমনি অমর হয়ে আছে একটা বিড়াল। শ্রডিংগারের বিড়াল। শ্রোডিংগার কুকুর-বিড়াল ভালোবাসতেন কিনা জানা যায়নি। তাহলে তাঁর বিড়াল কোত্থেকে এলো? শ্রডিংগারের কোনো বিড়াল ছিল না। তবু তাঁর বিড়াল অমর।

কোয়ান্টাম কণিকাদের মতোই রহস্যময় শোনাচ্ছে না কথাটা? আসলে কোয়ান্টামের রহস্যময়তার মাহাত্ম্য বোঝাতেই শ্রোডিংগার এক কাল্পনিক বিড়ালের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই বিড়ালটাই পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে গেছে। কেন এই বিড়ালের কাহিনি তৈরি করেছিলেন, সেটার জন্য আমাদের আইনস্টানের কাছে যেতে হবে আবার।

১৯২৭ সাল থেকেই আইনস্টাইন কোয়ান্টাম মেকানিক্সের বিরোধিতা শুরু করেন। বিশেষ করে অনিশ্চয়তা নীতিটা নিয়েই তাঁর আপত্তি ছিল। তখনকার তরুণ, প্রবীণ প্রায় সব বিজ্ঞানীই কোয়ান্টামের প্রেমে মজেছেন, মেনে নিয়েছেন অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। শুধু আইনস্টাইন বিষয়টা মানতে পারছেন না। অবশ্য একজনকে সঙ্গে পেয়েছিলেন। এরউইন শ্রোডিংগার। আমার আগের অধ্যায়গুলোতেই দেখেছি শ্রোডিংগার আর হাইজেনবার্গের তত্ত্ব মিলেমিশে কীভাবে অনিশ্চিয়তা তত্ত্বের জন্ম দিল। কিন্তু এর শুরুটা মোটেও সুখকর ছিল না। শ্রোডিংগার-আইনস্টাইন, কেউই হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা মানতে পারেন নি। অন্যদিকে হাইজেনবার্গও মানতে পারেননি শ্রোডিংগারের তরঙ্গ বলবিদ্যা। বিরোধ তুঙ্গে উঠল একসময়। আইনস্টাইনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ইলেকট্রন এক কক্ষপথ থেকে আরেক কক্ষপথে লাফ দেয় কীভাবে? সেকথা তিনি বর্নের কাছে জানতে চাইলেন। বর্ন যে জবাব দিয়েছিলে, তাতে আইনস্টানের মনে হয়েছিল এই জবাব সত্যি হলে তাঁর ব্যখ্যা করা ফটো-তড়িৎ ক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। ফোটনের আঘাতে কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া ইলেকট্রন নাকি নিজেই ঠিক করবে সে কোনদিকে যাবে।

আইনস্টাইনের কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে হলো। বললেন, বিজ্ঞান এতটাই অনিশ্চিত হবে আগে জানলে বিজ্ঞানী হতাম না, হতাম সরাইখানার বেয়ারা নয়তো ফুটপাথের মুচি।

এরপর শুরু হলো চ্যালেঞ্জ, পাল্টা চ্যালেঞ্জ। তৈরি হলো একটা যুদ্ধক্ষেত্রও। ১৯২৭ সালে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বিজ্ঞানীদের সমেম্মলন। সলভে সম্মেলন। সেই সম্মেলনে মুখোমুখি হলো দুইদল। আর সেখানেই  আইনস্টানের যুক্তি খন্ডন করলেন বোর, তাঁর সম্পূরক নীতি ব্যাখ্যা করলেন। আইস্টাইন তাঁর বিপরীতে কোনো যুক্তি দিতে পারলেন না। হার হলো তাঁদের। তবুও আইনস্টাইন মানতে পারেননি অনিশ্চয়তা তত্ত্ব।

বোর কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা দিলেন। শ্রোডিংগার সেটা মেনে নিলেন। অন্য যেসব বিজ্ঞানীর অনিশ্চয়তা তত্ত্ব নিয়ে সন্দেহ ছিল, তারাও মেনে নিয়েছিলেন কোপেনেহেগেন ব্যাখ্যা। মানতে পারেননি কেবল আইনস্টাইন। সেটা আমৃত্যু। বোরের ব্যাখ্যা অসার প্রমাণের জন্য তিনি নানা রকম চেষ্টা-চরিত্র করেন। আসলে আইনস্টাইন সুনির্দিষ্ট তত্ত্বে বিশ্বাসী। পদার্থবিজ্ঞানে অনিশ্চয়তা তত্ত্বের মতো পরাবাস্তব একটা বিষয় এসে পড়বে এটাই মানতে পারছিলেন না। বোর তাঁকে বুঝিয়ে পারছিলেন না, সাধারণ চিরায়ত জগতের সাথে কোয়ান্টাম জগতের ফারাক যোজন যোজন। বাস্তব জগতে যেটা অসম্ভব মনে হয় কোয়ান্টাম জগতে সেটাই সম্ভব।

১৯৩৫ সাল। আইনস্টাইন অনিশ্চয়তা তত্ত্বের ওপর আরেকবার আঘাত হানতে চাইলেন। প্রমাণ করতে চাইলেন বোর ভুল। এজন্য তিনি সামনে টেনে আনলেন আপেক্ষিকতা থেকে বেরিয়ে আসা তার চিরায়ত সেই স্বীকার্য- কোনো বস্তুর বেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হতে পারে না। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রকাশের আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করতেন মহাকর্ষ বল দূরক্রিয়া। অর্থাৎ মহাকর্ষ বলের খবর পৌঁছতে সময় লাগে না। ধরা যাক, কোনোভাবে সূর্য ধ্বংস হয়ে গেল। তার প্রভাব পৃথিবীর ওপরে পড়বে। সূর্য না থাকলে পৃথিবীও আর নিজের কক্ষপথে ঘুরতে পারবে না। সরলরৈখিক গতিতে ছিটকে যাবে অসীম মহাশূন্যের দিকে। কিন্তু পৃথিবী কতক্ষণে বুঝবে সূর্য ধ্বংস হয়ে গেছে? কখনই বা সে বন্ধ করে দেবে কক্ষপথে ঘোরা।
নিউটনের সূত্র এমনভাবে গড়ে উঠেছে, মহকর্ষ বলের প্রভাব সাথে সাথে কাজ করে, দুটি বস্তু যত দূরেই থাক। তাই সূর্য ধ্বংস হয়ে গেলে পৃথিবী সঙ্গে সঙ্গেই সে খবর পেয়ে যাবে। নিজের কক্ষপথে ঘোরা বাদ দিয়ে ধেয়ে যাবে অসীম মহশূন্যের দিকে। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, সেটা সম্ভব নয়। বিশেষ আপেক্ষিক তত্তর গড়েই উঠেছিল ওই স্বীকার্যের ওপর ভিত্তি করে- মহাবিশ্বের কোনোকিছুর বেগ আলোর চেয়ে বেশি হতে পারে না। তাই আলোর বেগের চেয়ে বেশি গতিতে কোনো তথ্য আদান-প্রদান করা সম্ভব নয়। সূতরাং মহাকর্ষ বলকেও সেটা মানতে হবে। মহাকর্ষীয় প্রভাব কখনোই আলোর বেগেরে চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে দেখালেন সেটাই। এটা করতেই গিয়েই বেরিয়ে এলো মহাকর্ষ তরঙ্গ নামে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক তরঙ্গ। মহাকর্ষ বলের সংবাদ বয়ে নিয়ে যায় এই তরঙ্গ। সেটা আলোর বেগের সমান গতিতে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পাবেন অন্বেষা থেকে প্রকাশিত আমার লেখা ‘মহাকর্ষ তরঙ্গ’ বইটিতে।

আইনস্টাইন দেখলেন অনিশ্চয়তা তত্ত্বে এসে ধাক্কা খায় তার এই তত্ত্ব। কোয়ান্টাম কণাগুলো নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করতে পারে মুহূর্তের মধ্যেই। এজন্য তিনি বোরিস পোডেলস্কি আর নাথান রোজেনকে সাথে নিয়ে এপিআর (EPR, আইনস্টাইন, পেডোলস্কি আর রোজেনের নামের আদ্যক্ষর সাজিয়ে এই নাম) নামে একটা বিভ্রমের (paradox) জন্ম দিলেন। সত্যিই সেটা এক মজার ধাঁধা। সেই ধাঁধা থেকেই জন্ম হলো কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট (entanglement) নামে এক নতুন তত্ত্বের।

আইনস্টাইনন, বোরিস পেডোলস্কিও ও নাথান রোজেন

কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট কি সেটা বোঝার জন্য আমরা একটা সিনেমার উদাহরণ দিতে পারি। আশির দশকের জনপ্রিয় এক বংলা সিনেমার নাম লাইলি মজনু। বিখ্যাত আরব্য লোককথা অবলম্বনেই সিনেমাটা বানানো হয়েছে। লাইলি-মজনুর প্রেমের গভীরতা কোন পর্যায়ে গিয়েছিল সেটা তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়। তাদের প্রেমে পারিবারিক ও সামাজিক বাধা প্রকট। সমাজ-সংসারের চাপে এক সময় পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দুজন। বহু দুরের তাঁদের অবস্থান। লাইলিকে ভুলে যাবার জন্য নানারকম চাপ আসে মজনুর ওপর। সেই সাথে অবর্ণনীয় অত্যাচার। যারা মজনুকে অত্যাচার করছে তারা লাইলির আপনজন। লাইলির ক্ষতি তাঁরা চায় না। কিন্তু ওরা জানে না, মজনুর গায়ে যে কটা আঘাত পড়ছে, তার সবুগলোর ব্যাথ্যা অনুভব করছে লাইলি। অনেক দূর থেকেও। এমনকী মজনুর পিঠে যেখানে যেখানে চাবুকের আঘাত পড়ছে, লাইলির পিঠেও সেখানে সেখানে আঘাতের দাগ তৈরি হচ্ছে। এ অদ্ভুত, অবাস্তব ভালোবাসা, কখোনই সম্ভব নয়।

লাইলি-মজনুর সেই ভালোবাসায় যেন উঠে এলো আইনস্টাইনের  (EPR) প্যারাডক্সে। ১৯৩৫ সাল নাগাদ কোয়ান্টাম মেকানিক্স ততদিনে দাঁড়িয়ে গেছে শক্ত ভিতের ওপর। ঠিক সেমসময় আঘাত হানলেন আইনস্টাইন। রোজেন আর পোডোলস্কিকে নিয়ে ফিজিক্যাল রিভিউতে লিখলেন চার পৃষ্ঠার একটা প্রবন্ধ। তাতে একটা থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করালেন পাঠককে। ধরা যাক, দুটো ইলেকট্রন ছুটছে পরস্পরের দিকে। দুটোর গতি আর ভরবেগ সমান। তারপর একসময় তাদের সংর্ঘষ হবে। পরস্পরকে তারা দেবে জোর ধাক্কা। দুটো ইলেকট্রন সমান গতিতে পরস্পরের দিকে ছুটতে থাকবে বিপরীত। ধরা যাক, এভাবে ইলেকট্রন দুটি পরস্পর থেকে কিলোমিটার দূরে চলে গেল। একজন বৈজ্ঞানিক একটা ইলেকট্রন পরীক্ষা কলেলন। নির্ণয় করলেন তার ভরবেগ আর গতিশক্তি।

সেই মুহূর্তে অন্য ইলেকট্রনের ভাগ্যে কী ঘটছে? যখন বিজ্ঞানী ইলেকট্রনের গতিশক্তি বা অবস্থান বের করছেন, সেই মুহূর্তে তিনি অন্য ইালেকট্রনের গতিশক্তিও বের করে ফেললেত পারবেন। কারণ দুটোরই ভর, গতি সমান। তাই একটা দেখেই আরেকটার অবস্থান, ভরবেগ বের করে ফেলা যায়। অথচ সেই ইলেকট্রনটা তার থেকে এক কিলোমিটার দূরে। অর্থাৎ সময় ব্যায় না করে এক কিলোমিটার দূরের আরেকটা ইলেকট্রনের ধর্ম বের করে ফেলা যাচ্ছে।
ধরা যাক, এভাবে ইলেকট্রন দুটি চলতে চলতে বহদূরের পথ পাড়ি দিল। দুজনের মধ্যবর্তী দূরত্ব এখন ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। একটার অবস্থান আমাদের পৃথিবীতে হলে আরেকটা চলে গেছে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিতে। আমরা পৃথিবীবর ইলেকট্রনের ভরবেগ আর গতিশক্তি ও অন্যান্য ধর্ম পরীক্ষা করে বলে দিতে পারি, অ্যান্ড্রোমিডাতে চলে যাওয়া সেই ইলেকট্রনের এই মুহূর্তের ধর্মও।

এই পরীক্ষার মধ্যদিয়ে আসলে আইনস্টাইন কোয়ান্টাম অনিশ্চিয়তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। এত দূর থেকেই যদি একটা কণার অবস্থা বলে দেওয়া যায়, কোয়ান্টামের অনিশ্চয়তা কোথায়? এখানেই আইনস্টাইনের প্রশ্ন।

ইপিআর নাড়া দিল শ্রোডিংগারকে। তিনি একটু অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইলেন বিষয়টাকে। বললেন দুটো কোয়ান্টাম কণা, পরস্পরের সাথে মিলিত হয়েছে। এতেই তাদের ভেতর তৈরি হয়ে হয়ে গেছে সেই মিলিত হওয়ার রেশ। ভালোবাসাও বলা যেতে পারে এটাকে। কোয়ান্টাম ভালোবাসা। তাই বহুদূনের গিয়েও রয়ে গেছে তাদের সেই ভালোবাসার রেশ। লাইলি-মজনুর ভালোবাসার মতো। এই ব্যাপারটার নাম দিলেন কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেমেন্ট। অর্থাৎ একজোড়া কণার মধ্যে তৈরি হয়ে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কের জের কণা দুটো বয়ে বেড়ায় বহদূর থেকেও। শ্রোডিংগার বললেন, কোয়ান্টামের জগৎটাই আসলে অদ্ভুত। কতটা? সেটার জন্য তিনিও একটা মানস পরীক্ষার উদাহরণ দিলেন। জন্ম দিলেন তাঁর বিখ্যাত বিড়াল কাহিনীর।

শ্রোডিংগার বললেন, একটা ধাতব বাক্স, তার ভেতরে বন্দী করে রাখা হলো একটা বিড়ালকে। রাখা হলো একটা তেজস্ক্রিয় পদার্থের উৎস, একটা হাতুড়ি আর একটা বিষপাত্র। হাইড্রোসায়ানিক বিষ আছে সেই পাত্রে। যেকেনো সময় তেজস্ক্রিয় উৎসাটার একটা পরমাণু ভাঙতে পারে। তার ফলে বিকিরত হবে শক্তি। সেই শক্তি হাতুড়িকে নাড়িয়ে দেবে। হাতুড়িটা তখন আঘাত করবে বিষপাত্রের গায়ে। পাত্র যাবে ভেঙে, বিষক্রিয়ায় মারা পড়বে বিড়ালটি।

এখন বাক্সটা এভাবে বন্ধ করে রাখা হলো এক ঘণ্টা। বাইরে থেকে বাক্সের ভেতরটা দেখা যায় না। তাহলে বলতে পারবেন বিড়ালটা এই মুহূর্তে জীবিত না মৃত?

শ্রোডিংগারের বিড়াল

পারবেন না। কারণ তেজস্ক্রিয় উৎস থেকে কখন একটা পরমাণু ভাঙবে কিনা সেটা আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তাই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না হাতুড়িটা নড়েছে কি-না। তাই আপনি নিশ্চিত নন গ্যাসপাত্র অক্ষত আছে কি-না। গ্যাসপাত্রের অবস্থা নিশ্চিত নয় বলে নিশ্চত নন, বিড়ালটা বেঁচে আছে না মারা গেছে। আপনার জন্য এখন দুটো সম্ভাবনাই সমান। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটেছে অথবা ঘটেনি। হাতুড়ি নড়েছে অথবা নড়েনি। বিষপাত্র ভেঙেছে অথবা ভাঙেনি। বিড়ালটা জীবিত অথবা মৃত। অর্থাৎ একটা বিড়াল এখন আপনার কাছে দুটো হয়ে গেছে। একটা জীবিত, একটা মৃত। এখানে তৈরি হয়ে গেছে একটা এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট। যখনই আপনি বাক্সের ডালাটা আলগা করবেন, তখন আবার বিড়াল একটা হয়ে যাবে। শুধু জীবিত অথবা শুধু মৃত।

এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের হিসাবটা এখানে তেজস্ক্রিয় পরমাণুর সাথে হাতুড়ির। হাতুড়ির সাথে বিষপাত্রের। বিষপাত্রের সাথে বিড়ালের। আপনি যদি নিশ্চিত হন, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটেছে, তাহলে সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যাবেন বিড়ালটিও মৃত। শ্রোডিংগার বললেন, যখনই আপনি সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, তখনই বিড়ালটার সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ছে। তিনি বললেন, কোয়ান্টাম কণিকাদের ক্ষেত্রেও হিসাবটা এরকম। আপনি যখন কোয়ান্টাম কণাদের কোনো সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পর্যক্ষণ করতে যাবেন, কণাগুলো সেই চরিত্রই আপনাকে দেখাবে। বিষয়টা আরো পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য আমি নিজের লেকার উদাহরণ দিতে পারি। জনপ্রিয় কিশোর ম্যাগাজিনে ২০১৬ সালে ‘বিজ্ঞানের গোলকধাঁধা’ নামে এটা ফিচার লিখেছিলাম, সেটারই অংশবিশেষ তুলে দিলাম কোয়ান্টাম কণিকাদের চরিত্র বোঝার জন্য-

“ইলেকট্রন বা ক্ষুদ্র কণারা তাদের চলার পথে ঠিক কোন জায়গায় অবস্থান করে? বিজ্ঞান বলে তারা এক সাথে চলার পথের সবখানে থাকে। পথ একাধিক হলে সবগুলো পথে একসাথে চলে! রহস্য না ধাঁধা?

ধরো একই কোয়র্টারে তোমারা চার বন্ধু থাকো। তোমাদের কোয়ার্টার থেকে স্কুলে যাবার চারটা পথ আছে। তোমরা সবাই একই সাথে স্কুলে যাও। ঠিক কোনপথে যাও সেটা কেউ  জানে না। ধরা যাক, তোমরা একেজন একেকটা ইলেক্ট্রন। ১ ও ৪ নং পথ দুটো খুব নোংরা। ওই পথে যাওয়া বারণ। কিন্তু তোমার বাবার সন্দেহ হলো। তিনি একদিন চুপি চুপি ১ নং পথে গিয়ে বসে থাকলেন। দেখলেন, যে তোমরা সেই পথেই যাচ্ছো। আরেক দিন ৪ নং পথে গিয়ে দেখলেন তোমরা সেই পথেই যচ্ছো। এবার দেখলেন ভালো পথে যাও কিনা। পর পর দুদিন ২ ও ৩ নং পথে পাহারা দিলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন তিনি যেদিন যে পথে পাহারায় থাকছেন সেদিন সেই পথে তোমরা যাচ্ছ। অথচ তোমার বাবার এই পাহারা দেবার ঘটনটা তোমাদের জানার কথা নয়।

তোমার বাবা তোমার বন্ধুদের বাবাকে বললেন ঘটনাটা। তাঁরা আলাপ করে একেকজন একেক পথে পাহরা বসালেন। তাঁরা অবাক হয়ে দেখলেন এবার তোমরা আর একসাথে যাচ্ছ না। প্রত্যেক পথে আলাদা আলাদা পথে যাচ্ছ। যিনি যে পথে বসছেন, তাঁর ছেলে সেই পথেই যাচ্ছে।

এবার বাবারা অন্য ফন্দি আঁটলেন। দুজন করে পাহারা বসালেন দুই পথে। ২ ও ৪ নং পথে। আরও অবাক ব্যাপার, তোমরা এবার দুজন দুজন করে সেই দু পথেই যাচ্ছ। কোন দুজন কোন পথে? যার যার বাবা যে পথে, তারা সেই পথেই! রহস্য, বড়ই রহস্য! নাকি গোলকধাঁধা। তোমরা কোনওভাবে জেনে যাচ্ছো আগে থেকেই তোমার বাবার কোন পথে পাহারা দেবেন? কিন্তু মনে রেখো তোমারা হচ্ছো ইলেক্ট্রন। জড় বস্তু। আর তোমার বাবার ভূমিকায় নামকরা সব বিজ্ঞানীরা!

এবার বাবারা একসাথে ঝটিকা অভিযান চালালেন। এবার তারা মোটর বাইকে করে তোমাদের ওপর নজর রাখলেন। প্রথমে ১ং পথে গিয়ে দেখলেন তোমরা চারজনই সেই পথে। তোমাদের স্কুলে পৌঁছানের আগেই তাঁরা ৩ নং পথে চলে গেলেন। ততক্ষণে তোমাদের ২নং পথে স্কুলের খুব কাছে পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাবারা  হতভম্বের মতো দেখলেন, তোমরা চারজনই ৩নং পথ দিয়ে স্কুলের খুব কাছে পৌঁছে গেছ! কোনওভাবেই বাবাদের আগে তোমরা ৩ং পথে যেতে পারো না।
এটা কণা বিজ্ঞানের এক মস্ত রহস্য। তবে প্রমাণিত সত্য। এর ব্যাখ্যা কী? বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান অন্যভাবে ভাবলেন। ক্ষুদ্র কণারা তাদের সামনে খোলা যতগুলো পথ আছে সবগুলোতে একসাথে চলে। আমরা যখন নির্দিষ্ট একটা পথ খুঁজি তখন ওরা সেই পথেই যায়। দুই পথেই তাহলে সবগুলোকে একই সাথে পাওয়ার কথা।

একই সাথে অসংখ্য পথে চলে পারমাণবিক কণারা

যখন দুটো পথে আলাদা আলাদা একই সাথে পাহারা বসানো হচ্ছে, তখন কণাগুলো দুভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে কেন? ফাইনম্যানের যুক্তি হলো, কণাদের আচারণ অদ্ভুত হলেও তারা বাস্তব কণা। নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে পারে না কখনোই। তাই একাধিক পর্যবেক্ষণের সময় ওরা ভাগ হয়ে যায়।’

এটাই আসলে কোয়ন্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের চিত্র। ধরা যাক, ইয়ংয়ের ডাবল স্লিটের মতো একটা পরীক্ষা করবেন আপনি। তবে আলোর বদলে আপনি ছিদ্র দিয়ে ইলেকট্রন পাঠাবেন। দুটো ছিদ্র আছে। তার ভেতর দিয়ে আপনি দশ হাজার, ইলেকট্রন পাঠাবেন। দেখবেন ইলেকট্রনগুলো দুই ছিদ্রের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে এবং পর্দার ওপর একটা অপবর্তন প্যাটার্ন তৈরি করছে। কোন ছিদ্র দিয়ে কতগুলো ঢুকল। হিসেব করলে দেখবেন, দুটো ছিদ্র দিয়েই ৫ হাজার করে ইলেকট্রন ঢুকেছে। অর্থাৎ ইলেকট্রনের তরঙ্গ ধর্ম আপনি পেয়ে গেলেন এই পরীক্ষায়। এবার একটা ছিদ্র বন্ধ করে দিন। ইলেকট্রন হিসাব অনুযায়ী একটা ছিদ্র দিয়ে ৫ হাজার ইলেকট্রন একসাথে ঢোকার কথা। কিন্তু দেখবেন, ৫ হাজার নয়। দশ হাজার ইলেকট্রনই একসাথে এক ছিদ্র দিয়ে ঢুকছে। ওপাশের পর্দায় গিয়ে জড়ো হচ্ছে একটা বিন্দুতে। তখন ইলেকট্রনের আর অপবর্তন প্যাটার্ন পাবেন না। অর্থাৎ ইলেকট্রন এবার কণার মতো আচরণ করবে।

আসলে প্রথমবার আপনার ছিদ্র ছিল দুটো। ওটা তো ব্যাতিচার মাপার মাপার জন্য। তখন ইলেকট্রন আপনাকে তার তরঙ্গ ধর্ম দেখিয়ে দিয়েছে। পরে আপনি একটা ছিদ্র রেখেছেন। একটা ছিদ্র আসলে কণাধর্ম পরীক্ষা করার জন্যই। এক্ষেত্রে ইলেকট্রন আপনাকে কণা ধর্ম দেখিয়েছে। তার মানে কী? আপনি যেভাবে ইলেকট্রনকে দেখতে চান, সেটা সে বুঝে ফেলছে, আপনাকে সেভাবেই তার চেহারা দেখাচ্ছে। বিচিত, বড়ই বিচিত্র ব্যাপার। আইনস্টাইন এটা মানতে চাননি। তাই তিনি বলেছিলেন, নিশ্চয়ই ইশ্বর পাশা খেলা করেন না।

অনিশ্চিয়তাবাদীরা কোয়ান্টাম কণিকাদের এই অদ্ভুতুড়ে আচরণ মেনে নিয়েছিলেন। তাই বোর, আইনস্টাইনের জবাব দিয়ে বলেছিলেন, আপনাকে বলে দিতে হবে না, ইশ্বর কী করবেন না করবেন না।

আইনস্টাইন মানুন আর না মানুন। কোয়ান্টাম কণিকাদের এই অদ্ভুত চরিত্রই কিন্তু পরে প্রমাণ হয়।  ১৯৮১ সালে এবং ১৯৯৭ সালের দুটি পরক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ হয় কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গেলমেন্ট সঠিক।

[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]
বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্পূর্ণ বইটি পড়া যাবে। তবে কেউ সংগ্রহে রাখতে চাইলে অনলাইনে কেনা যাবে ০১৫৫ ৭৭৭ ৯৩২৩ নম্বরে ফোন করে।

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]