[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]

বোর মডেলের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। সোমারফেল্ড আর দ্য ব্রগলি সেগুলো কীভাবে সমাধান করেছিলেন তাও দেখলাম। কিন্তু একটা সমস্যা তখনো রয়ে গেল গলায় আটকে থাকা কাঁটার মতো।
বোরের মডেল থেকে জানা যায়নি এক কক্ষপথ থেকে আরেক কক্ষপথে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ইলেকট্রন কী করে, কোথায় থাকে?

এ প্রশ্নে জবাব দ্য ব্রগলির আবির্ভাবের পরেও কেউ দিতে পারেনি। ব্রগলি যখন বোরের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবছেন, তখন আরেকজন তরুণ বিজ্ঞানীও নাওয়া-খাওয়া ভুলে সেগুলোর জবাব খুঁজে ফিরছেন। বিশেষ করে, ইলেকট্রন চার্জিত কণা হয়েও কেন ম্যাক্সওয়েলের তড়িচ্চুম্বকীয় তত্ত্ব মানে না, সেটা নিয়ে বেশি ভাবছেন সেই জার্মান যুবক। নাম তাঁর ওয়ার্নার কার্ল হাজেনবার্গ। জার্মান ঊচ্চারণে যার নাম ভার্নার হাইজেনবার্গ।

১৯২৫ সাল। হাজেনবার্গের বয়স তখন মাত্র ২৪। সেই বয়সে তিনি মনপ্রাণ সপে দিয়েছেন কোয়ান্টাম তত্ত্বে। হঠাৎ তিনি জ্বরে আক্রান্ত হলেন। বিখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্ণ তাঁর শিক্ষক। তিনি হাইজেনবার্গকে পরামর্শ দিলেন কিছুদিনের জন্য হাওয়া বদলের। গুরুর পরামর্শ মেনে চলে গেলেন উত্তর মহাসাগরের এক দ্বীপে। কিন্তু মন যার বোরের পারমাণবিক মডেলে মজেছে তিনি তা থেকে রেহাই পাবেন কী করে! তার মাথায় ওই একই চিন্তা ব্যাটা নচ্ছার ইলেকট্রন, কেন সে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে? কী এমন গুণ ইলেকট্রনের যে, কোয়ন্টাম লাফের সময় তার চেহারা-সুরত কেমন, সেটা জানতে দেবে না?

হাইজেনবার্গ দ্বীপে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াননি। খাতা-কলম আর মগজের কারবার করেছেন। অঙ্ক কষেছেন। ভাবনা-চিন্তা আর অঙ্কের খেলা করতে করতে হাইজেনবার্গের একসময় মনে হলো, কেয়ান্টাম লাফের সময় ইলেকট্রনের চরিত্র খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল। আসলে প্রশ্নটির ভিতই নেই।

ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ

গোলাকার পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর শেষ কোথায়? বা পৃথিবী পৃষ্ঠের কেন্দ্র কোথায়? এসব প্রশ্ন অবান্তর। তেমনি অবান্তর কোয়ন্টাম এক শক্তিস্তর থেকে কোয়ন্টাম লাফ দিয়ে আরেক শক্তিস্তরে পৌঁছুনোর মধ্যবর্তী সময়ে ইলেকট্রন কোথায় থাকে, সে প্রশ্নটিও। হাইজেনবার্গের মাথায় এলো ইলেকট্রনের গতিপথ বলে কিছু নেই। ইলেকট্রন শুধু এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে দেখা যায়। এর মধ্যবর্তী কোনো স্থান এদের নেই। আসলে ইলেকট্রনের গতিপথ আঁকা বা কল্পনা করা যায় না। শুধু মাত্র অবস্থানগুলো চিহ্নিত করা যায়। এ বিষয়টাকে তুলনা করা যেতে পারে দাবা কোট আর গুটিগুলোর সাথে। দাবার যেকোনো গুটিকে দাবার নিয়ম মেনে একটা নির্দিষ্ট ঘরে নেওয়া যেতে পারে। তবে এক ঘর থেকে নেওয়া হবে কোন পথে সেটার সাথে দাবা খেলার কোনো সম্পর্কই নেই। অর্থাৎ প্রতিপক্ষ আর বিচারকরা দেখবেন দাবার গুটিটা কোন ঘর থেকে কোন ঘরে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নেওয়অর সময় সেটা গড়িয়ে নেওয়া হলো, নাকি কোটের ওপর দিয় ঘষটে নেওয়া হলো নাকি হাত দিয়ে উঠিয়ে সেই ঘরে রাখা হলো এগুলোর দিকে কেউ দৃষ্টি দেন না। এগুলোর সাথে দাবা খেলার কোনো সম্পর্কই নেই। তাই প্রতিপক্ষ, রেফারি বা দর্শক কেউ এ বিষয় নিয়ে মাথাই ঘামান না। হাইজেনবার্গ ভাবলেন, ইলেকট্রনের শক্তিস্তর বদলের সময়ও একই ব্যাপার ঘটে। কোয়ান্টাম শর্ত মেনে ইলেকট্রন ঠিক ঠিক কক্ষপথে যাচ্ছে কিনা সেটাই আসলে বিজ্ঞানীদের মাথা ঘামানোর বিষয়। এক শক্তিস্তর থেকে আরেক শক্তিস্তরে পৌঁছনের মধ্যবর্তী সময়ে ইলেকট্রন কী করল সেটা জানার কোনো দরকার নেই।

ধরা যাক, ইলেকট্রন শক্তি শোষণ করে ১ নং শক্তিস্তর থেকে ৩নং শক্তিস্তরে যাবে। কিন্তু মাঝখানের অনঅনুমোদিত কক্ষপথগুলোতে ইলেকট্রন থাকতে পারে না। তাই সেইসব কক্ষপথে ইলেকট্রন দেখা যাবার কথাই নয়। যদি দেখা যেত, তাহলে সেটা কোয়ন্টাম শর্ত লঙ্ঘন করত। শর্ত লঙ্ঘন হলে তো হুমকির মুখে পড়ত খোদ তত্ত্বটিই। সুতরাং মাঝখানের কোনো জায়গায় তার দেখা যাবার কথা নয়। অবশ্য ১ ও ৩ নং শক্তিস্তরের মাঝে একটা কোয়ন্টাম শর্ত পূরণ করা অনুমোদিত কক্ষপথও আছে। সেটা হলো ২ নং কক্ষপথ। সেই কক্ষপথগুতে কি একঝলক ইলেকট্রনকে দেখা যাওয়ার কথা নয়?

ইলেকট্রনের কক্ষপথগুলো এক সমতলে থাকে না। তাই ১ থেকে ৩নং কক্ষপথে যাওয়ার সময় ইলেকট্রনের সামনে ২নং কক্ষপথটি নাও পড়থে পারে। কিন্তু যদি পড়ে?

তাহলেও সম্ভব নয়, ওই ইলেকট্রনকে ২নং কক্ষপথে দেখা পাওয়ার। কারণ ইলেকট্রন একটা নির্দিষ্ট শক্তি বা কম্পাঙ্কের আলো শোষণ করেই তার কক্ষপথ থেকে কোয়ান্টাম লাফ দেয়। সেই নির্দিষ্ট শক্তির আলোই ঠিক করে দেয় ইলেকট্রনের পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে। সেই কক্ষপথেই ইলেকট্রন সরাসরি পৌঁছে যাবে। এর মধ্যবর্তী কোনো জায়গা বা কোনো অনুমোদিত কক্ষপথেও সে দেখা দিতে পারবে না। তাহলে কোয়ান্টাম শক্তি শোষণের নীতি লঙ্ঘণ হবে। তাই ইলেকট্রনের শুধু কোয়ান্টাম লাফের আগে আর পরের অবস্থানই সনাক্ত করা যাবে, সেই অবস্থান দুটোতে ইলেকট্রন দেখা দেবে, কিন্তু মধ্যবর্তী কোনো জায়গায় ইলেকট্রন অবস্থান করতে পারবে না। তাই মধ্যবর্তী কোনো জায়গায় ইলেকট্রনকে এক ঝলক দেখাও যাবে।

দুই
১৯২২ সালের জুন মাস। গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালের বোরকে আমতন্ত্রন জানান আপেক্ষি তত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডেভিড হিলবার্ট। ১২ জুন থেকে ২২ জুন টানা বক্তৃতা দেন বোর। বক্তৃতার বিষয় ছিল বোর মডেলের বিশদ বিবরণ। গটিংগেনের সব পদার্থবিদ, গবেষক, ছাত্র সেই বক্তৃতার মূল স্রোতা। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছেন সোমারফেল্ড। তাঁর দুজন ছাত্রকে নিয়ে। দুই ছাত্র পরবর্তীকালের দুই বিখ্যাত কোয়ান্টাম তত্ত্ববিদ উলফগ্যাং পাউলি আর ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। বোরের বক্তৃতা দুজনের মনেই রেখাপাত। কিনউত বোরকে প্রশ্ন করতেও ছাড়েননি হাইজেনবার্গ। কিন্তু বোরের কাছে সেই প্রশ্নের উত্তর তখন ছিল না। সেই প্রশ্নে উত্তর খুঁজতেই গিয়েই পরবর্তীতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্ম দেন হাইজেনবার্গ।

১৯২০ সালে হাইজেনবার্গ সোমারফেল্ডের অধীনে পিএইচডি করতে আসেন। এবং পরমাণুর অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। হাইজেনবার্গ চেষ্টা করছিল বিষম জিম্যান ইফেক্ট ব্যাখ্যা করার। সেটা করতে গিয়ে তিনি অর্ধপূর্ণ কোয়ন্টাম সংখ্যা ব্যবহার করে বসেন। অর্ধপূর্ণ কোয়ন্টাম সংখ্যা কোয়ান্টাম তত্ত্বের নীতি বিরোধী। সুতরাং সোমারফেল্ড সেটা খারিজ করে দিলেন।
ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য সোমারফেল্ড হাইজেনবার্গ একটা বিষয় নির্বাচন করে দিয়েছিলেন। সেটা তরল গতিবিদ্যার সমস্যা। সেটার সমাধান হাইজেনবার্গ করেছিলেন একেবারে নিজস্ব পদ্ধতিতে। সেটা ১৯২৩ সালের ঘটনা। কিন্তু কম্পিউটার আবিষ্কারের আগে সেটা ঠিক কিনা নিশ্চিত হতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে কম্পিউটার আবিষ্কারের পর ১৯৫২ সালে বিজ্ঞানীরা সেই ফলফলটা যাচাই করে দেখেন, হাইজেনবার্গ শতভাগ ঠিক ছিলেন।

১৯২৩ সালে হাইজেনবার্গ মিউনিখ গটিংগেনে চলে যান। ম্যাক্স বর্নের কাছে গবেষণা করতে। ১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে তিনি গটিংগেনের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তখনই তিনি হাইড্রেজেন বর্ণালীর তীব্রতা গণণা করতে শুরু করেন। কিন্তু অচিরেই বুঝলেন, প্রচলিত গণিত দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। আসলে বোর মডেলের ত্রুটিটা তো ছিলই। আর বোর মডেল গড়েই উঠেছে হাইড্রোজেন পরমাণুর ওপর ভিত্তি করে। হাইড্রোজেন পরমাণুর গঠর ব্যাখ্যা করতে যাওয়া মানে অবধারিতভাবে সেখানে হাইড্রোজেন বর্ণালী চলে আসে। এজন্যই বোধহয় হাইজেনবার্গ হাইড্রোজেন বর্ণালীর তীব্রতা গণনা করতে চেয়েছিলেন।

আমরা কোয়ান্টাম বর্ণালীর অধ্যায়ে দেখে এসেছি, ইলেকট্রন যখন উচ্চ শক্তিস্তর থেকে নিন্ম শক্তিস্তরে কোয়ান্টাম লাফ দেয় তখনই আলোকরশ্মি বিকিরণ করে। ইলেকট্রন এক শক্তিস্তর থেকে অন্য শক্তিস্তরে যায় কিন্তু এক অবস্থান থেকে আরেক অবস্থানে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে সে কী করে তার খোঁজ পাওয়া যায় না। কিন্তু লাফ দেওয়ার আগের এবং পরের অবস্থান বের করা যায় সহজেই।

সাধারণ একটা বস্তুর কথা বলি। ধরা যাক, বস্তুটি A বিন্দু থেকে সোজাপথে B বিন্দুতে যাবে। A থেকে B পর্যন্ত বস্তুটির জন্য একটা সরলরেখা আাঁকা যায়। সরলরেখা মানে অনেকগুলো বিন্দু পর পর বসিয়ে একটা লম্বা সোজা রেখা। A থেকে B বিন্দুতে যাওয়ার বস্তুটি AB সরলরেখার প্রতিটি বিন্দু স্পর্শ করে যাবে। তাই প্রতিটি বিন্দুতে সরলরেখার একটা করে অবস্থান পাওয়া যাবে। ভেক্টর জ্যামিতিক হিসেবে বস্তুটির দুটি অবস্থান উভয়দিক থেকে গুণ করলে সমাণ ফল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ AB = BA। বস্তুটি যদি সরলরেখায় না গিয়ে বক্রপথে যায়, তবুও আমরা AB = BA লিখতে পারব। পথ বাঁকা হলে বস্তুটি চলারপথে AB বক্ররেখার প্রতিটা বিন্দু স্পর্শ করে যায়। একটা নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুটি ওই বক্ররেখার যেকোনো একটা বিন্দুতে অবস্থান করবে।

তবে এই হিসাব ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে চলবে না। ইলেকট্রন A থেকে B-তে কোন পথে যায়, সে হিসাব কষা যায় না। কারণ ইলেকট্রনের পথটি সরলরেখা না বক্ররেখা সেকথা কেউ বলতে পারে না। মোটকথা ইলেকট্রনের A থেকে B-তে যাওয়ার পথে আর কোনো বিন্দুতে অবস্থান করে না। শুধু A ও B অবস্থানকেই হিসাবে আনতে হবে। অন্যকোনো অবস্থানের হিসাব আনলে চলবে না। AB = BA হবে না তখন। ইলেকট্রনে জন্য A ও B আলাদা আলাদা কোয়ন্টাম সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। এদেরকে সাধারণ বীজগাণিতিক কিংবা জ্যামিতিক নিয়মে গুণ করা যায় না।

এমন গণিতের কথা আগে আগে কেউ শোনেনি। তাই হাইজেনবার্গের এই সমীকরণ দেখে ভড়কে গেল অনেকে। হাইজেনবার্গ নিজেও একটা উদাহরণ খুঁজছিলেন। সেই উদাহরণ যেন এই গণিতের সাহায্যে দেওয়া যায়। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন বিষম ছন্দিত স্পন্দক (সরল ছন্দিত দোলক নয়) গতির সমীকরণ তাঁর এই নতুন গণিত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

এরপরই পরই হাইজেনবার্গ অসুস্থ হয়ে পড়েন আর বর্নের পরামর্শে দ্বীপে যান অবকাশযাপন করতে। সেখানে থাকতেই দুটি সম্যসার সমাধান পেয়েছিলেন হাইজেনবার্গ। বোরের কোয়ান্টাম তত্ত্বের সকল শর্ত তার গণিতের সাহায্যে লেখা যায়, সেই পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন। আর নতুন গণিতের সাহায্যে শক্তির সংরক্ষণশীলতা যাতে লঙ্ঘিত না হয়, তার একটা গাণিতিক পদ্ধতিও আবিষ্কার করলেন।
সাজিয়ে-গুছিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখে ফেললেন হাইজেনবার্গ। জুলাইয়ের শেষ দিকে সেটা গুরু বর্নকে দেখালেন। ভাবনায় পড়ে গেলেন বর্ন। এ ধরনের গণিত আসলেই কি সম্ভব? সারাদিন আর সারারাথ ভাবতে লাগলেন। পরদিন পেয়ে গেলেন সমাধান। আবিষ্কার করে ফেললেন এ ধরনের গুণন কেবল ম্যাট্রিক্স ক্যালকুলাসেই সম্ভব। হাইজেনবার্গের সেই সমীকরণ বর্ন ম্যাট্রিক্স পদ্ধতিতে প্রকাশ করে দিলেন। আর তারফলেই জন্ম হলো ম্যট্রিক্স গতিবিদ্যার।
তিন
কোনো বস্তুর গতি থাকলে তার জন্য বলবিদ্যা থাকবে। সকল জড়বস্তুর জন্য আছে নিউটনীয় গতিবিদ্যা। আবর বিদ্যতের জন্য আছে তড়িৎগতিবিদ্যা। তাই কোয়ান্টাম কণিকাদের জন্যও গতিবিদ্যার আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। তরুণ হাইজেনবার্গ সেই করে দেখালেন।

একটা রেলগাড়ি কিংবা একটা রকেটের গতি আছে। আছে গতিপথ। ইলেকট্রনের মতো কোয়ান্টাম কণিকাদের গতিপথ নেই। তাই চিয়ায়ত গতিবিদ্যা দিয়ে কোয়ন্টাম কণিকাদের গতি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাই হাইজেনবার্গের কাজটি ছিল পদার্থবিজ্ঞানে সম্পূণ নতুন। যেমন নতুন ছিল নিউটনের গতিবিদ্যা, ম্যাক্সওয়েলের তড়িচ্চুম্বকীয় তত্ত্ব, নতুন ছিল প্ল্যাঙ্ক-আইনস্টাইনের কোয়ন্টাম তত্ত্ব। তেমনি হাইজেন বার্গের তৈরি করা ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যায় প্রথমবারের তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্ম দেয়। তাই বলে হাইজেনবার্গকে একক কৃতিত্ত্ব দিলে চলে না। শ্রোডিংগার, আর পল ডিরাকের অবদানও কম নয় সর্ম্পূর্ণ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা তৈরিতে। সে বিষয়ে আমরা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে জানব।

এখন আমরা দেখে একনজর দেখে নিই হাইজেনবার্গের সমীকরণটা কেমন ছিল। তবে ক্যালকুলেশনে যাব। আমরা এই বইয়ে সেইসব ছোটখাটো ক্যালকুলেশনই করেছি যেগুলো হাইস্কুলের বীজগণিত জানলেই বোঝা যায়। কিন্তু ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যার সমীকরণের প্রতিপাদন অতটা সহজ গণিত ব্যবহার করে করা সম্ভব নয়। তাই এই আমরা সেদিকে যাব না। তবে সমীকরণটা দেখে নিতে তো দোষ নেই।

$latex \sum _{ k }^{  }{ (X_{ nk }.P_{ km }-P_{ nk }.X_{ km }) } =i\frac { h }{ 2\pi  } $
এখানে X হলো ইলেকট্রনের অবস্থান, এবং ভরবেগ P।

হাইজেনবার্গের এই সমীকরণ প্রথম ব্যবহার করলেন উলফগ্যাং পাউলি। তিনি হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রনের গতি ও ভরবেগ বের করতে ব্যবহার করলেন। বোরের তত্ত্ব ব্যবহার করে ইলেট্রনের ভর, বেগ, গতিশক্ত, কক্ষপথের শক্তি ইত্যাদি যেসব মান পাওয়া গিয়েছিল, হাইজেনবার্গের বলবিদ্যা ব্যবহার করে পাউলিও সেইসব মান পেলেন। নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স বলবিদ্যা। পরবর্তীকালে হাইজেনবার্গ তাঁর অমর অনিশ্চয়তা তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর এইসব কাজের স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৩১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল দেওয়া হয়।

[বইটির সূচীপত্র এবং সবগুলো খন্ডের লিংক একত্রে দেখুন এখানে]
বিজ্ঞান পত্রিকায় সম্পূর্ণ বইটি পড়া যাবে। তবে কেউ সংগ্রহে রাখতে চাইলে অনলাইনে কেনা যাবে ০১৫৫ ৭৭৭ ৯৩২৩ নম্বরে ফোন করে।

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]