উপমহাদেশে পক্ষীতত্ত্ব গবেষণায় পথিকৃৎ সত্যচরণ লাহা

0

সেই চর্যাপদ-শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের সময় থেকে আজ, এই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিন অবধি বাংলার প্রকৃতি আর পাখপাখালির কলরবে মুগ্ধ হয়ে কবিতা লেখেননি এমন কবি কিংবা এই মুগ্ধতার বর্ণনা কোন ঔপন্যাসিক তাঁর লেখায় যোগ করেন নি  – এমনটা বোধ করি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাংলার প্রকৃতি আর পাখিদের উপর গবেষণা নিবন্ধ রচনা করে জগতের সামনে পাখিদের কলরবে ভরপুর বাংলার এই বিপুল প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য আর বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরেছেন- এমন বৈজ্ঞানিকের সংখ্যা খুব একটা বেশি নেই। আর তাই বাংলার প্রকৃতি, বিশেষত বাংলার পাখিদের নিয়ে গবেষণাকর্মে পথিকৃৎ বলা চলে যে মানুষটিকে তাঁর নাম সত্যচরণ লাহা। তিনি বিপুল ঐশ্বর্য আর আর্থিক সচ্ছলতা সম্পন্ন কলকাতার কৈলাস বসু স্ট্রিটে অভিজাত লাহা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা অম্বিকাচরণ ও মাতা কিরনবালা। তাঁর মূল পড়াশোনা মেট্রোপলিটন ও প্রেসিডেন্সি কলেজে। ইতিহাস বিষয়ে তিনি এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্র হওয়ার পরেও মনে প্রাণে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃতি পর্যবেক্ষক।

পক্ষীতত্ত্ববিদ সত্যচরণ লাহা

সত্যচরণ প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ বোধ করতেন একেবারে ছোটবেলা থেকেই। মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতেন আর  পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যবেক্ষণ করতেন আশেপাশের সকল কিছুকে। প্রকৃতির কোলে ছড়িয়ে থাকা বিচিত্র সব আনন্দ আয়োজন তিনি প্রাণভরে উপভোগ করতেন। দেশ বিদেশের পাখি সম্বন্ধে তিনি কৌতূহলী হয়েছিলেন ছাত্র অবস্থা থেকেই। ১৯২৮ সালে কলকাতার কাছে আগরপাড়ায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি পাখি নিকেতন। পক্ষীতত্ত্ব (Ornithology) সম্বন্ধে তাঁর অগাধ পড়াশোনা ছিল। পাখিকে হাতে নিয়ে বা খাঁচায় পুরে তার আচরণ সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণের চেয়ে লাহা চাইতেন প্রাকৃতিক ভাবেই এদের স্বাভাবিক আচরণ প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানতে। বনে জঙ্গলে বিচিত্র রকমের সব পাখির আচার আচরণ , বাসা তৈরির কৌশল, বাচ্চা প্রতিপালন এই সব কিছুই তিনি সূক্ষ্মভাবে নোট করে রাখতেন।

পাখি নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধগুলি ছিল বেশ সমৃদ্ধ এবং তাঁর অধিকাংশ গবেষণাগুলি বোম্বে জার্নাল অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি, এভিকালচার , আইবিস ( International Journal of Avian Science ) এর মত পিয়ার রিভিউ জার্নালে ছাপা হয়েছিল। পাশাপাশি তিনি বাংলায় বিভিন্ন সময়ে যে সব পাখিকে পোষ মানানো হয় তাদের জীবন, আচরণ প্রভৃতি বিশদ বিবরণ সহ উপর কয়েক খণ্ডে “পেট বার্ডস অফ বেঙ্গল” শিরোনামে বই রচনা করেন। তাঁর গবেষণা শুধুমাত্র পাখিদের নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাংলার তথা সেই সময়কার ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষা পদ্ধতি এবং এর বিবর্তনমূলক ইতিহাস সম্বন্ধেও আগ্রহী ছিলেন।  তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা নিবন্ধ ও বই এর তালিকা দেওয়া হল ।

  1. Law, S.C., 1945. Note on the Occurrence of some hitherto unrecorded Birds in Central and South Bengal. Ibis, 87(3), pp.405-408.
  2. LAW, S.C., 1924. XXXV.—Some Observations on Pyrrhulauda grisea. Ibis, 66(4), pp.645-647.
  3. Law, S.C., 1923. Pet Birds of Bengal: By Satya Churn Law. With a Foreword by Graham Renshaw. With Illustrations by N. Kushari. Thacker, Spink & Company.

সত্যচরণ লাহার আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল বাঙলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চাতে এগিয়ে আসা। পাখিদের উপর  ইংরেজি বইয়ের পাশাপাশি “পাখীর কথা” “কালিদাসের পাখী” “জলচারী” ইত্যাদি বইও তিনি রচনা করেছিলেন যেগুলো বাঙলা ভাষায় পক্ষীতত্ত্ব উপর বেশ সমৃদ্ধ কয়েকটি বইয়ের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। পুরুলিয়া জেলার অনবদ্য ও ব্যতিক্রমধর্মী প্রকৃতিকে পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য বলা চলে। এই পুরুলিয়ার পাখিদের নিয়ে সম্ভবত তিনিই সর্বপ্রথম সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় বাঙলা ভাষায় একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। সত্যচরণ যুগপৎ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলা ভাষায় “প্রকৃতি” নামের একটি বিজ্ঞান পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা করবার জন্য। সেই সময় “প্রকৃতি” নামের এই পত্রিকাটি যথেষ্ট খ্যাতি পেয়েছিল। বিদেশি বিভিন্ন শব্দ থেকে বাঙলা পরিভাষা সৃষ্টি ও প্রচলনের ক্ষেত্রেও এই পত্রিকার যথেষ্ট অবদান ছিল।

(সত্যচরণ লাহা রচিত পেট বার্ডস অফ বেঙ্গল)

পক্ষীতত্ত্ব সম্বন্ধীয় তাঁর এই গবেষণা ও বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি সম্মাননা পেয়েছেন নানা প্রতিষ্ঠান থেকে। আলিপুর চিড়িয়াখানায় তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় সভাপতি। ১৯৩৬ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তিনি লন্ডন জ্যুওলজিক্যাল সোসাইটিরও ফেলো নির্বাচিত হয়েছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি , বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।

১৯৮৪ সালের ১১ ডিসেম্বর বাংলায় পক্ষীতত্ত্ব চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ এই মানুষটি পরলোকগমন করেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা , পক্ষীতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর অসামান্য অবদান এবং তৎকালীন নানা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলার প্রকৃতি তথা পাখিদের নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

Reference:

  1. Shils, E., 1997. Portraits: a gallery of intellectuals. University of Chicago Press.
  2. Law, S.C., 1923. Pet birds of Bengal (volume 1). Calcutta, India: Thacker, Spink & Co.
  3. http://www.insaindia.res.in/detail.php?id=N36-0412

-অতনু চক্রবর্ত্তী
বুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিন কোরিয়া

Share.

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.