শ্লথ কেন শ্লথগতির?

0
84

[অতনু চক্রবর্ত্তী রচিত জীববিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা বইটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞান পত্রিকায়। আজ রইল এর প্রথম অধ্যায়, দুই সুতোয় বাঁধা জীবনমাল্যের ইতিকথা। বইয়ের সূচীপত্র (সবগুলো অধ্যায়ের লিংক পেতে) ও বিষয়বস্তুর জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন। ]

<

p style=”text-align: center;”>A thousand species have lived
& died. Born on a Sunday
Morning, with old-world algae
In your long hair, a goodness

<

p style=”text-align: center;”>Disguised your two-toed claws
Bright as flensing knives. In this
Upside-down haven, you’re reincarnated
As a fallen angel trying to go home.

-Yusef Komunyakaa

 

থমাস জেফারসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট । ১৭৭৬ সালে কর্ণেল স্টুয়ার্ট তাঁকে এক বাক্স ফসিল হয়ে যাওয়া কোন এক অজানা প্রাণীর অস্থি পাঠান । ভার্জিনিয়ার গ্রিনবায়ার কাউন্টিতে একটা গুহার ভেতর এই অস্থিগুলো পাওয়া গিয়েছিল । অস্থিগুলির ভেতরে বেশ দীর্ঘ আর ধারাল নখ যুক্ত পায়ের হাড় থাকায় তিনি ধরে নিয়েছিলেন এগুলো কোন সিংহের ফসিল এর অংশ । তাই ১৭৯৭ সালের ১০ ই মার্চ ফিলাডেলফিয়াতে অনুষ্ঠিত হওয়া আমেরিকান ফিলোসফিক্যাল সোসাইটির যে কনফারেন্সে জেফারসন “Certain Bones” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেই প্রবন্ধে তিনি মন্তব্য করেন এই অস্থিগুলো কোন বড় আকৃতির সিংহের ।

অস্থিগুলির মধ্যে ধারালো নখর বিশিষ্ট অস্থি থাকায়  তিনি সিংহের নামকরণ করেন Megalonyx (Giant Claw)। কিন্তু মজার ব্যাপার হল জেফারসনের বাক্সের হাড়গুলি কিন্তু সিংহের ছিল না । ওগুলি এসেছিল বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দানবাকৃতির শ্লথ হতে।

জেফারসন এই ফসিল হয়ে যাওয়া অস্থিগুলিই পেয়েছিলেন

ডাঙ্গায় চলে ফিরে বেড়ানো প্রাগৈতিহাসিক শ্লথগুলোর আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর আগে । উত্তর, দক্ষিণ আর মধ্য আমেরিকা মহাদেশের প্রায় পুরোটা জুড়ে বেশ কয়েক প্রজাতির শ্লথ দেখতে পাওয়া যেত । তখনকার Megalonychidae গোত্রের কিছু শ্লথ এখনো টিকে আছে  যেগুলির আকার  বড়োসড়ো বেড়ালের আকৃতির । কিন্তু শ্লথের অধিকাংশ প্রজাতি গুলোই ছিল দানবীয় আকারের । পরবর্তীতে গবেষকরা দেখতে পান জেফারসনের কাছে শ্লথের যে অস্থিগুলি গিয়েছিল সেগুলি ছিল Megalonyx গণের অন্তর্ভুক্ত । এদের ওজন ছিল প্রায় টন খানেক । এর চেয়েও বড় ছিল Megatherium গণের শ্লথগুলো যেগুলি ওজনে প্রায় ছয় মেট্রিক টন আর আকার আকৃতিতেও হাতির সমান । তারা নিজেদের বাহুর ওপর ভর দিয়ে বন কিংবা সাভানার ভেতর দিয়ে চলাফেরা করে বেড়াত । তীক্ষ্ম ও ধারালো নখগুলো তাদের খাবার খেতে ও গাছে উঠতে সাহায্য করত।

Megalonychidae গোত্র ভুক্ত শ্লথ

শ্লথেরা বিবর্তনের ধারায় বেশ কয়েক মিলিয়ন বছর টিকে ছিল । কিন্তু প্রায় দশ হাজার বছর আগ থেকে অন্যান্য বেশ কিছু দানবাকৃতির প্রাণীর সাথে সাথে বিলুপ্ত হতে শুরু করে । বিজ্ঞানীরা মনে করেন আসন্ন বরফ যুগ কিংবা ওই অঞ্চলে আস্তে আস্তে মানুষের অনুপ্রবেশের ফলেই স্থলচর দানবাকৃতির শ্লথেরা বিলুপ্ত হতে শুরু করে । শ্লথেরা উদ্ভিদভোজী  হওয়ায় গাছের শীর্ষে তারা খাবার জন্যে প্রচুর পাতার সরবরাহ পায় আর গাছের শীর্ষদেশে থাকলে যেকোন শিকারি প্রাণী সহজে তাদের আক্রমণ করতে পারবে না – মূলত এই দুটি সুবিধা থেকেই  কিছু ছোট আকৃতির শ্লথ গাছের শীর্ষদেশে উঠে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করে ।

এখন উত্তর দক্ষিণ আর মধ্য আমেরিকার রেইনফরেস্টে মাত্র ছয় প্রজাতির শ্লথ টিকে আছে ।

স্থলচর শ্লথগুলির আকৃতির তুলনা

শ্লথগতির ইতিবৃত্ত
আমরা জানি প্রাণীরা গ্রহণ করা খাদ্য হতে শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি (এটিপি) উৎপাদন করে । এই শক্তিই তাকে দৈনন্দিন জীবনের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে । এই শক্তির মাধ্যমেই প্রাণী তার সকল জৈবনিক ক্রিয়া সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করে পরিবেশে টিকে থাকে । তাই শ্বসন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ এবং প্রকৃতি, প্রাণী কর্তৃক গৃহীত খাদ্যের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে ।

বিবর্তনের ধারার একটা সময়ে গাছের শীর্ষ দেশে বসবাস শুরু করতে থাকা শ্লথ আস্তে আস্তে ওই পরিবেশে ই অভিযোজিত হতে থাকে । আর তারা ওই খাদ্যাভ্যাসেই অভ্যস্ত হয়ে যায় ( বিশেষত Bradypus গণের শ্লথ গুলি খাদ্যের জন্যে শুধু মাত্র গাছের পাতার উপর নির্ভর করে থাকে ) । গাছের পাতা থেকে শ্বসনে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ অন্যান্য ফল মূল কিংবা আমিষ খাদ্য থেকে  প্রাপ্ত শক্তির তুলনায় অনেক কম । তাই শুধু মাত্র গাছের পাতা খেয়ে বেঁচে থাকা শ্লথগুলি অন্যান্য প্রাণীগুলির তুলনায় বেশ কম শক্তি উৎপন্ন করে ।

Bradypus শ্লথ

 শ্লথতাই শ্লথদের এই কম পরিমাণ শক্তি দ্বারা সকল জৈবনিক কার্যাবলী সম্পন্ন করার জন্যে তাদের নিজেদের শারীরবৃত্তীয় আচরণকে সেই অনুযায়ী খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হয়েছে।

প্রথমত , শ্লথেরা খাদ্য থেকে নির্যাস হিসেবে সর্বোচ্চ শক্তিটুকু গ্রহণ করে। শ্লথের পুরো শরীরের অর্ধেকের ও বেশি অংশ জুড়ে কয়েকটি প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট পাকস্থলি রয়েছে । প্রজাতি ভেদে একবার খাদ্য গ্রহণ করবার পর তা সম্পূর্ণ রূপে পরিপাক করতে শ্লথের পাঁচ থেকে সাতদিন সময় লাগে। এভাবে তারা খুব চমৎকারভাবে শক্তি সঞ্চয় করে রাখে ।

দ্বিতীয়ত , দৈনন্দিন জীবনে তারা যত অল্প সম্ভব ঠিক ততটুকুই শক্তি ব্যয় করে। যেমন, তারা না পারতে একদম নড়াচড়া  করে না। তারা অধিকাংশ সময়েই খাদ্য গ্রহণ করে বিশ্রাম ও ঘুমিয়ে কাটায়। সপ্তাহে একবার তারা রেচন ক্রিয়ার জন্যে বিরতি গ্রহণ করে। তো সেই রেচন ক্রিয়ার উদ্দেশ্যে গাছ থেকে নামার সময়েও তারা খুব ধীরে সুস্থে নড়াচড়া করে । শ্লথ এক মিনিটে মোটামুটি পনের গজ মত পাড়ি দেয়।

তৃতীয়ত, যেহেতু শ্লথের খুব দ্রুত চলাচল করতে হয় না তাই শ্লথের খুব বেশি পেশির ও দরকার পড়ে না । প্রকৃতপক্ষে তাদের সমান আকৃতির যেকোন প্রাণীর চেয়ে তাদের পেশির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কম ।

এদের নিজেদের দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখতেও খুব বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয় না । কারণ অন্যান্য যেকোন স্তন্যপায়ী প্রাণীর চাইতে তাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে প্রায় পাঁচ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে। এই শারীরবৃত্তীয় ও আচরণগত অভিযোজন ও অর্জিত বৈশিষ্ট্য শ্লথের শক্তির ব্যয় কমিয়ে তা পরিমিত পরিমাণে খরচ করতে সাহায্য করে ।

শ্লথের এই ধীর গতি তাই তাদেরকে এভাবে  শুধুমাত্র পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে তাইই নয় বরং অন্যান্য বিভিন্ন শ্যাওলা, ছত্রাক ইত্যাদির পোষক হিসেবে ও কাজ করে । শ্যাওলার আবরণ আবার বনের ভেতর শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ছদ্মবেশ হিসেবে কাজ করে শ্লথকে কিছুটা অতিরিক্ত সুবিধা ও দান করে । বিবর্তনের ধারায় শ্লথ হয়ত তার সেই অতিকায় দানবীয় চেহারা হারিয়েছে । কিন্তু তারপরেও শারীরিক আর আচরণগত বৈচিত্র্য থেকে শ্লথ কিন্তু একেবারেই কম আকর্ষণীয় নয়।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জিঃ

  • Goaman, Karen, and Amery, Heather. Mysteries and Marvels of the Animal World. London: Usborne, 1983: 30.
  • Stewart, Melissa (November 2004). “Slow and Steady Sloths”. Smithsonian Zoogoer. Smithsonian Institution. Retrieved 2009-09-14.
  • Gilmore, D. P.; Da Costa, C. P.; Duarte, D. P. F. (2001-01-01). “Sloth biology: an update on their physiological ecology, behavior and role as vectors of arthropods and arboviruses”. Brazilian Journal of Medical and Biological Research. 34 (1): 9–25. doi:10.1590/S0100-879X2001000100002. ISSN 0100-879X.

[অতনু চক্রবর্ত্তী রচিত জীববিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা বইটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞান পত্রিকায়। আজ রইল এর দ্বিতীয় অধ্যায়, দুই সুতোয় বাঁধা জীবনমাল্যের ইতিকথা। বইয়ের সূচীপত্র (সবগুলো অধ্যায়ের লিংক পেতে) ও বিষয়বস্তুর জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন। ]

-অতনু চক্রবর্ত্তী
বুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিন কোরিয়া

 

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.