দুই সুতোয় বাঁধা জীবনমাল্যের ইতিকথা

0
347

[অতনু চক্রবর্ত্তী রচিত জীববিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা বইটি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হবে বিজ্ঞান পত্রিকায়। আজ রইল এর প্রথম অধ্যায়, দুই সুতোয় বাঁধা জীবনমাল্যের ইতিকথা। বইয়ের সূচীপত্র (সবগুলো অধ্যায়ের লিংক পেতে) ও বিষয়বস্তুর জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন। ]

১৩০২ বংগাব্দের কথা। কবিগুরু  বাইশে অগ্রহায়ণ শিলাইদহ অভিমুখে যাত্রাকালে লিখেছিলেন তাঁর ‘আবেদন’ কবিতাখানি  যার কিছুটা এরকম-

“ভৃত্যঃ     নানা কর্ম নানা পদ নিল তোর কাছে
নানা জনে; এক কর্ম কেহ চাহে নাই,
ভৃত্য-‘পরে দয়া করে দেহো মোরে তাই–
আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর।

রাণীঃ     মালাকর?
ত্যঃ ক্ষুদ্র মালাকর………………………
রাণীঃ …….কি কাজে লাগিবি?
ভৃত্যঃ …….শত শত আনন্দের আয়োজন
           ………রচি সে বিচিত্র মালা
রাণীঃ ……….আবেদন তব করিনু গ্রহণ…….
        তুই মোর মালঞ্চের হবি মালাকর। “

 প্রকৃতপক্ষে জীবনের বিচিত্র অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সজ্জিত হয়ে থাকে একটি দ্বিসূত্রক মালায়। চার ধরনের পুঁতির সন্নিবেশে । দুই সুতো পেঁচিয়ে জড়াজড়ি করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জীবনের গল্প বলতে থাকা সেই মালার রূপকথা বলার জন্যেই এই পরিচ্ছেদের অবতারণা।

পুরোনো সেই দিনের কথা

ইয়োহান ফ্রেডরিখ মিয়েশ্চার

সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহর। ইয়োহান ফ্রেডেরিখ মিয়েশ্চার (১৮৪৪-১৮৯৫) ২৪ বছর বয়সে যখন ইউনিভার্সিটি অফ বাসেল থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রিটি নিলেন তখন তার মামা উইলহেলম হিজ উপদেশ দিলেন জৈবরসায়নের উপর শিক্ষা গ্রহণ করতে। মামার কথামতো মিয়েশ্চার ভর্তি হলেন জার্মানির টুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয় এ। গবেষণা করতে লাগলেন বিখ্যাত জার্মান জীব রসায়নবিদ ফেলিক্স হপে সেলারের গবেষণাগারে। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এই জীবরসায়ন গবেষণাগারটি ছিল জার্মানির নেকার নদীর তীরে এক বিশাল দুর্গে! দুর্গের প্রশস্ত দেয়ালে ছোট একটু জানালার সামান্য আলোয় প্রায়ন্ধকার উঁচু ছাদবিশিষ্ট স্যাঁতস্যাঁতে বিরাট ঘরে ফ্রাংকো প্রুশিয়ান যুদ্ধে আহত সৈনিকদের পুঁজ মাখা ব্যান্ডেজ নিয়ে কাজ করতে করতে একদিন মিয়েশ্চার আবিষ্কার করলেন এমন এক জৈব রাসায়নিক বস্তু যাকে তিনি আখ্যায়িত করলেন Sui-Generis নামে। যার অর্থ অনেকটা -” এর কোন দ্বিতীয় রূপ  নেই”।  আসলে এটিই পরবর্তীকালে আত্মপ্রকাশ করে নিউক্লিক এসিড নামে। এর সেই সূত্র ধরে প্রায় দেড় যুগ পরে আলব্রেখসৎ কোজেল নামে একজন বিজ্ঞানী অর্জন করেন নোবেল পুরস্কার । তিনি নোবেল পান “in recognition of the contributions to our knowledge of cell chemistry made through work on proteins, including the nucleic substances” বিষয়ে । ফ্রেডরিখ মিয়েশ্চার হয়তো  জানতেনই না যে তিনি সেই আলো আঁধারি স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে যে আলোর  সন্ধান দিয়েছিলেন সেই আলোকে আলোকজ্জ্বল হয়ে থাকবে পরবর্তী জীব রাসায়নিক গবেষণার প্রতিটি ক্ষেত্র!

রূপকথার আলো এসেছিল আলো আঁধারি এই ঘরেই

নিউক্লিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ তখন সবে শুরু। নিউক্লিক অ্যাসিডের গঠন নিয়ে এর পরে উল্লেখযোগ্য কাজ করেন ফিবাস লেভেন ,নিউ ইয়র্কে রকফেলার ইন্সটিটিউটে।  লেভেন কোষে পাওয়া নিউক্লিক  অ্যাসিডের রাসায়নিক উপাদানগুলোকে আলাদা করতে পেরেছিলেন। সাধারণত নিউক্লিক এসিডে বিদ্যমান উপাদানগুলি হল- পাঁচ কার্বন বিশিষ্ট কার্বোহাইড্রেট, অজৈব ফসফেট এবং নাইট্রোজেন বেস। নাইট্রোজেন বেসগুলি হয় সাধারণত দুই ধরনের। – এক চাক্রিক পাইরিমিডিন ( সাইটোসিন C, থাইমিন T, ইউরাসিল U) এবং দ্বি চাক্রিক পিউরিন ( এডিনিন A  , গুয়ানিন G )  কিন্তু তিনি ক্রোমোজমের নিউক্লিক অ্যাসিডের সঠিক কাঠামো বলতে পারেন নি। ১৯২৯ সালে ডি-এন-এ বা ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড আবিষ্কার করার পরে তিনি প্রস্তাব করেন যে এটি মাত্র চারটি নিউক্লিওটাইড( নিউক্লিওটাইড হল নিউক্লিক এসিডের মনোমার )  নিয়ে গঠিত (ছবিতে লেভেন প্রস্তাবিত গঠন)।  লেভেনের এই আবিষ্কার ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেহেতু বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন বংশগতির বাহক খুবই জটিল বার্তা বহন করে। তাই তারা মনে করা শুরু করলেন যে বংশগতির বাহকের নিজের গঠন ও বেশ জটিল হবে। তাই বিজ্ঞানীরা মনে করতে থাকলেন প্রোটিনই হবে সেই বার্তাবাহক। ২০ রকমের বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরী বলে প্রোটিনের বিভিন্ন রূপ  ধারণ করা সম্ভব আর বার্তা বহনের কাজও করা সহজ। অপরদিকে, মাত্র চারটে ভিন্ন ধরণের রাসায়নিক দিয়ে তৈরী চার শৃঙ্খলার অণু কিছুতেই অত জটিল বার্তা বহন করতে পারে না।

বাঁ পাশের ছবিতে ফিবাস লেভেন এবং ডান পাশের ছবিতে ফিবাস লেভেন কর্তৃক প্রস্তাবিত নিউক্লিওটাইডের গঠন

এই ভুল ধারণা বিজ্ঞানীদের মনে আরো অনেক দিন রয়ে যেত, যদি না আরেক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পরীক্ষাগারে এক অঘটন না ঘটিয়ে ফেলতেন। ফ্রেডেরিক গ্রিফিথ নামের এই ভদ্রলোক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে নিউমোনিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টায় গবেষণা করছিলেন নিউমোকক্কাস(Streptococcus pneumoniae) ব্যাকটেরিয়া নিয়ে।

গ্রিফিথের পরীক্ষা

এই ব্যাকটেরিয়ার দুটি ভিন্ন স্ট্রেইন নিয়ে (একই প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার দুটি ভিন্ন ধরণের স্ট্রেইনের অর্থ হল একটি নির্দিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে তারা ভিন্ন) এই গবেষণা করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল virulent (S:Smooth) ( virulent অর্থ যেটি ইঁদুরের শরীরে সংক্রমণে সক্ষম )এবং অপরটি রোগ সৃষ্টিতে অক্ষম (R:Rough)। দেখা গেল, S ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরের দিকে উপস্থিত একটি পলিস্যাকারাইডের আচ্ছাদন ছিল যা পোষকদেহের অনাক্রম্যতন্ত্রের (Immune System) আক্রমণ থেকে কোষকে রক্ষা করত, R ব্যাকটেরিয়ার কোষের বাইরে সেরকম কোন আচ্ছাদন ছিল না। এবার তিনি কিছু  S শ্রেণীর ব্যাকটেরিয়াকে তাপ দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে ফেললেন। এবার এই নিষ্ক্রিয় সংক্রমণ সৃষ্টি করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াকে ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করবার পরে দেখলেন ইঁদুরের শরীরে এটি সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারছে না। এরপর নিষ্ক্রিয় S ব্যাকটেরিয়ার সাথে সক্রিয় R ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করিয়ে দেখা হল। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, এবার কিন্তু ইঁদুরটির দেহে সংক্রমণের লক্ষণ প্রকাশ পেল এবং ইঁদুরটি মারা গেল! এরকম ঘটনা এর আগে কখনো তিনি গ্রিফিথ কখনও দেখেন নি। আর তাই তার মনে “কি ভাবে মৃত ব্যাকটিরিয়াগুলো বেঁচে উঠে ইঁদুরটাকে মেরে দিল?” “দুই ভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া কি ভাবে ষড়যন্ত্র করে মেরে ফেলল ইঁদুরটাকে?” এরকম নানা রকমের প্রশ্ন খেলা করতে লাগল। মৃত ইঁদুরের শরীর থেকে সংগৃহীত ব্যাকটেরিয়াগুলো দেখা গেল সব S ব্যাকটেরিয়া। এর মানে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগতভাবেই বদলে গেছে ব্যাকটেরিয়া। কিন্তু প্রশ্ন হল, কি ভাবে এটা ঘটে? মৃত ব্যাকটেরিয়া থেকে কি এমন উপাদান সংগ্রহ করে জীবন্ত ব্যাকটেরিয়াগুলো যাতে তারা রূপ পরিবর্তন করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর গ্রিফিথ বের করতে পারেন নি।

অনেক পরে, ১৯৪৪ সালে সেই রকফেলার ইন্সটিটিউটেই এই প্রশ্নের উত্তর দিলেন অসওয়াল্ড আভেরি। তিনি বিজ্ঞানী ম্যাকলয়েড আর ম্যাককার্টির সাথে মিলে প্রমাণ করলেন, যে উপাদান সংগ্রহ করে নিষ্ক্রিয় রোগ সংক্রমণকারী ব্যাকটেরিয়ার সাথে মিশ্রণে রোগ সংক্রমণে অক্ষম ব্যাকটেরিয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের রূপান্তর ঘটে তা হল ডিএনএ। গ্রিফিথ গবেষণার যে ধাপে নিষ্ক্রিয় S স্ট্রেইন ব্যাকটেরিয়ার সাথে সক্রিয় R স্ট্রেইনের ব্যাকটেরিয়া মিশিয়ে ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করিয়ে ইঁদুরকে সংক্রমিত হতে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন, সেই ধাপটিকে এই ত্রয়ী আবার কয়েক ভাগে ভেঙে নিলেন। সেই সময় জীববিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়া কোষের অন্তুর্গত বিভিন্ন জৈব পদার্থকে আলাদা আলাদা ভাবে রূপান্তর করে ফেলার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন। গবেষণার এই ধাপে তাই তারা প্রথমে তাপদ্বারা নিষ্ক্রিয়কৃত S ব্যাকটেরিয়াগুলোর বাইরের আচ্ছাদন সরিয়ে নিলেন। এরপর এই মিশ্রণে নিয়ে সক্রিয় আচ্ছাদনহীন R ব্যাকটেরিয়ার সাথে মেশানোর আগে  নিষ্ক্রিয় S ব্যাকটেরিয়াগুলোতে প্রোটিয়েজ  এনজাইম প্রয়োগ করলেন।যেহেতু প্রোটিয়েজের মূল কাজ হচ্ছে প্রোটিনকে ভেঙে ফেলা, সেহেতু এই মিশ্রণ যখন ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করানো হল আর তারা দেখলেন ইঁদুর সংক্রমিত হয়েছে এবং সংক্রমিত মৃত ইঁদুরের দেহে তারা S স্ট্রেইন ব্যাকটেরিয়াই পেলেন। । তখন তারা এটা বুঝলেন যে আর যাই হোক প্রোটিন কিংবা বাইরের পলিস্যাকারাইড রোগ সৃষ্টি করবার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বহন করে না। একই ভাবে এর পরে নিষ্ক্রিয় S ব্যাকটেরিয়াগুলোতে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিয়েজ এনজাইম প্রয়োগ করা হল। কিন্তু এবার এই মিশ্রণ ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করাতে দেখা গেল ইঁদুর সংক্রমিত হয় নি। সুতরাং ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ালো – নিষ্ক্রিয় S ব্যাকটেরিয়াগুলোর ডিএনএ জীবিত R ব্যাকটেরিয়াগুলো গ্রহণ করে রূপান্তরিত হচ্ছে।তার মানে, এটা বোঝা গেল যে ডিএনএ ই হল জীবের বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক – অন্য কথায় ডিএনএ জিনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাঁ দিক থেকে আভেরি , ম্যাককার্টি এবং ম্যাকলয়েড

কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বিজ্ঞানী ত্রয়ীর মত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হল না। আভেরী, ম্যাকলয়েড কিংবা ম্যাককার্টি – কেউই  নোবেল পুরষ্কার পেলেন না। কারণ ততদিনে বংশগতির বাহক হিসেবে প্রোটিনকে ধরে নিয়ে একটা চিন্তা বিজ্ঞানীদের মধ্যে এতটাই গেঁথে গেছে যে অনেক বিজ্ঞানীই তার মত পাত্তাই দিলেন না। এই পাত্তা না দেবার দলে ছিলেন সুইডিশ রসায়নবিদ এইনার হ্যামারস্টেনও। এই ভদ্রলোক নিজেও গবেষণা করতেন ডিএনএ নিয়ে অথচ তিনি নিজে কখনও ডিএনএর মহিমা নিয়ে ভেবে দেখেন নি। হ্যামারস্টেন নিজে ছিলেন একটি প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য সুইডিশ পরিবারের বংশধর। এই প্রভাবের জায়গা থেকে তিনি আরো একটি কাজ করে বসলেন। নোবেল কমিটিতে তিনি আভেরির নোবেল মনোনয়নের বিরোধিতা করে বসলেন। যার ফলে আভেরির আর নোবেল পাওয়া হল না। এভাবে মানবজাতির জন্যে ভীষণ দরকারি মৌলিক একটি গবেষণা প্রকৃত গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত থেকে গেল। নোবেলজয়ী জীববিজ্ঞানী আর্নে টিসেলিয়াসের একবার তাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন নোবেল না জেতা বিজ্ঞানীদের মধ্যে আভেরিই ছিলেন সবথেকে যোগ্য বিজ্ঞানী।

অনেকসময়েই বিজ্ঞানের একাধিক শাখা একে অপরের সাথে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে ঋদ্ধ হয়। কিন্তু আজকালকার বিশেষায়নের যুগে দেখা যায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি সম্পর্কিত জ্ঞান বা বিজ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন একাধিক শাখায় দক্ষ লোকের সংখ্যা খুব একটা দেখতে পাওয়া যায়না। তবে যে সময়ের কথা বলছি তখন সময়টা এমন ছিল না। এমন অনেক বিজ্ঞানী ছিলেন যারা শুধু নিজেদের বিষয়েই প্রবল খ্যাতি লাভ করেন নি পাশাপাশি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোন শাখায় নিজেদের আগ্রহ এবং অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিত্ব দিয়ে অন্যান্যদেরও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। এরকম একজন মানুষ হলেন আরভিন শ্রোডিংয়ার।

আরভিন শ্রোডিংয়ার

শ্রোডিংয়ার মূলত ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ পদার্থবিদ। ১৯৪২ সালে ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে উনি বক্তৃতা দিতে গিয়ে জানালেন যে ওনার ওই দিনের বক্তব্যের বিষয়বস্তু পদার্থবিদদের অতি পরিচিত গাণিতিক সমীকরণের কাঠখোট্টা জগত নিয়ে নয়। এই বক্তব্যে তিনি কথা বলতে চান প্রাণের রহস্যময় জগতকে নিয়ে। এদিন তিনি পর পর টানা তিনটি লেকচার দিয়েছিলেন। এই বক্তৃতাগুলিতে শ্রোডিংয়ার প্রথম জীবন ও তার অর্থ বোঝার জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার কথা বলেন। এরপরে,  ১৯৪৪ সালে এই বক্তৃতাগুলিকে একত্র করে তিনি প্রকাশ করেন “হোয়াট ইজ লাইফ” নামের একটি বই। এই বইটিতে তিনি মূলত পাঠকদের জানিয়েছিলেন নানা ধরণের জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার সাপেক্ষে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকা আর অল্প সংখ্যক অণুর সমষ্টির উপর ভিত্তি করে প্রাণ ও তার প্রক্রিয়ার নির্ভরতা নিয়ে তার ব্যক্তিগত বিভিন্ন ভাবনা। তিনি লিখেছিলেন যে বিশেষায়িত কিছু তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ আর প্রবাহ- এই প্রক্রিয়াতেই প্রাণের গতি সর্বদা ধাবমান যেখানে ক্রোমোসোম হচ্ছে তথ্যের ধারক। বংশানুক্রমিক ভাবে আসা তথ্য ক্রোমোসোমের জটিল অণুদের বিন্যাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তাই তিনি বলতে চেয়েছিলেন জীবন কি সেটা বুঝতে গেলে আগে জীবনের গল্প কিভাবে ক্রোমোসোমে বিন্যস্ত থাকে সেটা আমাদের বুঝতে হবে। মোটামুটি একই সময়ে পদার্থবিদেরা কোয়ান্টাম তত্ত্বের মত জটিল তত্ত্ব দিয়ে ভৌত জগতে পরমাণুর গঠন ও তাদের আচার আচরণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। অথচ, ভৌত জগতের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হল আমাদের জীবন-কে বোঝা। সেই সময়ে যারা নিজেদের বিশুদ্ধ জীববিজ্ঞানী বলে দাবি করতেন তাদের  অধিকাংশই পর্যবেক্ষণ নিয়েই মগ্ন থাকতেন, গাণিতিক হিসাবনিকেশ বা পরিসংখ্যানেও ততটা দক্ষ ছিলেন না তারা। শ্রোডিংয়ারের এই বই অনেক অনেক পদার্থবিদকে জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণায় ভাবিয়ে তুলল। পাশাপাশি এ কথাও বলা দরকার যে সেই সময় ভৌতবিজ্ঞান নিয়ে যারা গবেষণা করতেন কিছুটা উন্নাসিকতার জন্যে তারা জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা গড়পড়তা মধ্যম মানের মেধাবীদের জন্য বলে মনে করতেন। শ্রোডিংয়ারের এই বই প্রকাশের মাধ্যমে এই ধারণা অনেকখানি পরিবর্তিত হয়েছিল। আরও মজার কথা এই যে পরবর্তীতে ডিএনএ এর গাঠনিক সজ্জা আবিষ্কারের রঙ্গমঞ্চে আসা কুশীলবদের অধিকাংশই এই বই পড়েই জীবন বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণার পথে আসেন। যেমন ধরা যাক মরিস উইলিকন্সের কথা। এই পদার্থবিদ পরমাণু বোমা তৈরীতে ম্যানহাটান প্রজেক্টের সাথে জড়িত ছিলেন। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমার অভাবনীয় ভয়াবহতা দেখে তার বোধোদয় হল। ভীষণ হতাশা থেকে তিনি একরকম মানসিক শান্তি পেতেই প্যারিসে চলে যাবেন চিত্রকর হবার ইচ্ছেয়- এমনটা ভাবছিলেন। এই সময়েই তার হাতে এসে পড়ে শ্রোডিংয়ারের বইটি। এই বইটি তাকে জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণায় ভীষণভাবে অনুপ্রেরণা দেয়। তিনিই সর্বপ্রথম এক্স-রে ডিফ্রাকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিএনএর গঠন পর্যবেক্ষণ করার কথা ভেবেছিলেন। পদার্থবিদ না হলে এই চিন্তা মাথায় আসা একেবারে বিশুদ্ধ জীববিজ্ঞানীর কল্পনায় আসাটা প্রায় অসম্ভব। আরেকজন ছিলেন ফ্রান্সিস ক্রিক। যিনি মূলত ছিলেন পদার্থবিদ্যার ছাত্র এবং তাই তার ভৌতবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ কাঠামোনির্ভর পড়াশোনাও ডিএনএ এর বিস্তৃত গাঠনিক সজ্জা আবিষ্কার সংক্রান্ত গবেষণায় ভীষণ ভাবে সহায়তা করে। ডিএনএ এর সজ্জা আবিষ্কারের আরেক নায়ক ছিলেন জেমস ডুয়ি ওয়াটসন। শ্রোডিংয়ারের লেখা তাকেও ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। তিনি লিখেছিলেন,

“From the moment I read Schrödinger’s What is Life I became polarized toward finding out the secret of the gene” (Watson in Cairns, Phage and the Origins of Molecular Biology, 239).

বাম থেকে মরিস উইলকিন্স, ফ্রান্সিস ক্রিক ও জেমস ওয়াটসন

১৯৫১ সালের শেষ দিকে ফ্রান্সিস ক্রীক আর ওয়াটসন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাভেন্ডিস ল্যাবেরটরিতে কাজ করা শুরু করেন। আজকে আমরা যে ডাবল হেলিক্সের ছবি দেখি সেই দ্বিসূত্র গঠন সম্পর্কে তাদের আবিষ্কার ১৯৫৩ সালে নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়। তাঁদের এই প্রস্তাবিত গঠনটি উইলকিন্সের এক্স রে ডিফ্রাকশন যন্ত্রের মাধ্যমে তোলা ছবির উপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্যামব্রিজের ঈগল পাবে এক দুপুরে এই দুইজন গিয়ে ঘোষণা দিলেন তাঁরা ডিএনএ এর গাঠনিক সজ্জার মনোহর মালার গঠন জানবার মাধ্যমে “জীবনের রহস্য” সম্বন্ধে জেনে ফেলেছেন!

এতক্ষণ তো বলছিলাম ডিএনএ এর গাঠনিক সজ্জা সম্বন্ধে জানবার পেছন দিককার কথা। এখন আমরা জানব ডিএনএ এর রাসায়নিক বিবরণ।

মূলত ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) হল একটি নিউক্লিক এসিড যা জীবদেহের গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রনের জিনগত নির্দেশ ধারন করে। সাধারণত সকল জীবের ডিএনএ জিনোম থাকে। জিন হচ্ছে জীবের বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক। আর জিনোম বলতে সাধারণত কোন জীবের কোষে থাকা সমস্ত জিনের সমষ্টিকে বোঝানো হয়। যদিও কিছু ভাইরাস রয়েছে যাদের আরএনএ জিনোম রয়েছে, তবে ভাইরাসকে সাধারণত জীব ও জড়ের যোগসূত্র হিসেবে ধরা হয় বলে এই প্রসঙ্গটি আমরা উপেক্ষা করতে পারি। সাধারণত জিনোমকে কখনও নীলনকশার সাথে তুলনা করা হয় কারণ, এতে কোষের বিভিন্ন অংশে যেমনঃ প্রোটিন ও আরএনএ অণু, গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী থাকে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ডিএনএ এর মূল কাজটা কি ? খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে বলা যায় এর মূল কাজ হল দীর্ঘকালের জন্য তথ্য সংরক্ষণ। ব্যাপারটা আরেকটু বুঝিয়ে বলি। আসলে আমাদের জীবনের সবচেয়ে মৌলিক জৈবনিক ক্রিয়াটি হচ্ছে কোষে প্রোটিন সংশ্লেষণ। এই প্রোটিন সংশ্লেষণের মাধ্যমেই কিন্তু বাহ্যিক যেকোন বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। সার্বিক ভাবে এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় “সেন্ট্রাল ডগমা” যার সরলরৈখিক ধাপ খানিকটা এরকম- “ডিএনএ-আরএনএ-প্রোটিন”। প্রোটিন তৈরি করবার যে বার্তা আরএনএ পায় সেই বার্তা সংরক্ষণ করে ডিএনএ। সাধারণত পৃথিবীতে থাকা সকল প্রাণকে দুটো ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হল প্রোক্যারিওট যাদের কোষে যে নিউক্লিয়াস থাকে তা কোন পর্দা (যেটাকে আমরা নিউক্লিয়ার মেমব্রেন বলি) দ্বারা বেষ্টিত থাকেনা। এজন্য সাইটোপ্লাজম এর সাথে নিউক্লিয়াস মিশে থাকে। কিন্তু আরেক প্রকার রয়েছে যাদের কোষের সাইটোপ্লাজমে নিউক্লিয়াস পর্দা দ্বারা বেষ্টিত এবং সাইটোপ্লাজম থেকে আলাদা থাকে। তাই প্রোক্যারিওটদের ক্ষেত্রে ডিএনএ ও সাইটোপ্লাজমে অবস্থান করে আর ইউক্যারিওটদের ক্ষেত্রে ডিএনএ থাকে নিউক্লিয়াসের ভিতরে।

নিউক্লিয়াসে থাকা ক্রোমোজোমের ক্রোমাটিন প্রোটিন যেমন হিস্টোন ডিএনএকে ঘনসন্নিবেশিত ও সংগঠিত করে, যা নিউক্লিয়াসের অন্যান্য প্রোটিনের সাথে এর আচরণ নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে। ডিএনএ হচ্ছে নিউক্লিওটাইড অণুর সমন্বয়ে গড়া একটি লম্বা পলিমার। সাধারনভাবে একটি ক্ষার যদি একটি কার্বোহাইড্রেট অণুর সাথে যুক্ত থাকে তাকে বলে নিউক্লিওসাইড এবং একটি বেস  যদি একটি চিনি ও এক বা একাধিক ফসফেট অণুর সাথে যুক্ত থাকে তাকে বলে নিউক্লিওটাইড। যদি একাধিক নিউক্লিওটাইড একসাথে যুক্ত থাকে, যেমন ডিএনএতে, তবে এই পলিমার কে বলে পলিনিউক্লিওটাইড। জীবদেহে সাধারণত ডিএনএ কোন একক অণু হিসেবে থাকে না, বরং চাপাচাপি করে জোড়া-অণু হিসেবে থাকে। এই লম্বা সূত্র দুইটি সুতো পেঁচিয়ে আগের দিনের বাড়িতে থাকা প্যাঁচানো যেরকম সিঁড়ি থাকে, সেরকম দ্বৈত হেলিক্সের মত হয়। একেকটা ডিএনএ সুতোয় থাকে নিউক্লিওটাইড যা ডিএনএ মেরুদন্ডকে ধরে রাখে, এবং একটি ক্ষার যা অন্য ডিএনএ সূত্রের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। এই নিউক্লিওটাইড ও ক্ষারের পুনরাবৃত্তিতেই ডিএনএ সূত্র গঠিত।

অন্যদিকে ডিএনএ দ্বিসূত্রক মডেলের দুইপাশের সুতো দুটির ভিত্তি ফসফেট ও চিনি অণুর পুনরাবৃত্তিতে গঠিত। ডিএনএর চিনি হচ্ছে পেন্টোজ (পাঁচ কার্বন বিশিষ্ট) ২-ডিঅক্সিরাইবোজ। এই চিনি ফসফেট গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে পাশাপাশি চিনির অণুর মধ্যে তৃতীয় ও পঞ্চম কার্বন পরমাণুর স্থানে ফসফোডিয়েসটার বন্ধন গঠন করে। এই অপ্রতিসম বন্ধন বোঝায় যে ডিএনএ অণুর মেরু বা দিক আছে। দ্বৈত হেলিক্সে এক সূত্রের নিউক্লিওটাইডের দিক অন্য সূত্রের ঠিক বিপরীত দিকে থাকে। ডিএনএ সূত্রের এই ধরনের বিন্যাসকে প্রতিসমান্তরাল বলে। ডিএনএর অপ্রতিসম প্রান্তকে বলে ৫’ (ফাইভ প্রাইম) এবং ৩’ (থ্রি প্রাইম) প্রান্ত। ডিএনএ ও আরএনএর মধ্যকার একটি প্রধান পার্থক্য হলো কার্বোহাইড্রেট , যেখানে ডিএনএতে ২-ডিঅক্সিরাইবোজ ব্যবহৃত হয় সেখানে আরএনএতে আরেকটি পেন্টোজ চিনি রাইবোজ ব্যবহৃত হয়।

ডিএনএর দ্বৈত হেলিক্স হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে স্থির থাকে, যা দুটি সূত্রের মধ্যে সংযুক্ত থাকে। ডিএনএতে যে চারটি ক্ষার পাওয়া যায় তা হল এডেনিন (সংক্ষেপে A), সাইটোসিন (C), গুয়ানিন  এবং থাইমিন (T)। নিম্নে এইচারটি ক্ষার দেখানো হয়েছে যারা চিনি/ফসফেটের সাথে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ নিউক্লিওটাইড গঠন করে, যেমনঃ এডিনোসিন মনোফসফেট।

পিউরিন এবং পাইরিমিডিন এর গঠন

এই ক্ষারগুলো দুই ভাগে ভাগ করা যায়; এডেনিন ও গুয়ানিন হল পিউরিন নামক ৫- ও ৬- কার্বনচক্রের হেটারোসাইক্লিক যৌগ এবং সাইটোসিন ও থাইমিন হল পাইরিমিডিন নামক কার্বনচক্রের যৌগ। ইউরাসিল  নামে পঞ্চম আরেকটি পাইরিমিডিন ক্ষার আছে যা সাধারণত আরএনএতে থাইমিনের বদলে থাকে। থাইমিনের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে কেবল একটি মিথাইল গ্রুপের অনুপস্থিতি। মোটামুটি এই হল ডিএনএর রাসায়নিক গঠনরীতি।

ডিএনএন নামের প্রাণরসায়নের এই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ অণুটিকে ঘিরেই ছিল আমাদের মালঞ্চের মাল্যের গল্প! এই মাল্য প্রবহমান নদীর মতন, আমাদের বংশগতির বৈশিষ্ট্য নদীর মতই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম তে বহন করে এই মাল্য! আমরা জেনেছি অসম্ভব কিছু প্রতিভাবান মানুষ ,কিছু অসাধারণ বিজ্ঞানীদের জন্যে আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হয় এই মালঞ্চের মাল্যের গল্প, এই দ্বি সূত্রের গল্প। তাঁদের আজীবন পরিশ্রম আর গবেষণায় আমরা আজ জীবনের গল্প পড়তে পারছি নতুন ভাষায়। এই লেখার প্রথম দিকে পড়া রবিঠাকুরের কবিতায় গলা মিলিয়ে তাই তাঁদের প্রতি আমাদের একটি কথাই বলতে ইচ্ছা হয় –  “আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর”

-অতনু চক্রবর্ত্তী
বুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিন কোরিয়া

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.