স্টিফেন হকিং-এর শেষ তত্ত্ব

0
276

গতবছর ১৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন স্টিফেন হকিং। তার প্রায় দেড় মাস পরে ২ মে, জার্নাল অফ হাই এনার্জি ফিজিক্সে (Journal of High Energy Physics) তাঁর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি লিউভেনের কসমোলজির অধ্যাপক থমাস হারটগের সাথে যৌথভাবে লেখা এই গবেষণাপত্রে মহাবিশ্বের উৎপত্তি ও বিকাশের নতুন তত্ত্ব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। গতবছরের জুলাইতে, হকিংএর ৭৫তম জন্মদিনে হারটগ, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সম্মেলনে নতুন তত্ত্বটি নিয়ে আলোচনা করেন।

মহাবিশ্বের বিকাশের পূর্বের তত্ত্বটি হলো চিরস্থায়ী স্ফিতি (eternal inflation) তত্ত্ব। এই তত্ত্বের আলোকে বিগব্যাং এর পরবর্তীতে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব একটি পর্যায়ক্রমিক সুচকীয় স্ফীতির (exponential inflation) মধ্য দিয়ে যায়। অতপর এই প্রক্রিয়া ধীর হতে থাকে এবং শক্তিসমূহ পদার্থ এবং বিকিরণে রূপান্তরিত হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে, স্ফীতি শুরু হলেও সবজায়গায় এটি কখনো বন্ধ হয়নি। ধারনা করা হয়, মহাবিশ্বের কিছু কিছু অঞ্চলে কোয়ান্টাম প্রভাবে চিরস্থায়ীভাবে বুদবুদের মতো স্ফীতি চলমান এবং সার্বিকভাবে তাই স্ফীতি চিরস্থায়ী। এর আলোকে বলা যায়, আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বটি সার্বিক মহাবিশ্বের বাসযোগ্য একটি পকেট যেখানে স্ফীতি থেমে গিয়ে নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্ম হয়েছে। স্থানের অন্যান্য বুদবুদে স্ফীতির মাধ্যমে অসীম সংখ্যক মহাবিশ্ব তথা মাল্টিভার্সের উদ্ভব ঘটে চলছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা যে মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণ করি তা কেবল এ ধরনের একটি মাত্র বুদবুদ।

স্ফীতিশীল মহাবিশ্বের দৃশ্যায়ন; সময়ের সাথে সার্বিক মহাবিশ্বে বুদবুদের মাধ্যমে স্থানিক মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটে চলেছে। (এ. লিন্ড/স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়)

হকিং এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, “প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, সার্বিক মহাবিশ্ব একটি অসীম ফ্র্যাক্টালের মতো, যেখানে বিভিন্ন স্থানে পকেট মহাবিশ্বের মোজাইক সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো স্ফীতির মহাসমুদ্রের মাধ্যমে পৃথক। স্থানীয়ভাবে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের সূত্রগুলো বিভিন্ন পকেট মহাবিশ্বে বিভিন্ন হতে পারে এবং এদের সমষ্টি নিয়েই গঠিত হয় মাল্টিভার্স। তবে আমি কখনো মাল্টিভার্সের ভক্ত ছিলাম না। যদি মাল্টিভার্সের বিভিন্ন পকেটে ইউনিভার্সের স্কেল আলাদা হয় কিংবা অসীম হয় তাহলে এই তত্ত্ব পরীক্ষাযোগ্য হবে না ।”

নতুন গবেষণাপত্রটিতে হকিং এবং হারটগ মহাবিশ্বের উৎপত্তিতে চিরস্থায়ী স্ফীত তত্ত্বকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন। স্ফীতি তত্ত্বের একটি সমস্যা হলো এটি একটি পটভৌমিক মহাবিশ্ব (background universe) কল্পনা করে নেয় যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব মেনে বিকাশিত হয় এবং কোয়ান্টাম প্রভাবসমূহ ছোট ছোট বিচ্যুতি হিসেবে বিদ্যমান থাকে। তবে, চিরস্থায়ী স্ফীতির গতিতত্ব চিরায়ত এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ, ফলে এতে আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

হকিংএর মতে, মহাবিশ্ব যথেষ্ট মসৃন এবং সর্বিকভাবে সসীম। তাঁরা তাঁদের তত্ত্বটিকে স্ট্রিং তত্ত্ব অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেন। স্ট্রিং তত্ত্ব তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার একটি শাখা যেখানে মহাকর্ষ এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকে একীভূত করা হয় এবং এদের স্পন্দিত স্ট্রিং তথা তন্তু হিসেবে দেখা হয়। এই অতিক্ষুদ্র স্পন্দিত তন্তুগুলোকে মহাবিশ্বের গাঠনিক একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের এই ধারনা অনুযায়ী মহাবিশ্বকে একটি ত্রিমাত্রিক হলোগ্রাম হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে যেটিকে গাণিতিকভাবে একটি দ্বিমাত্রিক পর্দায় প্রক্ষেপিত করা যায়।

হকিং এবং হারটগ হলোগ্রাফির এই তত্ত্বটির একটি বিশেষ প্রকরণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাত্রা হিসেবে ‘সময়’-কে চিরস্থায়ী স্ফীতি হতে পৃথক করেন। এর ফলে চিরস্থায়ী স্ফীতি তত্ত্বকে আইনস্টাইনের তত্ত্বের উপর আর নির্ভর করতে হয় না। তাঁদের নতুন তত্ত্বে চীরস্থায়ী স্ফিতিকে সময়হীন করে একটি স্থানিক পৃষ্ঠে সময়ের পূর্বে আবদ্ধ করা হয়। এই বিষয়ে হারটগ বলেন, “আমরা মহাবিশ্বের বিবর্তনে সময়ের উল্টোদিকে গিয়ে এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছি যেখানে সময়ের ধারনাটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।“ ১৯৮৩ সালে হকিং এবং আরেকজন পদার্থবিদ জেমস হার্টল যৌথভাবে ‘সীমানাবিহীন তত্ত্ব (no boundary theory)’ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যেটি হার্টল-হকিং তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। হারটক বলেন, “সীমানাবিহীন তত্ত্ব ধারনা করেছিলো, যদি আপনি সময়ের বিপরীত দিকে গিয়ে মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক বিন্দুতে পৌঁছান তাহলে মহাবিশ্বকে একটি ক্ষুদ্র গোলাক হিসেবে পাবেন। তবে নতুন এই গবেষণাটি কিছুটা ভিন্ন ধরনা পোষণ করে। এখন আমরা বলতে চাই অতীতে মহাবিশ্বের একটি সীমানা ছিলো।”

হকিং এবং হারটগ মহাবিশ্বের সার্বিক কাঠামোর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য অনুমান নির্ধারণ করতে তাঁদের নতুন তত্ত্বটি কাজে লাগিয়েছেন। তাঁদের ধারনা অনুযায়ী, ইতিপূর্বেকার চিরস্থায়ী স্ফীতি তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বকে যেমন জটিল অসীম ও ফ্র্যাক্টাল কাঠামো বলে ভাবা হয়েছিলো এটি তার চেয়ে অনেক সরল এবং সসীম। অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এই তত্ত্বটির যথার্থতা নিশ্চিত করা যায় তাহলে এটি মাল্টিভার্সের ধারনাটিকে সম্পূর্ন ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করবে। এর ফলে মাল্টিভার্স তত্ত্বটি আরো যথাযথ এবং পরীক্ষার উপযোগী হবে।

তথ্যসূত্র:
১. S.W. Hawking and Thomas Hertog. ‘A Smooth Exit from Eternal Inflation?’’ Journal of High-Energy Physics (2018). DOI: 10.1007/JHEP04(2018)147

২. https://www.cam.ac.uk/research/news/taming-the-multiverse-stephen-hawkings-final-theory-about-the-big-bang

৩. https://www.sciencealert.com/stephen-hawking-s-last-physics-paper-theory-on-eternal-inflation-multiverses

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

বিজ্ঞান পত্রিকা প্রকাশিত ভিডিওগুলো দেখতে পাবেন ইউটিউবে। লিংক:
১. টেলিভিশনঃ তখন ও এখন
২. স্পেস এক্সের মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.