বৃদ্ধ বয়সেও মস্তিষ্কে তৈরি হয় নতুন স্নায়ুকোষ!

1

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানব মস্তিষ্ক বয়ঃপ্রাপ্তির শেষভাগ এমনকি ৯০ বছর বয়সেও নতুন নতুন কোষ সৃষ্টি করে।

গবেষনাটি দেখায়, মানুষের স্নায়ুকোষের বিকাশ কতদিন ধরে চলতে পারে। পাশাপাশি দেখা যায় আলজেইমারে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে এই নতুন কোষ সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। শেষোক্ত এই আবিষ্কার আলজেইমার রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ অনেকাংশে ঘটে থাকে ভ্রুনাবস্থায় এবং মানব শিশুর জন্মলগ্নেই তার স্নায়ুকোষ প্রায় পরিপূর্নতা লাভ করে।

কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। ১৯৬০ এর দশকে প্রথমবারের মত আবিষ্কার হয় যে, স্তন্যপায়ী প্রানীর ক্ষেত্রে বয়প্রাপ্তির পরে ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ঘটতে থাকে, এমনকি প্রানীর বুড়ো বয়েসেও মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুতন্ত্র কোষ সৃষ্টি হতে থাকে।

মানব মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারনে এই নতুন স্নায়ুকোষ সৃষ্টির কৌশল কিভাবে কাজ করে এবং তা কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় সেটা নির্ধারন করা খুব একটা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না।

কিন্তু স্পেনের মাদ্রিদ অটোনোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনবিক জীববিজ্ঞানী মারিয়া লোরেন্স মার্টিনের নেতৃত্বে এক নতুন পরীক্ষায় গবেষকেরা মৃত ব্যাক্তির মস্তিষ্কের কোষ সংগ্রহ করে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে নতুন স্নায়ুকোষ সৃষ্টির ব্যাপারটিকে (এএইচএন) খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষন করেন।

গবেষক দলটির ল্যাব ওয়েবসাইটের মতে, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে নতুন স্নায়ুকোষ সৃষ্টির কৌশলটি শারীরবৃত্তীয় এবং রোগ সংক্রান্ত উভয় অবস্থার প্রেক্ষিতে পর্যবেক্ষন করা”।

“আমরা বিশেষ করে আগ্রহী কিভাবে স্নায়ুকোষ বিধ্বংসী রোগ যেমন আলজেইমার (এডি) এবং অন্যান্য “টাও” প্রোটিন সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসা স্বরূপ বয়স্ক ব্যাক্তিদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে নতুন স্নায়ুকোষ সৃষ্টি করা যায় তার সম্ভাবনার উপর”।

বয়স্ক ব্যাক্তিদের মধ্যে নতুন স্নায়ুকোষের সৃষ্টি হয় কিনা তা জানার লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা ১৩ জন মৃত ব্যাক্তির হিপোক্যাম্পাসের “ডেন্টাটে জাইরাস” (ডিজি) নামক কলার নমুনা সংগ্রহ করে গবেষনা পরিচালনা করেন।

৪৩ হতে ৮৭ বৎসর বয়সী এই ব্যাক্তিরা বিভিন্ন কারনে যেমনঃ ক্যান্সার, স্ট্রোক, পঁচন এবং অন্যান্য গুরুতর রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। এই ১৩ ব্যাক্তি মৃত্যুর পূর্বে স্নায়বিকভাবে সম্পূর্ন সুস্থ ছিলেন এবং মৃত্যু পরবর্তী তাদের দেহ বিজ্ঞান ও গবেষণার উদ্দেশ্যে দান করে যান।

বয়স্কদের মধ্যে স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত বেশ গুরুত্বপূর্ন কিছু আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের এই ধারা মানব জীবনের নবম দশক অবধি চলতে থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে ডাবলক্রোটিন (ডিসিএক্স+) নামক হাজার হাজার কোষে যেগুলো ডিজি’র স্নায়ুকে প্রকাশিত করে যা স্নায়ু বিকাশের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

গবেষণা পত্রে লেখক ব্যাখ্যা করেন, “সার্বিকভাবে প্রাপ্ত উপাত্তগুলো এই ধারনাকে সমর্থন করে যে, মানুষের ডিজি’র ডিসিএক্স+ কোষের উপদলগুলোর পরিপক্কতা অনিয়মিত”।   

আপেক্ষিকভাবে প্রচুর পরিমানে অপরিপক্ক ডিসিএক্স+ স্নায়ুর উপস্থিতি এবং কোষের প্রাথমিক ও শেষ পর্যায়ের প্রকাশ এটাই বোঝায় যে, মানুষের এএইচএন চলাকালীন সময়ে এই কোষগুলোর পরিপক্কতা লাভের সময়টিও বেশ দীর্ঘ।

যখন গবেষক দলটি ৫২ থেকে ৯৭ বয়েসি ৪৫ জন মৃত আলজেইমার রোগীর মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে, তারা দেখতে পায় যে, রোগ যত গাঢ় হতে থাকে অপরিপক্ক ডিসিএক্স+ স্নায়ুর উপস্থিতি ক্রমাগতভাবে কমতে থাকে।

বিপরীতক্রমে দেখা যায় যে, স্নায়বিকভাবে সুস্থ মানুষের মধ্যে বয়ঃবৃদ্ধিজনিত কারনে স্নায়ুকোষের বিকাশ হ্রাসের মাত্রা অনেক ধীর। স্নায়বিকভাবে সুস্থ সেই ১৩ জন মানুষের ডিজি কলাতে ডিসিএক্স+কোষের হ্রাসের পরিমান কম ছিল যেহেতু তাদের বয়স ছিল ৪৩ থেকে ৮৭ এর মধ্যে।

তবে গবেষকেরা দাবী করেন যে, যেকোন বয়েসের স্নায়বিকভাবে সুস্থ মানুষের মধ্যে ডিসিএক্স+ কোষের পরিমান এডি আক্রান্ত যেকোন বয়েসের মানুষের চেয়ে বেশি।

“এই উপাত্তগুলো এই ধারনাকে সমর্থন করে যে, এডি এমন একটি অবস্থা যা শারীরবৃত্তীয়ভাবে বয়োঃবৃদ্ধির চেয়ে ভিন্ন। বয়োঃবৃদ্ধিগত কারনে ডিসিএক্স+ কোষের সংখ্যা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এডি’র মত স্বতন্ত্র স্নায়বিক রোগ অপরিপক্ক স্নায়ু কোষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ধ্বংস করার জন্যে দায়ী”।

গবেষকেরা আরো বলেন যে, এডি রোগাক্রান্ত ব্যাক্তির স্নায়ুবিকাশের ব্যাপারটি রোগ ধরা পড়ার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ক্ষতির সম্মুখীন হয়, এমনকি স্নায়ুতন্তুর কুঞ্চন এবং বার্ধক্যজনিত জটিলতার মত উপসর্গগুলো প্রকাশিত হওয়ার আগেই।

এমনটা কেন হয়ে থাকে তা বোঝার জন্যে আমাদের এখনো অনেক গবেষণার দরকার। তবে গবেষক দলটি প্রস্তাব করেছে যে, এএইচএন এর কারনে সৃষ্ট ক্ষতিগুলো এমন একটি ঝুঁকিমুক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সনাক্ত করতে হবে যাতে করে এডি বেশিদুর গড়ানোর আগেই যেন চিকিৎসকেরা এর প্রাথমিক উপসর্গ দেখে রোগ নির্নয় করতে পারেন। 

এই লক্ষ্যে সফল হওয়ার জন্যে পরবর্তীতে আরো বিশাল গবেষণার দরকার। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় যতটুকু অর্জন তাও আমাদের এক বিশাল প্রাপ্তি।

গবেষকেরা উপসংহারে বলেন যে, “আমাদের উপাত্তগুলো দেখিয়েছে, শারীরবৃত্তীয় ও রোগভোগের পরে মানব জীবনের ১০ম দশকে এসে ও মানুষের “ডেন্টাটে জাইরাস” (ডিজি)-তে সচল অপরিপক্ক স্নায়ুকোষ বিদ্যমান”।

প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তগুলো নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত। [Science Alert অবলম্বনে]

  • পুলক বড়ুয়া

Share.

1 Comment

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.