ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি ১ : গুপ্ত ভরশক্তির খোঁজে

0
737

অচেনাকে ভয় কী আমার ওরে?

অচেনাকেই চিনে চিনে উঠবে জীবন ভরে

অচেনাকে চিনতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশায় বুক বেঁধেছেন। বিজ্ঞানীরাই বা কম কীসে? অচেনা গুপ্ত পদার্থকে চিনতে তাঁদের চেষ্টার একটুও খামতি নেই। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু ও শক্তি যথাক্রমে ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি। এদের কবজাতেই মহাবিশ্বের ৯৬ শতাংশ ভর! অথচ এরাই রয়েছে বিজ্ঞানীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরা ব্ল্যাকহোলও নয়। ভূত-টুতের ব্যাপারও বিজ্ঞানে চলে না। তবু কেনইবা এই আজগুবি বস্তু আর শক্তির অবতারণা? সে ইতিহাস বহু পুরোনো। বস্তুটির ভর আছে। ভর থাকা মানেই তার প্রভাব ছড়িয়ে থাকে আশপাশে। থাকবে তার মহাকর্ষশক্তিও। ভর-শক্তির আকারে থাকা এ গুপ্ত বস্তু (এবং শক্তি) যতই নিজেদের আড়ালে রাখুক, শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা তাদের যাচাই করছেন মহাকর্ষ বলের কষ্টিপাথরে। মহাকর্ষ বল যার থাকবে, স্থানকালের জালে তাদের জড়াতেই হবে। সাফল্য বলতে ওটুকুই। বিজ্ঞানীরা জানেন, ডার্ক ম্যাটার ছড়িয়ে আছে মহাবিশ্বের এখানে-ওখানে। তবু তাদের দেখা মিলছে না। কেন? কারণ কোনো এক অজানা-অচেনা বস্তু দিয়ে তৈরি এই গুপ্ত পদার্থ ও গুপ্ত শক্তি। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক কিংবা অন্য কোনো ফার্মিওন কণার অস্তিত্ব নেই সেই গুপ্ত বস্তুর ভেতরে। কিংবা গুপ্ত শক্তিগুলো, যা আকারে মহাবিশ্বের মোট ভরশক্তির প্রায় ৭৫ শতাংশ, সেই শক্তির উত্স ফোটন বা অন্যান্য বোসন কণার মতো কোনো কণা নয়। তাহলে এর দেখা মিলবে কীভাবে?

মিলবে কি মিলবে না সেটা পরের কথা, বিজ্ঞানীরা তো আর হাত গুটিয়ে থাকার পাত্র নন। ঘোরতর বৈজ্ঞানিক রহস্যের পেছনেই তাঁদের নিরন্তর ছুটে চলা। গুপ্ত পদার্থ ও শক্তির পেছনেও তাঁরা ছোটেন। ঘটনার শুরু গত শতাব্দীর ৩০-এর দশকে।

এক মহাশক্তি। ছড়িয়ে আছে মহাবিশ্বের প্রতিটা কোণে। তার আকার আকৃতিই বরং অনেক অনেক বেশি আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের চেয়ে। সেই শক্তি কে দেখা যায় না? আবার তিনি কালোও নন। পুরোপুরি অদৃশ্য এক বস্ত। হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়, ধ্বাক্কা তো দেওয়াও যায় না। আমাদের বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় পদার্থগুলোও দেখা যায় না। কিন্তু তাদের আমরা অনুভব করতে পারি। ঝিরি ঝির বাতাস গায়ে প্রশান্তির ছোঁয়া দেয়, তা থেকেই বুঝতে পারি তাদের অস্তিত্ব আছে। আবার বস্তুর অণু-পরমাণুকেও আমরা দেখতে পাই না। তাই বলে অনু-পরমাণু পুরোপুরি অদৃশ্য নয়। অন্যদিকে কোয়ার্ক-নিউট্রিনোর মতো কণাদের দেখাই যায় না। কিন্তু ডিটেক্টরের সাহায্যে তাদের শনাক্ত করা যায়। কখনো মুল কণিকাদের সরাসরি শণাক্ত করা যায় না। করতে হয় পরোক্ষভাবে। মহাবিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ভর-শক্তিকে কোনো ডিটেক্টর দিয়ে শনাক্ত করা যায় না। এমনকি কোনো বস্তু বা শক্তির সাথেও মিথস্ক্রিয়া ঘটে না এদের। তাই এই পৃথিবী, পাহাড়-পর্বত, পাথর-ধাতু আমাদের দেহ—সবকিছু ভেদ করে চলে যেতে পারে সেই গুপ্ত পদার্থ, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি।

দেখাই যদি না যাবে, স্পর্শ দিয়েও যার অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে না, পরোক্ষভাবেও যার হদিস মিলবে না, তবে সেই বস্তু এবং শক্তি আছে আমরা বুঝব কীভাবে?

হ্যাঁ, এটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। আর সেটার সমাধান মেলে মহাকর্ষ বলের কারণে। সেইসব গুপ্ত পদার্থ আর গুপ্ত শক্তির মহাকর্ষীয় প্রভাব আজও রয়ে গেছে। আর তাই দেখেই বিজ্ঞানীরা তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। সেই মহাকর্ষীয়  প্রভাব ঠিক নিউটনীয় মহাকর্ষী প্রভাব নয়। আসলে বৃহত্তর কাজে কখেনাই নিউটনীয় মহাকর্ষ সফল ছিল। তার দৌড় কেবল পৃথিবীতে আমাদের নিত্যদিনের কাজকর্ম করতে। ডার্ক ম্যাটার কিংবা ডার্ক এনার্জি বোঝার দরকার হয় আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব। যে তত্ত্বটা আইনস্টাইন প্রকাশ করেছিলেন ১৯১৫ সালে। এই তত্ত্ব বলে মহাকর্ষ বল মানে একটা বস্তু সাথে আরেকটা বস্তুর আকর্ষণ নয়। মহাকর্ষ হলো স্থানকাল জ্যামিতির খেলা। ভারি বস্তু তার চারপাশের স্থানকাল বাঁকিয়ে দেয়। সেই বাঁকানো স্থান কালের মধ্যে আরেকটা বস্তু এসে পড়লে মনে হয় বস্তু দুটো পরস্পরকে আকর্ষণ। এই স্থানকালের বক্রতার জাল ছিন্ন করতে পারে না ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি। সুতরাং ধরা না দিয়ে বাছাধন যাবে কোথায়?

তবে, কিন্তু, যদিটা আজও রয়ে গেছে। মহাকর্ষ দিয়ে মেপেই শুধু পাওয়া গেছে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব। কিন্তু কোন জায়গায় কতটুকু পরিমাণে আছে এই গুপ্ত পদার্থ আর গুপ্ত শক্তি, সেটা বিজ্ঞানীরা আজও মেপে বের করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তাই আদৌ সেগুলো আছে কিনা সে সন্দেহটা রয়েই গেছে। কবে এই সন্দেহের অবসান হবে আর কবে চক্ষু-কর্ণের মানভঞ্জন হবে তা এখনো কেউ বলতে পারে না।

ডাচ বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্ট গ্যালাক্সিদের ভর মাপার চেষ্টা করেছিলেন

১৯২০ সালের আগে বিজ্ঞানীরা জানতেনই না, মহাবিশ্বে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ছাড়াও আরও গ্যালাক্সি আছে। কিন্তু এরপর এক দশকে অনেক অনেক গ্যালাক্সির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা। শুধু তাই নয়, তাঁরা আবিষ্কার করলেন এই গ্যালাক্সিরা আবার আলাদা আলাদাভাবে থাকে থাকে না। অনেকগুলো গ্যালাক্সি মিলে একটা গ্যালাক্সির দল তৈরি করে। এই গ্যালাক্সির দলকে বলে গ্যালাক্সি ক্ল্যাস্টার। আমরা যে ক্ল্যাস্টার বাস করি সেই ভারগো ক্ল্যাস্টারে গ্যালাক্সির সংখ্যা ৪০টি।

১৯৩৩ সাল। সুইস জ্যোতির্বিদ ফ্রিত্জ জুইকি আর ডাচ ইয়ান ওর্ট বিজ্ঞানী গবেষণা করছিলেন কমা ক্ল্যাস্টার নিয়ে। ক্ল্যাস্টারটি আমাদের থেকে ৩২ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। এই গ্যালাক্সি ক্ল্যাস্টারে প্রায় এক হাজার গ্যালাক্সি আছে। জুইকি ওই ক্ল্যাস্টারের গ্যালাক্সিদের গতিবেগ মাপার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সেটা করতে গিয়েই অস্বাভাবিক ফল পেলেন তিনি। গ্যালাক্সিদের প্রবল মহাকর্ষীয় টান গ্যালাক্সিদের একত্রে আটকে রাখে। আমাদের পৃথিবীর একটা মুক্তিবেগ আছে। এই বেগের চেয়ে বেশি বেগে কোনো কিছু ওপর দিকে নিক্ষেপ করলে সেটা আর পৃথিবীতে ফিরে আসে না। তেমনি সূর্যেরও একটা মুক্তিবেগ আছে। পৃথিবীর রৈখিক বেগ সেই মুক্তিবেগের চেয়ে কম বলে পৃথিবী কক্ষপথ থেকে ছিটকে সূর্য থেকে অনেক দুরৈ সরে যায় না। তেমনি আমাদের সূর্যও মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে চলেছে অবিরাম। কোনো কারণে যদি সূর্যের এই ঘোরার বেগটা মিল্কিওয়ের মুক্তিবেগের চেয়ে বেশি হয় তাহলে সূর্যকেও মিল্কিওয়ে ধরে রাখতে পারবে না। তেমনি ক্ল্যাস্টারেও গ্যালাক্সিদের একটা বেগ আছে। ফ্রিত্জ জুইকি মাপতে চেয়েছিলেন কমা ক্ল্যাস্টারের গ্যালাক্সিদের সেই বেগই। সেটা করতে গিয়েই বিরাট এক অসংঙ্গতি ধরা পড়ে। যে বেগে ঘুরলে গ্যালাক্সিগুলো ক্ল্যাস্টারের মধ্যেই আটকে থাকবে, তারচেয়েও বেশি বেগে ঘুরছে গ্যালাক্সিগুলো। জুইকি হিসাব করে দেখেলেন এই বেগে ছুটলে গ্যালাক্সিগুলো ক্ল্যাস্টার থেকে ছিটকে মহাকাশে ছিটকে পড়ার কথা, কিন্তু সেগুলো ঠিকই ক্ল্যাস্টারের ভেতরে সুন্দরভাবে আবদ্ধ রয়েছে। তাহলে ব্যাপারখানা কী?

লেখাটি ‌’গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে’ বইয়ের অংশবিশেষ। বইটি অমর একুশে বইমেলায় প্রথমার (৮নং) প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাবে।

বইটি ঘরে বসে কিনতে পারবেন এখানে ক্লিক করে

তখন আরেকটা গবেষণা করলেন বিজ্ঞানীরা। গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং ব্যবহার করে ইয়ান ওর্ট বিজ্ঞানী ভর মাপার চেষ্টা করেন মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোর। মহাবিশ্বের ভর মাপা যায় দুভাবে। এক- মহাবিশ্বের সমসত্ম বস্তুর পরিমাণ মেপে আর মহাকর্ষ বলের সাহায্যে। মহাকর্ষীয় লেন্সিং ব্যবহার করে। সেখানেই বাঁধে গোল। মহাবিশ্বের মোটা বস্তুকণার হিসাব বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল। সেটা থেকেই বের করা যায় মহাবিশ্বের মোট ভর। সেই ভর আর ওর্ট-জুইকির মাপা ভর এক হওয়ার কথা। কিন্তু হিসাব থেকে মহাবিশ্বের মোট ভর অনেক অনেক গুণ বেশি পাওয়া গেল। এই বাড়তি ভরের জোগান কোত্থেকে এল?  অনেক বিজ্ঞানীই এটা নিয়ে গবেষণা করলেন। কিন্তু হিসাব মিলল না।

১৯৭০-এর দশকে মার্কিন জ্যোতির্বিদ ভেরা রুবিন বললেন, দুভাবে বের করা মহাবিশ্বের ভর সমান হবে, যদি মহাবিশ্বে বিপুল ভর ও শক্তি লুকিয়ে থাকে। রুবিন আরও বলেন, এসব গুপ্ত বস্তু তৈরি এমন কণা দিয়ে, যেগুলো আমাদের অজানা। আলোও এর ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই খুব সহজেই আমাদের চোখ ও শক্তিশালী ডিটেক্টরও ফাঁকি দিতে পারে।

এখন আমরা জানি, মহাবিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ দৃশ্যমান বস্তু দিয়ে গড়ে উঠেছে। ৯৬ শতাংশই রয়ে গেছে অদৃশ্য। অদৃশ্য ভরের ২১ শতাংশ গুপ্ত পদার্থ বাকি ৭৫ শতাংশ গুপ্ত শক্তি। এ বিশাল ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জিকে আমলে নিয়েই বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের প্রসারণ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করা যায়। ব্যাখ্যা করা যায় আইনস্টাইনের মহাকর্ষও। অর্থাৎ এর অসিত্মত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। শুধু কি এতে মন ভরে? বিজ্ঞানীরা জানতে চান, সেই ভুতুড়ে গুপ্ত বস্তুগুলো আসলে কী দিয়ে তৈরি?

মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল প্রতিষ্ঠিত করেন স্টিভেন ওয়েনবার্গ, আবদুস সালাম আর সেলডন গ্ল্যাশো। সেই মডেলে আমাদের পরিচিত সব বস্তুকণা (ফার্মিওন) ও বলবাহী কণাদের (বোসন) স্থান হয়েছে। কিন্তু গুপ্ত কণাদের খোঁজ ওই মডেল দিতে পারে না। ১৯৭০-এর দশকে ‘সুপার সিমেট্রি’ নামের আরেকটি মডেল দাঁড় করানো হয়। উদ্দেশ্য কৃষ্ণগহ্বর কিংবা ডার্ক ম্যাটারের মতো বিষয়গুলো—যেখানে নিউটন-আইনস্টাইনের মডেল অকার্যকর, কোয়ান্টাম মেকানিকসও ঠিকঠাক কাজ করে না—সেসব বিষয় ব্যাখ্যা করা। সুপার সিমেট্রির সূত্র ধরেই বিজ্ঞানীরা ডার্ক ম্যাটারের জন্য একধরনের কণার কথা বলেন। নাম তার উইম্প। পূর্ণাঙ্গ নাম উইকলি ইন্টার্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিক্যালস (Weakly interacting massive particles)। অর্থাত্ দুর্বল মিথস্ক্রিয়াশীল ভারী কণা। বিজ্ঞানীদের দাবি, এটা এমন এক কণা শুধু মহাকর্ষ বলের সঙ্গেই এর মিথস্ক্রিয়া ঘটায়। বিদ্যুচ্চুম্বকীয়, সবল নিউক্লীয় বল, এমনকি দুর্বল বলের সঙ্গেও এর মিথস্ক্রিয়া নেই। তাই কঠিন পদার্থ কিংবা ফোটনের সঙ্গেও এর সংঘর্ষের কোনো সুযোগ নেই। আর আলোর সঙ্গেই যদি সখ্য তৈরি না হয়, সেটা আমাদের চক্ষু-কর্ণের মানভঞ্জন ঘটাবে কী করে?

চলবে…

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.