ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি ৬ : গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং

0

সাধারণভাবে দেখলে বোঝা যায়, আলো সবসময় সোজাপথে চলে। কেন চলে? কারণ আলো চলার সময় এক স্থান থেকে অন্য যেতে সবচেয়ে কম সময়ের পথ বেছে নেয়। সমতলে দুটি বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে সরল রেখা। যেহেতু আমরা এতদিন মনে করতাম স্থানকাল সমতল সুতরাং আমরা দেখতাম আলো সররেখা পথে বা সোজা পথে চলে। আলো যখন এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে তখন আলোর প্রতিসরণ ঘটে। আলোর প্রতিসরণ মানে আলোর দিক পরিবর্তন হওয়া। যেমন আলো শূন্য মাধ্যম থেকে পুুরু কাচের দেয়ালে ভেতর প্রবেশ করলে তার দিক পরিবর্তন হয়।

আলো এই প্রতিসরণ নীতিই ব্যবহার করে তৈরি করা হয় লেন্স। লেন্স এমন একট কাঁচ, যে আলোকে দূর থেকে আসা আলোক রম্মিকে প্রতিসরিত করে একটা বিন্দুতে ফোকাস করে। আমরা বাজারে যেসব আতশ কাঁচ কিনতে পাই সেগুলো হলো উত্তল লেন্স। আমাদের চশমার কাঁচে, টেলিস্কোপে, অনুবিক্ষণ যন্ত্রে লেন্স ব্যবহার করা হয়। লেন্সের ভেতর দিয়ে কোনো বস্তুকে দেখলে তাঁর সঠিক অবস্থানটা বোঝা যায় না। উত্তল লেন্স ব্যবহার করলে মনে বস্তুটা অনেক কাছে আছে। বস্তুটাকে সাধারণ অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি বড় মনে হয়। আবার অবতল লেন্সের ভেতর দিয়ে দেখলে মনে হয় বস্তুটি অনেক ছোট এবং অনেক দূরে।

কাচের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর গতিপথ বেঁকে যায়

আলোর প্রতিসরণের একটা বড় উত্স হলো পানি। পানির ঘনত্ব আর বাতাসের ঘনত্ব সমান নয়। আলো এক ঘনত্বের মাধ্যম থেকে অন্য ঘনত্বের মাধ্যমে গেলে প্রতিসরিত হয়। ঠিক লেন্সে যেমন প্রতিসরিত হয়, তেমনি বায়ু মাধ্যম থেকে পানিতে গেলেও প্রতিসরিত হয়। পানি এখানে লেন্সের মতো কাজ করে। পানির ভেতর যখন কোনো মাছ থেকে তখন এর প্রমান পাওয়ায় যায়। অনেক সময় জেলেরা বর্শা জাতীয় অস্ত্র দিয়ে পানিতে মাছ ধরেন। তাঁদের তখন এই প্রতিসরণের ব্যাপারটা না মাথায় রাখতে হয়। স্বচ্ছ পানিতে মাছ যেখানে যায়, আসলে মাছটার অবস্থান সেখানে নয়। আমরা মাছটার প্রতিবিম্ব দেখি। আসল মাছটা থাকে তার থেকে কিছুটা দূরে। তাই ঠিক পানিতে যেখানে মাছটা আছে সেখানে বর্শা ছুঁড়লে মাছ পাওয়া যাবে না। মাছটা যদি ধরতে হয় তাহলে বর্শাটা প্রতিবিম্বের কাছাকাছি কোনো জায়গায় ছুড়তে হয়। কোথায় ছুড়তে হয় সেই হিসাবটা জেলেরা জানেন।

 

লেখাটি ‌’গুপ্ত মহাবিশ্বের খোঁজে’ বইয়ের অংশবিশেষ। বইটি অমর একুশে বইমেলায় প্রথমার (৮নং) প্যাভিলিয়নে পাওয়া যাবে।

বইটি ঘরে বসে কিনতে পারবেন এখানে ক্লিক করে

এতো গেল সাধারণ লেন্সিংয়ের ব্যাপর। মহকর্ষীয় লেন্সিংটা আবার কী? মনে হতে পারে মহাকাশে বিশাল একটা লেন্স ব্যবহার করে তাতে আলো টালো ফেলা হয় বুঝি। মহাকাশে বিশাল বিশাল লেন্স অবশ্য আছে। হাবল টেলিস্কোপের লেন্স কম বড় নয়। কিন্তু এটাকে মহাকর্ষ লেন্সিং বলা হয় না। মহাকাশে ভারী কোনো বস্ত যেমন আমাদের পৃথিবী, সূর্য গ্রহ-নক্ষত্ররা এমন লেন্স তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে ভালো লেন্সিংটা তৈরি করতে পারে আস্ত একটা গ্যালাক্সি। আর মহাকর্ষ বলকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের লেন্স তৈরি করা হয় বলে এর নাম মহাকর্ষীয় লেন্সিং। তবে এই মহাকর্ষীয় লেন্সিং সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে সাধারণ আপেক্ষিকতায়।

লেখকের আরও কিছু বই পাবেন প্রথমা, অন্বেষা ও তাম্রলিপির প্যাভিলিয়নে

আইনস্টাইনের জেনারেল থিরোরি অব রিলেটিভিটির প্রকাশের আগ পর্যন্ত সবাই জানত এবং মানত, আলো সোজা পথে চলে। কিন্তু আইনস্টাইন দেখালেন ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে  যাবার সময় আলো বেঁকে যায়। অর্থাত্ ভারি বস্তুর মহাকর্ষ বল আলোকে বাঁকিয়ে দেয়। তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়ায়?  আলো চলার সময় সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নেয়। কিন্তু যখন কোনো বস্তুর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের পাশ দিয়ে যায় তখন আলো বেঁকে যায়। তাহলে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যে আলোর ওই বাঁকানো পথটাই নিশ্চয়ই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। তাহলে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ভেতর দুটি বিন্দুর মধ্যে সংক্ষিপ্ত পথটাও বাঁকানো। এখান থেকেই আইনস্টাইন ধারণা করলেন মহাকর্ষ ক্ষেত্র কোনো সমতল ক্ষেত্র নয়। তা বাঁকানো।

আইনস্টাইন হিসেব করে দেখলেন, দূর নক্ষত্র থেকে পৃথিবীতে আসা আলোক রশ্মি আমাদের সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ভেরত দিয়ে আসার সময় বেঁকে যায়। আমরা আকাশে একটা নক্ষত্রকে জ্বলতে দেখি। আইনস্টাইনের মতে যেখানে নক্ষত্রটাকে জ্বলতে দেখি, তার অবস্থান সেখানে নয়। তার থেকে একটু বিচ্যুত জায়গায়। আইনস্টাইন হিসেব করে দেখালেন সূর্যের কোলঘেঁষে আসার সময় ওইসব নক্ষত্রের আলো কতটুকু পরিমাণ বিচ্যুত হয়। আইনস্টাইন বললেন এই বিচ্যুতির পরিমাণ ১.৭৫ সেকেন্ড-চাপ।

নিউটনও কিন্তু জানতেন দূর নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসার সময় বেঁকে যায়। তাই নক্ষত্রটাকে একটু বিচ্যূত জায়গায় আমরা দেখি। নিউটনে ব্যাখ্যা অবশ্য আলাদা। নিউটন আলোর কনা ধর্মের জনক। তিনি মনে করতেন আলো কণা বলেই মহাকর্ষ বলের দ্বারা আকৃষ্ট হয়। এজন্য ধূর নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসার সময় বেঁকে যায়। কিন্তু নিউটনের হিসবা অনুয়ায়ী আলোর এই বিচ্যুতির পরিমাণ ০.৮৫ সেকেন্ড-চাপ। আইনস্টাইনের হিসেবে সেটা এর প্রায় দ্বিগুন। এখন সত্যিকারের পরীক্ষার ফলটা যার সাথে মিলে যাবে তিনিই নিশ্চিতভাবে তাঁর মহাকর্ষ নীতিই ঠিক। আইনস্টাইন বললেন এটা পরীক্ষা করার উপযুক্ত সময় পুর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের দিন। কারণ সুর্যের কোলঘেঁষে যেসব আলো পৃথিবীতে আসার অন্যদিনে সুর্যের আলোর আড়ালে তা হারিয়ে যায়। পূর্ণগ্রাস সুর্যগ্রহণই এই পরীক্ষার উপযুক্ত সময়।

১৯১৯ সালের ২৯ মে সূর্য গ্রহণের দিন দুদল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের এই তত্ত্বের প্রমাণ দিতে গেলেন। ইংরেজ জ্যোতির্বিদ আর্থার এডিংটনের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী গিয়েছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার প্রিন্সিপি নামের এক দ্বীপে। আরেকটি দলের নেতৃত্বে ছিলে ক্রোমোলিন। তাঁরা গেলেনে ব্রাজিলের সোব্রালে। ১৯১৯ সালের ৬ নভেম্বর লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি ও রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির যৌথ বার্ষিক সভায় দুই দলের পরীক্ষার ফলাফল উত্থাপিত হলো। দুদলই সূর্যগ্রহণের সময় একটা নক্ষত্রের আলোা বিচ্যুতি পরীক্ষা করেছিলেন। দুদলের একদল ফলাফল পেলেন ১.৯৮ সেকেন্ড চাপ, আরেক দলের ফলাফল হলো ১.৬১ চাপ। দুই ফলাফলের গড় করলে দাঁড়ায় ১.৭৯৫ সেকেন্ড চাপ। আইনস্টাইনের অনুমানের খুব কাছাকাছি ফল এলো। অর্থাত্ সন্দেহতীতভাবে প্রমাণ হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আলোক রশ্মি বেঁকে যায়।

আলো সোজা পাথে চলে। বেঁকে যাওয়া স্থানকালের ভেতর দিয়ে চলতে গিয়ে আলোর গতিপথও তাই বেঁকে যায়। এ কারণে সূর্যের পাশ দিয়ে আসা কোনো নক্ষত্রের আলো সোজাপথে পৃথিবীতে পোঁছতে পারে না। বেঁকে যায় তার গতিপথ। তাই নক্ষত্রটা আমরা ঠিক যেখানে দেখি, তার আসল অবস্থান সেখানে নয়।

এই ব্যাপারটিই পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন এডিংটন বাহিনী। এজন্য তারা সূর্যগ্রহণের দিনটাকে বেছে নেন। কারণ সুর্যের  কোলঘেঁষে আসা নক্ষত্রের আলো সূর্যগ্রহণের দিন ছাড়া পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব পাশ করল লেটার মার্ক নিয়ে। আর সেদিন থেকেই সুচনা হলো গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের। লেন্সের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আলোর পথ বেঁকে যায়। ভারী বস্তুর প্রভাবে বেঁকে যাওয়া স্থানকালও অনেকটা লেন্সের মতো কাজ করে। লেন্সের ভেতর দিয়ে আসা আলোকে ফোকাস করে একত্রিত করা যায়। তেমনি গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের আলোও ফোকাস করে পৃথিবীতে এসে একত্রিত হতে পারে। নিচের ছবির দিকে লক্ষ করুন।

গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং

এডিংটনের পরীক্ষণের পর নড়েচড়ে বসেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত্ম খুলে দেয় এই গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং তত্ত্ব। ধরা যাক একটা গ্যালাক্সি আছে আমাদের সূর্যের ঠিক ওপারে। সেই গ্যালাক্সির আলো সরাসরি এসে পড়বে সুর্যের গায়ে। কিন্তু সূয়ের ভর এর আশপাশের স্থানকালকে বাঁকিয়ে দিয়েছে। তাই ওপারে গ্যালাক্সি থেকে আলো সুর্যের গায়ে পড়ে আড়াল হবে না। সূর্য দুই পাশ দিয়ে বাঁকা পথ ধরে পৃথিবীতে এসে ফোকাস করবে। যেহেতু আলো দুপাশ থেকে আসবে, তাই সূর্যের দুপাশে দুটি আলাদা আলাদা প্রতিবিম্ব দেখব একই গ্যালাক্সির। আমাদের কাছে মনে হবে একই মাপের একই রকম দুটি আলাদা গ্যালাক্সি আছে সূর্যের ডান ও বামপাশে। প্রথম দিকে বিজ্ঞানীদেরও বিভ্রান্ত করেছিল মহাকর্ষীয় লেন্সের এই দৃশ্য। কিন্তু খুব বেশিদিন লাগেনি ভুল ভাঙতে। স্থানকালের বক্রতার কারণেই সূর্যের দুদিক থেকে আসছে। আর তাতেই আমাদের মনে হচ্ছে দুটি উত্স থেকে আলো আসছে।

গ্রাভিটেশনাল লেন্সি আরও ভালোভাবে বোঝা যায় সূর্যের বদলে গ্যালাক্সি হলে। একটা আস্ত গ্যালাক্সির ভর সূর্য থেকে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন গুণ। গ্যালাক্সির আশপাশে স্থানকালের বক্রতাও অনেক বেশি। তাই একটা গ্যালাক্সির পেছনে আরেকটা গ্যালাক্সি থাকলে মহাকর্ষীয় লেন্সিং আরও স্পষ্ট হয়। এর সাহায্যে পেছনের গ্যালাক্সির বৈশিষ্ট্য আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

দূর আকাশের গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণের সময় হিসাবে নেওয়া হয় গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংকে। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে এক রহস্যময় বস্তুর অস্তিত্ব। ডার্ক ম্যাটার।

[বিশেষ দ্রষ্টব্য : বিবেচনায় ৩, ৪ ও ৫ নং পর্বের আগে ৬নং পর্ব প্রকাশ হলো। অপ্রকাশিত তিনটি পর্ব যথা সময়ে প্রকাশ করা হবে।]

এই বইয়ের সব পর্ব

  1. গুপ্ত ভরশক্তির খোঁজে
  2. প্রাচীন মহাবিশ্ব
  3. আধুনিক মহাবিশ্ব
  4. মহাবিস্ফোরণ
  5. কী ঘটেছিল মহাবিস্ফোরণের পর?
  6. গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং
  7. জুইকি থেকে রুবিন
  8. যা চেয়েছি আর যা পেয়েছি
  9. ছায়াপথ স্তবক
  10. মূল কণিকাদের গল্প
  11. স্ট্যান্ডার্ড মডেল
  12. প্রতিসাম্যতা
  13. ডার্ক পার্টিকেলের খোঁজে
  14. মিলেনিয়াম সিমুলেশনে ডার্ক ম্যাটার
  15. নিউট্রিনো কি ডার্ক ম্যাটার?
  16. স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ত্রুটি সুপারসিমেট্রিতে সমাধান
  17. ডার্ক ম্যাটারের প্রার্থী কারা?
  18. কীভাবে শনাক্ত হবে ডার্ক পার্টিকেল?
  19. গামা রশ্মির সন্ধানে
  20. মহাবিশ্বের সম্প্রারণ ও ডার্ক এনার্জি
  21. সুপারনোভার জন্ম
  22. আদর্শ বাতির খোঁজে
  23. আদিম আলোয় বিশ্ব দেখা
  24. মহাকাশের মানচিত্রে গুপ্ত ভরশক্তি
  25. কুইন্টেসেন্স তত্ত্ব
  26. ডার্ক ফোটনের সন্ধানে
  27. উপসংহার

 

 

 

 

Share.

মন্তব্য করুন