মঙ্গলে তরল পানির বিশাল হ্রদের সন্ধান লাভ!

0

একটি ইএসএ মহাকাশযান মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে পানির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে । ইএসএ / আইএনএএফ / ডেভিড কোরিও বোরা

গত কয়েক দশক ধরে আমরা মঙ্গলে পানির অনুসন্ধান করে আসছি, এবং এ পর্যন্ত মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশে আমরা খুব অল্প পরিমানে সরু জলধারার মত বা বরফ আকারে এর অস্তিত্ব পেয়েছি। কিন্তু একটি অবিশ্বাস্য নতুন আবিষ্কার সবকিছু আমূল পাল্টে দিতে পারে।

রোমের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (আইএনএএফ) এর গবেষক দলের প্রধান ডঃ রবার্টো অরোসেই “সায়েন্স” জার্নালে জানিয়েছেন যে, তারা মঙ্গলের দক্ষিণ মেরুতে পানির এক বিশাল আধার খুঁজে পেয়েছেন। পানির এই আধারটি এত বিশাল যে এটা দেখতে অনেকটা পৃথিবীর গ্লেসিয়ারের নিচে আটকে পড়া হ্রদের মতই বিশাল, যেখানে প্রানের উৎপত্তি সম্ভব।

ডঃ অরোসেই আইএফএল সায়েন্সকে বলেন, “সম্ভবত এটিই হতে যাচ্ছে মঙ্গলে আমাদের জানা প্রথম বাসস্থান। এটিই হচ্ছে প্রথম স্থান যেখানে আজ পৃথিবীতে বিদ্যমান অণুজীবেরা বেঁচে থাকতে পারবে”।

এই জলাধারটির অস্তিত্ব ধরা পড়েছে ইএসএ এর মার্স এক্সপ্রেস মহাকাশযানের Mars Advanced Radar for Subsurface and Ionosphere Sounding (MARSIS) নামক যন্ত্রের রাডারে। দলটি মহাকাশযানের ২০১২ সনের মে হতে ২০১৫ সনের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মঙ্গল পৃষ্ঠের ১.৫ কিলোমিটার (০.৯ মাইল) নিচে, Planum Australe অঞ্চলে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) প্রসস্ত তরল পানির একটি উৎস বিদ্যমান। গবেষক দলটি জানে না এই জলাধার কতটা গভীর, তবে ধারনা করা হচ্ছে এটি নূন্যতম ত্রিশ-চল্লিশ সেন্টিমিটার বা তার চেয়েও বেশি গভীর।

পৃথিবীর এন্টার্কটিকা ও গ্রীনল্যাণ্ডের বরফাচ্ছাদিত জলে প্রতিফলিত তরঙ্গ রশ্মি যে সঙ্কেত পাঠায়, ঠিক একই সঙ্কেত পাওয়া গেছে ঐ স্থানে ২৯ প্রস্থ সমতুল্য রাডার সংকেত পাঠিয়ে। গবেষক দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এটি পানি, কিন্তু ঠিক কোন প্রকৃতির পানি তা এখনো নিশ্চিত নয়।

 

মার্স এক্সপ্রেস মহাকাশযান থেকে রাডার রশ্মি প্রক্ষেপনের মাধ্যমে এই হ্রদ আবিষ্কৃত হয়। ইউএসজিএস / এএসইউ / ইএসএ / আইএনএএফ / ডেভিড কোরিও বোরা

 

নরওয়ে’র ট্রমসোতে নরওয়েজিয়ান পোলার ইন্সটিটিউট এর ডঃ অঞ্জা ডাইজ, যিনি গবেষণাটির সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছিলেন, আইএফএল সায়েন্সকে বলেন, “এটা বলা আসলে কঠিন আমরা ঠিক কী খুঁজছি। এটি হতে পারে পানির পাতলা একটি স্তর, অথবা একটি বিশাল জলরাশির স্তর, নয়তো তলানির পানি”।

গবেষক দলটি প্রাপ্ত সংকেতের অন্যান্য সম্ভাবনা ও বিবেচনা করেছে, যেমন, এটি হতে পারে কার্বন ডাই অক্সাইড বরফের একটি স্তর বা খুব কম তাপমাত্রার তরল বরফ। তারা জানান যে, এই ধরনের সম্ভাবনা খুবই কম কারণ প্রাপ্ত তথ্যে এই ধারনা গুলো খুব একটা প্রতিফলিত হয় না।

এই অনুমিত পানির বৈশিষ্ট্য কেমন হতে পারে তা এই পানির অবস্থানগত কারনে আরো জটিল আকার ধারন করেছে। পৃথিবীতে, উপগত হ্রদের তাপমাত্রা প্রায় -৬০º সেন্টিগ্রেড (-৭৬º ফারেনহাইট) হয়। কিন্তু উপরস্থিত বরফের প্রচন্ড চাপ বরফের গলনাঙ্ক এতটাই কমিয়ে দেয় যে, স্বাদু পানির হ্রদে বরফের নিচে পানি তরল আকারে বিদ্যমান থাকে।

তবে ধারনা করা হয় যে, মঙ্গলের এই অঞ্চলে তাপমাত্রা প্রায় -৬৮° সেন্টিগ্রেড (-৯০º ফারেনহাইট) পর্যন্ত নেমে যায়। এই তাপমাত্রায় তরল থাকতে হলে এই পানিকে ম্যাগ্নেসিয়াম, ক্যালসিয়াম এবং সোডিয়ামে পরিপূর্ন থাকতে হবে, যার অর্থ হল এই পানি  লবনাক্ত, পৃথিবীতে প্রাপ্ত বরফে ঢাকা হ্রদের নিচের স্বাদু পানির মত নয়। অবশ্য পৃথিবীতে ও কিছু লবনাক্ত হ্রদ আছে।

ডঃ ডাইজ বলেন, “এন্টার্কটিকার বরফের স্তরের নীচে পানির পক্ষে গলনাঙ্ক তাপমাত্রায় থাকা সম্ভব এর উপরিস্থিত বরফের কারনে। কিন্তু মঙ্গলে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন কারন সেখানে বরফের নিচেও প্রচন্ড ঠান্ডা তাপমাত্রা হওয়া সম্ভব। ঐ রকম ঠান্ডা তাপমাত্রায় শুধুমাত্র লবনাক্ত পানির অস্তিত্ব সম্ভব।

মহাকাশযান প্রাপ্ত রাডার সংকেত । নীল অংশে পানির উপস্থিতি ধরা পড়ে । ইএসএ / আইনএএফ / ডেভিড কোরিও বোরা

এন্টার্কটিকার ভস্টক হ্রদ সহ হাতে গোনা কয়েকটি উপগত হ্রদ এ পর্যন্ত ড্রিল করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো মোটেও সহজ নয় এবং বরফের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার ড্রিল করতে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক প্রাপ্তিসমূহ চমকপ্রদ – এবং আমরা যতবার নিচে ড্রিল করি, ততবার আমরা প্রানের অস্তিত্ব খুঁজে পাই।

ইতোপূর্বে আমরা মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশে গড়িয়ে পড়া পানির প্রমাণ খুঁজে পেয়েছি, যা recurring slope lineae (আরএসএল) নামে পরিচিত। এই বৈশিষ্ট্যগুলি স্বল্পমেয়াদী কারন মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশের অল্প চাপের পরিবেশে পানি খুব দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন ধরে তাত্ত্বিক ভাবে এটা ধারনা করা হয়, যেমনটা এই গবেষনায় ও প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, মঙ্গলের পৃষ্টদেশের নিচে পানির আরো অনেক বেশি স্থিতীশীল অবস্থা সম্ভব। এবং এটি যদি সত্যি হয়, এটি মঙ্গলের বর্তমান বা অতীতের অণুজীবের চমৎকার একটি নতুন বাসস্থানের সংবাদ প্রদান করে।

ডঃ অরোসেই বলেন, “এই জলাধার খুবই স্বতন্ত্র একটি ব্যাপার। যদি এটি স্থানীয় না হয়ে আঞ্চলিক হয়ে থাকে, তবে আপনি পৃথিবীর সমতুল্য উপগত হ্রদের একটি সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এতে দেখতে পাবেন । আপনি হয়তো দেখতে পাবেন জীবিত অণুজীবেরা কী করে একটি বৃহৎ পরিবেশে বিচরণ করছে”।

এর উত্তর দেওয়ার জন্য, দলটি আগামী কয়েক বছরে মার্স এক্সপ্রেস মহাকশযানটি যে তথ্য উপাত্ত পাঠাবে, তা বিশ্লেষনের অপেক্ষা করছে। মহাকাশযানটি পুরনো হয়ে যাচ্ছে এবং এর জ্বালানী ও ফুরিয়ে আসছে, তাই সময় এখন খুবই মূল্যবান ।

বিগত দিনে মঙ্গলে পানির উপস্থিতির সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ ছিল আরএসএল (ক্রুপক জ্বালামুখের নীচে, বামদিকে)। নাসা / জেপিএল – ক্যালটেক / অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটি

ভবিষ্যতেও এই তরল পানির উৎসে পৌঁছানো বেশ কঠিন হতে পারে । পৃথিবীতে ড্রিলিং অপারেশনের জন্যে জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন, এবং মঙ্গলে এতো সহজে এগুলো পাওয়া যাবে না । ২০২০ সনে আসন্ন ইউরোপীয় এক্সোমার্স রোভারটি মঙ্গল পৃষ্ঠের নীচে ২ মিটার (৬.৬ ফুট) ড্রিল করতে সক্ষম হবে, কিন্তু তা জলাধারগুলির কাছাকাছি যাওয়ার মত যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এখনও এই তরল জল আবিষ্কার সম্পর্কে অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। এটি এখন ও পরিষ্কার নয়, এই আবিষ্কার কি আদৌ কোন বৃহৎ পানির উৎস নাকি শিলারাশির মধ্যে চুইয়ে পড়া জলধারা। তবে এটি একটি ব্যাপারে নিশ্চিত করে যে, মঙ্গল পৃষ্ঠের নীচে তরল জল বিদ্যমান।

পৃথিবীতে তরল পানি মানেই জীবন। সাম্প্রতিক সময়ে মঙ্গলে আবিষ্কৃত জীবন গঠনের একক এবং এক সময় মঙ্গলে প্রানের বসবাস উপযোগী পরিবেশ এটাই প্রমাণ করে যে, হয়তো মঙ্গল গ্রহ একেবারেই প্রানহীন নয়।

ডঃ অরোসেই বলেন, “এটা সম্ভবত আমরা বসবাস উপযোগী স্থান হিসেবে বর্ণনা করবো। এটার অন্তত এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যা মহাজাগতিক অণুজীবের প্রান ধারনের উপযোগী”। [iflscience অবলম্বনে]

-পুলক বড়ুয়া

Share.

মন্তব্য করুন