ইউরেনাস রহস্য

0

জ্যোতির্বিদগণ অবশেষে ইউরেনাসের মেঘ কি দিয়ে তৈরি হয় তা বুঝতে পেরেছেন এবং সেই সাথে দেখতে পেয়েছেন এই মেঘ হতে পরবর্তীতে ইউরেনাসে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। প্রথমবারের মত সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইডের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে এবং এই হাইড্রোজেন সালফাইড পঁচা ডিমের মত দুর্গন্ধের জন্যে দায়ী যা ইউরেনাসে ছড়িয়ে পড়ে।

কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও ইউরেনাসের মেঘের উপাদানগুলো সম্পূর্ণরূপে নির্ণয় করা দুষ্কর ছিলো। আমরা জানি ইউরেনাসের পরিবেশে মিথেন গ্যাস রয়েছে যা গ্রহটির নীলাভ বর্ণের জন্যে দায়ী (যদিও মিথেন গন্ধহীন)। পূর্বে উড্ডয়নকৃত নভোযান ভয়েজার -২ এর পর্যবেক্ষণ থেকেও গ্রহটিতে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু পানি, এমোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইডের ঘনমাত্রা নির্ণয় করা
খুবই দুরূহ ছিল যেহেতু আমাদের গ্রহ থেকে ইউরেনাস অনেক দূরে এবং টেলিস্কোপে ইউরেনাসকে প্রায় অনুজ্জ্বল দেখা যেত। আর গ্রহটি মেঘ বলয় দিয়ে ঘেরা থাকার কারণে মেঘ গঠনকারী গ্যাসগুলো প্রায়ই আমাদের নিকট দৃশ্যমান মেঘ বলয় দিয়ে ঢাকা পড়তো, কিছুটা মেঘ বলয়ের উপর দিয়ে দেখা গেলেও তা নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য ছিল। কিন্তু যন্ত্রপাতি এবং পদ্ধতির উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটে এবং একদল জ্যোতির্বিদ Gemini Telescope এর সাহায্যে ইউরেনাসের মেঘ বলয়ের অভ্যন্তরে পর্যবেক্ষণে সক্ষম হন।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহসম্বন্ধীয় পদার্থবিদ Patrick Irwin এর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল ৮ মিটার লম্বা একটি টেলিস্কোপের Near-Infrared Integral Field Spectrometer(NIFS) ব্যবহার করে ইউরেনাসের মেঘের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণালিমিতিক বিশ্লেষণ করতে সমর্থ হন।

দৃশ্যমান মেঘ বলয়ের ঠিক উপর থেকে প্রতিফলিত সূর্যরশ্মি পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা মেঘে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হন – যদিও প্রতিফলিত রশ্মিটি ছিল অনুজ্জ্বল কিন্তু পর্যবেক্ষণটি ছিল অব্যর্থ।

Irwin বললেন, “আমরা যে রেখা নির্ণয় করতে চাচ্ছিলাম সেটা যদিও পরিমাণে খুব কম ছিল, আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই Gemini Telescope এর NIFS প্রক্রিয়ার সংবেদনশীলতাকে এবং Maunakea আগ্নেয়গিরির তীব্র পরিস্থিতিকে। যদিও আমরা জানতাম বর্ণালি রেখাগুলো নির্ণয় করা কষ্টসাধ্য হবে কিন্তু আমরা Gemini এর তথ্য-উপাত্তগুলো পর্যবেক্ষণ করে ধারণা নিতে সিদ্ধান্ত নিলাম।”

ফলাফলটি ইউরেনাসের মেঘ বলয়ে হাইড্রোজেন সালফাইড নাকি এমোনিয়া কোন গ্যাসের অস্তিত্ব বেশি সেটা নিয়ে জ্যোতির্বিদ্যায় দীর্ঘ বিতর্কের জন্ম দিল। এটি আমাদের সৌরজগতের ভেতরকার গ্রহগুলো (বৃহস্পতি,শনি প্রভৃতি) এর সাথে ইউরেনাসের পার্থক্য সূচিত করে যেমন ভেতরকার গ্রহগুলোর পরিবেশে এমোনিয়ার পরিমাণ প্রচুর কিন্তু মেঘে হাইড্রোজেন সালফাইডের কোনো অস্থিত্ব নেই। গঠনে প্রায় ইউরেনাসের মত নেপচুন গ্রহ সম্পর্কেও পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে অনুমান করা যায় যা ইউরেনাস থেকে আরো দূরে অবস্থিত। আমাদের সৌরজগতটি কিভাবে তৈরি হয়েছিল সে ব্যাপারেও পরবর্তীতে মত পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

Leicester বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহসম্বন্ধীয় বিজ্ঞানী Leigh Fletcher ব্যাখ্যা করেন," সৌরজগত গঠনের সময় নাইট্রোজেন এবং সালফারের (এমোনিয়া এবং ইউরেনাসে নতুন শণাক্তকৃত হাইড্রোজেন সালফাইড) মধ্যে সাম্য নির্ভর করে তাপমাত্রা এবং গ্রহ যে অবস্থানে গঠিত হচ্ছে সেটির ওপর।" পরবর্তী প্রজন্মের ভূমি ও মহাকাশ ভিত্তিক Giant Magellan Telescope এবং James Webb Space Telescope দিয়ে আরো বিস্তারিত জানা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্যে ইউরেনাসে মহাকাশযান পাঠাতে হবে এবং নাসা এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছে যদিও অভিযানটি সম্মতি পেলেও অন্তত আগামী কয়েকবছরে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ হবে না।

এখন যদি মানুষ সেখানে যায় তাহলে কি হবে? আমরা এখনো মঙ্গলগ্রহ যাওয়ার পেছনেই যৌক্তিকতা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি যেখানে ইউরেনাস আরো ৫ গুণ বেশি দূরে অবস্থিত। কিন্তু কখনো যদি মানুষ সেখানে যায় তাহলে অবশ্যই এমোনিয়া এবং হাইড্রোজেন সালফাইডের দুর্গন্ধের ব্যাপারটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে।

যদিও শ্বাসকষ্ট আর -২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গ্যাসে উন্মুক্ত থাকার কারণে দুর্গন্ধ অনুভব করার আগেই হাইড্রোজেন, হিলিয়াম এবং মিথেনের উপস্থিতিতে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। এই বিষয়ক গবেষণাপত্রটি Nature Astronomy জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
.[sciencealert অবলম্বনে]

-আবরার আলী

Share.

মন্তব্য করুন