সূর্যের মত গনগনে বরফ তৈরি হলো পৃথিবীতে!

0

এটি একই সঙ্গে কঠিন এবং তরল। এটি সাধারণ বরফের চেয়ে ৬০ গুন বেশি ঘনীভূত। এবং এটি তৈরি হয় সূর্যপৃষ্ঠের প্রায় সমান তাপমাত্রায়। এটি সুপার আয়োনিক বরফ যা বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত পরীক্ষাগারে তৈরি করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ধারনা করা হচ্ছিল যে উচ্চ চাপে সৃষ্ট এই বরফ, ইউরেনাস এবং নেপচুনের অভ্যন্তরীণ অংশে পাওয়া যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর অস্তিত্ব ছিল শুধুমাত্র তাত্ত্বিক পর্যায়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির পদার্থবিজ্ঞানী, মেরিয়াস মিলোট, ল্যাবরেটরির একটি বিবৃতিতে বলেন, “আমাদের পরীক্ষাটি সুপার আইওনিক বরফের অস্তিত্ব পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করে এবং দেখায় যে ঐ ভবিষ্যদ্বাণীগুলো শুধুমাত্র সিমুলেশনে প্রাপ্ত নিদর্শনই নয়। তদুপরি পরীক্ষণটি ঐ সকল পরিস্থিতিতে পানির অদ্ভুত আচরণকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।”। মিলোট ছিলেন ঐ নতুন গবেষণা ব্যাখ্যাকারী দলের প্রধান গবেষক।

৩০ বছর আগে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত পানির যুগপৎ কঠিন এবং তরল অবস্থার অস্তিত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। এটি সাধারণ বরফের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় ঘনীভূত, কারণ এটি চরম তাপমাত্রা এবং চাপের মধ্যে সৃষ্টি হয়, ঠিক যেমনটি বিশাল গ্রহের ভিতরে পাওয়া যায়। সুপার আয়নিক পর্যায়ে পানির অণুস্থিত হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন বিচিত্রভাবে আচরণ করে। এই অবস্থায় অক্সিজেনের কঠিন স্ফটিকের জালের মধ্যে হাইড্রোজেন আয়ন তরলের ন্যায় ঘুরতে থাকে।

বরফ তৈরীর প্রক্তিয়াটি বেশ জটিল ছিল। গবেষক দলটি প্রথমে সঙ্কোচনের মাধ্যমে পানিকে একটি অতি শক্তিশালী স্ফটিকাকার বরফ খন্ডে পরিনত করেন। এই বরফের স্ফটিক সাধারণ বরফ খন্ডের স্ফটিক হতে সম্পূর্ন ভিন্ন। এই বরফ তৈরীর জন্য, গবেষকেরা হীরের নেহাই কোষ ব্যবহার ক’রে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩৬০,০০০ পাউন্ড (২.৫ গিগাপ্যাসকেল) চাপ প্রয়োগ করেন। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রায় ২৫,০০০ গুন।। পরবর্তীতে, গবেষকেরা লেজার-চালিত শক ব্যবহার করে হীরের নেহাই কোষগুলোকে আরো সংকুচিত করতে থাকেন। বরফের প্রতিটি স্ফটিকের গায়ে সবোর্চ্চ ছয়টি লেজার রশ্মির মাধ্যমে উক্ত উচ্চ চাপের চেয়ে আরো ১০০ গুণ বেশি চাপ প্রয়োগ করা হয়।

মিলোট বলেন, “যেহেতু আমরা আগেই পানিকে সঙ্কুচিত করেছিলাম, তাই সাধারন পানিকে চাপের মাধ্যমে সঙ্কুচিত করার তুলনায় লেজার রশ্মির আঘাতের কারনে পানি কম উত্তপ্ত হয়েছিল”। এই নতুন পদ্ধতি গবেষকদের “পূর্বের সঙ্কোচন চাপের তুলনায় অনেক বেশি শীতল অবস্থায় উচ্চ চাপে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়”।

সুপার আয়োনিক বরফ প্রস্তুত হওয়ার পর, গবেষক দল এর আলোক ও তাপগতিবিদ্যা সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের জন্য দ্রুত কাজ শুরু করেন। চাপ তরঙ্গের প্রভাবে সঙ্কোচন শিথিল এবং পানি দ্রবীভূত হওয়ার আগে সব কাজ শেষ করতে তাদের হাতে ছিল শুধুমাত্র ১০ থেকে ২০ ন্যানোসেকেন্ড। এবং ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। তারা দেখলেন যে, বরফটি অবিশ্বাস্য রকম ভাবে ৮,৫৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইট (৪,৭২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস) তাপে এবং ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড প্রতি বর্গইঞ্চি চাপে (২০০ জিপিএ) গলে যায়। এই চাপ পৃথিবীর স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রায় দুই মিলিয়ন গুন বেশি।

বার্কেলি’র ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহ বিষয়ক পদার্থবিদ এবং এই গবেষণার অন্যতম লেখক, রেমন্ড জ্যানলোজ, ঐ বিবৃতিতে বলেন, “এটা মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত ব্যপার যে এই গ্রহগুলোর অভ্যন্তরে হাজার হাজার ডিগ্রী তাপমাত্রায় বরফের অস্তিত্ব রয়েছে।”

এই নতুন আবিষ্কার ইউরেনাস এবং নেপচুনের মত গ্রহগুলোর অভ্যন্তরে কী কী থাকতে পারে তার সম্পর্কে একটা ধারনা দেয়। গ্রহ বিষয়ক বিজ্ঞানীদের মতে, এই গ্রহগুলোর অভ্যন্তর ভাগের ৬৫ শতাংশ পানি এবং বাকি অংশে আছে কিছু এমোনিয়া ও মিথেন।

কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা যাচ্ছে সুপারআইওনিক বরফের হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি অক্সিজেনের কঠিন জালের মধ্যে তরলের মত প্রবাহিত হচ্ছে।

পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো থেকে ধারনা করা হত যে এই গ্রহগুলির অভ্যন্তরভাগ তাপ সঞ্চালনকারী “সম্পূর্ণ তরল” পদার্থে পরিপূর্ণ। কিন্তু সুপার আয়োনিক বরফের আবিষ্কার এই চিত্রটি আমূল পাল্টে দিয়েছে। গবেষকেরা বিবৃতিতে জানান, নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী গ্রহগুলোর অভ্যন্তরভাগে রয়েছে “পানির অপেক্ষাকৃত পাতলা একটি স্তর এবং সুপার আয়োনিক বরফের বিশাল বড় একটি আবরণ”।

দশ বছর আগে একটি কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে ইউরেনাস এবং নেপচুনের অদ্ভুত চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিল। ছোট দৈত্যাকৃতির গ্রহের অভ্যন্তরভাগের এই চিত্র সেই কম্পিউটার সিমুলেশনকে নিশ্চিত করবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ইউরেনাসের চৌম্বক ক্ষেত্রের অবস্থান তার অক্ষের ৫৯ ডিগ্রী দূরে। নেপচুনের চৌম্বকীয় মেরুগুলির রয়েছে প্রায় ৪৭ ডিগ্রী ঢাল। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ১১ ডিগ্রী ঢালের তুলনায় ইউরেনাস এবং নেপচুনের চৌম্বক ক্ষেত্রের ঢাল অস্বাভাবিক রকমের বেশি। তাদের চৌম্বক ক্ষেত্রগুলি ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে; উদাহরণস্বরূপ, ইউরেনাসের চৌম্বক ক্ষেত্রটি একটি ফ্ল্যাশ বাতির মতো চালু ও বন্ধ হতে পারে।

একটি মহাকাশযানের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই গ্রহগুলি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সৌভাগ্যবশত, নাসা “ইউরেনাস এবং/অথবা নেপচুন মহাকাশযান” এর প্রস্তাব করেছে যা পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে এই গ্রহগুলিকে পর্যবেক্ষন শুরু করবে। এদিকে, গবেষকেরা সংকোচনকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন যাতে করে বৃহস্পতি ও শনির মত আরো দৈত্যাকৃতির গ্রহের আভ্যন্তরীন অবস্থাকে অনুকরণ করা যায়।

গবেষনা লব্ধ ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি প্রবন্ধ গত ফেব্রুয়ারিতে নেচার ফিজিক্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। [Livescience অবলম্বনে

-পুলক বড়ুয়া

Share.

মন্তব্য করুন