স্বপ্ন দেখুন পছন্দমত, আসছে ইচ্ছে-স্বপ্ন দেখার মেশিন

0

স্বপ্নকে নিয়ে আমরা কত কিছুই না ভাবি! ঘুমের জগতে একটি আনন্দময় স্বপ্ন আমাদেরকে শারীরিক প্রশান্তি না দিলেও দুঃস্বপ্ন আমাদের জন্য আতংকজনক। দুঃস্বপ্নের কারণে অনেকেই ঠিকভাবে ঘুমাতে পারেন না। এক সময় দুঃস্বপ্ন মনের মধ্যে ঘুমের ভয়ই ঢুকিয়ে দেয়। অনেকে ঘুমকেই পরে ভয় পান, ঘুমাতে যান না যদি আবার দুঃস্বপ্ন হানা দেয়।

এমন যদি হয় আপনি নিজের ইচ্ছেমত স্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্নকে নিজের ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রণ করছেন, ইচ্ছে করলেই স্বপ্নকে বদলে দিচ্ছেন প্রয়োজনমত! হ্যাঁ, MIT রিসার্চ ল্যাবের একদল ইচ্ছেস্বপ্ন নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা স্বপ্নকে দ্রষ্টার নিয়ন্ত্রনে আনার প্রয়াস নিয়ে কাজ করছেন। আর এই গবেষণায় পথ দেখাচ্ছে বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের “স্টীলের গোলক” চর্চা।

কথিত আছে বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন দিনের আঠারো ঘন্টাই কাজ করতেন এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে অল্প সময় করে করে ঘুমিয়ে নিতেন। ঘুমের প্রথম ধাপ অর্থাৎ শুরুর প্রথম ১ থেকে ১০ মিনিটের মত মানুষ আধো সচেতন, আধোঘুম বা তন্দ্রার মধ্য দিয়ে যায়। এই সময় আস্তে আস্তে ব্রেইন ধীর হতে শুরু করে, পেশী হতে থাকে শিথিল। এডিসন তাঁর ভাতঘুমের সময় দুই হাতে দুইটি ছোট “স্টীলের গোলক” শক্ত করে ধরে রাখতেন। তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে গেলেই গোলকগুলো হাত থেকে পরে গিয়ে যে শব্দ করতো সে শব্দে এডিসন জেগে উঠতেন। আর জেগে উঠেই তন্দাচ্ছন্ন অবস্থায় কি ভাবছিলেন, দেখছিলেন, শুনছিলেন, তা লিখে রাখতেন।

এডিসনের এই গোলক নিয়ে জেগে থাকার চেষ্টা আমাদের কাছে উদ্ভট কিংবা হাস্যকর শোনালেও MIT রিসার্চ ল্যাবের গবেষকদের কাছে এটিই হয়ে উঠছে পদপ্রদর্শক। এই ঘটনাটা মানুষের ঘুম এবং ঘুম থেকে জেগে উঠা কিংবা সজাগ অবস্থা থেকে ঘুমিয়ে যাবার মধ্যখানের সুক্ষ্ম সময়টাকে খুজে পেতে সাহায্য করছে গবেষকদেরকে। এই সময়টা এতই সুক্ষ্ম যে মানুষ এ সময় না থাকে পুরোপুরি সচেতন, না থাকে অচেতন। আর সময়টুকু খুজে পাওয়া গবেষকদের আসলেই অনেক জটিল। দেখা গেছে, এই সুক্ষ্ম সময়ের মধ্যে কেউ কেউ হুট করে সচেতন হয়ে পড়ে আবার কেউ কেউ পড়ে যায় হেলুসিনেশনে, দেখতে থাকে অদ্ভুতসব দৃশ্য, শুনতে পায় অদ্ভুত কথোপথন।

বিজ্ঞানীরা এই সুক্ষ্ম সময়টাতে মানুষের মনের অবস্থার নাম দিয়েছেন Hypnagogia এবং অনেকে বিশ্বাস করেন এই অবস্থায় মানুষ থাকে সবচেয়ে বেশি সৃজনশীল, দেখে স্বপ্ন।

এডাম হরোয়িচ-এর নেতৃত্ব MIT Media ল্যাব-এর একদল বিজ্ঞানী DORIMO নামের এক যন্ত্র উদ্ভাবনের দাবী করেছেন যা দিয়ে Hypnagogia অবস্থাকে সনাক্তকরণসহ এই সময়ের চিন্তাভাবনা, দৃশ্য কল্পনা অর্থাৎ স্বপ্নকে ইচ্ছেমত নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তাদের এই যন্ত্রটির খুঁটিনাটি আসছে সপ্তাহে মন্ট্রিলের “কম্পিউটার-হিউম্যান ইন্টারফেস কনফারেন্স”-এ তুলে ধরা হবে।

DORIMO-দস্তানার প্রোটোটাইপ

MIT Media ল্যাব-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী Hypnagogia অবস্থা মনের এমন এক অবস্থা যা স্থান-কালের উর্ধ্বে, স্বতস্ফুর্ত ও অবারিত জগতসমুহে নিজের আবছা অস্তিত্ব নিয়ে এক ধরণের অনিশ্চয়তায় পরিভ্রমণ।

বিজ্ঞানীরা দাবী করেছেন মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের তাদের DORIMO যন্ত্রটির মাধ্যমে Hypnagogia-র অবারিত জগতসমুহে অনিশ্চিত পরিভ্রমণকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ইচ্ছেমত জগতে পরিভ্রমণ করা যাবে। অর্থাৎ, নিজের ইচ্ছেমত স্বপ্ন দেখা যাবে। তাহলে কি বাস্তব জীবনে প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে বিষণ্ণ থাকলেও স্বপ্ন জগতে প্রেমিকার সাথে ডুবে থাকা যাবে ইচ্ছেমত প্রেমে!

জেনে রাখা ভালো, Hypnagogia-র স্বপ্ন আর লুসিড ড্রিমের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। Hypnagogia-র স্বপ্নগুলো মানুষ দেখে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আর লুসিড ড্রিম সম্পন্ন হয় ঘুমের REM স্টেজে।

DORIMO যন্ত্রটির পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবকরা একটা গ্লাবস পরিধান করেছেন যার মধ্যদিয়ে ব্যক্তির পেশীর অবস্থা, হার্টের গতি, চামড়ার কণ্ডাকটেন্স সার্বক্ষণিক পর্বেক্ষণ করার সুবিধা আছে। যখন এই যন্ত্র ব্যক্তির Hypnagogia স্টেজ বা অবস্থা নির্ণয়ের সিগন্যাল প্রধান করেছে তখন যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আস্তে আস্তে ঐ ব্যক্তিকে আরেকটু সজাগ রাখার জন্য সিগন্যাল প্রদান করা হয় সাথে একটা অডিও বার্তাও প্লে করা হয়। এই অডিও বার্তাটি ব্যক্তির Hypnagogia-স্বপ্নকে প্রভাবিত করে সাথে এই অডিও বার্তার মাধ্যমে ব্যক্তির ইচ্ছাকে জানার চেষ্টা করা হয় এবং সে অনুযায়ী যেন স্বপ্নকে প্রভাবিত করা যায় তাঁর সিগন্যাল প্রদান করা হয়।

গবেষক বিজ্ঞানীরা দাবী করেন এই যন্ত্রটি পরীক্ষাধীন ব্যক্তিদের Hypnagogia-স্বপ্নকে পুরোপুরি প্রভাবিত করতে পেরেছে, তাদের চিন্তাভাবনায় সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়েছে এই যন্ত্রটির মাধ্যমে। তবে  যন্ত্রটি অনেক ব্যয়বহুল, কিন্তু আশার কথা হচ্ছে এটিকে কম খরচে সকলের ব্যবহার উপযোগী করে উৎপাদনের কাজও এগিয়ে চলছে।

আশা করা হচ্ছে অচিরেই যন্ত্রটি সাধারণের ব্যবহারযোগ্য এবং হাতের নাগালে চলে আসবে, মানুষেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাদের Hypnagogia-স্বপ্নকে, করতে পারবে তাদের সৃজনশীলতার সর্বোচ্চ ব্যবহার। [IFLScience অবলম্বনে]

-পৃথু স্যন্যাল

Share.

মন্তব্য করুন