মানবকোষে নতুন গঠনের ডিএনএর প্রমাণ পেলেন বিজ্ঞানীরা

0

ডিএনএর গঠন শুধুমাত্র ডাবল হেলিক্স নয়!

বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত জীবন্ত কোষে পূর্বে দেখা যায় নি এমন গঠনের ডিএনএ চিহ্নিত করেছেন। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে বোঝা যায়  ডিএনএ ‘টুইস্টেড নট’ অর্থাৎ পাকানো জট আকারেও থাকতে পারে। এর মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হলো যে আমাদের জটিল জেনেটিক কোডগুলো প্রথাগতভাবে ডিএনএ যেভাবে বিন্যস্ত আছে তার চেয়ে অনেক বেশি নিপুণতার সাথে জটিল প্রতিসাম্য তৈরি করতে পারে। আমাদের প্রাণ রসায়ন কিভাবে কাজ করে ডিএনএর এই গঠন থেকে আমরা আরো ভালোভাবে জানতে পারব।

অস্ট্রেলিয়ার গারভান ইন্সটিটিউট অব মেডিক্যাল রিসার্চের এন্টিবডি থেরাপিউটিক্স গবেষক ডেনিয়েল খ্রিস্ট বলেন,“বেশীরভাগ মানুষ যখন ডিএনএর কথা ভাবেন তারা দ্বিসূত্রক ( ডাবল হেলিক্স) ডিএনএর কথাই ভাবেন। এই গবেষণা আমাদের এটা দেখালো দ্বিসূত্রক ডিএনএ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ধরণের ডিএনএর অস্তিত্ব আছে যা আমাদের কোষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ।“

নতুন যে ধরণের ডিএনএ সনাক্ত করা হয়েছে তাকে বলা হচ্ছে ইন্টারক্যালেটেড ( অন্যের মধ্যে নিবেশিত থাকা) মোটিফ বা আই মোটিফ ডিএনএ । এই ধরণের ডিএনএ জীবদেহের বাইরে পরীক্ষাগারে কৃত্তিমভাবে প্রথম আবিস্কৃত হয় ১৯৯০ সালের দিকে।

খ্রিস্টের দলকে ধন্যবাদ কারণ আমরা এখন জানি এই আই মোটিফ শুধুমাত্র ল্যবেই দেখানো সম্ভব নয়, বরং এটা মানব দেহেই প্রাকৃতিকভাবে থাকে। এই আই মোটিফ কোষ জীববিদ্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই এই আবিষ্কার গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

আপনি যদি শুধুমাত্র ওয়াটসন ও ক্রিকের বিখ্যাত দ্বিসূত্রক ডিএনএ মডেলের কথা জেনে থাকেন তবে ইন্টারক্যালেটেড মোটিফের কনফিগারেশন আপনাকে আশ্চর্যান্বিত করবে।

এই গবেষণার সহপ্রধান জিনোমোসিস্ট মার্সেল ডিঞ্জার বলেন, ‘আই মোটিফ ডিএনএর চার সূত্র বিশিষ্ট একটি পাকানো অবস্থা। এই জটপাকানো অবস্থায় একই সূত্রকের সাইটোসিন পরস্পর যুক্ত হয় অপরদিকে ডিএনএর দ্বিসূত্রক মডেল অনুসারে এক সূত্রের সাইটোসিন অন্য সূত্রের গুয়ানিনের সাথে যুক্ত হয়।“

এই গবেষণার প্রথম লেখক গারভান মাহদি জেরাতির মতে, ”আই মোটিফ A-DNA, Z-DNA, ট্রিপ্লেক্স ডিএনএ, ক্রুসিফরম ডিএনএর মতোই কখনো দ্বিসূত্রক কাঠামোতে থাকে না। এই আই মোটিফ আমাদের কোষেই অবস্থান করে।“

আরেক ধরণের ডিএনএ কাঠামো G_quadruplex (G4) DNA মানবদেহে দৃশ্যমান হয় ২০১৩ সালে। মুলত তৈরিকৃত এন্টিবডির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কোষের মধ্যে G4 প্রকাশিত হয়। নতুন এই গবেষণায় জেরাতি ও অন্যান্য গবেষকরা একই ধরণের পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তাঁরা একটি এন্টিবডি খণ্ড তৈরি করেছেন যা সুনির্দিষ্টভাবে আই মোটিফকে চিহ্নিত করে ও এর সাথে যুক্ত হয়। এর জন্যে ইমিউনোফ্লোরসেন্ট গ্লুর সাহায্যে তাদের অবস্থান দৃশ্যমান করা হয়।

জেরাতি বলেন, “ যেটা আমাদের সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত করে সেটা হচ্ছে আমরা সবুজ দাগ অর্থাৎ আই মোটিফ দেখতে পেয়েছিলাম যা সময়ের সাথে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হচ্ছিল। এটা প্রমাণ করে যে আই মোটিফ তৈরি হচ্ছিল আবার ধ্বংসপ্রাপ্তও হচ্ছিল এবং আবার নতুন তৈরি হচ্ছিল ।

যদিও এই আই মোটিফ ডিএনএ কিভাবে কাজ করে তার সম্বন্ধে আরও অনেক জানতে হবে তারপরও এই ফলাফল হতে দেখা যায় এই অস্থায়ী আই মোটিফ সাধারনত  কোষ চক্রের শেষ পর্যায় অর্থাৎ লেট G1 দশায় তৈরি হয় যখন ডিএনএকে সক্রিয়ভাবে পড়া যায়। আই মোটিফ থাকার প্রবণতা বেশি দেখা যায় ডিএনএর প্রোমোটার অঞ্চলে যেখানে জিনের কাজ চালু অথবা বন্ধ হয় এবং বয়স বৃদ্ধিজনিত জেনেটিক মার্কার টেলোমিয়ার অঞ্চলে।

জেরাতি বলেন ,“ আমরা মনে করি আই মোটিফের যাওয়া আসার মধ্যে এটির কার্যক্রমের একটি ইঙ্গিত আছে। মনে হয় আই মোটিফ জিনের কাজ চালু অথবা বন্ধের জন্যে এবং একটি জিন সঠিকভাবে পড়া যাবে কিনা সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখে”।

আমরা এখন নিশ্চিতভাবেই জানি আমাদের কোষে নতুন ধরণের ডিএনএ বিদ্যমান। এই আবিষ্কারের মাধ্যমে গবেষকদের মধ্যে নতুন দায় তৈরি হয়েছে আর তা হলো এই ডিএনএ গুলো আমাদের শরীরের ভেতরে কি করে তা খুঁজে বের করা।

জেরাতি সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, এর উত্তরগুলো আই মোটিফ এর পাশাপাশি A-DNA, Z-DNA, ট্রিপ্লেক্স ডিএনএ, ক্রুসিফরম ডিএনএ সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে। এই নতুন ধরণের ডিএনএর গঠন কোষে প্রোটিনের সগোত্রীয় ডিএনএ সিকুয়েন্স বের করা এবং কিভাবে প্রোটিন কাজ করে তা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কাজেই কোষের স্বাভাবিক কাজ পরিচালনার জন্য এই আই মোটিফ ডিএনএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর যে কোন বিচ্যুতির ফলাফল রোগ বয়ে আনতে পারে। [Science Alert অবলম্বনে]

এই গবেষণার ফলাফল nature chemistry তে প্রকাশিত হয়েছে।

-জোনায়েদ হাসান

Share.

মন্তব্য করুন