ঈশ্বর-কণাই কি আমাদের মহাবিশ্বের অন্তিম মুহূর্তের নিয়ামক?

0

বিখ্যাত হলেন হিগ্‌স, কেননা তাঁর হিসেব মতোই একটি আন্তঃপারমানবিক কণার নিশ্চিত অস্তিত্বের মাঝে বিশ্বলোকের বাকী রহস্যের সন্ধানে আজ বিশ্বের প্রথিতযশা পদার্থ বিজ্ঞানীরা। কণাটির নামের সাথেও ইতোমধ্যেই জড়িয়ে গিয়েছেন তিনি। যার নাম হিগ্‌স বোসন।  বস্তুর ভর গঠনে এর কারসাজি রয়েছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির বাহুগুলোর ভাঁজে ভাঁজে যে কৃষ্ণ এলাকা দেখা যায় সেখানে  এমনকি মহাকাশের অন্যত্র সর্বত্র এই কণা বা কণাজাত কৃষ্ণ বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে।

স্কটিশ পর্বতে আনন্দ ভ্রমণে যাবার সময় গ্রুপকে নির্দেশ দিতে ভুলে গিয়েছিলেন সাথে তাঁবু নিতে। অগত্যা তাই প্রত্যাবর্তন আকস্মিক বেরসিক টিপিক্যাল বৃষ্টির তাড়ায়। এডিনবার্গের নিজের ছোট্ট অফিস ঘরে ফিরে এসে হাঁফ ছাড়লেন তিনি! খুশীও হলেন খুব, কারণ মাথার ভবনা রাশির তো একটা পরম্পরা দরকার, দরকার তো এক অবয়ব সৃষ্টির। চিন্তা-ইটের শক্ত গাঁথুনি, যা কিনা বিল্ডিং ব্লক, শুধু দরকার একটা যুতসই যোগসূত্র! তত্ত্বটা মাথাতেই ছিলো অবয়বটা পায়নি তখনো। কয়েক দিনের টানা লেখা, কফির কাপের ধোঁয়া আর তার সাথে  তত্ত্বীয় গণিতের অকাট্য যুক্তির সিমেন্টিং-এ দাঁড়িয়ে গেলো প্রাকৃতিক রহস্যভেদের এক এক অবিস্মরণীয় রূপরেখা। আলো দেখলেন তিনি। লিখিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রস্তাব করলেন গডস পার্টিক্যালের। এতোটা সফলতায়ও ইউরেকা ইউরেকা বলে ছুটে বেরোতে পারেননি। কারণ অনেকটাই যে তখনো বাকী! বাকী হলো কণাটির প্রকৃতি, এর উৎস আর এর সম্ভাব্যতা।

আজ তা উদ্ঘাটিত, চিহ্নিত এবং চর্চিত! ইদানীং কণা পদার্থবিদ-গন জোরেশোরেই বলে থাকেন হিগ্‌স পার্টিক্যালের কথা, যার প্রচলিত নাম গডস পর্টিক্যাল, বাংলায় ঈশ্বর-কণা, যা এই কণাটিকে দিয়েছে সর্বোচ্চ পরিচিতি, করে তুলেছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কণার সমন্বয়ে পদার্থের আভ্যন্তরীণ গঠনের যে আদর্শিক মডেল সেখানে এই কণাটি সবিশেষ গুরুত্বের সাথেই বিবেচিত হচ্ছে। শূন্য হতে যে বস্তু জগতের সৃষ্টি হতে পারে বোধ করি তার নিশ্চয়তার বিধান এ কণাটির অস্তিত্বের সাথেই অনেকটা মিশে আছে। মডেলটি এমন একটি প্রাথমিক বিশেষ কণাময় বিগ-ব্যাঙ অব্যবহিত পরের মহাবিশ্বকে উপস্থাপিত করছে যে পরবর্তী শতকোটি বছরে এই কণার সমন্বয়েই সৃষ্টি হয়েছিলো যাবতীয় বস্তু জগত, এই তারকারাজি, গ্যালাক্সি, ধূমকেতু, গ্রহপূঞ্জ, মানবজাতি এবং অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণু-পরমাণু সমেত সমগ্র বিশ্বভ্রম্মান্ড। আর আজকের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে নতুন আর এক চমৎকারিত্বে ভরা অধ্যায়! অর্থাৎ আমাদের অস্তিত্বের অন্তিমের ডাক! এ কণারাজিই সৃষ্টির মূলে এবং অন্তিমেও! ঈশ্বর কণাই বটে!

কণা পদার্থ বিদ্যার আদর্শ তত্ত্বীয় পরি-কাঠামোতে যে কণা বিশ্বজগতের সৃষ্টির মূলে পারষ্পরিক মিথষ্কৃয়ায় ভরের সৃষ্টি করেছিলো, করেছিলো বস্তু জগতের এই যে বাস্তবতা তার নিশ্চয়তার বিধান। এর অনুপস্থিতিতে কোন ভাবেই সম্ভব নয় কোন ধরনের কণারই ভর সৃষ্টি। কিংবা সৃষ্টি তার অবয়বের, অস্তিত্বের অর্থাৎ বাস্তবতার এবং দশাগ্রস্থতার জন্যে এই ঈশ্বর-কণার উপস্থিতি এবং মিথষ্কৃয়া এক অবশ্যম্ভাবী বিষয়।

সাম্প্রতিকতম পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে এই ঈশ্বর-কণারা তাদের ভরের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্রমশঃ ছুটেছে অন্তিমে। বর্তমানে এ কণার পরিমাপকৃত ভর হচ্ছে ১২৫ গিগাইলেক্ট্রন ভোল্ট, যা পরিমাপ করা হয়েছিলো লার্জ হেড্রন কলাইডারে। অনুধ্যায়ী হিসাবে দেখা যাচ্ছে দূর ভবিষ্যতে বস্তু কণারা তাদের ভর পরিবর্তন করে হ্রাস-কৃত ভরের দিকে যাত্রা করবে। এর অর্থ দাঁড়াবে সৃষ্টি জগতের সমস্ত বস্তুর ভর যাবে কমে ক্রমে ক্রমে। যা কিনা বিশ্বভ্রম্মান্ডের অন্তিম গতির দিক নির্দেশনাই দেয়।

বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অন্তিম কালক্ষণ গণনা করেছেন।

তবে ভয়ের কিছু নেই এই জন্যে যে, সে এখনো অনেক অনেক অপেক্ষার পালা! সে পালার দূরত্ব? সম্ভবতঃ আজ থেকে প্রায় আটান্ন হাজার কোটি থেকে তেরশ’ নব্বই হাজার কোটি বছরের মধ্যে কোন এক সময়!

প্রকল্পের প্রধান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আ্যন্ডারস আ্যন্ড্রিসেন বলেন সেটা নিতান্তই এক অপ্রিয় যদিও তবুও সেখানে পৌঁছুতে এখনো অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক সময় বাকী! ততদিনে আমাদের সৌরমন্ডলীর কেন্দ্রের তারাটির অস্তিত্বই গত হয়ে যাবে!

হার্ভার্ডের কসমোলজি বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, যেভাবে আকস্মিক এক বিগ-ব্যাঙ প্রক্রিয়ায় এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির মহেন্দ্রক্ষন এসেছিলো ঠিক একই ভাবে এক আকস্মিক ঘটনায় এই স্থানিক-সময়ের পরিসমাপ্তিও ঘটবে। এটি এমন নয় যে ধীরলয়ের সঙ্গীত সুরে এক অমায়িক আদরে বিলুপ্ত হবে সব। বিপুল বিক্রমের এক আকস্মিক শক-ওয়েভ থাকবে নেপথ্যে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারনা। অন্ততঃ তত্ত্বীয় কণা-পদার্থবিদ্যার সাময়িক কালের হিসেব থেকে এমনটা ঘটবারই আশংকা করা হচ্ছে বেশী। তবে সংকুচিত হয়ে ভীত হবার কারণ নেই এই জন্যে যে এই মহা প্রলয়ের সময়টি আসলে নির্ধারিত হবে এ মহাবিশ্বের ব্যাপ্তি এবং ক্রান্তিকালে মহাবিশ্বের পদার্থ-রসায়নের সূত্রসমূহের ভেঙ্গে পড়ার গতির উপড়ে।

আমরা আসলে জানি না এখনো এই ঈশ্বর-কণাদের ভেঙ্গে পড়ার দশা সম্পর্কে। সেটা এই জন্যে যে আমাদের মহাবিশ্ব আসলে অসীম পর্যন্ত যদি বিস্তৃত হয় তবে এই কণাদের বিস্তৃতিও রয়েছে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়ে। অসীমে কণাদের প্রান্তীয় ঘনত্বে শক্তির ভারসাম্যহীনতা থেকেই শুরু হবার কথা পতনের। অতএব সেই প্রান্তীয় দশা সম্পর্কে আমরা অবগত নই এখনো। সময় হয়তো একদিন আমাদের জানিয়ে দেবে দেরী আসলেই হয়ে গেছে কিনা। ঈশ্বর কণা বা হিগস বোসনের ভরের পরিবর্তন হবে কোন এক সময়। আজ এই হিগস বোসনের মিথষ্কৃয়ায় বস্তুকণার যে ভরের উদ্ভব সেই ভর বিচ্ছিন্ন হবে বিপুল বিক্রমে। যে মিথস্কৃয়ায় সৃষ্টি হয়েছিলো বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ কণিকা থেকে শুরু করে বিশ্বভ্রম্মান্ড এবং এ ভ্রম্মান্ডের জীবন-শৈলী।

ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাথ গ্রেগোরীর মতে এরকম এক ভাবে এটা অনুমান করা যেতে পারে, যেখানে সৃষ্ট কৃষ্ণ-গহ্বর ঘিরে প্রান্তীয় স্থানিক-সময়ের বিপুল বক্রতা এই মহাবিশ্বের ঈশ্বর-কণাদের ভেঙ্গে পড়ার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে ভূমিকা রাখবে, থাকবে পর্যবেক্ষণের আওতায়।

কণা-পদার্থবিদ্যার সাধারণ সূত্রমতে মহাবিশ্বের পরিসমাপ্তি ঘটবে পর্যায়ক্রমে। কেননা, কৃষ্ণ-শক্তি ক্রমশঃ বিস্তৃতির পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের গোটা মহাবিশ্বটিকে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত ক্রমশঃ বিকশমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত না বস্তু জগতের সকল কণাই শীতল অবস্থায় পর্যবসিত হয়। অর্থাৎ ঐ অবস্থায় বস্তুর কোন বিশেষ চরিত্র অবয়ব আর দৃশ্যমান থাকবে না। যার অর্থ হলো এই বিকশমান মহাবিশ্বের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হবে এক মহা-শূন্যতা, যার শক্তি হবে ঋণাত্মক। এরকম একটি পর্যায়ের উদ্ভব হবে ধীরলয়ে। এই যে একটি শূন্যতায় ভরা ক্রমশঃ বিকশমান ঋণাত্মক শক্তির সৃষ্ট বুদবুদ, সেটাই গিলে খাবে এই অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত আমাদের এই মহাবিশ্বটিকে নিমেষেই।

মহাবিশ্বের মহাপ্রয়াণের এই যে তত্ত্ব তার ইঙ্গিত ফার্মি ন্যাশনাল এক্সিলারেটর ল্যবরেটরী থেকে পূর্বেই দিয়েছিলেন স্মরণকালের অবিস্মরণীয় বিজ্ঞানী অধ্যাপক স্টিফেন হকিং এবং জ্যোতিপর্দার্থবিদ জোসেফ লিকেন। জোসেফ লিকেনের মতে আমাদের মহাবিশ্ব ইতোমধ্যে স্থিতিশীল মহাবিশ্বাবস্থা থেকে অস্থিতিশীল মহাবিশ্বাবস্থায় সরে এসেছে! স্থিতিশীলতার ক্রান্তি কালে তার এই অবস্থান দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে তবে তার শেষ পরিণতি অবশ্যই “বুম”! এবং সেই “বুম”-এর পথে যাত্রা সম্ভবতঃ শুরুও হয়েছে!

তথ্যসূত্র:

প্রবন্ধটির ভিত রচিত হয়েছে ভাষান্তর এবং গৃহীত অন্তর্জালিক তথ্য ভাণ্ডার থেকে। নিচে এর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।

  1. Universe could be destroyed by huge energy bubble – and scientists warn process may have begun; The Sun, Saqib Shah, 3rd April 2018, 12:09 pm, Updated: 3rd April 2018, 2:07 pm.
  2. God Particle will eventually DESTROY the universe – physicists in Doomsday claim; The Express, Sean Martin, PUBLISHED: 16:59, Tue, Apr 10, 2018 | UPDATED: 17:09, Tue, Apr 10, 2018
  3. Stephen Hawking Says ‘God Particle’ Could Wipe Out the Universe; Live Science, Kelly Dickerson, September 8, 2014 02:21pm ET.
  4. Finding the ‘God’ particle could destroy the universe, warns Stephen Hawking; The Daily Mail, Ollie Gillman, Published: 11:17 BST, 7 September 2014 | Updated: 18:11 BST, 7 September 2014.
  5. https://journals.aps.org/prd/pdf/10.1103/PhysRevD.97.043520

-কেশব কে অধিকারী
সহকারী অধ্যপক, ইনহা বিশ্ববিদ্যালয়
দক্ষিণ কোরিয়া

 

Share.

মন্তব্য করুন