কৃষ্ণগহ্বর-১৩ : স্থানকালের বক্রতা যেখানে অসীম

0

১৯১৫ সাল। প্রুসেডিং অব দ্য প্রুশিয়ান একাডেমির জার্নালে প্রকাশ হয় আইনস্টাইনের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ সাধারণ আপেক্ষিকতা। সে গল্প আমরা আগেই করেছি। আমরা এও বলেছি, আইনস্টাইন বলেছিলেন, ভারী বস্তু তার চারপাশের স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেয়। সেই বস্তুটা হতে পারে একটা নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ এমনকি গ্রহাণু। তাদের ভরের ওপরেই নির্ভর করবে স্থানকে কতটুকু দোমড়াতে-মোচড়াতে পারবে তারা। আর এই দোমড়ানো স্থানকালের ভেতর দিয়ে চলতে গিয়ে আলো যায় বেঁকে।

সূর্যের ভরটাই যদি অনেক অনেক গুণ বাড়িয়ে নিই, তখন সূর্য তার চারপাশের স্থানকালে আরো বেশি দুমড়ে-মুচড়ে দেবে
এখন প্রশ্ন হলো ভারী বস্তর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলো কতটা বেঁকে যায়। সেটা নির্ভর করে বস্তুর ভরের ওপর।ভর যত বেশি হবে, সেটা তত বেশি তার চারপাশের স্থানকালকে দুমড়ে-মুচড়ে দেবে। আমাদের সূর্যের কথাই ধরা যাক। এটার পাশ দিয়ে যাবার সময় আলো বেঁকে ৭৬ সেকেন্ড চাপ। কৌণিক হিসাবও সেকেন্ড আর মিনিটে করা হয়। তবে ঘণ্টা নেই। তার বদলে আছে ডিগ্রি। ৬০ সেকেন্ডে এক মিনিট আর ৬০ মিটিটে এক ডিগ্রি। তাই বলা যায়,৭৬ কেকেন্ড চাপ খুবই কম।
কিন্তু বস্তুর ভর যদি বেশি হয় তখন?
তখন কতটা বাঁকে আলো, সেটা নির্ভর করবে ভর কত বেশি। আমরা সূর্যের ভরটাই যদি অনেক অনেক গুণ বাড়িয়ে নিই, তখন সূর্য তার চারপাশের স্থানকালে আরো বেশি দুমড়ে-মুচড়ে দেবে। তাই আলোর পথও যাবে আরো বেশি বেশি। ধরা যাক সেই বক্রতার পরিমাণ ৪৫ ডিগ্রি। (চিত্র : ১১.২)

চিত্র : ১১.২

এবার আমরা সূর্যের ভর আরো বাড়িয়ে দেব। আগের চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে আরো বেশি মাত্রায় স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেবে সূর্য। ধরা যাক, এই অবস্থায় সূর্যের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলো ৯০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যাবে। (চিত্র : ১১.৩)

চিত্র : ১১.৩

এখন আরো বাড়াব সূর্যের ভর। এখন সূর্য এত বেশি মাত্রায় তার চারপাশের স্থাকালকে বাঁকিয়ে দেবে যে আলো তার পাশ দিয়ে যাবার সময় ১৮০ আশি ডিগ্রি কোণে বেঁকে যাবে। তার মানে আলোকে সূর্যের পাশ দিয়ে যেতে হলে সূর্যের অর্ধেক পরিধি পেরিয়ে যেতে হবে। (চিত্র : ১১.৪)

চিত্র : ১১.৪

এই অবস্থায় কিন্তু একটা মজার ঘটনা ঘটবে। সূর্যের ওপাশে পৃথিবীর ঠিক উল্টো দিকে কোনো নক্ষত্র যেটা থাকে, সেটাকে আমরা কখনই দিনেরবেলায় দেখতে পাই না।
কিন্তু সূর্যের যদি এমন হয়। যখন সে আলোকে ১৮০ ডিগ্রি কোণে বাঁকিয়ে দিতে পারে, তাহলে সেই নক্ষত্র কখনই আমাদের আড়াল হবে না। কারণ তার আলো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আমাদের পৃথিবীতে এসে পড়বে। একই সরলরেখায় পৃথিবী আর সেই নক্ষত্র, যেটা আবার আড়াল হয়ে আছে সূর্যের পেছনে, সেই নক্ষত্রটাকে দেখতে পাওয়ার চেয়ে মজার কী আছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য সে ঘটনা ঘটবে না। কারণ সূর্যে ভর বাড়ার কোনো সুযোগ নেই।
আবার আমরা সূর্যেও ভর বাড়ানোর দিকে নজর দিই। ধরা যাক সূর্যের ভর পর্যায়ক্রমে এমনভাবে বাড়ানো হলো সেটা আলোকে ২১০, ২৭০, ৩২০ ইত্যাদি কোণে বাঁকিয়ে দিতে সক্ষম হলো। শুধু তা-ই নয়, তখন ৩৬০ কম একই যেকোনো মনেরও হলে আপত্তি নেই।
এসব ক্ষেত্রে আমরা নক্ষত্রের আলোটাকে দেখব ঘুর পথে। একটা মজার ঘটনা ঘটে আলোর এমন বেঁকে যাওয়ার ঘটনা ঘটলে। তখন আমরা একটা নক্ষত্র না দেখে একটাকে আমরা দুটো দেখব। কারণ পৃথিবীর বাম পাশ দিয়ে আসা সংক্ষিপ্ত পথ দিয়েও আমরা আলোটা দেখব। আবার ডান পাশ দিয়ে ঘুরপথে আসা আলো আমরা দেখতে পাব।

এ ধরনের ঘটনাকে বলে মহাকর্ষীয় লেন্সিং। লেন্সের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর পথ বেঁকে যায়। ভারী বস্তুর প্রভাবে বেঁকে যাওয়া স্থানকালও অনেকটা লেন্সের মতো কাজ করে। লেন্সের ভেতর দিয়ে আসা আলোকে ফোকাস করে একত্র করা যায়। তেমনি গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের আলোও ফোকাস করে পৃথিবীতে এসে একত্র হতে পারে।
একটা নক্ষত্র দুটো দেখা মজার ব্যাপার। তবে জ্যোতির্বিদদের জন্য মহাকর্ষীয় লেন্সিং কখনো কখনো দেয়। তাঁরা একটা নক্ষত্রকেই দুবার গোনেন। তাই আকাশে যত নক্ষত্র তার চেয়ে বেশি নক্ষত্র হিসাবে আসে। সূর্যের ভর অত নয় বলে এর পাশ আশপাশে থাকা নক্ষত্রটিকে দুবার দেখা যায় না। কিন্তু আকাশে অনেক ভারী নক্ষত্র আছে। তার উল্টোপাশে আরো কত নক্ষত্র আছে। সেই সব ভারী নক্ষত্রের উল্টোপাশের নক্ষত্রগুলির দুটো প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। নিচের চিত্রগুলো লক্ষ করুন।
এবার আবার আমরা সূর্যের ভর বাড়াই। তখন সেই আশপাশের স্থানকালকে আরো বাঁকিয়ে দেবে। এবার এই বক্রতার পরিমাণ ধরা যাক অনেক বেশি। সেটা এত বেশি যে সূর্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আলোকরশ্মি ৩৫৯ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যাবে। এতেও সমস্যা নেই। অন্তত অল্পের জন্য যে সূর্যের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে আলো। (চিত্র : ১১.৬)

চিত্র : ১১.৬

কিন্তু স্থানকালের বক্রতা যদি এমন হয়, আলোক রশ্মি বেঁকে যায় ৩৬০ ডিগ্রি কোণে, তখন কী হবে? সূর্যের পুরো পরিধিই তো সে ঘুরে ফেলল। বেরেবো কোন পথে।

চিত্র : ১১.৭

এবার আর আলোর সূর্যকে পাশ কাটিয়ে যাবার সুযোগ থাকবে না। আলোকে কণা বা তরঙ্গ যেটাই বলুন, সেটার অবস্থা হবে নিউটনের কামানের সেই গোলার মতো। একবার সে পুরো সূর্যকে চক্কর দিয়ে আসবে। তারপর প্রথম যে বিন্দু দিয়ে সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল সেখানেই এসে পড়বে। তারমানে সূর্য এখন অসীম মাত্রায় আলোকে বাঁকিয়ে দিয়েছে। আলোকরশ্মি তাই ফিরে এসেছে আগের বিন্দুতে। আলো সব সময় সোজা পথে চলে।
কিন্তু রাস্তা যদি অসীম মাত্রায় বাঁকা হয় তখন সে কী করবে? ৩৫৯ ডিগ্রির ক্ষেত্রেও সে শেষ মুহূর্তে গিয়ে একটা সোজা পথ পেয়েছিল। সেই পথে বেরিয়ে যেতে পেরেছিল সূর্যের মহাকর্ষ ক্ষেত্র ছেড়ে। কিন্তু পুরো বৃত্ত পূরণ করার যদি দেখে আবারও তাকে বাঁকা পথেই যেতে হয়, তখন বেচারাকে ঘুরে মরতে হবে বারবার।
এই বিষয়টাকে আরেকটু ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। ধরা যাক, একটা প্লাস্টিকের পাইপ আছে আপনার কাছে। স্বচ্ছ পাইপ। ভেতরটা যেন দেখা যায়। আর আছে একটা মার্বেল আকৃতির লোহার বল। বলের সাইজটা এমন হবে যেন নলের ভেতর দিয়ে অনায়াসে চলাচল করতে পারে। নলটা রাখুন একটা উঁচু টেবিলের ওপর সোজা করে শুইয়ে। তার ভেতর ঢুকিয়ে দিন লোহার বলটিকে।
এবার নলে খুব জোরে ফুঁ দিন। বলটা ফুঁ-এর ধাক্কায় গতি পাবে। সেই গতিতে সে নলের অন্য মাথা দিয়ে বেরিয়ে যাবে স্বাচ্ছন্দ্যে। এবার নলটা বাঁকিয়ে একটা অর্ধবৃত্তের মতো করুন। এবার ফুঁ দিলে বলটা বেরিয়ে যাবে নলের অন্য মাথা দিয়ে। এবার আরো বাঁকান নলটা। প্রায় বৃত্তের মতো করুন। নলের দুই মুখ খুব কাছাকাছি থাকে। এবারও ফু দিলে বলটা বেরিয়ে আসবে নল থেকে।
কিন্তু এবার অসীম মাত্রায় বাঁকিয়ে ফেলুন নলটাকে। ভড়াকোনোর কিছু নেই। অসীমের বাস্তব উদাহরণ আসলে বৃত্ত, গোলক পৃষ্ঠ ইত্যাদি। নলের দুই মুখ সুপার গ্লু দিয়ে আটকে দিন। তবে তার আগে নলের ভেতর ঢুকিয়ে দিন লোহার বলটাকে। এবার নলের ভেতরে একটা অসীম স্থানকাল (আক্ষরিক অর্থে নয়) তৈরি হবে। বৃত্তাকার নলটা শুইয়ে রাখুন টেবিলের ওপরে।
এবার একটা শক্তিশালী চুম্বক নিন। সেটাকে নিয়ে যান নলের খুব কাছে, যেখানে বলটি আছে তার ঠিক ওপরে। চুম্বকটি বলকে আকর্ষণ করবে। কিন্তু বল তো নলের ভেতরে, সে তো চুম্বকের আকর্ষণে ছুটে আসতে পারবে না। তবে হালকা নলসহই সেটা উঠে আসতে পারে চুম্বকের দিকে। তাই আমরা একটা কাজ করব। নলটা সুপার গ্লু দিয়ে টেবিলের সাথে আটকে রাখব। যাতে নল নড়াচড়া না করতে পারে।
এবার যদি নলের ওপরে চুম্বকটাকে নড়াচড়া করাই, নলের ভেতরের বলটাও নড়াচড়া করবে। ধীরে ধীরে চুম্বকটাকে গোটা নলের ওপর একবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, তাহলে চুম্বকটাকে অনুসরণ করে নলের ভেতরটা এক পাক দিয়ে ফেলকে লোহার বলটিও। এভাবে বারবার ঘোরালে চুম্বঠারক, বলটিও নলের ভেতর ঘুরবে বারবার।
ধরা যাক, বৃত্তের অর্ধেক পথ ঘোরার পর নলটির ওপর থেকে চুম্বক সরিয়ে নেওয়া হলো যেকোনো একদিকে। লোহার বলটিও চাইবে চুম্বক অনুসরণ করে সোজা যেতে। কিন্তু পারবে না। কারণ সে নলের ভেতর আটকা পড়েছে। কিন্তু নলের কোথাও যদি একটা বড় ছিদ্র থাকত, তাহলে সেই ছিদ্র দিয়ে বলটা বেরিয়ে পড়ত চুম্বককে আকর্ষণ করে।

নলের পাশে চুম্বকের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে কিন্তু মহাকর্ষ বলের সাথে তুলনা করার জন্য নয়। আলোর কণা সব সময় গতিশীল। এরা থামে না কখনো। কিন্তু লোহার বল তো অন্য বল প্রয়োগ না করলে গতিশীল হবে না তাই চুম্বকটাকে আমদানি করা হয়েছে।
এবার আমরা ফিরে যাই আবার সেই অতি ভারী সূর্যের চারপাশে, যেখানে অসীম মাত্রায় বেঁকে গেছে আলোর পথ। সেই পথে আলো একবার ঢুকে গেলে সে ঘুরতেই থাকবে সূর্যের চারপাশে অবিরাম।


এখানে আরেকটা ব্যাপার আছে। নলের ভেতর সরু একটা বক্রতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নল হয়ে যদি গোলক হতো। ধরা যাক, একটা ছোট্ট লোহার গোলক ঝোলানো আছে ঘরের সিলিং থেকে। সেই গোলকটি রাখা আছে আরেকটা প্লাস্টিকের ফাঁপা স্বচ্ছ গোলোকের ভেতর। দুই গোলকের মাঝখানে যে ফাঁকা জায়গাটা থাকবে সেটাইকে আমরা ধরে নিই অসীম মাত্রায় বেঁকে যাওয়া স্থানকাল। এর ভেতরে চলতে গেলে এই বক্র পথেই আলোকে চলতে হবে। এর ভেতর একটা লোহার বলকে গতিশীল করলে যেমন গোলকের মধ্যেই তার গতি সীমাবদ্ধ থাকবে। তেমনি অসীম মাত্রায় স্থানকালকে বাঁকিয়ে দেওয়া ভারী নক্ষত্রের চারপাশের আলোর গতি ওই গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

চলবে….

আগের সব পর্ব :

কৃষ্ণগহ্বর-১২ : বলবাহী কণা, মৌলিক বল আর এদের আত্মীয়তার গল্প

কৃষ্ণগহ্বর-১১ : প্রতি কণার জগতে
কৃষ্ণগহ্বর-১০: কোয়ার্ক, নিউট্রিনো আর অন্যান্য কণিকা
কৃষ্ণগহ্বর-৯ : মূল কণিকাদের কথা 
কৃষ্ণগহ্বর-৮ : পরমাণুর কথা
কৃষ্ণগহ্বর-৭ : মহাকর্ষের কথা শোনে আলোও
কৃষ্ণগহ্বর-৬ : আপেক্ষিকতা ও আধুনিক মহাকর্ষ
কৃষ্ণগহ্বর-৫ : আলোর কচড়া
কৃষ্ণগহ্বর-৪ : নিউটনের কামান আর পৃথিবীর মুক্তিবেগ
কৃষ্ণগহ্বর-৩ : নিউটনের মহাকর্ষে
কৃষ্ণগহ্বর-২ : মহাকর্ষের পটভূমি
কৃষ্ণগহ্বর-১ : ফিরে দেখা ইতিহাস
Share.

মন্তব্য করুন