কৃষ্ণগহ্বর-১০: কোয়ার্ক, নিউট্রিনো আর অন্যান্য কণিকা

1

১৯৬৭ সাল। বিজ্ঞানীরা তখন মূল কণিকাগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছেন। তখন মার্কিন বিজ্ঞানী মারে গেলম্যানের পরীক্ষা থেকে বেরিয়ে এলো চমকপ্রদ এক তথ্য। ইলেকট্রন অবিভাজ্য কণা হলেও প্রোটন ও নিউট্রন নাকি তা নয়।
গেলম্যান বললেন, কোয়ার্ক নামের আরো ক্ষুদ্র্র কিছু কণা দিয়ে প্রোটন আর নিউট্রন তৈরি। এই কোয়ার্ক ছয় প্রকার। এর মধ্যে দুটির নাম আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক। এই দুই রকম কোয়ার্ক দিয়েই প্রোটন আর নিউট্রন তৈরি। দুটি আপ আর এটি ডাউন কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি হয় প্রোটন। অন্যদিকে দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি হয় নিউট্রন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য গেলম্যান ১৯৬৯ সালে নোবেল প্রাইজ পান।

বাকি চারটি হলো স্ট্রেঞ্জ, চার্ম, টপ এবং বটম কোয়ার্ক। অর্থাৎ কোয়ার্ক ছয়টি ফ্লেভারের। এখানে ফ্লেভার মানে আক্ষরিক অর্থে গন্ধ নয়। এটা আসলে কোয়ার্কের আদুরে নাম। এই ছয়টি ফ্লেভারের প্রত্যেকটির তিনটি করে কালার আছে। এখানে কালারের মানেও স্বাভাবিক রং নয়। কোয়ার্কগুলোকে একটার সাথে আরেকটাকে আলাদা করে চেনার জন্য কালার দিয়ে ভাগ করা হয়েছে।
কণা জগতে ক্ষুদ্রতম সদস্য হলো নিউট্রন। এই নিউট্রনকে খুঁজে পেতে বৈজ্ঞানিক কালঘাম ছুটে গেছে। অতি ক্ষুদ্র এক কণা। শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না। অথচ তার অস্তিÍত্ব আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে কোনো বস্তুর ওপর তার কোনও প্রভাবও নেই। সামনে যত বাধাই আসুক তা ভেদ করে চলে যায়। পৃথিবীর মতো বিশাল একটা বস্তুও এর জন্য কোনো বাধাই নয়।
২৯২৯ সাল। ডেনিশ বিজ্ঞানী নীলস বোর পরামর্শ চেয়ে চিঠি লিখলেন অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলিকে। আইনস্টাইন ভরশক্তির সমীকরণ অনুসারে বস্তুর ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করা যায়। ভর ও শক্তির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে এই সমীকরণ। এর থেকেই বেরিয়ে ভরশক্তির নিত্যতা সূত্র।
আগে ভর ও শক্তির আলাদা আলাদা নিত্যতা সূত্র ছিল। নিত্যতা সূত্রে বলা হলো, মহাবিশ্বের ভরশক্তির পরিমাণ সমসময় এক। নতুন করে ভরশক্তির জš§ দেওয়া যাবে না আবার মোট ভরশক্তির কমও হবে না। শুধু ভরশক্তিকে এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় রূপান্তর করা যাবে।
কিন্তু নিত্যতা সূত্রগুলো লঙ্ঘিত মনে হলো কিছু তেজস্ক্রিয় পরমাণুতে। বিশেষ করে বিটা ক্ষয়ে।
ট্রিটিয়ামের কথাই ধরা যাক। ট্র্রিটিয়াম হলো দুটো প্রোটন ও একটা যুক্ত হাইড্রোজেনের তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াস। স্বাভাবিক হাইড্রোজেনে শুধুমাত্র একটি প্রোটন থাকে, কোনো নিউট্রন থাকে না। ট্রিটিয়াম নিউক্লিয়াসে থাকে দুটি নিউট্রন ও একটি প্রোটন। ট্রিটিয়াম বিটা রশ্মি নিঃসরণ করে হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। আর বিটা রশ্মি ইলেকট্রনের ভর ও বেগ নিয়ে ছিটকে চলে যায়। ফলে ট্রিটিয়ামের ভরশক্তি কিছুটা কমে যায়।
অন্যদিকে কিছুটা ভরশক্তি নিয়েই পরমাণু থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছে ইলেকট্রন বা বিটা রশ্মি। ট্রিটিয়ামের হারানো ভরশক্তি নিউক্লিয়াস থেকে ছুটে বেরিয়ে যাওয়া ইলেকট্রনের ভরশক্তির সমান হওয়া উচিৎ। কিন্তু হিসাব কষে দেখা গেল বিটা রশ্মির ইলেকট্রনের ভরশক্তি কিছুটা কম।
তাহলে বাকি ভরশক্তি গেল কোথায়?

উলফগ্যাং পাউলি

উলফগ্যাং পাউলি

বোর প্রস্তাব করলেন, পরমাণুর অভ্যন্তরে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের অনেক সূত্রই খাটে না। এ কারণেই জš§ হয়েছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্সের। বোরের মতে, হারিয়ে যাওয়া ভরশক্তির ব্যাখ্যা না পাওয়ার অর্থ ভরশক্তির নিত্যতা সূত্র কাজ করছে না এখানে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমাদের নিত্যতা সূত্র পরিহার করতে হবে পারমাণবিক বস্তুগুলোর ক্ষেত্রে। আর এই প্রস্তাবটাই তিনি জানিয়েছিলেন পাউলিকে লেখা চিঠিতে।

 [এই লেখাটি কৃষ্ণগহ্বর ঃ এক মহাজাগতি রহস্যের ঊপাখ্যান বইয়ের অংশবিশেষ। বইটি ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করবে অন্বেষা প্রকাশন]

[এই লেখাটি কৃষ্ণগহ্বর ঃ এক মহাজাগতি রহস্যের ঊপাখ্যান বইয়ের অংশবিশেষ। বইটি ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করবে অন্বেষা প্রকাশন]

পাউলি তখন এ বিষয়টা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি ভরশক্তির নিত্যতাকে বাদ দিতে চাইলেন না। কারণ আলফা ও গামা রশ্মি বিকিরণের ভরশক্তির নিত্যতা বজায় থাকে। বোরের কথা মানলে সেখান থেকেও ভরশক্তির নিত্যতা সূত্র বাদ দিতে হয়। আর সেটা করতে গেলে পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই ওলটপালট হয়ে যাবে।
পাউলি একটু অন্যভাবে ভাবতে শুরু করলেন। ভাবলেন, হারানো ভরটুকু নিশ্চয়ই অন্য কোনো অদৃশ্য কণায় পরিণত হয়। কী সেই কণা? কণাটার অস্তিত্বই বা ধরা পড়ে না কেন?
সেই কণাটার নাম নিউট্রনো। পাউলি বললেন সেই কণাটার চার্জ নেই। চার্জযুক্ত কণারা চার্জিত অন্য কণাদের দ্বারা আকৃষ্ট হয়। তাই বাতাসে বা অন্য বস্তুর মধ্যে তাদের মিথস্ক্রিয়া ঘটে। চার্জযুক্ত কণাকে তাই সহজেই কণা-ডিটেক্টর যন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করা যায়।
কিন্তু চার্জবিহীন কণা অন্য বস্তুর সাথে মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। অদ্ভুত সেই কণা একে তো চার্জনিরপেক্ষ তার ওপর এর ভেদনক্ষমতা অত্যন্ত বেশি।
১৯৩১ সালে বিখ্যাত কোয়ান্টাম তত্ত্ববিদ এনরিকো ফার্মি কণাটির নাম দিলেন নিউট্রনো। সেই বছর চ্যাডউইক নিউট্রন আবিষ্কার করেন। নিউট্রনের ধর্ম ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখা গেল, নিউক্লিয়াসের নিউট্রন থেকেই মূলত বিটা রশ্মির ক্ষয় হয়।
তার ফলে জš§ হয় একটা ইলেকট্রন ও নিউট্রিনোর। সাথে একটা প্রোটনের জš§ হয়। ওটা রয়ে যায় নিউক্লিয়াসের ভেতরে। ফলে ট্রিটিয়ামে নিউক্লিয়াস পরিণত হয় হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। তাত্ত্বিকভাবে নিউট্রিনোর হদিস পাওয়া গেল। কিন্তু পরীক্ষাগারে কিছুতেই মিল ছিল না কণাটি। এনরিকো ফার্মি এ বিষয়ে একটা পেপার লিখলেন। ছাপা হলো জার্মানির বিখ্যাত এক জার্নালে। সেই পেপারের তত্ত্ব ধরেও মিলল না ভূতুড়ে নিউট্রিনোর দেখা।

মারে গেলম্যান

মারে গেলম্যান

১৯৫৬ সালে রেইনস ও কাওয়ান ঘোষণা দিলেন তাঁরা প্রতি-নিউট্রনোর সন্ধান পেয়েছেন। পাউলি তখন আনন্দে আত্মহারা। ২৬ বছর পর তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রমাণ মিলেছে! পরে আবিষ্কার হলো নিউট্রিনো ৩ প্রকার। ইলেকট্রন নিউট্রিনো, টাউ নিউট্রিনো ও মিউ নিউট্রিনো। এই কণাটিই এতই অদ্ভতূড়ে, খুঁজে পাওয়ার পরই নিজের সবটুকু রহস্য উš§ুক্ত করেনি।
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীদের এর পেছনে খাটতে হয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানী মনে করতেন এটা ভরহীন কণা। কিন্তু এখন নিশ্চিত খুব সামান্য হলেও এর ভর আছে। এ পর্যন্ত এই কণার রহস্য সমাধানের জন্য তিন কিস্তিতে মোট ৭ জন বিজ্ঞানীকে নোবেল দেওয়া হয়েছে।

 

৮৪ বছরের প্রতিক্ষার পর খোঁজ মেলে ভাইল ফার্মিওনের

৮৪ বছরের প্রতিক্ষার পর খোঁজ মেলে ভাইল ফার্মিওনের

কণা পদার্থবিজ্ঞানে সর্বশেষ সংযোজন হলো ভাইল ফার্মিওন। ১৯২৯ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ হারম্যান ভাইল এক ধরনের কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ভাইলের হিসাব মতে, এই কণার কোনো ভর থাকার কথা নয়। তবে এরা চার্জ বহন করতে পারবে। সাধারণত ফার্মিওন কণাগুলো ভরযুক্ত হয়। ভরহীন ভাইল তাই ব্যতিক্রমী চরিত্রের ফার্মিওন। আগেই বলেছি একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিউট্রনোকে ভরহীন মনে করত। তাই বেশ কিছু বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন পাউলির নিউট্রিনো আর ভাইলের কণা বুঝি একই। কিন্তু ১৯৯৮ সালে প্রমাণ হয় নিউট্রনো ভরহীন কণা নয়। অতি সম্প্রতি পদার্থবিদ জাপানি পদার্থবিদ তাকাআকি কাজিতা ও কানাডিয়ান বিজ্ঞানী আর্থার বি ম্যাকডোনাল্ড নিউট্রনোর ভর মাপতেও সক্ষম হয়। সুতরাং ভাইল কণাকে আর কিছুতেই নিউট্রনো বলার উপায় রইল না।
অনেক দিন ধরে হিগস বোসন খুঁজছিলেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৩ সালে সার্নের বিজ্ঞানীরা হিগস বোসন খুঁজে পান। নড়েচড়ে বসেন বিজ্ঞানীরা। হিগস বোসন আবিষ্কারকারী বিজ্ঞানীরা একটা পরামর্শ দিলেন, বিশেষ এক প্রক্রিয়া মিলতে পারে ভাইল ফার্মিওন কণা। সেই পরামর্শ মোতাবেক কাজে লেগে পড়লেন বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাহিদ হাসান।
২০১৫ সালে বিখ্যাত বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ একটি প্রবন্ধ লিখে ভাইল কণা আবিষ্কারের ঘোষণা দেন জাহিদ হাসান। সাথে সাথে অবসান ঘটে ভাইল কণার জন্য ৮৪ বছরের প্রতিক্ষার। এই আবিষ্কারই হয়তো প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জাহিদ হাসানকে পদার্থবিদ্যায় নোবেল এনে দিতে পারে।

মূল কণিকাদের স্ট্যান্ডার্ড মডেল

মূল কণিকাদের স্ট্যান্ডার্ড মডেল

এই অধ্যায়ে আমরা যতগুলো কণার কথা বলেছি সবগুলোই আসলে ফার্মিওন শ্রেণির কণা। আরেক ধরনের কণা আসে স্টোকে বলে বোসন কণা। বোসন কণাদের গল্প পরের কোনো এক অধ্যায়ে করব। এখন আসি এই কণাদের নাম ফার্মিওন হলো কেন?
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও আলাবর্ট আইনস্টাইন এক ধরনের পরিসংখ্যানের জš§ দেন। সেই পরিসংখ্যানকে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান বলে। এই পরিসংখ্যানের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষুদ্র কণাদের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা। উদ্দেশ্য সফল হলো। তবে আংশিক। অর্থাৎ সব ধরনের কণার বৈশিষ্ট্য বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এসব কণার জন্য দরকার হলো আরেক ধরনের পরিসংখ্যান।
১৯২৬ সালে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান কিছুটা পরিমার্জন করে নতুন আরেক ধরনের পরিসংখ্যানের জš§ দিলেন পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি ও পল ডিরাক। তাঁদের এই নতুন পরিসংখ্যানের নাম হলো ফার্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান। তখন থেকেই মহাবিশ্বের সব ক্ষুদ্র কণিকাগুলো দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা হলো।

যেসব কণিকার আচরণ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় তাদের ফেলা হলো বোসন শ্রেণির কণার কাতারে। আর যেসব কণার আচরণ ফার্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় সেগুলোকে ফার্মিওন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ফার্মিওন মূলত বস্তু কণা। যেমন, কোয়ার্ক, ইলেকট্রন, মিউওন। এদের দ্বারাই পদার্থ তৈরি হয়। অন্যদিকে বোসন হলো ভরহীন বলবাহী কণা। ফোটন, গ্লুওন, হিগস বোসন ইত্যাদি।
এই ছিল ফার্মিওন শ্রেণির কণাদের ফিরিস্তি। তবে এখানেই শেষ নয় এদের সংখ্যা। কারণ প্রতিটা কণার একটা করে প্রতিকণা আছে। সেই প্রতিকণার ধর্ম কৃষ্ণগহ্বর ব্যাখ্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিকণা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাটা জরুরি।

 

Share.

1 Comment

  1. Pingback: কৃষ্ণগহ্বর-১১ : প্রতি কণার জগতে - বিজ্ঞান পত্রিকা

মন্তব্য করুন