জেনোর প্যারাডক্স ও কচ্ছপের গতি

0

কচ্ছপ গতিতে যাওয়ার আগে প্যারাডক্স বিষয়টা একটু ঝালিয়ে নেয়া যাক। প্যারাডক্সের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ সম্ভবত যখন আপনি বলেন “আমি কিছুই জানি না”। কিন্তু আপনি আসলে অন্ততঃ এটা জানেন যে আপনি কিছুই জানেন না। অর্থাৎ প্যারাডক্স হলো পরস্পর বিরোধী বক্তব্য।

প্যারাডক্সের আরও একটি সুন্দর উদাহরণ পাওয়া যায় মিগুয়েল ডি সারভান্তেসের “ডন কুইক্সট” বইয়ের একটা গল্পে। সেখানে এক অদ্ভুত নগর থাকে যার নগররক্ষী একজন রগচটা কড়া মানুষ। যখনই কেউ নগরে বেড়াতে আসে তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তার নগরে আসার কারণ। সে যদি একবার মিথ্যা উত্তর দেয় তবে সাথে সাথে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়। চড়িয়ে দেয়া হয় শূলে। তো, একদিন এক ব্যক্তি বেড়াতে আসলেন ওই নগরে। যথারীতি তাকে জিজ্ঞাসা করা হল তার নগরে আসার কারণ। তখন আগন্তক উত্তর দিলেন “আমি ফাঁসিতে ঝুলতে এসেছি।” নগররক্ষী তো মহা বিপদে পড়ে গেলো। যদি সে তার কথা মিথ্যা ধরে নেয় তাহলে নগরের নিয়ম অনুযায়ী তাকে ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে। আবার ফাঁসিতে ঝুলালে তো আগন্তকের কথাই সত্যি হয়ে যাবে।

শুধু এই নগররক্ষী নয় প্যারাডক্সে হেনস্তা হয়েছিলেন বিখ্যাত গ্রিক দর্শনগুরু সক্রেটিসও । এবার তার গল্পটা একটু শোনা যাক। আর সেই সাথে কচ্ছপ গতির ব্যাপারটাও বলা হয়ে যাবে।

প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলের মতো পন্ডিতরাই শুধু নন একে একে এসেছিলেন আরো অনেক পন্ডিত। জ্ঞান অন্বেষণে নেমে তাঁরা তুলে ধরেছিলেন অসংখ্য প্রশ্ন। মাঝে মধ্যেই বিজ্ঞানের তর্ক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন পন্ডিতরা। সময়টা আনুমানিক ৪৪৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ, এথেন্সে আসেন পারমিনিডিয়াস। সঙ্গে তার শিষ্য জেনো। উদ্দেশ্য ছিল পিথাগোরীয় মতবাদের উত্থানকে নস্যাৎ করে দেয়া।

জেনোর প্যারাডক্সটি আসলে ছিলো এমন: একদিন বীর একিলিস সমূদ্রের ধারে হাঁটছিল। হ্যাঁ, সেই গ্রিক বীর একিলিস কিছুদিন আগেই যে অলিম্পিকের দৌড় প্রতিযোগিতায় (প্রাচীন অলিম্পিক) জলপাই পাতার মুকুটটি মাথায় পড়েছিল। সমুদ্রের ধারে হাঁটার সময় এক বজ্জাত কচ্ছপ তাকে নিজের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ করলো। শুধু শর্ত ছিলো যে তাকে কিছুদূর সামনে থেকে দৌড় শুরু করতে দিতে হবে। বীর একিলিস তো হেসেই খুন। ছোট্ট কচ্ছপের সাথে নাকি তাকে স্বামর্থ্যের প্রমাণ দিতে হবে! তবু সে রাজি হল।

দৌড় শুরু হবে এমন মুহুর্তে কচ্ছপ বলে উঠল ভায়া একিলিস, আমি যদি যুক্তি দিয়ে প্রমান করতে পারি তুমি আমাকে হারাতে পারবে না, তুমি কি তাহলে হার মেনে নেবে? একিলিস তো অবাক। সে বলল হ্যাঁ, তুমি যদি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারো যে আমি কখনই জিততে পারবো না তাহলে আর শুধু শুধু দৌড়ে কি লাভ? আমি হার মেনে নিব।

দুষ্ট কচ্ছপ তার যুক্তিতে পরাস্ত করল মহাবীল একিলিসকে। অগত্যা একিলিসকে হার মেনে নিতে হলো। কিন্তু কি ছিল বজ্জাত কচ্ছপের যুক্তিটা? কচ্ছপের যুক্তিটা বোঝার জন্য ছোট দুটো বিষয় সর্ম্পকে কিছুটা অবগত থাকা দরকার। প্রথমটি হল কচ্ছপ ও একিলিসের মধ্যবর্তী দুরত, অপরটি পিথাগোরীয় মতবাদ। যদি দৌড়টি সরল রেখায় চিন্তা করি তাহলে বলা যায় একিলিস যে মুহুর্তে কচ্ছপকে স্পর্শ করবে সেই মুহুর্তে তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব শূন্য হবে। অর্থাৎ কচ্ছপকে স্পর্শ করতে হলে অবশ্যই তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব ০ হতে হবে। এবার পিথাগোরীয় মতবাদটা একটু জেনে নেয়া যাক।
পিথাগোরীয় মতবাদে স্থানকে অগনিত বিন্দুর সমষ্টি আর সময়কে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষণের সমাহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মোট কথা স্থান ও সময়কে অগণিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করা যায়। ছোট একটা উদারহরণের সাহায্যে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক।

I —————————————-T

মনে করি IT একটি সরল রেখা। পিথাগোরীয় মতবাদ অনুসারে IT হল অনেকগুলি বিন্দুর সমষ্টি। কিন্তু সমস্যাটা হল অনেকগুলি আসলে কত? তার উত্তর হলো অসীম সংখ্যক (যদিও অসীম কোনো সংখ্যা নয়। অসীম শুধুমাত্র একটি সুন্দর ধারণা)।

একিলিস এবং কচ্ছপের মধ্যবর্তী দুরত্ব কখনই শূন্য হচ্ছে না।

এবার আমরা কচ্ছপের যুক্তিটা বোঝার জন্য একদম প্রস্তুত। কচ্ছপের যুক্তিটা আসলে ছিল এরকম: যেহেতু কচ্ছপ কিছুটা সামনে থেকে দৌড় শুরু করেছিল তাই কচ্ছপকে অতিক্রম করতে হলে একিলিসকে অবশ্যই ঐ এগিয়ে থাকা দুরত্বটা আগে অতিক্রম করতে হবে। ধরা যাক দৌড় শুরুর কিছুক্ষণ পর একিলিস ঐ দুরত্বটা অতিক্রম করে ফেলল। কিন্তু ঐ সময়ে কচ্ছপ তো আর বসে থাকে নি । সেও ঐ সময়ে কিছুটা পথ এগিয়ে গেছে। তাই কচ্ছপকে ধরতে হলে আবার কচ্ছপের এগিয়ে যাওয়া দুরত্বটুকু অতিক্রম করতে হবে। সেই সময়েও কিন্তু কচ্ছপ বসে থাকবে না সে আরও একটু পথ এগিয়ে যাবে। তার পর একিলিস যখন আবার কচ্ছপকে ধরতে যাবে সেই সময়ে কচ্ছপ আরো একটু পথ এগিয়ে যাবে। এভাবে চলতেই থাকবে।

একটু কল্পনা করা যাক, একিলিস আর কচ্ছপ সরল রেখায় দৌড় প্রতিযোগীতায় অংশ নিয়েছে। যেহেতু সরল রেখা অসীম সংখ্যক বিন্দুর সমষ্টি (পিথাগোরীয় মতবাদ অনুসারে) তাই সরল রেখাকে অসীম সংখ্যক ভাগে ভাগ করা যায়। ফলে একিলিস আর কচ্ছপের ঐ দৌড়ের গতিপথকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করা যাবে। এবার একটু ভেবে দেখুন তো, কচ্ছপ প্রতিবারই একিলিস অপেক্ষা কিছুটা দুরত্ব এগিয়ে থাকছে। একিলিস ঐ দুরত্ব অতিক্রম করার পর কচ্ছপও আরেকটু এগিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং গতিপথে তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব কখনই শূন্য হচ্ছে না। আর আগেই বলেছি কেউ কাউকে অতিক্রম করতে চাইলে অবশ্যই গতিপথের কোথাও তাদের মধ্যবর্তী দুরত্ব শূন্য হতে হবে। সুতরাং স্পষ্টতই একিলিস কখনই কচ্ছপকে অতিক্রম করতে পারবে না।

যেহেতু যুক্তিতে কোনো ভুল নেই(!) সুতরাং একিলিস কখনই কচ্ছপকে হারাতে পারবেনা। ব্যস! মিটে গেল। কিন্তু এখানে প্যারাডক্সের কি আছে?
এবার কল্পনা থেকে বেরিয়ে একটু বাস্তবে আসা যাক। কিছুটা পিছিয়ে থেকে দৌড় শুরু করা কোনো ব্যক্তি কি কখনই সামনে থাকা কাউকে অতিক্রম করতে পারে না? অবশ্যই পারে। হরহামেশাই তা দেখা যায়। তাই কচ্ছপ আর একিলিসের দৌড়ের সাথে বাস্তবের প্যারাডক্সটা আসলে এখানেই।
আর এটাই সেই প্যারাডক্স যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন পিথাগোরীয় মতবাদের ভিত। জেনো এই প্যারাডক্সের জন্য আজও জগদ্বিখ্যাত হয়ে আছেন। পীথাগোরীয় মতবাদের ত্রুটি প্রমাণ করতে গিয়ে জেনো আরও দুটো প্যারাডক্স সক্রেটিসের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। সে দুটো প্যারাডক্স নিয়ে অন্য কোনো দিন বলা যাবে। আজকের মতো মহাবীর একিলিস ও বজ্জাত কচ্ছপকে ছেড়ে দেয়া যাক।

তথ্যসূত্র:
উইকিপিডিয়া,
অনলাইন ব্লগ
গনিতের রঙে (চমক হাসান)

-তাসীন নুর রাহিম
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, রংপুর।

Share.

মন্তব্য করুন