ভিটামিন পিল সেবনে সাবধান!

0

লিনাস পাউলিং নিঃসন্দেহে একজন প্রজ্ঞাবান বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি দু’দুটো নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন যার মধ্যে একটি রসায়নে। তবে অতি প্রজ্ঞাবান মানুষেরও ভুল হয়ে যায়। তাঁর ভুল শুরু হয়েছিলো সকালের নাস্তার রুটিন পরিবর্তনের মাধ্যমে।

১৯৬৪ সালে তাঁর বয়স যখন ৬৫ বছর তখন তিনি প্রাত্যহিক প্রাতঃরাশে কমলার জুসে আলাদাভাবে ভিটামিন সি মেশাতে শুরু করলেন। এটি অনেকটা কোকাকোলার মধ্যে চিনি যোগ করার সাথে তুলনীয়। আর এই কাজটি করে তাঁর মনে হয়েছিলো স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এটি খুব উপকারী।

ইতিপূর্বে তাঁর সকালের নাস্তা নিয়ে উল্লেখ করার মতো কিছু ছিলো না। কেবল বলা যায় তিনি বেশ ভোরে উঠে নাস্তা করতেন তারপর ক্যালটেকে তাঁর গবেষণার কাজে চলে যেতেন। ছুটির দিনেও এই রুটিনের ব্যত্যয় হতো না। তিনি ক্লান্তিহীন কাজ করে যেতেন এবং তাঁর কাজে সফলতাও এসেছিলো। ৩০ বছর বয়সে তিনি পরমাণুসমূহের পারস্পরিক বন্ধনের তৃতীয় একটি প্রকরণ হাইড্রোজেন বন্ধন আবিষ্কার করেন। এই কাজে তিনি রসায়ন এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা প্রয়োগ করেন। দুই বছর পরে, ১৯৫৩ সালে প্রোটিনের কাঠামো নিয়ে তাঁর কাজের ফলাফল ফ্রান্সিস ক্রিক এবং জেমস ওয়াটসনকে ডিএনএ’র কাঠামো উদ্ঘাটন করতে সাহায্য করে।

এর পরের বছর পাউলিং রসায়নে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের জৈবরসায়নবিদ নিক লেন ২০০১ সালে তাঁর প্রকাশিত বই ‘অক্সিজেন’-এ উল্লেখ করেন, ‘পাউলিং ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের দৈত্য, যাঁর কাজের মাধ্যমেই আধুনিক রসায়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’

লিনাস পাউলিং সবচেয়ে প্রভাবশালী বিজ্ঞানীদের একজন, তবু এন্টিঅক্সিডেন্টের শক্তি বিষয়ক তাঁর বিশ্বাস আমাদের বিপদজনক পথে নিয়ে গিয়েছিলো।

তবে এর পরেই ভিটামিন সি’র যুগ এলো। ১৯৭০ সালে ‘How To Live Longer and Feel Better (কীভাবে দীর্ঘায়ু হওয়া যায় এবং ভালো থাকা যায়)’ নামক তাঁর বহুল বিক্রীত বইয়ে পাউলি দাবী করেন, আলাদাভাবে ভিটামিন সি সেবনের মাধ্যমে ঠান্ডা লাগা নিরাময় হয়। তিনি প্রতিদিন ১৮,০০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সেবন করতেন, যা সেবনবিধির মাত্রার চেয়ে ৫০ গুণ বেশী।

বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি ফ্লু রোগের নিরাময় হিসেবেও ভিটামিন সি এর কথা উল্লেখ করেন। যখন ১৯৮০’র দশকে এইচআইভি ছড়িয়ে গেল তখন তিনি দাবী করলেন ভিটামিন সি এইচাআইভির নিরাময় হিসেবেও কাজ করে।

১৯৯২ সালে তাঁর ভিটামিন সংক্রান্ত এ ধারণাগুলো বিশাল গুরুত্ব দিয়ে প্রসিদ্ধ টাইম ম্যাগাজিনে “ভিটামিনসমূহের প্রকৃত শক্তি” শিরোনাম দিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করা হলো। এদেরকে দেখানো হলো হৃদরোগের চিকিৎসা, চোখের ছানি এবং ক্যন্সারের প্রতিকার হিসেবে। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিলো, “ভিটামিন সেবনে আরো প্রণোদনা যোগাবে এটি ব্যার্ধক্যের নানাবিধ জটলতা হ্রাস করে”। হরেক রকম ভিটামিন আর ভিটামিনযুক্ত খাবার দাবারের বিক্রি আকাশ চুম্বী হয়ে উঠেছিলো আর সেই সাথে আকাশ চুম্বী হয়েছিলো পাউলিংএর খ্যাতি।

কিন্তু তাঁর গবেষণা সংক্রান্ত সুনাম গেলো বিপরীত পথে। বছরের পর বছর ধরে ভিটামিন সি এবং অন্যান্য বিকল্প খাবারগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তেমন ফল দিতে পারল না। প্রকৃতকপক্ষে, প্রতি চামচ ভিটামিন সি কমলার রসে যোগ করার মাধ্যমে তিনি তাঁর শরীরে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছিলেন। তাঁর ধারনাগুলো শুধু ভুলই প্রমানীত হলো না বিপদজনক হিসেবে দেখা গেলো।

পাউলি তাঁর তত্ত্বের ভিত্তি ধরে নিয়েছিলেন একটি বাস্তবতা থেকে। ভিটামিন সি এন্টিঅক্সিডেন্ট। এন্টিঅক্সিডেন্ট একগুচ্ছ অণু যার মধ্যে আরো রয়েছে ভিটামিন ই, বেটা ক্যারোটিন এবং ফলিক এসিড। এই এন্টিঅক্সিডেন্টগলো শরীরের মধ্যে উৎপন্ন নানাবিধ সক্রিয় মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে। এর ফলে শরীরের ক্ষয় ইত্যাদি রোধ করা যায় বলে ভিটামিন জাতীয় এই বস্তুগুলোকে শরীরের জন্য উপকারী মনে করা হয়।

১৯৫৪ সালে নিউইয়র্কের তৎকালীন ইউনিভার্সিটি অব রচেষ্টারের রেবেকা গ্রেশম্যান সর্বপ্রথম এই মুক্ত র‌্যাডিকেলের বিপদ সনাক্ত করেন। এই ধারনা পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কেলির ডেনহ্যাম হারম্যানের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি গবেষণায় দেখান মুক্ত র‌্যাডিকেলগুলো কোষের ধ্বংস সাধন করে, রোগ তৈরি করে এবং শেষপর্যন্ত বার্ধক্যে উপনীত করে।

বিংশ শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এই ধারনা পোষন করে গেছেন এবং এই ধরনা সর্বমহলে গৃহীত হয়ে গিয়েছিলো। মুক্ত র‌্যাডিক্যালের বার্ধক্য সৃষ্টির প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটে দেখা যাক। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় মাইটোকন্ড্রিয়ার মাধ্যমে। এটি আমাদের শরীরে ইঞ্জিনের মতোই কাজ করে যার মাধ্যমে শক্তি তৈরি হয়। মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরের পর্দায় খাদ্য এবং অক্সিজেনের সমন্বয়ে পানি, কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং শক্তি তৈরি হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় শ্বসন। এই প্রক্রিয়াতেই জটিল জীবজগতের জীবন চালিত হয়।

তবে প্রক্রিয়াটি এত সরল নয়। খাদ্য এবং অক্সিজেনের পাশাপাশি ঋনাত্মক ইলেক্ট্রনের একটি বিপুল সরবরাহের দরকার হয়। একটি পানির প্রবাহ যেমন এক শ্রেনীর অনেকগুলো পানির টারবাইনকে ঘোরায়, এই ইলেক্ট্রনের প্রবাহও চারটি প্রোটিনের সমন্বয়ে তৈরি হয় এবং এই প্রোটিনের মধ্য দিয়ে গমন করে। এই প্রোটিনগুলো মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরের পর্দায় যুক্ত থাকে এবং এদের কর্মকান্ডের ফলশ্রুতিতে আমরা শক্তি পাই।

এই বিক্রিয়া আমাদের শরীরের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত করে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি নিখুঁত নয়। ইলেক্ট্রন প্রোটিনের মধ্য দিয়ে গমনের সময় চারটির মধ্যে তিনটিতে কিছু কিছু করে লিক হয়ে বেরিয়ে যায় যারা নিকটস্থ অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে ফেলে। এর ফলেই তৈরি হয় মুক্ত র‌্যাডিক্যাল যা রাসায়নিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় থাকে।

নিষ্ক্রিয় হতে হলে মুক্ত র‌্যাডিকেলগুলোকে বিক্রিয়া করতে হয় এবং এরা নিকটস্থ কোষীয় কাঠামোর উপর নৈরাজ্য চালায়, গুরুত্বপূর্ণ কোনো অণু যেমন ডিএনএ বা প্রোটিন যা-ই পায় তার সাথে বিক্রিয়া করে নিজের চার্জ প্রশমিত করে এবং স্থিতিশীল হয়। ফলে ওই গুরুত্বপূর্ণ অণুটি হতে আর কাজ পাওয়া যায় না। যদিও খুব স্বল্প মাত্রায় তৈরি হয়, কিন্তু হারম্যান এবং অন্যান্যরা যুক্তি দিলেন এই মুক্ত র‌্যাডিকেলগুলো সময়ের সাথে সার্বিকভাবে অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলতে পারে। এগুলোর মাধ্যমে ডিএনএ’তে মিউটেশন তৈরি হয়ে বার্ধক্যজনিত রোগ যেমন ক্যান্সার ইত্যাদি হতে পারে।

সংক্ষেপে বলা যায়, অক্সিজেন আমাদের জীবনের নিঃশ্বাস হলেও এটি একই সাথে আমাদের বৃদ্ধ, জরাজীর্ণ করে তোলে এবং মৃত্যু ঘটায়। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে লোহায় যেমন মরিচা পড়ে, বিষয়টি তেমনই।

বার্ধক্য এবং রোগ সৃষ্টির সাথে সংযোগসুত্র আবিষ্কারের পর মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলোকে শত্রু হিসেবে দেখা হতে লাগল এবং যে কোনো উপায়ে এদের শরীর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য গবেষণা হতে লাগল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭২ সালে হারম্যান লিখলেন, “[মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলোকে] শরীর হতে হ্রাস করার মাধ্যমে জৈব ক্ষয়-ক্ষতি হ্রাস করা যায় এবং এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর দীর্ঘ জীবন লাভ করা যায়। আশা করা যাচ্ছে [এই তত্ত্ব] আমাদেরকে ফলদায়ক গবেষণার দিকে নিয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘায়ু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ”

সুযোগ তৈরি হওয়া বলতে তিনি এন্টিঅক্সিডেন্ট আবিষ্কৃত হওয়ার কথা বুঝিয়েছেন যা মুক্ত র‌্যাডিক্যাল হতে ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে এদের নিষ্ক্রিয় করবে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা হ্রাস করবে। তিনি যেসব ফলদায়ক গবেষণার দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন সেগুলো বছরের পর বছর ধরে চালানো হলেও উল্লেখযোগ্য পরিমান ফলদায়ক হয় নি।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০ এবং ১৯৮০’র দশকে ইঁদুরের উপর বেশ কিছু গবেষণা চালানো হয় এই বিষয়ে। কিছু ইঁদুরের খাদ্য তালিকা বদলে এন্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত খাবার সরবরাহ করা হলো, কোনো ক্ষেত্রে সরাসরি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে রক্তে এন্টিঅক্সিডেন্ট পুশ করা হলো। এমনকি জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমেও এর কার্যকারীতা পরীক্ষা করা হলো যেন পরিবর্তিত জিনে এই এন্টিঅক্সিডেন্টগুলো প্রভাব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় যা জিন অপরিবর্তিত অবস্থায় বোঝা যায় না।

পদ্ধতি বিভিন্ন হলেও সবক্ষেত্রেই ফলাফল হলো একই ধরনের। অতিরিক্ত এন্টিঅক্সিডেন্ট বার্ধক্যের ছাপ প্রশমিত করে না কিংবা রোগ প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে না।

স্প্যানিশ ন্যাশনাল সেন্টার ফর কার্ডিওভাস্কুলার রিসার্চের গবেষক এন্টোনিও এনরিকেজ বলেন, “এন্টিঅক্সিডেন্টগুলোকে কখনোই জীবন দীর্ঘায়ুকারী হিসেবে কিংবা এর উন্নতিকারী হিসেবে পাওয়া যায় নি। ইঁদুরগুলোকে পরিবর্তিত খাবারের প্রতি খুব উৎসাহীত বলে মনে হয় নি।”

আমদেরকে রোগ হতে রক্ষা করার বদলে ভিটামিনের বিকল্প খাবারগুলো ধুমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

মানুষের ক্ষেত্রে কিছু পাওয়া গেছে? ছোট স্তন্যপায়ী ইঁদুরের বিপরীতে বিজ্ঞানীরা সমাজ হতে মানুষ তুলে তুলে গবেষণাগারে নিয়ে যেতে পারেন না এবং তাদের সমগ্র জীবনের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মেপে মেপে দেখতে পারেন না। তবে এই ক্ষেত্রে করণীয় আছে। দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোকে হাসপাতাল ইত্যাদিতে প্রয়োগ করে বিপুল পরিমান উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানুষের উপর এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।

পদ্ধতিটি বেশ সহজ। প্রথমে একগুচ্ছ লোক বাছাই করতে হবে যাদের বয়স, অবস্থান এবং জীবন-যাপন পদ্ধতি একই ধরনের। দ্বিতীয়ত, এদেরকে দুটি দলে বিভক্ত করতে হবে। একদল পরীক্ষাধীন বিকল্প খাবার/পিল গ্রহণ করবে, আর অন্য দলকে প্লাসিবো হিসেবে মেকী খাবার বা পিল দেওয়া হবে যাতে কোনো সক্রিয় উপদান থাকবে না। এবং তৃতীয়ত, কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব যেন তৈরি না হয়, পরীক্ষাধীন সময় শেষ হওয়ার আগে কাউকে জানানো হবে না তাকে সত্যিকারের পিল দেওয়া হয়েছিলো নাকি চিনির বড়ি।

ডাবল-ব্লাইন্ড কন্ট্রোল নামে পরিচিত এই পরীক্ষাই ঔষুধের প্রয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্বীকৃত পদ্ধতি। ১৯৭০ এর দশক হতে এধরনের অনেক পরীক্ষা চালানো হয়েছে আমাদের শরীরের উপর এন্টিঅক্সিডেন্টর প্রভাব নির্ণয়ের জন্য। ফলাফল খুবই হতাশাব্যাঞ্জক।

উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৪ সালে ফিনল্যান্ডের পঞ্চাশোর্ধ ২৯,১৩৩ জন মানুষের উপর একটি পরীক্ষার কথা বলা যায়। এদের সবার জীবন-যাপন পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হয়; সবাই ধুমপান করতেন। তবে অল্প কিছু মানুষকে বিটাক্যারোটিন বিকল্প খাবার হিসেবে দেওয়া হয়। দেখ গেলো যাদের বিটা ক্যারোটিন দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের হার ১৬ শতাংশ বেড়ে গেছে।

একই ধরনের একটি গবেষণা চালানো হয়েছে মেনোপজ হয়ে যাওয়া নারীদের উপর। দশ বছর ধরে ফলিক এসিড সেবনের পর দেখা যায় যাঁরা সেবন করেননি তাঁদের তুলনায় এদের ২০ শতাংশ বেশী স্তন ক্যান্সার হচ্ছে।

আরো খারাপ ফলাফলও আসতে লাগল। ১৯৯৬ সালে ১০০০ বেশী তীব্র ধুমপায়ীর মধ্যে করা একটি গবেষণা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ করে দিতে হয়েছিলো। মাত্র দু’বছর বেটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন এ অতিরিক্ত হিসেবে সেবন করতে দিয়ে দেখা গেলো ফুসফুসের ক্যান্সারের হার ২৮ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং এই ক্যান্সারের রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর পরিমান ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মৃত্যুর এই পরিমান খুব সামান্য নয়। যাদেরকে প্লাসিবো দেওয়া হয়েছিলো তাদের তুলনায় যাদের সত্যিকারের বিকল্প পিল সেবন করতে দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ২০ জন বেশী মানুষ মারা গিয়েছিলেন। চারবছরের পরীক্ষা শেষে আরো ৮০ জন বেশী মৃত পাওয়া যায়। এই গবেষণার গবেষক তখন লেখেন, “বর্তমান প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায় বেটা ক্যারোটিন কিংবা একত্রিতভাবে বেটা ক্যারোটিন এবং ভিটামিন এ পিল অতিরিক্ত হিসেবে গ্রহন করা নিরুসাহিত করার মতো উল্লেখযোগ্য ভিত্তি তৈরি হয়েছে।”

অবশ্যই এই উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোই সবটুকু নয়। কিছু কিছু গবেষণায় এন্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণ করার সুফলও দেখা গেছে; বিশেষ করে যেসব অঞ্চলের মানুষ স্বাস্থ্যকর খাবার হতে বঞ্চিত।

তবে ২০১২ সালে ২৭ টি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে একটি রিভিউ গবেষণাপত্র লেখা হয় যাতে সার্বিকভাবে এন্টিঅক্সিডেন্ট সেবনকে উপকারী হিসেবে দেখা যায় না। কেবলমাত্র, সাতটি গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট প্রদানের মাধ্যমে কিছু স্বাস্থ্য সুবিধা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রয়েছে করোনারী হৃদরোগের এবং অগ্নাশয়ের ক্যান্সারের প্রবণতা হ্রাস। ১০ টি ক্ষেত্রে কোনো সুবিধাজনক ফলাফল পাওয়া যায় নি, অর্থাৎ চিনির বড়ি আর ভিটমিন বড়ি সেবকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায় নি। বাকী থাকে আর ১০ টি গবেষণা, নিশ্চিতভাবেই সেগুলোতে দেখা গেছে এন্টিঅক্সিডেন্ট সেবনের পরে ক্ষতির মাত্রা বেড়ে যায় যার মধ্যে রয়েছে ফুসফুস ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকির হার বৃদ্ধি।

লিনাস পাউলিং কখনো ধারনা করতে পারেন নি তাঁর নিজের ধারনা এত মারণাত্মক হতে পারে। ১৯৯৪ সালে তিনি নিজে প্রোস্টেট ক্যান্সারে মারা যান। তখনো ভিটামিন সেবন নিয়ে বড় বড় গবেষণাগুলোর ফল প্রকাশিত হয় নি, তাই তিনি জেনে যেতে পারেন নি এর কুফল সম্বন্ধে। তবে তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় ভিটামিন সেবনের অতিরিক্ত সেবন তাঁর জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। এটি কী তাঁর শরীরে ক্যান্সারের ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছিলো?

আমাদের পক্ষে আর জানার সুযোগ নেই। তবে যেহেতু নানা গবেষণার মাধ্যমে অতিরিক্ত এন্টিঅক্সিডেন্ট সেবনের সাথে ক্যান্সার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাই সন্দেহ থেকেই যায়। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায় যাঁরা নিয়মিত মাল্টিভিটামিন গ্রহণ করেন তাঁদের প্রোস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ২০১১ সালে প্রকাশিত ৩৫৫৩৩ জনের অংশগ্রহণে অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যারা ভিটামিন ই এবং সেলেনিয়াম গ্রহণ করেন তাঁদের প্রোস্টেট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায় ১৭ শতাংশ।

যেদিন হতে মানুষ মুক্ত র‌্যাডিক্যালের সাথে বার্ধক্যের সম্পর্ক সূচিত করেছে সেদিন হতে আজ অবধি ক্রমশঃ এন্টিঅক্সিডেন্ট এবং মুক্ত র‌্যাডিক্যালের (অক্সিডেন্টের) মধ্যে সংঘর্ষ কমে আসছে। এই সংঘর্ষ নিজেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে।

এন্টিঅক্সিডেন্ট কেবলই একটি নাম, এটি কোনো কিছুর প্রকৃতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নয়। পাউলিংএর পছন্দের এন্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন সি’র কথাই ধরা যাক। উপযুক্ত মাত্রায় ভিটামিন সি মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলোর ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে উচ্চমাত্রার চার্জ প্রশমিত করে। এটি আনবিক পর্যায়ের একজন শহীদ; নিজে আঘাত গ্রহণ করে কোষীয় প্রতিবেশীদের রক্ষা করে।

কিন্তু একটি ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে ভিটামিন সি’র অণু নিজেই একটি মুক্ত র‌্যাডিকেলে পরিণত হয় যা কোষ আবরণী, প্রোটিন এবং ডিএনএ’র ক্ষতি করতে পারে। সৌভাগ্যবশতঃ ভিটামিন সি রিডাকটেজ নামক এনজাইম ভিটামিন সি’কে র‌্যাডিক্যাল অবস্থা হতে মুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু কেমন হবে যদি মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন সি প্রবেশ করে আর এনজাইম তার কাজ করে পেরে উঠে না? জটিল জৈবরসায়নের এমন সরল বর্ণনা অবশ্য যথাযথ নয়, তাই আমারা বরং আগে উল্লিখিত গবেষণার তথ্যের দিকেই আলোকপাত করি।

এ্যান্টি অক্সিডেন্টের একটি অন্ধকার দিক রয়েছে। এবং সময়ের সাথে অনুধাবন করা যাচ্ছে মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী যদিও তাদের ভালো দিকটি সবসময় আমাদের কাজে আসে না।

আমরা এখন জানি মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলো আণবিক বার্তাবাহকের মতো কাজ করে যা কোষের এক অংশ থেকে অন্য অংশে সংকেত পাঠায়। এই ক্ষেত্রে, যখন একটি কোষ বৃদ্ধি পায়, যখন একটি কোষ দুটি কোষে পরিণত হয় কিংবা যখন কোষ মৃত্যুবরণ করে তখন এটি তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে। কোষের জীবনের প্রতিটি ধাপে মুক্ত র‌্যাডিক্যালের ভূমিকা আছে। এরা না থাকলে কোষেরা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেত এবং বিভাজিত হতো। এই ঘটনার একটি নাম আছে। এর নাম ক্যান্সার!

মুক্ত র‌্যাডিক্যাল না থাকলে আমরা বাহ্যিক ইনফেকশনের শিকার হতাম আরো বেশি। যখন ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাস আমাদের কোষের উপর চাপ সৃষ্টি করে তখন এরা বেশী হারে উৎপন্ন হয়ে আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার নিরাপত্তা প্রহরীর মতো কাজ করে। এদের সাড়ায় আমাদের রোগ প্রতিরোধ কোষ ম্যাক্রোফাজ এবং লিম্ফোসাইটগুলো বিভাজিত হয়ে বংশবৃদ্ধি ঘটাতে থাকে এবং সমস্যাটি খতিয়ে দেখে। যদি হুমকীটি ব্যাকটেরিয়া হয় তাহলে এরা তৎক্ষণাৎ এটিকে গ্রাস করে খেয়ে নেয়।

এটি অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে তখনো মরে যায় না। এই পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মুক্ত র‌্যাডিক্যালের ডাক পড়ে। প্রতিরোধ কোষের মধ্যে তাদের সেই কাজটিই করতে দেওয়া হয় যার জন্য তারা প্রসিদ্ধ: ক্ষতি সাধন করা এবং হত্যা করা। হানাদার ব্যাক্টেরিয়াটি খন্ড-বিখন্ড হয়ে যায়।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি নিয়াময় প্রক্রিয়ায় মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলো আমাদের মাঝে থেকে আমাদের জন্য কাজ করে। দু’জন জিনতত্ত্ববিদ জোয়াও পেদ্রো ম্যাগালহেস এবং জর্জ চার্চ ২০০৬ সালে লেখেন,  “আগুন ব্যাবহার না জানলে এটি যেমন আমাদের জন্য বিপদজনক, কোষের ক্ষেত্রেও তাই, যতক্ষণ না এটি মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলোকে কাজে লাগাতে শিখেছে ততক্ষণ মুক্ত র‌্যাডিক্যালগুলো বিপদজনক।”

অন্যভাবে বললে, শরীরকে মুক্ত র‌্যাডিক্যাল মুক্ত করা মোটেও ভালো কিছু নয়। তাতে বিভিন্ন রকম ইনফেকশনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ থাকবে না। সৌভাগ্যবশতঃ আপনার শরীরে এমন ব্যবস্থা করা আছে যেন জৈব রাসায়নিক বস্তুগুলো যথাযথ স্থানে বিন্যাস্ত থাকে। এন্টিঅক্সিডেন্টগুলো অতিরিক্ত হয়ে গেলে এরা সাধারণত রক্তের মাধ্যমে মুত্রথলিতে জমা হয় এবং সেখান থেকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।

আমরা যাই করি না কেন তার সম্পূর্ন কুফল আমাদের ভোগ করতে হয় না কারণ শরীর নিজেই নিজের যত্ন নেয়। এর জন্য শরীরের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। যখন এককোষী প্রাণী প্রথম শ্বাস-প্রশ্বাস শুরু করেছে অক্সিজেনের মাধ্যমে, তখন থেকেই এই বিষাক্ত গ্যাসটিকে নিয়ন্ত্রন করতে শিখেছে। একটি সাধারণ পিলের মাধ্যমে আমরা শতকোটি বছরের বিবর্তনের ধারা পাল্টে দিতে পারি না।

অন্য সব এন্টিঅক্সিডেন্টের মতোই ভিটামিন সি আমাদের স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এটি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। তবে যতক্ষণ না ডাক্তারের পরামর্শ মতো সেবন করছেন, ততক্ষণ এটি আপনার দীর্ঘায়ু কিংবা সুস্থ শরীরের প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে সামান্যই। যদি শরীরে কোনো এন্টিঅক্সিডেন্টের অভাব দেখা দেয় তখন পিলের মাধ্যমে সেই অভার পূরণ করা যেতেই পারে।  এন্টিঅক্সিডেন্ট সেবনের সবচেয়ে যথাযথ ব্যবস্থা হলো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া যার মাধ্যমে নানাবিধ বিভিন্ন ধরনের এন্টিঅক্সিডেন্ট একত্রে পাওয়া যেতে পারে এবং এরা একত্রে ভালোভাবে কাজ করতে পারে। [অ্যালেক্স রিলে’র বিবিসিতে প্রকাশিত প্রবন্ধ “Why vitamin pills din’t work, and may be bad for you” অবলম্বনে]

-ইমতিয়াজ আহমেদ
সম্পাদক, বিজ্ঞান পত্রিকা
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন