কৃষ্ণগহ্বর-৪ : নিউটনের কামান আর পৃথিবীর মুক্তিবেগ

0

ভারী বস্তুর মহাকর্ষীয় প্রভাব কতদূর পর্যন্ত কাজ করে?

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র বলে এর প্রভাব অসীম পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। কিন্তু এটাও ঠিক এই বল খুবই দুর্বল। মহাবিশ্বে, পৃথিবীতে মহাকর্ষ বল ছাড়াও আরও তিন রকম বলের হদিস বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন। বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল, সবল নিউক্লিয় বল আর দুর্বল নিউক্লিয় বল।

মহাকর্ষ বল কতটা দুর্বল তার একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। শুকনো তেলহীন মাথার চুলে একটা চিরুনি ঘষুন। আর মাটিতে ছড়িয়ে দিন কিছু কাগজের টুকরো। এবার ঘষা চিরুনিটা নিয়ে যান কাগজের টুকরোগুলোর কাছাকাছি। চিরুনি কাগজের টুকরোগুলোর কাছে পৌঁছনোর আগেই সেগুলো লাফ দিয়ে উয়ে আসবে চিরুনির গায়ে। এটা কেন হলো? চিরুনি মাথার চুলে ঘষা হয়েছিল। তাই ওতে তৈরি হয়েছে বিদ্যুৎচ্চুম্বকীয় বলের একটা ক্ষেত্র। সেই বিদ্যুৎচুম্বক ক্ষেত্রই আকর্ষণ করেছে কাগজের টুকরোগুলোকে। কাগজের টুকরোগুলোকে আকর্ষণ করছিল পৃথিবী তার সমস্ত মহাকর্ষ বল দিয়ে, সমস্ত ভর ভর ব্যবহার করে- নিউটনের সূত্র আমাদের তা-ই শেখায়। অন্যদিকে চিরুনিতে তৈরি হয়েছে খুব সামান্য বিদ্যুৎশক্তি। এইটুকুন বিদ্যুৎচ্চম্বকীয় শক্তির কাছে হার মেনেছে গোটা পৃথিবীরর মহাকর্ষ বল। সামান্য বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল পৃথিবীর বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে কাগজের টুকরোগুলোকে মহাকর্ষীয় বলকে কাঁচকলা দেখিয়ে।

চিরুনি দিয়ে কাগজের টুকরো তোলা হলো। তারমানে এই নয়, টুকুরোগুলো মহাকর্ষ বলের প্রভাবমুক্ত হলো। চিরুনি, আপনি, কাগজ-সবই তো পৃথিবীর মহাকর্ষেও ক্ষেত্রের মধ্যেই রয়েছে। পৃথিবীর আকর্ষণ বল সবার ওপরই কাজ করছে। পৃথিবীর মহাকর্ষক্ষেত্রের ভেতর দাঁড়িয়ে অনেক হম্বিতম্বি করা যায়। পৃথিবীর কথাই ধরা যাক। এর মহাকর্ষ বলের সীমা অসীম। কিন্তু বস্তুকে পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়তে হলে সেই বস্তুকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের থাকতে হবে। এই দূরত্বের বাইরের বস্তুকে পৃথিবী তাঁর নিজের বুকে টেনে নিতে পারবে না। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সেই দূরত্ব পর্যন্ত পৃথিবীর চারপাশের এলাকাকে মহাকর্ষ ক্ষেত্র বলে।

বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে তাঁর মহাকর্ষ ক্ষেত্র কত দূর পর্যন্তর বিস্তার করে থাকবে। যেমন সূর্যের এই মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সীমা পৃথিবী থেকে অনেক বেশি। আবার বুধ গ্রহের মহাকর্ষ সীমা পৃথিবীর থেকে অনেক কম।

আবার আরেকটা কথাও সত্যি। এই মহকর্ষ ক্ষেত্রের ভেতর থেকে কোনো হালকা বা গতিশীল বস্তুও বেরিয়ে যেতে পারে না। যেমন পারে না বায়ুমণ্ডলও।

বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় পদার্থগুলো পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের বাইরে যেতে পারে না। কারণ, গ্যাসের প্রতিটা পরমাণুকে পৃথিবী মহাকর্ষ বল দ্বারা নিজের দিকে টানছে। অনেকে হয়তো পালটা যুক্তি দেখাবেন। বলবেন, মহাকর্ষ বলই যদি গ্যাসীয় পদার্থের পরমাণু বা অণুগুলোকে আকর্ষণ করে রাখে তবে তাদের কেন এত ওপরে ওঠার প্রবণতা?

একটা কথা বোধহয় কারো অজনা নয়, কঠিন পদার্থের ভেতর অণু-পরামণুগুলো বেশ শক্তিশালী রাসায়নিক বন্ধনের কারণে গায়ে গায়ে লেগে থাকে।  এদের অণু-পরমাণুগুলো তাই মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে না। নিতান্ত ভঙ্গুর না হলে একটা হালকা কঠিন পদার্থের ওপর তুলানামুলক ভারী কোনো কঠিন পদার্থ রাখলেও খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু তরল পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো অনেকটা মুক্তভাবে থাকে। অনেকগুলো তরল পদার্থ একটা পাত্রে যখন রাখা হবে, তখন একটা হিসাব নিশ্চিতভাবে এসে যাবে- কে ওপরে থাকবে আর কে নিচে থাকবে। এখানেও এদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় মহাকর্ষ বল। যে তরলের ঘণত্ব বেশি তার ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব বেশি থাকবে। তাই তুলনামূলক ভারী তরলটা মাহাকর্ষ টানের ফলে পৃথিবীর কাছাকাছি থাকতে চাইবে। অন্যদিকে হালকা তরলের ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাব তুলনামূলক কম হওয়ায় সে ভারী তরলকে নিচের দিকে জায়গা ছেড়ে দেবে। আর নিজে উঠে যাবে ওপরে। এক বালতি পানির ভেতর কিছু মধু ঢেলে দেখলেই এ ব্যাপারটার সত্যতা মিলবে।

ঠিক ওপরের মতোই ঘটনা ঘটে গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থে। গ্যাসীয় পদার্থের অণু-পরমাণুগুলো বলতে গেলে প্রায় মুক্তভাবে থাকে। সুতরাং এদের ওপর মহাকর্ষ বলের প্রভাবও থাকে অনে কম। তবুও তো থাকে। আমাদের গোটা বায়ুমণ্ডলটাকে বলা যায় গ্যাসীয় পদার্থের সমুদ্র। সব গ্যাসের ঘনত্ব যেমন সমান নয়, তেমনি সব গ্যাসের পরমাণু সমান ভারী নয়। স্বাভাবিকভাবেই ভারী ও বেশি ঘনত্বের গ্যাসগুলো ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকে। হালকা গ্যাসগুলো উঠে যায় ওপরের দিকে।

এখানে আরেকটা প্রশ্ন আসতে পারে, বায়ুমণ্ডলের স্তর যেখানে শেষ, অন্যবস্তুকে নিজের বুকে টেনে আনার ক্ষমতার সীমাও কি সেখানে শেষ ?

না, সেখানে নয়। আমাদের পৃথিবীতে মোট যে গ্যাসীয় পদার্থের পরিমাণ তা দিয়ে মহাকর্ষ সীমার পুরোটাই পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই বায়ুমণ্ডলীয় সীমার বাইরেও মহাকর্ষ ক্ষেত্র রয়েছে। বায়ুর ছড়িয়ে যাওয়া বৈশিষ্ট্যের কথা ভাবলে এই প্রশ্নটা মাথায় এসে যেতে পারে। এ কথা ঠিক, গ্যাসের পরিমাণ যাই হোক, তাকে যখন যে পাত্রে রাখা হয়, তার সবটুকু আয়তন ওই গ্যাস দখল করে। কিন্তু মহাকর্ষ ক্ষেত্রকে এমন গ্যাস পাত্র হিসেবে ধরলে চলবে না, কারণ গ্যাস পুরো ক্ষেত্রে ছড়িয়ে যেতে চাইলেও মহাকর্ষ বলের টান তা হতে দেয় না।

চাইলেই কি মহাকর্ষ অগ্রাহ্য করা যায়?

অনেক পুরোনো প্রশ্ন। চাইলেই সব কিছু সম্ভব। তবে এজন্য কিছু নিয়ম মানতে হবে। নিউটনের মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সাতে বস্তুর গতি জড়িয়ে। একমাত্র গতিই পারে বস্তুকে মহাকর্ষক্ষেত্রকে উপেক্ষা করে বস্তু পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে যেতে। সেটা কীরকম গতি? এর ব্যাখ্যায় নিউটন টেনেছিলেন একটা কামানের উদাহরণ। তাঁর প্রিন্স্রিপিয়া অব ম্যাথমেটিকা বইটির ৩ নং ভলিউমের ৬ নং পৃষ্ঠায় ছিল বিস্তারতি ব্যাখ্য। সাথে একটা ছবিও ছিল। সেই ছবিটাই এখানে দেওয়া হলো।

ধরাযাক, খুব উঁচু একটা পাহাড়। সেই পাহাড়ের ওপর একটা কামান রাখা হলো। কামান থেকে একটা গোলাটা কিছুদূর গিয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। নিউটনের প্রথম সূত্র বলে, বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ নাক করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির। আর গতিশীল বস্তু সুষম বেগে চলতে থাকবে অনন্তকাল। নিউটনের এই সূত্রটা কাজ করে যেখানে বাহ্যিক বলের প্রভাব নেই, শুধু সেখানেই। কিন্তু ভূপৃষ্ঠে মহাকর্ষ বলের প্রভাব রয়েছে। তাই পাহাড় থেকে ছোড়া কামানের গোলা কামান থেকে সোজা পথে চলতে পারবে না একটানা। পৃথিবরে আকর্ষণে গোলার অভিমূখ ক্রমেই নিচের দিকে বেঁকে যাবে। এবং বাঁকানো পথে মাটিতে আঘাত করবে। এতো প্রথমবার ।

এবার কামানের শক্তি একটু বাড়িয়ে দিন। সেই শক্তি গোলার ওপর বাড়তি বল প্রয়োগ করবে। ফলে গোলাটার গতি প্রথমবারের চেয়ে বেশি হবে। তাই আগের বারের একটু বেশিদূর যেতে পারবে গোলাটি। অর্থাৎ মহাকর্ষ বলের চেয়ে প্রথমবারের তুলনায় বেশিক্ষণ লড়তে পেরেছে দ্বিতীয় গোলাটি। এভাবে আরেকটি বেশি গতি বাড়ালে গোলা আরো বেশি দূর যেতে পারবে। পর্যায়ক্রমে কামানের শক্তি যদি বাড়তেই থাকে, ফলে যদি গোলার ওপর ধ্বাক্কা বলও পর্যায়ক্রমে বাড়ে, তাহলে প্রতিবারই একটু একটু বেশি দূরত্বে গিয়ে পড়বে কামানের গোলা।

পৃথিবী গোলককার। কামানের গোলায় বাঁকানো পথে গিয়ে পড়ছে মাটিতে। ধরা যাক, কামানের শক্তি এতটাই বাড়ানো হলো কামানটি পেরিয়ে গেল হাজার কিলোমিটার। হ্যাঁ, এটা ঠিক কামানের গোলার অত শক্তি নেই। তবে এ যুগের মিসাইলগুলো কিন্তু অতদূর যেতে পারে। নিউটনের পরক্ষীটা ছিল পুরোটাই কাল্পনিক। কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে তা অসম্ভব নয়। তাই আমরাও কামানের গোলা দিয়েই পরীক্ষাটাকে আরেকটু এগিয়ে নিই।

ধরা যাক, এবার আরও বেশি ভল প্রয়োগ করে কামানের গোলাটা ছোড়া হলো। এবার সে গিয়ে পড়ল ২০৫০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর পরীধির অর্ধেক পথ সে পাড়ি দিয়ে ফেলল বাঁকানো পথে। এবার ধাক্কা বল দ্বিগুন করে ফেলি। তাহলে গোলাটা নিশ্চয়ই আর দ্বিগুন দূরে গিয়ে পড়বে। অর্থাৎ কামান থেকে ৪১ হাজার কিলোমিটিার পথ দূরে গিয়ে পড়বে। কিন্তু পৃথিবী গোল। সর্বোচ্চ পরিধি ৪০০৭৫ কিলোমিটার। সূতরাং কামানের গোলাটা এবার বাঁকানো গোলাকার পথে গোটা পৃথিবীকেই পদক্ষিণ করে ফেলবে।

কিন্তু কামান দাঁড়িয়ে আছে তার চলার পথে। গোলাটা পুরো পৃথিবী ঘুরে কামানের পেছনে এসে ধাক্কা মারবে। পৃথিবী ঘুরে আসতে লাগবে অনেক সময়। ততক্ষণে যদি আমরা কামানটাকে সরিয়ে নিই পাহাড় থেকে, তাহলে কি হবে?

সাদা চোখে দেখলে মনে হবে, কামানের সামনের দিক থেকে ছোড়া গোলা পুরো পৃথিবী ঘুরে এসে কামানের পেছন বারাবর আসতে ৪০০৭৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু গোলার ওপর যে বল প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে কামান সেই পাহাড় পেরিয়ে আরও ৯২৫ কিলোমিটার সামনে এগিয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ার কথা। কিন্তু কামানের গোলো সেখানেও পড়বে না।  নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র মেনে ঘুরতেই থাকবে বার বার। ঠিক যেভাবে চাঁদ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে, কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ঘুরছে পৃথিবীর কক্ষপথে। তেমনিভাবে কামানের গোলাটিরও একটি কক্ষপথ তৈরি হবে পৃথিবীর চারপাশে। অবিরাম সে ঘুরতেই থাকবে, যদি বাতাসের বাধা না থাকে।

বাতাসের বাঁধা নেই। কিন্তু মহাকর্ষের প্রভাব আছে। তাই কামানের গোলাটা ভূপৃষ্ঠে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটাকে ঠেকিয়ে দিচ্ছে গোলার গতিশক্তি। আসলে তখন গোলাটার গতিশক্তির কারণে একটা একটা বল তৈরি হচ্ছে। সেই বলটা চাইছে গোলাটাকে পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে একটা সোজা পথে মহাশূন্যে নিয়ে যেতে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পৃতিবীর মহাকর্ষ বল। মহকর্ষ বল গোলটাকে টেনে পৃথিবীতে নামাতে চাইছে। সেটাতে সে আগে সফলও হয়েছে, নামাতে পেরেছে কামানের গোলাকে। তখন অবশ্য গোলার গতিশক্তি কম ছিল। কিন্তু এখন আর গোলার গতিশক্তি মহাকর্ষীয় বলকে ছেড়ে কথা কইবে না। শুরু হবে দুই বলের লড়াই। এ লড়াইয়ে দুই বলের শক্তিই সমান। তাই কেউ কাউকে হারাতে পারবে না। কামানের গোলা গতিশক্তি নিয়ে সোজা চলতে চায়, পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে সেই চলায় বাধা দেয়। যেহেতু দুটোরই শক্তি সমান, তাই গোলাও মহাশূন্যে হারিয়ে যেতে পারে না। আবার মহাকর্ষ বলও গোলাকে টেনে মাটিতে নামাতে পারে না। তখন গোলাটা পৃথিবীর কক্ষপথে অবিরাম ঘুরবে।

ধীরে ধীরে কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। মহাকর্ষ বল অজেয় নয়। যত বেশি বলে কামান গোলা ছুড়ছে, গোলার গতি তত বাড়ছে, পৃথিবীর মহাকর্ষ বলকে তত বেশি পরাস্ত করে গোলা দূরে সরে যেতে পারছে। তারপর গোলা যখন একটা নির্দিষ্ট গতি লাভ করছে তখন মহাকর্ষ আর গোলার শক্তি সমান হচ্ছে।

কিন্তু এমন কি হতে পারে না, এই যুদ্ধে গোলা জিতে যাবে!

নিশ্চয়ই পারে। পাঠকদের বুঝতে বাকি নেই, সেটা পারে একমাত্র গতি বাড়িয়েই। হ্যাঁ, গোলার গতি একটা সময় এমন হতে পারে যখন পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের আর সাধ্য নেই গোলাকে আটকে রাখে। তখন গোলাটা সোজা সেই গতিতে ছিটকে চলে যাবে মহাশূন্যের গহীনে।

নূন্যতম যে বেগে চললে গোলাটা মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে, সেটাই হলো পৃথিবীর মুক্তিবেগ। গোলার বেগ যদি সেকেন্ডে ১১.২ কিলোমিটার হয়, তাহলে সেটা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় বলের বাঁধন ছিঁড়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে। কিন্তু কামানের সাধ্য নেই অত বেগে গোলা ছোড়ার। নিউটনের সময় কামানই ছিল গোলা নিক্ষেপের মোক্ষম হাতিয়ার। এরচেয়ে ভালো নিক্ষেপক আর ছিল না। কিন্তু মানুষ থেমে থাকে না, বিজ্ঞানের সাথে প্রযুক্তিকেও এগিয়ে নেয় সমান তালে। বিংশ শতাব্দীতেই রকেট এসেছে। এই রকেটের কতই না ব্যবহার। যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট্ট গোলা ছুঁড়তে কিংবা দূরদেশে মিসাইল দিয়ে আঘাত হানতে যেমন রকেট করিৎকর্মা, মহাশূন্যযানগুলো পৃথিবীর বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে রকেটের সাহায্যে। মানুষ যেদিন চাঁদে মহাকাশযান পাঠালো, সেদিনই নিউটনের সেই কামানগোলা পরীক্ষার সত্যিকারের প্রমাণ পাওয়া গেল। পৃথিবীর মুক্তবেগের চেয়ে বেশি বেগে রকেট উৎক্ষেণ করা হলো। সেই রকেট মহাকাশযানকে বয়ে নিয়ে গেল পৃথিবীর মহাকর্ষ শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে।

মুক্তিবেগের ব্যাপার-স্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বস্তুর ভরের। যে বস্তুর ভর যত বেশি তার মুক্তি বেগও ততবেশি। সূর্যের কথাই ধরা যাক, সূর্যের মুক্তিবেগ সেকেন্ডে ৬১৭ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীখে যদি সূর্যের আকর্ষণ বল কাটিয়ে মহাশূন্যে ছিটকে যেতে হয়, তাহলে এর বেগ হতে ৬১৭ কিলোমিটারের বেশি।

ব্ল্যাকহোলের ব্যাখ্যায় নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব বেশি কাজের নয়। তবু মুক্তিবেগটা দরকার হবে। তাই এটাকে ভালো করে মনে রাখুন। সময়মতো মুক্তিবেগের ক্যারিশমা জানাব।

 

আগের পর্ব :

কৃষ্ণগহ্বর-৩ : নিউটনের মহাকর্ষে

http://কৃষ্ণগহ্বর-২ : মহাকর্ষের পটভূমি

কৃষ্ণগহ্বর-১ : ফিরে দেখা ইতিহাস

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

[এই লেখাটি কৃষ্ণগহ্বর ঃ এক মহাজাগতি রহস্যের ঊপাখ্যান বইয়ের অংশবিশেষ। বইটি ২০১৮ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করবে অন্বেষা প্রকাশন]

 

Share.

মন্তব্য করুন