রূপালী পর্দার আয়রনম্যানের বাস্তব রূপায়ন

0

রূপালী পর্দার সবচেয়ে অত্যাধুনিক সুপারহিরো। শব্দের বেগের চেয়েও বেশি গতিবেগে উড়ে মুহূর্তে একটি দেশ অতিক্রম করে ফেলে সে। রোবটিক একটি স্যুট-এ শরীর মোড়া, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সে স্যুট প্রতিটি মুহূর্তে হামলা এবং পাল্টা হামলা সামলাবার জন্য প্রস্তুত থাকে। মিসাইল, বিধ্বংসী রশ্মি ইত্যাদি দ্বারা মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে কয়েকশ শত্রুকে। আলোচনা যদি সুপারম্যানের মত কোন চরিত্র নিয়ে হত তবে সমস্যা ছিলনা, কিন্তু এখানে কথা হচ্ছে আয়রনম্যান নামক এক চরিত্র নিয়ে, গল্পের ভাষ্যমতে যে কিনা ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা কাজে লাগিয়ে বানিয়ে নিয়েছে ঝা চকচকে বিধ্বংসী এক রোবটিক স্যুট। অনুসন্ধিৎসু যৌক্তিক চিন্তা ধারণকারী মনে তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, আসলেই কি পুরোটা কল্পনা?

কতটুকু কল্পনা আর কতটুকুই বা বাস্তবসম্মত? কাছাকাছি প্রযুক্তির কিছু একটা বানানোও কি সম্ভবনা? যদিও এই সুপারহিরো বুকে আস্ত একটা পারমাণবিক শক্তির উৎস লাগিয়ে রাখে শক্তি সরবরাহ এবং জীবন বাঁচানোর জন্য, তবুও অনেকটা আশা নিয়েই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসেছিলাম।

অনুসন্ধিৎসা ছিল তো বটেই, তবে সত্যিকার অর্থে আশাই ছিল বেশি! যাই হোক, আলোচনা শেষে কোথায় গড়ায় দেখা যাক।

আয়রনম্যানের স্যুট সম্পর্কিত আলোচনাকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। আয়রনম্যান চলচ্চিত্রটি মূলত নির্মাণ করা হয়েছে কমিক বইয়ের কাহিনীর সামান্য পরিবর্তন-পরিবর্ধন করে। তাই প্রথম অংশটি হচ্ছে মূল গল্পে কী এবং কতটুকু ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে, অপরদিকে দ্বিতীয় অংশটি হচ্ছে এখন পর্যন্ত আমাদের যে যৎসামান্য(!) প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে তা গল্পের বর্ণনাকে কতটুকু সমর্থন করছে। এই দু’টিবিষয়খেয়ালরেখেআলোচনাএগোবে।

বিকারহীন মৌল ও নিটিনলের গল্প

চিত্রঃ মি.স্টারকের তৈরি আয়রনম্যান স্যুটের একটি কল্পিত নীলনকশা

আয়রনম্যানের স্যুট সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই যেই দৃশ্যটি মাথায় আসে তা হল লাল-সোনালীর সমন্বয়ে চকচকে একটি দেহত্রান! যদিও কমিক বইয়ের গল্প অনুযায়ী মি.স্টারকের এরকম ৫৩টি ভিন্ন ভিন্ন স্যুট রয়েছে!

যাই হোক, এই প্রসঙ্গে গল্পে যেই ব্যাখ্যাটি দেয়া হয়েছে সেটি অনেকটা এইরকম, প্রথমত আয়রন শব্দটি ব্যাবহার করা হলেও লোহার মত ভারী কোন ধাতু এক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হয়নি! এমনকি সমগ্র স্যুটটি আলাদা আলাদা অংশ জুড়ে তৈরি করা মনে হলেও ব্যাপারটি আরও সূক্ষ্ম! বলা হচ্ছে যে এটি প্রায় ২০ লক্ষ একক দানা আকৃতির বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত। কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য এরা এমনভাবে বিন্যস্ত যেন পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল সর্বোচ্চ হয়। একেকটি দানা বা কোষ আলাদাভাবে শক্তি গ্রহন এবং ত্যাগ করতে পারে, সবগুলোর মিলিত শক্তির যোগফল হয় মোট শক্তি।

বড়রকমের আঘাতপ্রাপ্তির পরও কীভাবে একটি যন্ত্র কাজ করতে পারে এটি হল তার ব্যাখ্যা, সমগ্র স্যুটটির অংশবিশেষ অক্ষত থাকলেও স্যুটটি কাজ করবে। এছাড়া একক দানাগুলো ভিন্নভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে নিজেদের মাঝে দূরত্বও কমাতে পারে। দৃঢ় সন্নিবিষ্ট হবার কারনে এটি অত্যন্ত ঘাতসহ। তবে একেবারেপ্রথমদিকের কমিকগুলোতে উপাদান হিসেবে নিরেট ধাতুর কথাও বলা হয়েছিল, বলা হয়েছিল একধরনের লৌহ-সংকর দিয়ে স্যুটটি তৈরি।

যাইহোক, এবার একটু দেখা যাক বাস্তবে এমন কোন উপাদানের অস্তিত্ব রয়েছে কিনা। বাস্তবে নিটিনল( নিকেল ৪৫% এবং টাইটেনিয়াম ৫৫% সংকর) নামক একটি বস্তু রয়েছে। এটি যথেষ্ট শক্ত, তাপ প্রতিরোধী, হাল্কা একটি সংকর। তবে এর সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুনর্গঠিত হবার ক্ষমতা।

চিত্রঃ- নিটিনলের রুপান্তর প্রক্রিয়া

বেশ চমকপ্রদ এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে “shape memory”যা সংকর হিসেবে নিটিনলকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। প্রাথমিক আকৃতি হতে যতই বিকৃতি ঘটান হোক না কেন, “রুপান্তরতাপমাত্রায়” উত্তপ্ত করা হলে নিটিনল দিয়ে তৈরি কোন বস্তু তার প্রাথমিক রুপে সহজেই ফিরে যেতে পারে।

নিটিনলের এর চেয়েও কার্যকর প্রায়োগিক দিক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ নিটিনল দিয়ে তৈরি একটি স্প্রিঙে ১০ কেজি ওজন ঝোলানোর ফলে তা কিছুটা প্রসারিত হল। এখন রুপান্তর তাপমাত্রা প্রয়োগ করা হলে স্প্রিঙটি আবার পূর্বের দৈর্ঘ্য ফিরে পাবে, ধরি তা ১০ মিটার। এরপর স্প্রিঙে ১০০ কেজি ওজন ঝোলানোয় তা আরও প্রসারিত হল, আবারও রুপান্তর তাপমাত্রা প্রয়োগ করলে স্প্রিঙটি ঠিক ১০ মিটার দৈর্ঘ্যে ফিরে আসবে। ব্যাপারটি অনেকটা এইরকম যে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে যতই বল প্রয়োগ করা হোক না কেন, নিটিনলের বিকৃতি ঘটানো সম্ভব নয়! এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য যেন অনেকটা আয়রনম্যান স্যুট তৈরির সেই কাল্পনিক উপাদানটিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে!

গতিবিদ্যার ফাঁদ ও একটি বাস্তবসম্মত প্রচেষ্টাঃ-

আয়রনম্যানের অন্যতম স্বকীয় ক্ষমতা হচ্ছে প্রচণ্ড বেগে যে কোন দিকে উড়বার এবং বাতাসে দড়াবাজির ক্ষমতা! বাতাসে তার গতিবিধি অনেকটা পানিতে সাঁতার কাটার মতই সাবলীল, কিন্তু এই চলন পদার্থবিদ্যার মূল সূত্রগুলোকে সবসময় মেনে চলছে কি!

নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে গল্পে এমনও বলা হয়েছে যে আয়রনম্যান শব্দের বেগের সমান বেগে উড্ডয়নে সক্ষম, শুধু তাই নয়, ১১৯৫ কি.মি/ঘণ্টা বেগে উড়বার সময় ১ সেকেন্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগ সময়ে পুরোপুরি থেমে যাওয়ার একটি দৃশ্য দেখানো হয়েছে সিনেমায়! এক্ষেত্রে যে পরিমাণ ঋণাত্মক ত্বরণ প্রয়োজন তা প্রায় ৩৫০ জি! জি বলতে এখানে অভিকর্ষজ ত্বরণকে বোঝানো হয়েছে। যেহেতু সাধারন মানুষ ১ জি ত্বরণে অভ্যস্ত তাই এর চেয়ে সামান্য বেশি ত্বরণের সম্মুখীন হলেও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে!

উদাহরণস্বরূপ, নভোচারীরা ৩ জি এবং যুদ্ধবিমানের পাইলটরা ৮ জি এর মুখোমুখি হতে পারেন উড্ডয়নকালীন সময়ে। সেখানে ৩৫০ জি ত্বরণ সহ্য করতে পারা বিজ্ঞানসম্মত নয়। এরকম পরিস্থিতিতে শরীরের বেশিরভাগ রক্ত মাথায় জমা হয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারে! যুদ্ধবিমানের পাইলটরা ৮ জি অনুভব করার মুহূর্তটিকে বলেন- “G-loc”অথবা “G-Loss Of Consciousness”! দুঃখিত, কল্পনাবিলাসী পাঠকদের কল্পনার রঙ আপাতত কিছুটা মলিন হয়ে যাচ্ছে হয়ত, কিন্তু বিজ্ঞান একইসাথে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারে!

চিত্রঃ- কাঠঠোকরার প্রাকৃতিক সুরক্ষা পদ্ধতি

কাঠঠোকরা এমন একটি প্রাণী যা গাছে ঠোকরাবার সময় প্রতি সেকেন্ডে ২২ টি ঠোকর দেয় এবং প্রতিটি ঠোকরের প্রতিক্রিয়া বল হয় প্রায় ১২০০ জি! এই প্রাণীটির রয়েছে এমন কিছু প্রাকৃতিক সুরক্ষা যার বদৌলতে এরকম অস্বাভাবিক রকমের বল ক্রিয়া করবার পরও এর মাথার কোন ক্ষতি হয়না! ওপরে আয়রনম্যানের যেই উদাহরণটি দেয়া হয়েছে সে অনুযায়ী বলা যায় থেমে যাওয়ার মুহূর্তে গতি জড়তার কারনে মাথার খুলির ভেতরের মগজ ৬৬০০০০ নিউটন বলে খুলিতে আছড়ে পরতে পারে! স্যুট- এর ভেতরে শরীরটাকে যেকোনভাবে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হলেও মগজের সুরক্ষা বাইরে থেকে দেয়া সম্ভব নয়। যেই ব্যাপারটি এতক্ষণ ব্যাখ্যা করা হল তা ফুটবল, রাগবি, বক্সিং ইত্যাদি খেলায় দুজন খেলোয়াড়ের সংঘর্ষের মুহূর্তে ঘটা একটি সাধারন ঘটনা এবং এর ফলে অসংখ্য খেলয়াড়কে জ্ঞান-হারানো এবং মস্তিষ্কে রক্তপাতের মত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

বাস্তবিকভাবেই কাঠঠোকরার অসাধারন প্রাকৃতিক সুরক্ষা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা একধরনের প্রতিরোধ উপায় আবিষ্কার করেছেন। যদিও কাঠঠোকরার সুরক্ষার পিছনে এর স্পঞ্জ আকৃতির মগজের হাড়, মাথায় ফাঁপা অংশ কম থাকা, হাইওয়েড নামক একপ্রকার বিশেষ অস্থি যা সমগ্র খুলি পেঁচিয়ে জিহবা আকারে বের হয়ে আসে ইত্যাদি ব্যাপারের ভূমিকা রয়েছে। ‘কিউ-কলার” নামক এই বস্তুটি যেই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে বানানো হয়েছে তা হল, এটি জুগুলার শিরা নামক একটি শিরার ওপর চাপ প্রয়োগ করে মস্তিষ্কে রক্তের পরিমাণ বারিয়ে দেয় ফলে মগজের পক্ষে নড়াচড়ার জায়গা কমে যায়! হটাত সংঘর্ষে মগজ খুলিতে আছড়ে পরার ঝুকি কমে যায় এবং এই আবিষ্কারের ফলে ক্রীড়া-দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমে এসেছে।

চিত্রঃ- খেলোয়াড়দের পরিধেয় কিউ-কলার

তো যা বলছিলাম, অত্যন্ত প্রতিভাবান মি.স্টারকের পক্ষে হয়ত আরও উন্নত কোন পদ্ধতি আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে যা তার মগজকে খুলির ভেতরে সুরক্ষিত রাখবে!

সুপারসনিক গতি, বাস্তবতা ও অদ্ভুত শক্তির উৎস

যাই হোক, কথা হচ্ছিল শব্দের সমান কিংবা তার চেয়ে বেশি গতিতে উড়বার সক্ষমতা নিয়ে। শব্দের চেয়ে বেশি বেগে উড়তে সক্ষম এমন বিমান ইতিমধ্যে বানানো সম্ভব হয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় “সুপারসনিকবিমান”। এর মূলনীতি গড়ে উঠেছে “সংকোচনশীলপ্রবাহ”নামকএকটিতত্ত্বেরওপরভিত্তিকরেযাব্যাখ্যাকরলেএলেখারপরিধিকেছাড়িয়েযাবে।একটিসুপারসনিকবিমানউড্ডয়নেরজন্য৬০০০- পাউন্ডধাক্কারপ্রয়োজনহয়, যারকেটইঞ্জিনেযোগানদেয়াহয় তরল অক্সিজেন ও ইথাইল এলকোহল জ্বালানি হতে। এক্ষেত্রে ইঞ্জিনের আকৃতি যেমন হওয়া প্রয়োজন এবং তাপ নিঃসরণের জন্য যে কৌশল অবলম্বন করা হয়, আয়রনম্যানের ছয় ফুট স্যুট-এর ভেতর নিঃসন্দেহে তা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়!

এক্ষেত্রে গল্পে বলা হয়েছে “আর্ক-রিএকটর”নামকএকটিকাল্পনিক শক্তি উৎসের কথা যা আয়রনম্যানের বুকে লাগানো থাকে। এর পরিচয় দেয়া হয়েছে ক্ষুদ্রাকৃতির একটি পারমাণবিক শক্তি উৎস হিসেবে!

বর্তমানে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পারমানবিক চুল্লী হচ্ছে জাপানের “Kashiwazak-Kariwa”যার কর্মক্ষমতা ৭.৯৬৫ গিগাওয়াট, অপরদিকে কমিকবুকের ভাষ্যমতে আর্ক-রিএকটরের কর্মক্ষমতা ৮ গিগাওয়াট! যাই হোক, একটি পারমাণবিক চুল্লীর তাপ নিয়ন্ত্রণ ও বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য কি বিশাল পরিমাণ কাঠামো প্রয়োজন তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা! নিঃসন্দেহে তা একটি ছয় ফুট স্যুটের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব নয়! আরও বলা হয়েছে এই আর্ক-রিএকটর নিউক্লিয়ার ফিউসন বিক্রিয়া কাজে লাগায়। আমরা জানি নিউক্লিয়ার ফিউসন বিক্রিয়া সূর্যে ঘটে এবং তা নিয়ন্ত্রণের কৌশল মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি! পারমানবিক চুল্লীতে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া ঘটান হয়।

গল্পে ব্যাখ্যাটি দেয়া হয়েছে এভাবে, আর্ক-রিএকটরে প্যালাডিয়াম নামক একটি মৌল ব্যাবহার করা হয়। প্যালাডিয়াম-এর একটি আইসোটোপ প্যালাডিয়াম-১০৭ বিটা ক্ষয় নামক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিলভার- মৌলে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়ায় একটি নিউট্রন ভেঙ্গে প্রোটনে পরিণত হয় এবং তখন একটি ইলেকট্রন নিঃসরণ করে। গল্পে বলা হচ্ছে মুক্ত হওয়া ঐ ইলেকট্রনের প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা সম্ভব।

মজার ব্যাপার হচ্ছে প্যালাডিয়াম নামক একটি মৌলের অস্তিত্ব বাস্তবে রয়েছে এবং উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়াটিও বাস্তব। একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে বাস্তবে মুক্ত হওয়া ইলেকট্রনটি প্যালাডিয়াম হতে সিলভারের রুপান্তর বিক্রিয়ায় প্রোটনের ভারসাম্য রক্ষার কাজে লেগে যায়, ইলেকট্রনের প্রবাহ পাওয়া সম্ভব নয়।

আমরা আরও জানি ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, এই পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হলে স্যুট-এর ভেতর জনাব স্টারকের শরীর সেদ্ধ হয়ে যাবার কথা! এক্ষেত্রে “কোল্ডফিউশন”নামকএকপ্রকারপদ্ধতিরকথাবলাহয়েছেযাবাস্তবজগতেএখনওপ্রমানিতহয়নি, হাইপোথিসিসপর্যায়েরয়েছে।এই প্রক্রিয়ায় কোন তেজস্ক্রিয় নিঃসরণ হয়না এবং উৎপন্ন তাপকে সরাসরি বিদ্যুৎ বা অন্য কোন শক্তিতে রুপান্তর করা সম্ভব! তাই গল্পের বর্ণনামতে স্যুট-এ ঘটা ফিউশন বিক্রিয়ায় যে নিঃসরণ হবার কথা তা সরাসরি বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তরিত হয়ে যায়!

এবার সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি বলছি, MIT  এর plasma science and fusion center- এ ছোট পরিসরে একটি ফিউশন রিএকটর ইতিমধ্যে নকশা করা হয়েছে। যদিও এটি সিনেমার মত একেবারে ক্ষুদ্রাকৃতির নয়, এর ব্যাসার্ধ ৩.৩ মিটার। এই আর্ক-রিএকটরটি ৫০ মেগাওয়াট শক্তি গ্রহন করে ৫০০ মেগাওয়াট সরবরাহ করতে পারবে!

কে জানে, প্রযুক্তির ক্রমশ উন্নতির ফলে হয়ত আরও ক্ষুদ্রাকৃতির কোন শক্তির উৎস বানানো সম্ভব হবে!

চিত্রঃ একটি ফিউশন রিএকটরের নকশা

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য

আয়রনম্যান মুভিতে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে Artificial Intelligence  অর্থাৎ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা। J.A.R.V.I.S( Just A Rather Very Intelligent System!)  নামক একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা স্যুট-এর হালচাল থেকে শুরু করে মি.স্টারকের দৈনন্দিন বিভিন্ন বিষয়ও নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা কখনো তাকে মুখ দিয়ে কোন নির্দেশনা দিতে শুনিনা! ব্যাপারটি যেন অনেকটা কাল্পনিক টেলিপ্যাথির মত, মাথায় একটি ব্যাপার চিন্তা করলেই স্যুট সেই নির্দিষ্ট কাজটি সম্পাদন করতে পারে।

গল্পের এই ব্যাপারটি খুব একটা অবাস্তব ঠেকছে না কারন সফটওয়্যার এবং কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত কার্যাদি এর দিক দিয়ে মানুষ হার্ডওয়ার এর তুলনায় বহুলাংশে উন্নতি সাধন করেছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ বর্তমানে দৈনন্দিন জীবনেও প্রবেশ করছে প্রায়।

চিত্রঃ Brain- Computer Interface প্রক্রিয়া

চিত্রে Brain-Computer Interface  নামক প্রক্রিয়ার একটি অংশ দেখানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা যখন কোনকিছু চিন্তা করি আমাদের মস্তিষ্কে আয়নিক প্রবাহ নামক একধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি হয়। এই প্রবাহ যে কোন সাধারন বিদ্যুৎ প্রবাহের মতই তাড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করে, যেই তরঙ্গ কিনা রেডিও কিংবা টিভি সম্প্রচারের কাজে ব্যাবহার করা হয়। একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে, এই ক্ষেত্রে উৎপন্ন তরঙ্গ রেডিও তরঙ্গের সাথে তুলনা করলে প্রায় লক্ষগুণ দুর্বল তরঙ্গ, যা বাহির হতে কোন যন্ত্রের মাধ্যমে রেডিও তরঙ্গের মত গ্রহন করা যায়না!

তবে মাথার চামড়ায় বসানো বিশেষ একধরনের ইলেক্ট্রোডের সাহায্যে সেই দুর্বল তরঙ্গও আটকে ফেলা সম্ভব! এরপর তো একেবারেই সহজ কাজ, সেই তরঙ্গকে এমপ্লিফায়ার বা বিবর্ধকের সাহায্যে বিবর্ধিত করে বিশ্লেষণ করার মত সুবিধাজনক আকৃতি দেয়া হয়, কম্পিউটার এলগরিদম সহজেই এসব কাজ করতে পারে। এভাবে মাথায় উৎপন্ন অত্যন্ত দুর্বল তাড়িত-চৌম্বকীয় তরঙ্গ হতে বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরোপুরি না হলেও মনের কথা(আসলে মাথার!) অনেকটাই বের করে ফেলা সম্ভব!

উপরিউক্ত আলোচনার ধারাবাহিকতায় বলাই যায় যে, আয়রনম্যান মুভিতে প্রদর্শিত কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা জারভিস, স্যুট-এ বসানো সেন্সর, মিসাইল বা অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া খুব একটা কাল্পনিক নয়!

# H.U.L.C( Human Universal Load Carrier)  একটি বাস্তবিক পদক্ষেপ

এতক্ষন ধরে আমাদের আলোচনার যে ধারা তা অনেকটাই “অনেকখানিকল্পনাএকটুখানিবিজ্ঞান”- ধরনেরছিল।আয়রনম্যানেরস্যুট-এরযেইধারনাটি, তারগালভরাবৈজ্ঞানিকনামহচ্ছে“Exoskeleton System”বা বহিঃকঙ্কাল। কঙ্কাল যেমন ভেতর থেকে শরীরের কাঠামোকে ধরে রাখে তেমনি শরীরের বাইরে আরেকটি কৃত্তিম কঙ্কাল সাধারন মানুষের শক্তিমত্তাকে বাড়িয়ে দিতে পারে বহুগুন।

চিত্রঃ U.S Army এর একজন সেনা exoskeleton পরিহিত অবস্থায়

শরীরের বাহিরে পরিধানযোগ্য একটি কাঠামো যা কিনা একজন সেনার শারীরিক সামর্থ্যকে অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে, যুদ্ধক্ষেত্রে একেকটি সেনা হয়ে উঠবে একেকটি বিধ্বংসী শক্তি! এই ছিল U.S Army এর মূল উদ্দেশ্য, তারা কল্পনার সাগরে না ডুবে আপাতত এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।

এই স্যুট এর দুইটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলঃ-

(১) পরিধানকারী কোন অতিরিক্ত পরিস্রম ছাড়াই ২০০ পাউন্ড পর্যন্ত ভার ওঠাতে সক্ষম, ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে strength augmentation

(২) স্যুট পরিহিত অবস্থায় হাঁটাচলা কিংবা দৌড়াদৌড়ি করলেও পরিধানকারীর শারীরিক শক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে কম খরচ হবে। এই ব্যাপারটিকে বলা হচ্ছে endurance augmentation, স্যুট পরিহিত অবস্থায় যদি একজন সেনা ২ মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে হাঁটেন তবে স্যুট ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে যে অক্সিজেন লাগে তার ৫-১২% কম অক্সিজেন গ্রহন করতে হবে। ভার পরিবহনের সময় এর প্রভাব আরও  বেড়ে যায়, উদাহরণস্বরূপ ৮০ পাউন্ড-এর একটি বোঝা নিয়ে যদি একজন সেনা ২ মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে স্যুট পরিহিত অবস্থায় হাঁটেন, তবে স্বাভাবিকের তুলনায় তার ১৫% কম অক্সিজেন গ্রহণেই কাজ চলে যাবে!

আমাদের আলোচনা শুরু হয়েছিল কল্পিত একটি চরিত্রকে বিজ্ঞানের রঙ দিয়ে যতটুকু আঁকা যায় সেই প্রচেষ্টায়। নিঃসন্দেহে কল্পনাকে স্বাধীনভাবে ডানা মেলে উড়তে দেয়া উচিত, কোনো যুক্তির বোঝা চাপান উচিৎ নয়। তবুও বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে একটু একটু করে কল্পনার এই রঙিন চরিত্র যে বাস্তবে নেমে আসতেই পারে, বর্তমান দিনগুলো তারই নিশানা দিচ্ছে। দেখা যাক, ভবিষ্যতের দিনগুলো সে আশা কতটুকু পূর্ণ করতে পারে।

মোহাম্মাদ গালিব খান
ইলেকট্রনিকস এন্ড কমিউনিকেশন ইন্জিনিয়ারিং
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

মন্তব্য করুন