ডার্ক ম্যাটারের মৃত্যুঘণ্টা

1

১৯১৯ সালের ২৯ মে। সূর্যগ্রহণ চলছিল সেদিনটাতে। বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ আর্থার এডিংটনের নের্তৃত্বে দুটি দল মাঠে নেমেছিল সেদিন। আইনস্টাইনের নতুন মহাকর্ষ তত্ত্বের প্রমাণ দিতে। একটা দল আফ্রিকার প্রিন্সিপি দ্বীপে, আরেকটা ব্রাজিলের সেব্রালে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, মহাকর্ষ বল আসলে বস্তুর ভরের জন্য তৈরি হয় না। ভারি বস্তুর প্রভাবে বেঁকে যায় মহাজাগতিক স্থানকাল। সেই বাঁকা অঞ্চলে যখন আরেকট বস্তু এসে পড়ে তখন মনে বড় বস্তুটা আকর্ষণ করছে ছোটটটাকে। অনেকটা শূন্যে টানটান করে রাখা একটা চাদরের মতো। সেখানে একটা ভারি গোলক রেখে দিলে চাদরটা ঝুলে পড়ে। তারপর সেই চাদরের ওপর একটা মার্বেল গড়িয়ে দিলে মনে হয়, গোলটকটা চাদরকে আকর্ষণ করে টেনে নিচ্ছে।

আলো সোজা পাথে চলে। বেঁকে যাওয়া স্থানকালের ভেতর দিয়ে চলতে গিয়ে আলোর গতিপথও তাই বেঁকে যায়। এ কারণে সূর্যের পাশ দিয়ে আসা কোনো নক্ষত্রের আলো সোজাপথে পৃথিবীতে পোঁছতে পারে না। বেঁকে যায় তার গতিপথ। তাই নক্ষত্রটা আমরা ঠিক যেখানে দেখি, তার আসল অবস্থান সেখানে নয়।

এই ব্যাপারটিই পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন এডিংটন বাহিনী। এজন্য তারা সূর্যগ্রহণের দিনটাকে বেছে নেন। কারণ সুর্যের  কোলঘেঁষে আসা নক্ষত্রের আলো সূর্যগ্রহণের দিন ছাড়া পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব পাশ করল লেটার মার্ক নিয়ে। আর সেদিন থেকেই সুচনা হলো গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের। লেন্সের ভেতর দিয়ে যাবার সময় আলোর পথ বেঁকে যায়। ভারি বস্তুর প্রভাবে বেঁকে যাওয়া স্থানকালও অনেকটা লেন্সের মতো কাজ করে। লেন্সের ভেতর দিয়ে আসা আলোকে ফোকাস করে একত্রিত করা যায়। তেমনি গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের আলোও ফোকাস করে পৃথিবীতে এসে একত্রিত হতে পারে। ১ নং ছবির দিকে লক্ষ করুন।

গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং

নড়েচড়ে বসেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দেয় এই গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং তত্ত্ব। দূর আকাশের নক্ষত্রগুলো পর্যবেক্ষণের সময় হিসাবে নেওয়া হয় গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংকে। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে এক রহস্যময় বস্তুর অস্তিত্ব। ডার্ক ম্যাটার।

বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, মহাবিশ্বে মোট গ্যালাক্সির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন ভর মাপবেন গোটা মহাবিশ্বের। সেজন্য সবগুলো গ্যালাক্সির ভর মাপতে হবে। তারপর সেগুলো যোগ করলেই বেরিয়ে আসবে মহাবিশ্বের মোট ভর। গ্যালাক্সির ভর নির্ণয় করা যায় দুভাবে। গ্যালাক্সিতে যত বস্তুকণা আছে সেগুলো যোগ করে। মহাজাগতিক বস্তু থেকে আসা বর্ণালি বিশ্লেষণ তার ভেতরের বস্তকণা পরিমাণ অর্থাৎ ভর মাপা সম্ভব। আরেকটা উপায় আছে, বস্তুগুলোর মহাকর্ষ বলের প্রভাব। অর্থাৎ মহাকর্ষ বল স্থানকালের ওপর কীরকম প্রভাব বিস্তার করেছে সেটা থেকে বোঝা যায় বস্তুটির ভর কেমন হবে। মহাকর্ষীঢ প্রভাব বেশি হলে বস্তুর ভরও বেশি হয়। এই প্রভাব বের করার জন্য ভালো উপায় হচ্ছে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং।

ফ্রিৎজ যুইকি

 

ইয়ান ওর্ট

কিন্তু একটা সমস্যা বাঁধে ১৯৩০ এর দশকে। ডাচ বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্ট ও সুইস-মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ যুইকি গ্যালাক্সিগুলোর ভর মাপার চেষ্টা করনে। সেটা করতে গিয়েই দেখা দেয় বড় সমস্যা। দুইভাবে মাপা গ্যালাক্সিগুলোর ভর এক নয়। ব্যবধান আকাশ পাতাল। মহাকর্ষীয় প্রভাব থেকে বেরুনো ভর বস্তুকণা যোগ করে বেরা করা ভরের তুলনায় ১০ থেকে ১০০ গুণ বেশি। এই বাড়তি ভরের যোগান কোত্থেকে এলো। বিজ্ঞানীরা আদাজল খেয়ে নেমে পড়লেন।

১৯৫৯ সাল, জ্যোর্তির্বিদ লুইস ভোল্ডারস এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন। তাতে দেখালেন, সর্পিলাকার গ্যালাক্সি এম ৩৩ ঘুর্ণন বেগ  কেপলার-নিউটনীয় গতিবিদ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। তবে সেটা ব্যাখ্যা তখন বেরুলো না। ১৯৭০ এর দশকে মার্কিন জ্যোতির্বিদ ভেরা রুবিন বিষয়টি নিয়ে আরো পরীক্ষা নীরিক্ষা করেন। তিনি অনেকগুলো গ্যালাক্সির গতিপথ হিসাবে আনেন। দেখেন, তাদের ঘূর্ণন গতিবেগ যেমন হওয়ার কথা তেমনটি হচ্ছে না। এর ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার চেষ্টা করলেন রুবিন। হিসাব করে দেখলেন, গালাক্সির ভর যেটা বেরোয় তারচেয়ে অনেক বেশি হলে হিসাবটা মেলে। তাহলে ওই বাড়তি ভরের উৎসটা কী? ভেরা রুবিন বললেন, সেটা বিশেষ এক গুপ্ত পদার্থ (DarK Matter)। যেগুলো সাধারণ কোনো বস্তুকণা– ইলেকট্রন, কোয়ার্ক দিয়ে তৈয়ি নয়। সেগুলো তৈরি হয়েছে অচেনা-অদৃশ্য বস্তকণা দিয়ে। সেগুলো কোনো আলোকরশ্মি বিকরণ করতে পারে না।

 

ভেরা রুবিন, ডার্ক ম্যাটার গবেষণার পথিকৃৎ

 

দিন যত এগিয়েছে সেই গুপ্ত পদার্থের ভিত তত মজবুত হয়েছে। আজ আমরা জানি, গোটা মহাবিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ দৃশ্যমান বস্তু দিয়ে গড়ে উঠেছে। ৯৫ শতাংশই রয়ে গেছে অদৃশ্য। এর মধ্যে ২৭ শতাংশ গুপ্ত পদার্থ বাকি ৬৮ শতাংশ গুপ্ত শক্তি। তো এই বিশাল পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জিকে আমলে নিয়েই বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের প্রসারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা যায়। ব্যাখ্যা করা যায় আইনস্টাইনের মহাকর্ষও। তবে আইনস্টাইনের মহাকর্ষ সব জায়গায় খাটে না। আইনস্টানের সাধারণ  আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকেই বেরিয়েছিল ব্ল্যাকহোলের ভভিষ্যদ্বাণী। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরের খবর বলতে পারে না আইনস্টাইনের সেই তত্ত্ব। আবার ক্ষুদ্র কণিকাদের জগতেও অচল সাধারণ আপেক্ষিকতা। তাই বলে কোয়ান্টাম মেকানিক্সও চলে না সব জায়গায় । বৃহৎ ভরের বস্তু, সাধারণ গতিবিদ্যার জগতে অচল কোয়ন্টাম তত্ত্ব। তবে বিজ্ঞনীরা বিশ্বাস করেন, এমন একটা তত্ত্ব আছে যেটা একই সাথে কোয়ান্টাম জগৎ ও বৃহৎ জগতের গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে পারবে। আর সেই তত্ত্বটাই দরকার হবে সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যায়। স্ট্রিং থিওরিকে অনেকে তেমন একটা তত্ত্বই মনে করা হয়। আবার কোয়ন্টাম গ্রাভিটি নিয়েও আলোচনা চলছে।

এমনই একটা তত্ত্ব ‘বিকল্প মহাকর্ষীয় তত্ত্ব (Competing Model of Gravity)’। এই তত্ত্বটি গড়ে উঠেছে সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স, স্ট্রিং তত্ত্ব ও ইনফরমেশন তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। এই তত্ত্বে কিন্তু বাদ দেওয়া হয়েছে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব। তত্ত্বটির প্রবক্তা এরিক ভারলাইন্ড। নেদারল্যান্ডের আর¥স্টাডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। তত্ত্বটির প্রথম পরীক্ষা হয়েছে সম্প্রতি। সেটাতে বেশ ভালোভাবেই উৎরে গেছে তত্ত্বটি। পরক্ষাটা করেছেন নেদারল্যান্ডের লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্গাট ব্রাউয়ার ও তাঁর সহকর্মীরা।

২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩০ হাজাররেও বেশি গ্যালাক্সির দূরত্ব ও গতি-প্রকৃতি মেপেছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। বেশিরভাগই গ্রাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের সাহায্যে। সেসব ডাটা ব্যবহার করেছেন ব্রাউয়ার তাঁর গবেষণায়। গ্রালাক্সির আকৃতি ও পটভূমিক রং বিবেচনা করে একটা গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং প্রোফাইল তৈরি করেছেন ব্রাউয়ার ও তাঁর দল। দেখেছেন, বিকল্প মহাকর্ষীয় তত্ত্বের সাহয্যে এসব গ্যালাক্সির গতি-প্রকৃতি বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এবং সেটার জন্য ডার্ক ম্যাটারের দরকার হয় না। তত্বটির মূল সুবিধা হলো, পযবেক্ষণ লব্ধ ফলাফলের সাথে তাল মিলিয়ে একে ব্যাখ্যা করা যায়। স্বাধীনভাবে পরিমার্জনও সম্ভব এ তত্ত্বটির। কোনো কোনো  ধ্রবক (ফ্রি প্যারামিটার) ওপর নির্ভরশীলও নয় এটা। অথচ প্রচলিত ডার্কম্যার তত্ত্বে ব্যাবহার করা ৪টি মুক্ত ধ্রুবক। বিকল্প এই মহাকর্ষ তত্ত্ব সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। জানা যায়নি পরীক্ষালব্ধ ফলাফল কীভাবে ডার্ক ম্যাটারকে বাতিল করে সে ব্যাখ্যাও। তবে এটা বৈপ্লাবিক তত্ত্ব, তাতে সন্দেহ নেই।

কেবল মাত্র একটা পরীক্ষা উৎরেছে। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীর দৃষ্টি হয়তো এর ওপর পড়বে শীঘ্রি। আরও পরীক্ষা-নিরিক্ষা হবে। সেগুলোও যদি উৎরে যায়, তাহলে নিশ্চিত থাকুন বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে ডার্ক ম্যাটারের।  সাথে সাথে পাল্টে যাবে পদার্থবিদ্যার চিরচেনা জগৎ। কে জানে,  হয়তো এক শ বছরের বেশি সময় ধরে রাজত্ব করা সাধারণ আপেক্ষিকতারও মৃত্যু ঘটবে। [সূত্র : নিউ সায়েন্টিস্ট]

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

1 Comment

  1. ASOKE KUMAR GHOSH on

    Onek upakrito holam.Ei sab article ami english e onek porechi kintu bhalobhabe bujhe uthte pari nai.Tai ajashra dhannyabad janiye comment shesh korlam

মন্তব্য করুন