আলবার্ট আইনস্টাইন, আপেক্ষিকতা এবং বিজ্ঞানের নতুন অধ্যায়

0

আলবার্ট আইনস্টাইন, দুটি শব্দ, একটি নাম, অসংখ্য কীর্তি। মানুষের বিজ্ঞানবিষয়ক  চিন্তা-ভাবনা তথা বিজ্ঞানকেই কেমন বৈপ্লবিকরূপে পরিবর্তন করে দিলেন এই মানুষটি। একজন মানুষের অর্জন কিভাবে এতো বেশি হতে পারে তা ভাবতেও বিস্ময় লাগে। ধন্দে পড়ে যাই মাঝে মাঝে আইনস্টাইন আসলে মানুষ ছিলেন তো? নাকি অন্য কোন গ্রহের বুদ্ধিমান এক প্রাণী! নাহ তিনি মানুষই ছিলেন। তবে আপনার আমার মত সাধারণ মানুষ নয়। তিনি ছিলেন একজন মহামানব। বরং তাঁর অর্জনের সামনে মহামানব শব্দটিও তুচ্ছ লাগে। তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ তো আকাশের উজ্জ্বলতম তারকার চেয়েও উজ্জ্বলতর। তাহলে তার প্রশংসা আপনি কিভাবে করবেন? আমি দুঃখিত, অভিধানের কিছু বিশেষণে তাকে সীমাবদ্ধ করবার দুঃসাহস আমি দেখাতে পারবো না। আমি কেবল তাঁর জীবনের উপর সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করতে পারবো, বিস্তারিত বলতে গেলে যে মহাভারতসম লিখতে হবে!

শুরুর কথা 

শিশু আইনস্টাইন; ছবিসূত্রঃ .thejournal.ie

আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালের ১৪ই মার্চ জার্মানীর ওয়েটেমবার্গের উলম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা হেরমান আইনস্টাইন ছিলেন একজন পাখির পালকের দ্বারা তৈরী ব্লেড ব্যবসায়ী। মা পলিন কখ ছিলেন গৃহিণী। হেরমান দম্পতির ঘরে আইনস্টাইন ছাড়াও ছিল আরও একটি মেয়ে তথা আইনস্টাইনের বোন মাজা। হেরমান পরবর্তীতে নিজের ভাইয়ের সাথে মিলে মিউনিখ শহরে একটি ইলেকট্রনিকস নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। ফলে মিউনিখেই শৈশব কাটে আইনস্টাইনের।

আইনস্টাইন ছিলেন খুব স্বল্পভাষী। তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে জানা যায় তিনি তিন বছর বয়স হবার আগে পর্যন্ত কথাবার্তা একরকম বলতেন না বললেই চলে। মিউনিখে লুইটপোল্ড জিমনেসিয়াম নামে একটি ক্যাথলিক এলিমেন্টারি স্কুলে ভর্তি হন আইনস্টাইন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি গণিত ও পদার্থে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাঁর সবসময় সৃজনশীল কাজকর্ম ভাল লাগতো। ফলে লুইটপোল্ডের প্রুশীয় ধরণের পড়ালেখা দ্রুতই তাঁর নিকট বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তাঁর বয়স যখন ১৫ তখন তাঁর বাবার ব্যবসায়ে আর্থিক সঙ্কট দেখা দেয়। হেরমান তাই সপরিবারে মিলানে পাড়ি জমান। ১৬ বছর বয়সে আইনস্টাইন পরিবার চলে যায় সুইজারল্যান্ডে যেখানে আইনস্টাইন তাঁর মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন।

তবে আইনস্টাইনের শৈশব জীবনের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কথা না বললেই নয়। ম্যাক্স তালমুড নামক একজন পোলিশ মেডিক্যাল ছাত্রের সাথে আইনস্টাইন পরিবারের ভাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তালমুড পরবর্তীতে আইনস্টাইনের ঘরোয়া শিক্ষক হন। এই তালমুডের কাছেই আইনস্টাইন আলো সম্বন্ধীয় কিছু প্রাথমিক শিক্ষা পান যা তার মধ্যে আলোর চরিত্র নিয়ে কৌতুহল সৃষ্টি করে। এই কৌতুহল থেকেই আইনস্টাইন কিশোর জীবনে ‘দ্য ইনভেস্টিগেশন অব দ্যা স্টেট অব ইথার ইন ম্যাগনেটিক ফিল্ডস’ নামের একটি গবেষণাপত্র লেখেন!

সুইজারল্যান্ডে আইনস্টাইন এবং উচ্চশিক্ষা

১৮৯৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে আইনস্টাইন সুইস ফেডারাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। যদিও আইনস্টাইন মিউনিখ থেকে তাঁর মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারেননি, তথাপি সুইজারল্যান্ডে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। ভর্তি পরীক্ষা তথা এন্ট্রেন্স পরীক্ষায় গণিত ও পদার্থে অসাধারণ কৃতিত্ব তাঁকে ভর্তি হতে সহায়তা করে। কিন্তু পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পড়ালেখা তাঁর পছন্দ হয় না। তিনি আবার বেশ ভালো ভায়োলিন বাজাতে পারতেন। তাই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তিনি হয় গবেষণাগারে বসে গবেষণা করতেন নয়তো ভায়োলিন বাজিয়ে সময় কাটাতেন। কিন্তু সহপাঠীদের ক্লাসনোট নিয়ে পরীক্ষায় ঠিকই পাস করে যেতেন। ১৯০০ সালে তার স্নাতক পড়ালেখা শেষ হয়।

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউশনে স্নাতক শেষে আইনস্টাইনকে  তাঁর শিক্ষকরা আর পড়ালেখা চালিয়ে যাবার সুপারিশ করেননি এই কারণে যে তিনি ভাল ছাত্র ছিলেন না! ১৯০২ সালে তিনি সুইস ফেডারাল পেটেন্ট অফিসে পরীক্ষকের পদে চাকরি পান। তবে সুইস পলিটেকনিকে পড়ার সময়ই আইনস্টাইন পদার্থ বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সমস্যার ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করেন এবং এব্যাপারে ভাবতে শুরু করেন। সমস্যাটি হচ্ছে, নিউটনের গতির সূত্রের সাথে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের তড়িচ্চুম্বক তত্ত্বের সমীকরণ এর সমন্বয় করা।

প্রেম, বিয়ে এবং ব্যক্তিজীবন

স্ত্রী মেরিকের সাথে আইনস্টাইন; ছবিসূত্রঃ myweb.rollins.edu

আইনস্টাইন জুরিখের আরাউ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় মেরি নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়েন। এসময় তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সুইস নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। মেরির সাথে প্রেম সফল হয়নি আইনস্টাইনের। স্নাতক পড়ার সময়ই তিনি মিলেভা মেরিক নামক এক সার্বিয়ান মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। ১৯০২ সালে তাঁদের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ফলে একটি কন্যা সন্তান হয়। ‘লিজার্ল’ নামক শিশুটির সম্বন্ধে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না, কিন্তু জানা যায় যে তাঁকে পালক হিসেবে কোথাও দিয়ে দেয়া হয়েছিল সম্ভবতঃ।

পেটেন্ট অফিসে চাকরি পাবার পর আইনস্টাইন আর্থিকভাবে কিছুটা স্বচ্ছল হন। অন্যদিকে তাঁর বাবা মেরিকের সাথে আইনস্টাইনের সম্পর্ক মেনে নিতে পারতেন না, মেরিকের জাতিগত ভেদের কারণে। ১৯০৩ সালের দিকে আইনস্টাইনের বাবা মারা গেলে আইনস্টাইন মেরিককে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে দুই পুত্র হ্যানস এবং এদুয়ার্দের জন্ম হয়। মেরিকের জন্য দুর্ভাগ্যই ছিল বটে। কারণ ১৯১৯ সালে তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। যদিও আইনস্টাইন তার সম্ভাব্য নোবেল পুরস্কারের অর্থ থেকে মেরিককে কিছু সাহায্য দেয়ার কথা বলে মীমাংসা করেন, মেরিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু  সেবছরই আইনস্টাইন এলসা লোয়েনথাল নামক তার এক কাজিনকে বিয়ে করেন!

একনজরে তার বৈজ্ঞানিক অর্জন

  • ব্রাউনীয় গতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অণু পরমাণু এর অস্তিত্বের স্বপক্ষে শক্ত যুক্তি প্রদান করেন।
  • ফটোইলেকট্রিক ক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন।
  • আলো যে প্যাকেট বা বান্ডেল আকারে নিঃসরণ হয় তাদের নাম দেন ‘কোয়ান্টা’ এবং প্রমাণ করেন যে যথেষ্ট শক্তি সম্পন্ন ফোটন ধাতব বস্তু থেকে ইলেকট্রন নির্গত করে।
  • প্রমাণ করেন যে আলোর গতি পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভর করে না। এর থেকে যুগান্তকারী এক তথ্য বেরিয়ে আসে যে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলমান বস্তুর জন্য সময় ধীরে প্রবাহিত হয়।
  • আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং জনপ্রিয় সমীকরণ E=mc2 আবিষ্কার করেন এবং এতে প্রমাণ হয় যে বস্তু এবং শক্তির পারষ্পারিক রূপান্তর সম্ভব।
  • আপেক্ষিকতার বিশেষ এবং সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করেন যা নিউটনিয়ান মহাকর্ষীয় তত্ত্বের পরিবর্তন সাধন করে।
  • তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেন যে স্থান, কাল এবং সময় স্থির নয় বরং আপেক্ষিক যা নিউটন ধ্রুব মনে করতেন।
  • তিনি প্রমাণ করেন যে মহাকর্ষ শক্তিশালী হলে সময় ধীরে চলে, আলো মহাকর্ষ দ্বারা বেঁকে যায়।
  • যদিও তিনি সফল হননি, আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের সাথে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সমন্বয় করার চেষ্টা করেন তিনি।

আইনস্টাইনের সাফল্যের সূচনা  

পেটেন্ট অফিসে কর্মরত থাকাকালীনই আইনস্টাইন তার জীবনের অধিকাংশ বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলো করেন। ১৯০৫ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে তার গবেষণাপত্র ‘অ্যা নিউ ডিটারমিনেশন অব মলিকুলার ডাইমেনশনস’ এর জন্য পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে। এবছরই আইনস্টাইন চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। সেগুলো হচ্ছে-

  • ব্রাউনীয় গতি সম্বন্ধীয় গবেষণা
  • ভর-শক্তি সম্পর্ক
  • আলোক তড়িৎ ক্রিয়া বা ফটোইলেকট্রিক ক্রিয়া
  • আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব

১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। এতো অল্প বয়সে একই বছরে চারটি এমন গবেষণা প্রকাশ করা সাধারণ ব্যাপার নয় যার প্রতিটিই ছিল যুগান্তকারী। তার এই গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয় পৃথীবির ইতিহাসে অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞান সাময়িকী ‘অ্যানালিয়ান ডার ফিজিক’ এ।

এর মধ্যে ৪র্থ গবেষণাটিই ছিল সবচেয় বিস্ময়কর এবং বৈপ্লবিক। তিনি E=mc^2 সূত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে ভরকে শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। এখানে, E= নির্গত শক্তির পরিমাণ, m= বস্তুর ভর এবং c= আলোর গতি। এই সূত্র থেকে জানা যায় যে খুব সামান্য পরিমাণ বস্তু থেকেও বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়া সম্ভব।

আলোকতড়িৎ ক্রিয়া

আলোকতড়িৎ ক্রিয়া; ছবিসূত্রঃ hyperphysics.phy-astr.gsu.edu

যদি কোন ধাতব বস্তুর উপর আলো পড়ে তাহলে সেই ধাতব বস্তু থেকে ইলেকট্রন নির্গত হতে পারে। আইনস্টাইন বলেন যে, আলোর প্যাকেট বা কোয়ান্টা যখন ধাতব বস্তুতে পতিত হয় তখন এর দ্বারা পরিবাহিত শক্তি ধাতব বস্তুর ইলেকট্রনে চলে যায় এবং ইলেকট্রন এর কক্ষপথ থেকে মুক্ত হবার মত যথেষ্ট শক্তি লাভ করা মাত্রই নির্গত হয়। আইনস্টাইন আরও দেখান যে আলোর কণা এবং তরঙ্গ, উভয় চরিত্রই আছে।

আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব

আইনস্টাইনের এই তত্ত্ব প্রকাশের পর সমকালীন অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেনি। এই তত্ত্বে আইনস্টাইন দেখান যে আলোর গতি কখনো, কোনো অবস্থাতেই পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভর করে না। ধরুন আপনি একটি আলোর উৎসের দিকে দৌড়াচ্ছেন, এতে ভাববেন না যে আলো উৎস থেকে কম সময়ে আপনার নিকটে পৌঁছাবে। আপনি আলোর উৎসের দিকে যদি হেটে যান আবার কোন দ্রুতগামী জঙ্গিবিমানে চড়েও যান, আলো আপনার নিকট একই সময়ে পৌঁছাবে। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে যদি আপনি উৎসের বিপরীত দিকেও রওনা দেন, তবুও আলো সেই একই সময়ে আপনাকে ধরবে! হ্যাঁ, যেদিকেই যান, যত দ্রুতই ভ্রমণ করেন, আলোর গতি আপনি সবসময় একই দেখবেন।

এই বিষয়টি থেকে আরও বিস্ময়কর এক তথ্য উদঘাটিত হয়। আইনস্টাইন এর আগে পর্যন্ত যা মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি, তাই প্রমাণ করে এই তত্ত্ব। স্থান,কাল এবং ভর ধ্রুব নয়, বরং গতির সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়! হ্যাঁ, যদি কোন বস্তু আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলে তাহলে ঐ বস্তুর জন্য ঘড়ির কাঁটা চলবে ধীর গতিতে, বস্তুর ভর সম্প্রসারণ ঘটবে এবং একই সাথে দৈর্ঘ্য হবে সংকুচিত!

আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব     

মহাকর্ষের দ্বার স্থান সংকোচনের ফলে আলোর পথ বেঁকে যাচ্ছে; ছবিসূত্রঃ www.varunshrivastava.in

১৯১৫ সালে আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই তত্ত্বে তিনি মহাকর্ষ কিভাবে স্থান ও সময়কে বিকৃত করে তা আলোচনা করেন। শক্তিশালী মহাকর্ষের প্রভাবে এমনকি আলোও বেঁকে যায়! এটাও সম্ভব? আলোর তো ভর নেই তাহলে মহাকর্ষ কি করে আলো বাঁকায়? আসলে আলোর গতিপথ মহাকর্ষ বাঁকায় না। মহাকর্ষ স্থানকে বাঁকায় যার মধ্য দিয়ে আলো চলাচল করে। ফলে আলোও বক্রপথে চলাচল করতে বাধ্য হয়! তাঁর এই আশ্চর্য আবিষ্কারের সত্যতা নির্ণয় করতে একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ১৯১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার এক দ্বীপে গিয়েছিলেন সূর্যাস্ত দেখবেন বলে। সূর্যাস্তের সময় তাঁরা দূরবর্তী তারকাসমূহ হতে আগত আলোক রশ্মির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে আলো আসলেই বক্রপথে ভ্রমণ করছে! অর্থাৎ মহাকর্ষ স্থানকে বিকৃত করে!

নোবেল পুরস্কার  

নোবেল গ্রহণকালে আইনস্টাইন এবং হেনরি বার্গসন; ছবিসূত্রঃ google.com

১৯২১ সালে আইনস্টাইন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর অবদান এবং আলোকতড়িৎ ক্রিয়া ব্যাখ্যার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।  মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে আপেক্ষিকতার বিশেষ ও সাধারণ তত্ত্বকেই ধরা হয়ে থাকে, কিন্তু তিনি নোবেল পান আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার জন্য।

তবে মন খারাপ করার কিছু নেই; ‘রয়্যাল সোসাইটি অব লন্ডন’ তাঁকে আপেক্ষিকতার তত্ত্বের জন্যই ১৯২৫ সালে সম্মানজনক ‘কুপলি মেডেল’ প্রদান করে। এই তত্ত্বের জন্য ১৯৩৫ সালে তিনি আরও একটি পুরস্কার লাভ করেন। ফ্রাঙ্কলিন ইনস্টিটিউটের ফ্রাঙ্কলিন পদক। ততদিনে আইনস্টাইন বিশ্বজুড়ে একজন যশস্বী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। বিশ্বের সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাঁকে ডক্টরেট প্রদানের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে আর মিডিয়া গুলো তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রচারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রে আইনস্টাইন

১৯৩৩ সালে আইনস্টাইন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটনে ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভানসড স্টাডি’ তে যোগদান করেন। এখানেই তিনি তাঁর জীবনের বাকীটা সময় কাটিয়ে দেন। এসময় তিনি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে সমন্বিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান।

১৯৩৯ সালে আইনস্টাইন তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এর কাছে একটি চিঠি লিখে তাকে সতর্ক করে দেন যে জার্মান নাৎসি বাহিনী বিধ্বংসী বোমা তৈরী করে থাকতে পারে। এমনকি আক্রমণও করতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নিজেদের পারমানবিক বোমা তৈরীর পরামর্শও দেন। ঘটনাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রও পারমাণবিক বোমা তৈরীর জন্য ‘প্রোজেক্ট ম্যানহাটন’ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ততদিনে।

প্রিন্সটনে ক্যারিয়ার শুরুর পর আইনস্টাইন আর কখনো নিজ দেশে ফিরে যাননি। ১৯৩৫ সালে তিনি আমেরিকায় চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি প্রাপ্ত হন এবং এর কয়েকবছর পরই তিনি আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইনস্টাইন যুদ্ধে বোমার ব্যবহার বন্ধ করতে সচেতনতা সৃষ্টির কাজে যোগ দেন। তিনি এবং অপর একজন বিজ্ঞানী সিলার্ড মিলে ‘ইমার্জেন্সী কমিটি অব অ্যাটমিক সাইনটিস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি এবং আফ্রিকান আমেরিকানদের সাথে বর্ণবাদী আচরণ দেখে ব্যথিত হন এবং তাদের সমানাধিকার দেয়ার জন্য কাজ করেন।

শেষ জীবন

তিনি তাঁর সব যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলো অপেক্ষাকৃত নবীন বয়সে করেন। পরবর্তীতে তিনি বিজ্ঞানের সাথে সংযুক্ত থাকেন ঠিকই তবে রাজনীতিতে বেশি আকৃষ্ট হন। ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে তাঁর ‘অ্যাবডোমিনাল অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম’ নামক রোগ হয়। ডাক্তাররা তাঁকে অস্ত্রোপচার করাতে বললেও তিনি করাতে রাজি হননি। দীগ্বীজয়ী বীরের মতই তিনি মৃত্যুকে ভয় না করে বলেছিলেন- “কৃত্তিমভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে কোন আনন্দ নেই। আমি আমার অংশ সম্পন্ন করেছি, এবার যাবার পালা!”

এই অমর উক্তি করার পরেরদিনই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন প্রিন্সটনের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে মৃত্যুবরণ করেন। দিনটি ছিল ১৮ এপ্রিল ১৯৫৫, আইনস্টাইনের তখন ৭৬ বছর বয়স। অটপসির সময় থমাস স্টোলজ তাঁর পরিবারের অনুমতি ছাড়াই তাঁর মস্তিস্ক অপসারণ করেন। বহুবছর গবেষণার পর তাঁর মস্তিষ্ক প্রিন্সটনের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁর দেহভষ্ম লোকচক্ষুর আড়ালে অজানা জায়গায় ছড়িয়ে দেয়া হয়!

শেষ করবো জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর বিরক্তি প্রকাশক এক বিখ্যাত উক্তি দিয়ে-

“ যদি আপেক্ষিকতা সঠিক প্রমাণিত হয় তাহলে জার্মানরা আমাকে বলবে জার্মান নাগরিক, সুইসরা আমাকে বলবে সুইস নাগরিক, ফরাসিরা আমাকে বলবে একজন মহান বিজ্ঞানী। কিন্তু যদি আপেক্ষিকতা ভুল প্রমাণিত হয় তাহলে ফরাসিরা আমাকে বলবে সুইস, সুইসরা আমাকে বলবে জার্মান, জার্মানরা আমাকে বলবে ইহুদি!”

প্রিন্সটনের ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টারে সংরক্ষিত আইনস্টাইনের মস্তিস্ক;ছবিসূত্রঃen.wikipedia.org

তথ্যসূত্রঃ
১)  en.wikipedia.org/wiki/Albert_Einstein
২)  biography.com/people/albert-einstein-9285408৪
৩) history.com/topics/albert-einstein
৪) famousscientists.org/albert-einstein/
৫) nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/1921/einstein-bio.html

-মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share.

মন্তব্য করুন