এক বৈজ্ঞানিক ভালোবাসার উপখ্যান

0

প্রথম নারী নোবেলজয়ী মেরি কুরি। একাধিকবার প্রেমে পড়েছেন তিনি। প্রথম প্রেম কৈশরে। টানাটানি সংসারে ছিল মেরির পরিবারের। বাবা সংসার চালানোর জন্য বাড়িতেই একটা স্কুল খুলে বসেছিলেন। ছেলেমেয়েরা পড়তে আসত। তাঁদের বাড়িতেই মেস বানিয়ে থাকত কোনো কোনো ছেলেমেয়ে। ভিটোল্ড রেমেকি নামে এক সুদর্শন ছাত্র এক সুদর্শন ছাত্র তাদের বাড়িতে বোর্ডার হলো। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে গেলেন মেরি। মন তোলপাড় করা প্রেম যাকে বলে। ভিটোল্ডকে ঘিরেই তাঁর ভাবনা-ভালোবাসা জগৎ। তাঁকে দেখলেই বুক ধক ধক করে, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে যায়।

হাত-পায়ের তালু ঘামে। কিশোর বয়সের প্রেম তো এমনই হয়। ভালোবাসার মানুষটি মিষ্টি করে কথা বললে ভালো লাগে, তাঁর হাসি ভালো লাগে, তাঁর নাম শুনলেও ভালো লাগে। তবু মুখফুটে মানুষটিকে বলা যায় না সেসব কথা। ভেতরে ভেতরে মান-অভিমান চলে। মেরি কুরির প্রেমটাও ছিল এমন। ছট ফট করেন। কাছের মানুষকে জানাতে ইচ্ছে করে। পিঠোপিঠি বোন হেলা। বছর খানেকের বড়। কিশোরি কুরি থাকতে না পেরে বোনকে বলতে গেল সেকথা। কিন্তু হায়, হেলাও ততোদিনে ভিটোল্ডের প্রেমে হাবুডুবু খুাচ্ছে। শুরু দু বোনের হলো প্রতিযোগিতা– ভিটোল্ডের মন জয় করার।

বাবফ, দুই বোন বর্নীসালা (মাঝখানে) ও হেলা (ডানে)র সাথে মেরি কুরি (বামে)

আগেরকার মানুষ মনে করত মানুষের আবেগ-অনুভূতির বাস বুকের ভেতরে- হৃৎপিণ্ডের। আবেগের সাথে হৃৎকম্পনের ওঠানামার সম্পর্ক আছে বলেই ভুল ধারাণটা শেকড় গেঁড়ে বসেছিল। এখন আর ধারণায় চলে না। চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ বেদনা, ভালোবাসার বাস মগজে।

মনে ভালোবাসার যে অনুভূতি সেটার জন্য দায়ী ডোপামিন নামে এক ধরনের হরমন। এই হরমন মস্তিষ্ক থেকে যখন রক্তে নিঃসৃত হয়, রক্তের ঘনত্ব বেড় যায়। তার প্রভাব পড়ে রক্তচাপে। হার্টবিট যায় বেড়ে। তবে ভালোবাসার রসায়নে ডোপেমিনের সাথে আছে জড়িয়ে আছে অক্সিটাইসিন, ভেসোপ্রেসিন নামে আরো কিছু হরমন।

হরমন যতই সক্রিয় হোক, বাস্তবতরা কাছে তাকে হার মানতে হয়ে প্রায়ই। ভিটোল্ড মেরি বা হেলা কাউকে ভালোবেসেছিলেন কিনা যায় না। তবে শিঘ্রি মেরিদের বাড়ি থেকে চলে যায় ভিটোল্ড। মেরি আ হেলার কিশোর প্রেমের অপমৃত্যু ঘটে।

অভাবে সংসারে লেখাপড়ার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল মেরিদের সংসারে। তাই বাধ্য হয়ে বাবার এক ধন্যাট্য বন্ধুর পরিবারে গর্ভনেসের কাজ নেন মেরি। সেই পরিবারেরই বড় ছেলে কাজিমি জোরাভোস্কির। সুদর্শন, শিক্ষিত, গণিতানুরাগী। প্রথম দর্শনেই তাঁর প্রেমে পড়ে যান মেরি। কাজিমিরও সামান আগ্রহী। ভালোবাসা শুর। গোপনে-গোপনে চলে তাঁদের অভিসার। একবছর বেশ সুখেই কাটে তাদের প্রেমপর্ব। মেরি তখন আঠারো বছরের তরুণি। কাজিমির কয়েক বছর বেশি। বাবা-মাকে জানান কাজিমি- মেরিকে বিয়ে করতে চান। গরীব মেরিকে ছেলের বউ হিসেবে মানতে পারেননি। কাজিমিও বাবা-মার মুখের ওপর কথা বলতে পারেননি। সুতরাং মেরির দ্বিতীয় প্রেমের করুণ সমাপ্তি।

মানব মস্তিষ্কে অ্যামাগডালা নামে একটা অঞ্চল আছে। বাদামকৃতির। আর মস্তিষ্কের ওপরের স্তরে আছে কর্টেক্স। আম্যাগডালা আর কর্টেক্স অঞ্চলের বিশেষ কিছু গুন আছে। ভয়-ভীতির জন্ম ওই অঞ্চলে। মানুষ বিপদের আগাম গন্ধ পায়, খারাপ পরিস্থিতে সতর্ক হতে পারে, এড়াতে পারে আকস্মিক দুর্ঘটনা। তাই ওই অঞ্চলের কারণে। তুর্কি তরুণ প্রেমে পড়লে কর্টেক্স আর অ্যামাগডালা কাজ বন্ধ করে দেয়ে অনেকটাই। আসলে ভালোবাসা সৃষ্টিকারী হরমনগুলো বাধ্য করে ওই অঞ্চলকে নিষ্ক্রিয় থাকতে। তখন ভালোবাসায় উত্তাল মানুষটি দুর্বার হয়ে ওঠে। ভয়-ভীতি এমনকী মৃত্যুকেও সে পরোয়া করে না। অভিভাবকদের সাথে বিদ্রোহ করে। দরকার হলে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।

মেরি কুরি বা কামিজিমির ক্ষেত্রে ভালোবাসার হরমনগুলো অ্যামাগডালাআর কর্টেক্স অঞ্চলে অতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তাই ভালোবাসার কাছে পরাস্ত না হয়ে দুজনই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছিলেন।

পরে অবশ্য মেরি চলে যান ফ্রান্সে। বিখ্যাত সরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি সমাপ্ত করেন। এরপর গবেষণার ইচ্ছে তাঁর। কোথায় করবেন। টাকা-পয়সারও প্রচ- অভাব। তখন তাঁর শিক্ষক জোসেফ কাওয়ালাস্কি তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তরুণ গবেষক পিয়েরে কুরির সাথে। কুরির বাবা ইউজিন কুরি নিজের বাড়িতেই একটা গবেষণাগার গড়ে তুলেছিনে। সেখানেই ভাই জাকা কুরি আর বাবাকে নিয়ে রাতদিন গবেষণা করতেন।

মেরিকে দেখেই প্রেমে পড়ে গেলেন পিয়েরে। প্রথম দেখায় পিয়েরেকেও ভালো লেগেছিল মেরির। কিন্তু কাজিমির সাথে ভারোবাসার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। তাই প্রথমদিকে এ বিষয়টাকে এড়িয়েই চলেতেন।

যাইহোক, কুরিদের গবেষণাগারে গবেষণার সুযোগ পান মেরি। দুজন মিলে চুম্বক নিয়ে গবেষণায় মেতে ওঠেন। সেই সাথে তীব্র ভালোলাগার অনুভূতি- জন্ম নেয় এক বৈজ্ঞানিক প্রেমের উপখ্যান। পিয়েরেই বেশি আগ্রহী ছিলেন। অন্যদিকে মেরি বাস্তববাদী। শেষমেষ প্রস্তাবই দিয়ে বসেন পিয়েরে। মেরি সরাসরি না বলেননি, তবে বেশকিছু অজুহাত তুলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলে। আসেলে কুরি তাঁর নিজ দেশ পোল্যান্ডে ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। সেখানাকার স্কুলে শিক্ষকতা করতে চান। জবাবে পিয়েরে জানিয়েছিলেন তিনিও গবেষণা-টনা ছেড়ে পোল্যান্ডে যেতে রাজি। সেখানে গিয়ে তিনিও না হয় শিক্ষকতা করবেন।

এরপর আর ‘না’ বলতে পারেননি মেরি। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয়। ১৮৯৫ সালের ২৬ জুলাই। সংসার, গবেষণা আর ভালোবাসা যেন হাত ধরাধরি করে চলছিল। পিয়েরে ও মেরি দুজনেই পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। করেছেন তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে গবেষণা। স্বামী-স্ত্রীর সেই যৌথ গবেষণার সূত্র ধরেই আবিষ্কার হয়ে রেডিয়াম নামের তেজস্ক্রিয় ধাতুটি। এজন্য ১৯০৩ সালে নোবেল কমিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে জন্য সুপারিস করা হয় দুটি নাম। হেনরি বেকরলে ও পিয়েরে কুরি। মেরির নাম ছিল না। পিয়েরে আপত্তি তোলেন। জানান রেডিয়াম আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাঁর একা নয়। মেরি তাঁর সাথে না থাকলে মিলত না রেডিয়ামারে দেখা। নোবেল কমিটি বাধ্য হয় মেরির নাম যুক্ত করতে। ১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারে যৌথভাবে তিন বিজ্ঞানী নোবেল পান পদার্থবিজ্ঞানে।

বেশ সুখেই কাটছিল মেরি আর পিয়েরে বৈজ্ঞানিক ভালোবাসাময় জীবন। তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুই কন্যা আইরিন কুরি ও ইভ কুরি। দুজন যোগ দিলেন সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে। হঠাৎ তাঁদের সুখের জীবনে নেমে এলো বিষাদের ছায়ায়। গাড়ি-দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হলো পিয়েরের। ১১ বছরের ভালোবাসার সমাপ্তি সেখানেই!

না বোধহয়। মেরি পিয়েরের ভালোবাসা ধারণ করেই এগিয়ে নিলেন অসামাপ্ত কাজ। ১৯১১ সালে প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে পেলেন দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার। এবার রসায়নে। তারপর পিয়েরে প্রতি ভালোবাসাটা উজাড় করে দিলেন মানবসেবায়। তেজস্ক্রিয়াতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে চেষ্টা করলেন। সফলও হলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লাখো মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগল তাঁর প্রযুক্তি। কিন্তু দিন-রাত তেজস্ক্রিয় মৌল নাড়াচড়ার ফল ভালো হলো না। নিজের দেহে ডেকে আনলেন ঘাতকব্যাধি ক্যান্সার। পিয়েরে কুরির সাহচার্যে যে তেজস্ক্রিয় ভালোবসার জন্ম হয়েছিল, ১৯৩৪ সালে তার সমাপ্তি ঘটল মেরি কুরির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। [তথ্যসূত্র : মেরিকুরি ডট অর্গ ডট ইউকে]

-আব্দুল গাফফার রনি
বিজ্ঞান লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন