প্রতিসাম্যতার সৌন্দর্য

0

প্রতিসাম্যতা শব্দটি দুই ক্ষেত্রে দুইভাবে ব্যবহৃত হয়। বাস্তব জীবনে কোনো কিছুর সুন্দরতম আনুপাতিক হারকে বুঝাতে প্রতিসাম্যতা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। গণিতে বিশেষ করে জ্যামিতিতে প্রতিসাম্যতা শব্দটির পরিধি ব্যাপক। কোনো একটা বস্তুকে যদি মাঝখান দিয়ে কেটে দুই ভাগ করে ফেলা হয় এবং দুই ভাগের প্রতিটাই একটা আরেকটার দর্পন প্রতিবিম্বের মতো হয় তাহলে ঐ বস্তুটি প্রতিসম।[1] উদাহরণ হিসেবে নিচের চিত্রটিকে বিবেচনা করা যাক।

ইংরেজি ‘এ’, একটি স্মাইলি ও একটি আইসোস্কেলেস ট্রাপিজিয়াম (isosceles trapezium)। এদেরকে যদি মাঝখান থেকে কেটে ফেলা হয় তাহলে দুইটি করে আলাদা আলাদা অংশ তৈরি হবে। এদের যেকোনো একটিকে যদি দর্পণ বা আয়নার সামনে ধরা হয় তাহলে এরা দেখতে এদের মূল আকৃতির মতোই হবে। এই বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে এদেরকে ‘প্রতিসম’ বস্তু বলা যায়। এমন বৈশিষ্ট্য অন্য যেকোনো উপাদানে থাকলে তাদেরকেও প্রতিসম বলা যাবে। এ ধরনের প্রতিসাম্যতাকে বলা যেতে পারে আলোকীয় প্রতিসাম্যতা। এটা যেহেতু আয়নার সাথে সাথে জড়িত এবং আয়নার কার্যপ্রণালী মূলত আলোকেরই তাই একে আলোকীয় প্রতিসাম্যতা হিসেবে নির্দিষ্ট করলাম। এই ধরনের প্রতিসাম্যতা ছাড়াও আরো প্রতিসাম্যতা আছে, যেগুলো নিচে আলোচনা করবো।

যত ধরনের সৌন্দর্যমণ্ডিত আকৃতি বা প্যাটার্ন আছে তার পেছনে আছে এই প্রতিসাম্যতা। স্বাভাবিকভাবে এই জিনিসটা সুন্দর বলে চিত্রকলা, স্থাপত্যকলা, মৃৎ শিল্প, পোশাক-আশাক, ফার্নিচার, ও অন্যান্য দ্রব্যাদিতে এই প্রতিসাম্যতাকে ব্যবহার করা হয়। গণিতেও এই প্রতিসাম্যতার ব্যবহার হয়েছে জ্যামিতি, গ্রুপ তত্ত্ব ও রৈখিক বীজগণিতে। জীববিজ্ঞানেও প্রতিসাম্যতার প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। প্রাণী সনাক্তকরণ, শ্রেণিবিন্যাসকরণ বিভিন্ন অঙ্গাণুর বিশ্লেষণে প্রতিসাম্যতাকে ব্যবহার হরা হয়। রসায়নে অণুসমূহের আকৃতি ও কেলাসের গঠন ব্যাখ্যা করতে প্রতিসাম্যতার ব্যবহার রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানেও এর প্রচুর ব্যবহার রয়েছে।[2] প্রকৃতির পরতে পরতে প্রচুর প্রতিসাম্যতার অস্তিত্ব রয়েছে। যে বস্তু প্রতিসম নয় তাদের বলে অপ্রতিসাম্য। অপ্রতিসাম্যতাকে প্রতিসমের বিপরীত আকৃতি বলা যায়।

চিত্র: আলোকীয় প্রতিসম ও অপ্রতিসম আকৃতি।

প্রতিসাম্যের বেশ কয়েকটি প্রকারভেদ রয়েছে। এখানে সেসব নিয়ে কিছু আলোচনা করা হলো।

আলোকীয় প্রতিসাম্যতা

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিসাম্যতা বলতে আলোকীয় প্রতিসাম্যতাকেই বোঝানো হয়। দ্বিমাত্রিক কোনো আকৃতির উপর রেখা টানলে এবং ত্রিমাত্রিক কোনো বস্তুকে কোনো তল দিয়ে বিভাজিত করলে তার প্রতিসাম্যতার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। একটি সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ বা কোনো মানুষের চেহারা কিংবা ডানা মেলা কোনো প্রজাপতি আলোকীয় প্রতিসাম্যের ভালো উদাহরণ। আলোকীয় প্রতিসাম্যের আবার বস্তু ভেদে প্রকারভেদ থাকতে পারে। রেখা প্রতিসাম্য ও তল প্রতিসাম্য। জীববিজ্ঞানে এই আলোক প্রতিসাম্যতাকে ‘দ্বিপার্শ প্রতিসম’ও বলা হয়।

চিত্র: সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ ও প্রজাপতি আলোকীয় প্রতিসাম্যের উদাহরণ। দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রটি রেখা প্রতিসাম্য ও ত্রিমাত্রিক আকৃতিটি তল প্রতিসাম্যের উদাহরণ।

ঘূর্ণন প্রতিসাম্যতা

জীববিদ্যায় প্রতিসাম্যতার আরেকটি প্রকারভেদ খুব পাওয়া যায়, অরীয় প্রতিসাম্যতা। নানা ধরনের ফুল ও সামুদ্রিক প্রাণীর মাঝে এই বৈশিষ্ট্যটি দেখা যায়। সামুদ্রিক প্রাণীর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় এনিমোন, তারা মাছ, জেলি মাছ ইত্যাদি। ক্ষুদ্র জগতেও এমন প্রাণী প্রচুর দেখা যায়। যেমন হাইড্রা। এই অরিয় প্রতিসাম্যতাকেই গাণিতিক ভাষায় বলা হয় ঘূর্ণন প্রতিসাম্যতা। এই ধরনের আকৃতিগুলোতে ঘূর্ণন প্রদান করলেও মূল আকৃতির মতোই থাকে। এই ধরনের বস্তু দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক উভয়ই হতে পারে। দ্বিমাত্রিক আকৃতির ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্র থাকে, ঐ কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন কোণে এটি একই আকৃতি বজায় রাখে। ত্রিমাত্রিক বস্তুর বেলায় একটি অক্ষ থাকে। ঐ অক্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দিক থেকে এটি প্রতিসম। যেমন একটি সিলিন্ডার সদৃশ প্রাণী, হতে পারে সেটি একটি হাইড্রা। সিলিন্ডার একটা কাল্পনিক অক্ষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ঐ কাল্পনিক অক্ষটি মাঝ বরাবর অবস্থান করে, ঐ অক্ষ থেকে লম্বভাবে সবসময়ই পরিধি পর্যন্ত দূরত্ব সমান হয়ে থাকে। নলাকার প্রাণীগুলোর বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। এর উপর এরকম সিলিন্ডার সদৃশ প্রাণীর দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষকে স্পর্শ করে যেকোনো দিক থেকে কোনো তল দ্বারা বিভাজিত করলে তা আলোকীয় প্রতিসমের মতো ফলাফল পাওয়া যাবে।

চিত্র: নিখুঁত সাম্যাবস্থা বোঝাতে চৈনিক প্রতীক ইন-ইয়াং ও কাগজের চরকি ঘূর্ণনজাত প্রতিসাম্যের উদাহরণ। প্রথমটি দ্বিমাত্রিক, পরেরটি ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রের নমুনা।

সমজাত প্রতিসাম্যতা

বাসা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের মেঝে বা দেয়ালে দারুণ দারুণ নকশার টাইলস দেখা যায়। টাইলসের প্রতিটিই একই রকম। এরকম অভিন্ন নকশার আকৃতি একটার পর একটা করে অনেকগুলো মিলে যে আকৃতির তৈরি করে সেটাও সামগ্রিকভাবে একটা প্রতিসাম্যের উদাহরণ। এই ধরনের প্রতিসাম্যতাকে আমরা বলতে পারি সমজাত প্রতিসাম্যতা (Translational symmetry)। কোনো একটি ক্ষেত্রে একই নকশা বা প্যাটার্ন যদি বারবার পাওয়া যায় তাহলে সেটি সমজাত প্রতিসাম্যতা। [3]

চিত্র: সমজাত প্রতিসাম্যের দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক উদাহরণ।

যৌগিক প্রতিসাম্যতা

আগের প্রকারভেদগুলো ছাড়াও একটি আকৃতিতে একই সাথে একাধিক প্রতিসাম্যতা বজায় থাকতে পারে। যেমন কোনো কোনোটি হতে পারে ঘূর্ণন প্রতিসাম্য ও আলোকীয় প্রতিসাম্যের মিশ্রণ। আবার কোনোটি আলোকীয় ও সমজাত হতে পারে। এই ধরনের প্রতিসাম্যকে বলা যেতে পারে যৌগিক প্রতিসাম্য।

চিত্র: পায়ের পাতার ছাপ। বালু বা কাদায় হাঁটলে পায়ের পাতার যে ছাপ পড়ে তা আলোকীয় ও সমজাত প্রতিসাম্য। বাম পায়ের ছাপকে আয়নায় ফেললে ঠিক ঠিক ডান পায়ের ছাপের মতো পাওয়া যাবে। আবার একই আকৃতির ছাপ একের পর এক মিলে সমজাতের সৃষ্টি করছে। এটি যৌগিক প্রতিসাম্যের একটি চমৎকার বাস্তব উদাহরণ।

চিত্র: সর্পিল প্রতিসাম্যতা। উপরের চিত্রে কতগুলো পিরামিড আকৃতির চতুস্তলক একত্র হয়ে একটি সর্পিলাকার সূত্রক তৈরি করেছে, অনেকটা ডিএনএ’র প্যাচানো দ্বিসূত্রক এর মতো। এখানে সমজাত আর ঘূর্ণন প্রতিসাম্য একত্রে অবস্থান করছে। এমন স্ক্রু এর মতো প্যাচানো প্যাটার্নকে বলা যেতে পারে সর্পিলাকার প্রতিসাম্যতা।

প্রতিসাম্যতার এই সম্বলগুলোকে বগলদাবা করে বাস্তব জগতের ত্রিমাত্রিক বস্তুর মাঝে প্রতিসাম্যতার সৌন্দর্য খুঁজতে নামা যায়। গাছের পাতা, পাখির বাসা, দালান-কোঠা, হতে শুরু করে সবখানেই প্রতিসাম্যতার ছড়াছড়ি। মূলত যে সকল আকৃতি প্রতিসম হয় হয় সেগুলো অপেক্ষাকৃত সুন্দর হয়ে থাকে। মানুষের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য নির্ণয় করতেও আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিসাম্যতাকে ব্যবহার করে।[4]

চিত্র: উদ্ভিদ ও প্রাণীর মাঝে প্রতিসাম্যতার দৃষ্টান্ত। গাছের পাতার ও জেব্রার সাদাকালো ডোরাকাটার মাঝে প্রতিসাম্যতা। ছবি: Rick Bethem ও Woxys

এবার প্রতিসাম্যতার সৌন্দর্য পূজারী একজন অসম্ভব অধ্যবসায়ীর একটা ছবি দেখবো। নিচের পানিতে ছুঁই ছুঁই করা মাছরাঙার ছবিটি তুলতে অ্যালান ম্যাকফাডেন নামক একজন আলোকচিত্রি টানা ছয় বছর ধরে প্রায় সাত লক্ষ্য বিশ হাজার পরিমাণ ছবি তুলতে হয়েছে।[5] এই খবরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সহ অন্যান্য অনলাইন জগতে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। মনে হতে পারে এমন একটা ছবি তুলতে এতো পরিশ্রমের কী আছে? ঠিক পানি ছুঁই ছুঁই করার মুহূর্তের একটা ছবি তুলতে চাইলে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে খুব অল্প সময়েই এটা করে ফেলা যায়। যেমন সেকেন্ডে কয়েক হাজার ফ্রেম ছবি তুলতে পারে এমন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে সেখান থেকে একটা বাছাই করে নিলে হয়।

কিন্তু অ্যালান আসলে এমনটি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন অনন্য একটি গাণিতিক প্যাটার্ন। সত্যিকার অর্থে ছবিটি ‘পানিতে ঠোঁট ছুঁই ছুঁই’ করার মুহূর্তের নয়। ছবিটি মূলত ‘নিখুঁত প্রতিসাম্যতা’র। বামদিকে-ডানদিকে, উপরে-নিচে, বস্তু-প্রতিচ্ছবি ইত্যাদি অনেকগুলো দিক মিলিয়ে ছবিটিকে অনন্য ও অমূল্য করে তুলেছে। প্রতিসাম্যের এতগুলো উদাহরণ উপস্থিত থাকার কারণে একে নিখুঁত প্রতিসাম্যতা (Perfect Symmetry) বলা যেতে পারে। এমন প্রতিসাম্যতা পাবার জন্যই এতগুলো ছবি তুলতে হয়েছিল চিত্রগ্রাহককে। এই কারণেই ভিডিও থেকে স্ক্রিন শট নিলেই এমন ধরনের ছবি পেয়ে যাওয়াটা সহজলভ্য কিছু নয়। এই ছবি থেকে একটা জিনিস খুব মোটা দাগে ধরা পড়ে, গাণিতিক সৌন্দর্যের জন্য মানুষ কত পরিশ্রমই না করে!

চিত্র: মাছরাঙার সেই বিখ্যাত ছবি। তুলেছেন: Alan McFadyen

তথ্যসূত্র

[1] https://en.wikipedia.org/wiki/Symmetry
[2] What Is Symmetry? by Robert Coolman, Live Science, http://www.livescience.com/51100-what-is-symmetry.html
[3] পূর্বোক্ত
[4] ভালোবাসা কারে কয়, অভিজিৎ রায়, শুদ্ধস্বর, ২০১২
[5] Man Takes 720,000 Photos Over Six Years to Nab Perfect Bird Pic, http://www.slice.ca/breaktime/blog/man-takes-720000-photos-over-six-years-to-nab-perfect-bird-pic/70018/

-সিরাজাম মুনির শ্রাবণ
সহ-সম্পাদক, বিজ্ঞান ব্লগ
লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল

Share.

মন্তব্য করুন