গণিতের সনেট

0

বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে গণিতের ব্যবহার পাওয়া যায় না, হোক সেটা পদার্থবিজ্ঞান, হোক না রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞান- গণিত কোনো না কোনো ভাবে এদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। গণিতকে তাই বলা হয় বিজ্ঞানের ভাষা। কারো কারো কাছে গণিত শুধুই এক বিরক্তির নাম আবার কারো কাছে গণিত এক বিস্ময়। এইলেখার বিষয় একটি সমীকরণ নিয়ে যা গণিতের সকল সমীকরনের মধ্যে সবথেকে সুন্দর (The Most Beautiful Equation) হিসেবে পরিচিত হয়েছে।

বলা হয়ে থাকে যে শেক্সপীয়রের সনেট যেমন ভালোবাসার মর্মার্থকে সবার সামনে প্রকাশ করে, ভিঞ্চির শিল্পকর্ম যেমন শিল্পের আবরণ ছাপিয়ে মানবজীবনের বাস্তবতাকে গভীরভাবে প্রকাশ করে তেমনি গণিতে অয়লারের সমীকরণও (Euler’s Equation) গণিতের চরমসত্তাকে প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু কেনো একে সবথেকে সুন্দর সমীকরণ বলা হয়েছে? সেটাই চলুন জানা যাক। এই সমীকরণে যে তিনটি গাণিতিক রাশি ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে e (exponential), i (imaginary number) এবং π (pi)।

প্রথমেই আসে এক্সপোনেন্সিয়াল e এর কথা। e একটি অমূলদ সংখ্যা। এর মান শুরু হয় 2.71828…… দিয়ে যা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত (Irrational number with unending digits)। মূলত অবিরত জটিল হারে কোনো কিছুর বৃদ্ধি হিসাব করতে গিয়েই এর আবিষ্কার যা পতঙ্গের বংশবৃদ্ধির হার গণনা থেকে শুরু করে পরমাণুর তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের হার গণনা করতে এর অবদান অনস্বীকার্য। গাণিতিকভাবে এই রাশিটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় এটি 0 থেকে অসীম পর্যন্ত সকল সংখ্যার ফ্যাক্টোরিয়ালের বিপরীত সংখ্যাসমূহের যোগফলের সমান।

পরবর্তী রাশিটি হচ্ছে i। গণিতে একে কাল্পনিক সংখ্যা (Imaginary number) হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে যা ঋণাত্বক ১ (-1) এর বর্গমূলের সমান। বাস্তবে ঋণাত্বক সংখ্যার বর্গমূল করা সম্ভব নয় অর্থাৎ কোনো সংখ্যার বর্গসংখ্যা ঋণাত্বক হতে পারে না। কিন্তু গণিতে এমন কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে অনেকটা জোর করেই ঋণাত্বক সংখ্যার বর্গমূল করার দরকার পড়ে। i কে তাই -1 এর বর্গমূল হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

শেষ রাশিটি π যা বৃত্তের পরিধির সাথে এর ব্যাসের অনুপাত প্রকাশ করে। গণিতে এটি সবথেকে সুপরিচিত এবং বহুল ব্যবহৃত রাশি। এর মান 3.1416…… যা e এর মতই অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর ব্যবহারও e এর মত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় সুবিস্তৃত।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যখন i এবং π এর গুণফলকে e এর ঘাত হিসেবে ব্যবহার করে e কে বৃদ্ধি যদি করা হয় তখন এর মান হয় -1 বা এর সাথে 1 যোগ করলে ফলাফল হয় 0 যা বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের কাছে বিস্ময়। কারণ বিভিন্ন সময় আবিষ্কার হওয়া এই রাশি গুলোকে একত্র করলে যে এমন একটি ফলাফল পাওয়া যেতে পারে সেটা তারা কল্পনা করতে পারেন নি এবং এই কাজটিই সম্ভব হয়েছে অয়লারের সমীকরণের জন্য। গণিতবিদদের কাছে তাই এটি Most Beautiful Equation এর খ্যাতি পেয়েছে।

কেনো এমন হয়?
সাধারণত কোনো ধনাত্বক সংখ্যা a এর জন্য an এর অর্থ a কে a দ্বারা n সংখ্যকবার গুণ করা, যেমন { a }^{ 3 }=a.a.a । অর্থাৎ এর দ্বারা আমরা লিখতে পারি সকল ধণাত্বক সংখ্যার জন্য am+n = an.am। যদি আমরা লিখি \frac { 1 }{ a } ={ a }^{ -1 } সেক্ষেত্রেও সকল পূর্ণসংখ্যার জন্য লেখা যায় am+n = an.am। আবার a এর বর্গমূলকে লেখা যায় { a }^{ 1/2 } এবং a={ a }^{ 1/2 }+{ a }^{ 1/2 } । সহজ কথায় বলতে গেলে সকল মূলদ সংখ্যার জন্য ar এর কে স্বাভাবিকভাবেই a এর r সংখ্যকবার গুণফল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু অয়লার সমীকরণের ক্ষেত্রে কমপ্লেক্স এনালিসিস (Complex analysis) দ্বারা বলা যায় যে যেকোনো বাস্তব সংখ্যা x এর জন্য,
{ e }^{ ix }=cox(x)+sin(x)
মূলত অয়লারের সমীকরণ দ্বারা বৃত্তের পরিধির উপরস্থ কোনো বিন্দুর গমনপথ প্রকাশ করা হয়ে থাকে। বৃত্তীয় গতির ক্ষেত্রে যদি কোনো বিন্দু x রেডিয়ান কোণে অবস্থান করে সেক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিক ব্যবস্থায় cos(x) বিন্দুটির বাস্তব রেখার স্থানাংক এবং sin(x) অবাস্তব রেখার স্থানাংক প্রকাশ করে। সুতরাং cos(x) + isin(x) দ্বারা বিন্দুটির যেকোনো অবস্থানের মান প্রকাশ করা যায়।

যেখানে ত্রিকোনিমিতিক ফাংশন sine এবং cosine এর মান রেডিয়ানে হিসেব করা হয়। রেডিয়ান স্কেলে 180 ডিগ্রিকে ধরা হয় π, অর্থাৎ π = 180 ডিগ্রি। সুতরাং যদি অয়লারের সমীকরণে x এর পরিবর্তে π বসাই তাহলে,
{ e }^{ ix }=cox(x)+sin(x)
এখন cos(π) = cos(180) = -1 এবং sin(π) = sin(180) = 0
অর্থাৎ, { e }^{ i\pi  }=-1+i.0=-1

তথ্যসূত্রঃ
http://www.livescience.com/51399-eulers-identity.html https://en.wikipedia.org/wiki/Euler%27s_identity

Intuitive Understanding Of Euler’s Formula

-স্বরাজ মল্লিক
বস্ত্রকৌশল বিভাগ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Share.

মন্তব্য করুন