পাই দিবসের ইতিকথা

0

দিনটা ছিল ১৪ই মার্চ। আমরা অর্থাৎ পাড়ার কয়েক বন্ধুরা মিলে সকাল সকাল হাজির হলাম আমাদের পাড়ার বিজ্ঞানীকাকুর কাছে। বিজ্ঞানীকাকুর পুরো নাম প্রফেসর বালক কৃষ্ণ হাজরা, মাথায় উস্কো-খুস্কো চুল, লম্বা দাঁড়ি, দড়ি ঝুলানো চশমা, সর্বদা পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়া, মুখের প্রশান্তির হাসি নিয়ে থাকা এক বিজ্ঞান সাধক। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে ডবল এম.এস.সি. তাই বিজ্ঞানের অগাধ পাণ্ডিত্য।

বিজ্ঞানীকাকু বললেন, ‘ আজকের দিনটা কি জন্যে স্পেশাল বলতো?’

আমরা বললাম যে, ‘ আজ বিখ্যাত  বিজ্ঞানী  অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন। তিনি এই দিনে ১৮৭৯ সালে জার্মানিতে জন্মেছিলেন।’

-‘তোমরা ঠিকই বলেছ তবে আজকে পাই(π) দিবস(Pi Day)। একে  আপাত পাই দিবস(Approximate Pi Day) ও বলে। আচ্ছা তোমরা পাই এর মান বলতো কতো?’

সবাই মিলে আলোচনা করে বললাম, ‘মোটামুটিভাবে এর মান ৩.১৪১৫৯২৬।’

-‘ঠিকই বলেছ তোমরা। পাই-এর মান প্রায় ৩.১৪ বলে প্রতি বছর মার্চ ১৪ (আমেরিকায় তারিখ লেখার নিয়ন অনুযায়ী মাস/তারিখ তাই ৩/১৪)পাই দিবস হিসাবে পালিত হয়। পাই এর মান যেহেতু অনেক বড়ো এবং এর শেষ নেই তাই একে আপাত পাই দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।এই দিবস কখনও কখনও ১৪ই মার্চ দুপুর ১টা ৫৯ মিনিটে পালন করা হয়। তাই এই দিন দুপুর ১টা ৫৯ মিনিটকে পাই মিনিট নামে আখ্যায়িত করা হয়। দুপুর ১টা ৫৯ মিনিট ২৬ সেকেন্ডকে পাই সেকেন্ড বলা হয়। পাই সেকেন্ডে পাই দিবস পালনের মধ্য দিয়ে পাইয়ের মানের (৩.১৪১৫৯২৬) কাছাকাছি সময়ে দিবসটি উদযাপন করা সম্ভব হয়। ভেবে দেখো কি সুন্দর গণনা।’

আমাদের মধ্যে প্রজিত বলে উঠল, ‘ আচ্ছা কাকু ছেলেবেলায় পড়েছি বৃত্তের পরিধি(circumference) ও ব্যাসার্ধের(radius) যে অনুপাত(ratio) তা এক ধ্রুবক যাকে পাই বলি। এই পাই এর মানও তো ২২/৭।’

এর মধ্যে সুদিপ্ত বলে উঠলো, ‘আরে তার আপাত মানও তো মনে হয় ৩.১৪২৮৫৭১ যা কিনা পাই এর কাছাকাছি।’

বিজ্ঞানী কাকু এবার হেসে উঠলেন, ‘ তোমরা জেনে অবাক হবে যে আপাত পাই দিবস বিভিন্ন দিনে পালন হয়ে থাকে। ২২-এ জুলাই (২২/৭) যা প্রজিত বলছিল সেই  তারিখেও যা কিনা  সবচেয়ে পরিচিত পাই দিবস। এছাড়াও ১০-ই নভেম্বর, যা কিনা বছরের ৩১৪-তম দিন (অধিবর্ষ (Leap year) এর ক্ষেত্রে ৯-ই নভেম্বর) আপাত পাই দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। কোথাও কোথাও ২১-এ ডিসেম্বর (বছরের ৩৫৫-তম দিন) এবং লিপ ইয়ারের ক্ষেত্রে ২০-এ ডিসেম্বর দুপুর ১:১৩ মিনিটে চৈনিক পাই ভগ্নাংশের (৩৫৫/১১৩= ৩.১৪১৫২৯২৯২ প্রায় আসল পাই এর মানের কাছাকাছি) তার সাথে মিল রেখে আপাত পাই দিবস উদযাপন করা হয়।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোথায় প্রথম এই পাই দিবস পালন করা হয়।কারা প্রথম পালন করেছিল?’

বিজ্ঞানীকাকু এবার হেসে বললেন, ‘খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। ১৯৮৮ সালে প্রথমবারের মতো পাই দিবস পালিত হয় সানফ্রানসিসকো (San Francisco)-এর এক বিজ্ঞান জাদুঘর (Science Museum)-এ। জাদুঘরের বৃত্তাকার স্থানে এর কর্মচারী ও দর্শনার্থীরা মিলে এক ধরণের কেক (যাকে পাই(Pie)বলে) খেয়ে দিনটি উদযাপন করেন। ঐ জাদুঘরের কর্মকর্তা পদার্থবিদ ল্যারি শ’ (Larry Shaw) এই দিবস উদযাপনের উদ্যোক্তা বলে তাকে “পাই‌‌-এর রাজপুত্র” বলা হয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে দ্বিতীয় জীবনে প্রথম পাই দিবস উদযাপনকে যোগ করেছে। ম্যাসাচুসেট্‌স ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT) অনেক সময় তাদের নতুন শিক্ষার্থীদের গ্রহণপত্র পাই দিবসে ডাকে দিয়ে থাকে।ল্যারি সাহেব একবার এই দিবস সম্পর্কে বলেছিলেন যে এই দিবস সকলকে বিশেষ করে ছোটদের বিজ্ঞান ও গণিতে উৎসাহ দেবার জন্যে যুক্ত করা হয়- “Everybody learns best when they’re excited and happy।That’s basically where the museum as a whole is coming from.” ভেবে দেখো কি সুন্দর বিজ্ঞান প্রচার করার চিন্তা তাঁর। অঙ্ককে খেলার ছলে করতে হবে তাঁকে ভালোবাসতে হবে ভয় না পেয়ে। তবে আমাদের বাংলাদেশও কিন্তু পিছিয়ে নেই গণিতে এখানেও পাই দিবস উদযাপিত হয়ে থাকে ২০০৬ সাল থেকে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি  উদ্যোগে নিয়ে দেশে এই দিবস উদযাপন শুরু করে। বাংলাদেশের বেশ কিছু গণিত ক্লাব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজনের মধ্যে দিবসটি পালিত হয়। আয়োজনের মধ্যে রয়েছে পাই শোভাযাত্রা, পাই-এর মান বলা, পাই নিয়ে আলোচনা ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে পাই দিবসের শুভেচ্ছা বিনিময়।’

এরপর প্রজিত জিজ্ঞেস করল, ‘ পাই এর কতো পর্যন্ত মান বের করা গেছে?’

বিজ্ঞানীকাকু বললেন, ‘ আকিরা হারাগুচি(১৯৪৬) নামে এক জাপানী অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ২০০৬ সালে পাই এর মান ১০০০০ ডিজিট পর্যন্ত বলে Guinness World Records এ নাম করেছিল। আর কম্পিউটার ব্যবহার করে পাইয়ের মান দশমিকের পর কয়েক ট্রিলিয়ন ঘর পর্যন্ত নির্ণয় করা হয়েছে এবং এখনো নির্ণয় চলছে। পাই এর মান কতো তা দেখতে এই নাও এই কাগজটি।’ বলে একটি কাগজ দিলেন আমাদের হাতে জাতে ইংরেজি অক্ষরে পাই এর মান লেখা ছিল :-

3.141592653589793238462643383279502884197169399375105820974944592307816406286208998628034825342117067982148086513282306647093844609550582231725359408128481117450284102701938521105559644622948954930381964428810975665933446128475648233786783165271201909145648566923460348610454326648213393607260249141273724587006…………………………

সসীম শব্দ পাই অসীমের দিকে চলে যায়।

  • ইন্দ্রনীল মজুমদার
    বিজ্ঞানে স্নাতক ও বিজ্ঞান লেখক।
    কলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারত।

 

Share.

মন্তব্য করুন