মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design): পর্ব-৮

0
159

[বইটির সূচিপত্র তখা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

অষ্টম অধ্যায়: গ্র্যান্ড ডিজাইন বা মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design)

এই বইটিতে আমরা বর্ণনা করেছি কীভাবে সূর্য চাঁদ অন্যান্য গ্রহ এবং জ্যোতিষ্কদের গতির নিয়মানুবর্তিতা আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে যে তারা অলৌকিক কোনো কিছুর খেয়ালপনা কিংবা ঈশ্বর বা দেবদেবীদের মর্জির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং সুনির্দিষ্ট কিছু সূত্রের কারণে আবর্তিত হচ্ছে। প্রথমদিকে এইরকম সূত্রের অস্তিত্বের দেখা মিলেছিলো জ্যোতির্বিদ্যায় (অথবা জ্যোতিষশাস্ত্রে, যেটিকে জ্যোতির্বিদ্যার মতো প্রায় একই ব্যাপার বলে মনে করা হতো)। পৃথিবীতে বিদ্যমান বস্তুসমূহের মতিগতি এতোই জটিল যে এবং সেগুলো এতো সব বল দ্বারা প্রভাবিত যে প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা সূত্র উপলব্ধি করতে পারা অসম্ভব ছিলো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে, জ্যোতির্বিদ্যা ছাড়া-ও বিভিন্ন কর্মপরিধিতে নতুন সূত্রাবলি আবিস্কৃত হয়েছিলো এবং এটি একসময় আমাদের বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তাবাদে পৌঁছাতে সাহায্য করে অর্থাৎ এমন কিছু সূত্রাবলি আছে যে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে মহাবিশ্বের সুনির্দিষ্ট অবস্থা জানা গেলে পরবর্তী সময়ে মহাবিশ্ব কীভাবে বিকশিত হবে সেটি নির্ণয় করা যাবে। এই সূত্রাবলি সকল সময়ে এবং সকল ক্ষেত্রে বলবৎ হওয়ার মতো হতে হবে; অন্যথায় এগুলো সূত্র হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এই ব্যাপারে কোনো ব্যতিক্রম বা অলৈৌকিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। ঈশ্বর কিংবা দেবদেবীরা মহাবিশ্বের চলমান প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারবেন না।

যখন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তাবাদ প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিলো, তখন নিউটনের গতিসূত্র এবং মাধ্যকর্ষণের সূত্রগুলোই কেবলমাত্র জানা ছিলো। আমরা বর্ণনা করেছি কীভাবে আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকবাদ তত্ত্বে এই সূত্রগুলো আরো ব্যাপকভাবে পরিবর্ধিত করেছিলেন, কীভাবে মহাবিশ্বের বিভিন্ন রূপকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরো নতুন সব সূত্রাবলি আবিস্কৃত হয়েছিলো।

প্রাকৃতিক সূত্রাবলি আমাদের মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে সেটি বুঝতে সহায়তা করে, কিন্তু বলে না যে ঠিক কেনো এমনটিই ঘটে? বইটির সূচনাপর্বে আমরা যেসব প্রশ্নের উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো হলো:

কেনো কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু বিদ্যমান?

কেনো আমাদের অস্তিত্ব আছে?

কেনো ঠিক এই ভৌত সূত্রসমূহ আছে, কেনো অন্য কোনো ভৌত সূত্র নেই?

কেউ কেউ হয়তো দাবি করবেন যে ঈশ্বরই মহাবিশ্বকে এমনভাবেই সৃষ্টি করেছিলেন। কে বা কী মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করেছিলো এটি জানতে চাওয়া খুবই যৌক্তিক, কিন্তু যদি এর উত্তর হয় ঈশ্বর, তবে প্রশ্নটি কে ঈশ্বরকে সৃষ্টি করেছিলো সে বিষয়ক আলোচনায় সরে আসে। যেনো মেনে নেয়া যে আসলেই সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন হয় না এমন কোনো স্বাধীনসত্তা আছে এবং এই স্বাধীনসত্তাকে ঈশ্বর বলা হয়ে থাকে। এটি হলো ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে প্রথম-কারণ যুক্তি (first-cause argument) দেয়া। কিন্তু আমরা দাবি করছি যে এই প্রশ্নসমূহের উত্তর খুব সহজেই দেয়া যাবে কোনো দেবতাসুলভ সত্তার দারস্থ না হয়েই বিজ্ঞানের আলোকে।

তৃতীয় অধ্যায়ে অবতারণা করা মডেল-নির্ভর বাস্তবতা অনুসারে, আমাদের মস্তিষ্ক ইন্দ্রিয়াবলির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে বাহিরের জগতের একটি মডেল রূপায়িত করে। আমরা আমাদের বাড়ি, গাছপালা, অন্যান্য মানুষজন, দেয়ালের সকেটে প্রবাহিত বিদ্যুৎ, পরমাণু, অণু এবং অন্যান্য মহাবিশ্বের মানসিক প্রতিরূপ তৈরি করি মাথার ভেতরে। এইসব মানসিক ধারণাগুলোর সমষ্টি হলো আমাদের জ্ঞাত একমাত্র বাস্তবতা। বাস্তবতার মডেল-অনির্ভর কোনো পরীক্ষানিরীক্ষা নেই। কারণ একটি সুগঠিত মডেল নিজেই একটি নিজস্ব বাস্তবতা সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরূপ, বাস্তবতা এবং সৃষ্টিজগতের বিষয়গুলো বুঝতে আমরা ১৯৭০ সালে ক্যামব্রিজের গণিতবিদ জন কানওয়ে কর্তৃক উদ্ভাবিত জীবনের খেলা (the Game of Life) নিয়ে চিন্তা করে পারি।

‘জীবনের খেলা’য় ব্যবহৃত “খেলা” শব্দটি আসলে বিভ্রান্তিকর পরিভাষা। সেখানে জয়ী বা পরাজিত কারো সম্পর্কে কিছু বলা নেই, প্রকৃতপক্ষে কোনো খেলোয়াড় সম্পর্কেই কিছু বলা নেই। জীবনের খেলা আসলে কোনো খেলা নয় বরং কতকগুলো সূত্রাবলি- যেগুলো একটি দ্বিমাত্রিক মহাবিশ্বকে পরিচালিত করে। এটি একটি নিশ্চয়তাবাদী মহাবিশ্ব: আপনি একবার প্রারম্ভিক হালচাল ঠিক করে দিলে সূত্রাবলিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে মহাবিশ্বে কী কী ঘটবে।

কানওয়ে সে জগত বিবেচনা বা কল্পনা করেছেন সেটি একটি চতুর্ভুজাকৃতি বিন্যাস, অনেকটা দাবার বোর্ডের মতন, তবে চারিদিকে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিটি চতুর্ভুজ যে কোনো একটি অবস্থায় থাকবে: সক্রিয় বা জীবিত (সবুজ রঙা) অথবা নিস্ক্রিয় বা মৃত (কালো রঙা)। প্রতিটি চতুর্ভুজের আটটি করে প্রতিবেশি আছে: উর্ধ্বে, নিম্নে, বামে, ডানে, এবং চারটি কর্ণিক (diagonal) প্রতিবেশি। এই জগতে সময় লাগাতার চলমান নয়, তবে অসংলগ্নভাবে সামনের দিকে চলে। সক্রিয় অথবা নিস্ক্রিয় চতুর্ভুজের যে কোনো বিন্যাসই নেয়া হোক না কেনো, সক্রিয় চতুর্ভুজের সংখ্যা নির্ধারণ করে সামনে কী ঘটবে, মূলত নিম্নের সূত্রাবলি অনুযায়ী:

১. দুই বা তিনটি সক্রিয় চতুর্ভুজ আশপাশে থাকা একটি সক্রিয় চতুর্ভুজই টিকতে পারে (উত্তরজীবিতা)।

২. তিনটি সক্রিয় প্রতিবেশি চতুর্ভুজ বেষ্টিত নিষ্ক্রিয় চতুর্ভুজটি সক্রিয় হয়ে ওঠে (জীবনলাভ)।

৩. অন্য সব পরিস্থিতির ক্ষেত্রে হয় চতুর্ভুজ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় অথবা নিষ্ক্রিয়ই থাকে।

শূন্য অথবা একটি প্রতিবেশির পাশে থাকা একটি সক্রিয় চতুর্ভুজ একাকিত্বের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়; যদি এটির তিনের অধিক প্রতিবেশি থাকে তবে এটি ভিড়ের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

যে কোনো প্রারম্ভিক অবস্থা বা হালচাল নির্ধারণ করে দেন না কেনো, উপরের সূত্রাবলি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সৃষ্টি করবে। একটি বিচ্ছিন্ন সক্রিয় চতুর্ভুজ অথবা সন্নিহিত দুইটি সক্রিয় চতুর্ভুজ পরবর্তী প্রজন্মে মারা বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে যথেষ্ট প্রতিবেশি না পেয়ে। তিনটি কর্ণিক সক্রিয় প্রতিবেশি কিছুটা বেশি বাঁচে। প্রথম সময়-ধাপের পরে প্রান্তিক চতুর্ভুজগুলো মারা যায়, শুধুমাত্র মাঝের যে চতুর্ভুজটি টিকে থাকে সেটি পরবর্তী প্রজন্মে সূত্র মেনে এমনিতেই নিস্ক্রিয় হয়ে বা মারা যায়। একইভাবে, যে কোনো কর্ণরেখায় অবস্থিত চতুর্ভুজগুলো “উবে” যায়। কিন্তু যদি তিনটি সক্রিয় চতুর্ভুজকে একটি আনুভূমিক সারিতে রাখা হয়, তাহলে পুনরায় প্রান্তিক প্রতিবেশিগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে, তবে ঠিক সেই সময়ে মাঝখানের চতুর্ভুজটির উপরে ও নিচে জীবনলাভ হয়। ফলে সারিটি একটি জীবিত চতুর্ভুজের স্তম্ভে পরিণত হয়। একইভাবে, পরবর্তী প্রজন্মে স্তম্ভটি সারিতে পরিণত হয় এবং এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। এইরকম ক্রমাগত বিপরীতমুখী হওয়া আকৃতি বা গঠনকে ব্লিঙ্কার বলে।

যদি তিনটি সক্রিয় চতুর্ভুজকে L আকারে স্থাপন করা হয় তবে নতুন ধরনের চালচলনের উদ্ভব হয়। পরের প্রজন্মে L এর দোলনায় অবস্থিত চতুর্ভুজটি জন্মদান করবে, সেটি মিলে একটি ২ x ২ ব্লক সৃষ্টি হবে। ব্লকের মতন এইরকম নমুনাকে স্থির-জীবন (still life) বলা হয়ে থাকে, কারণ এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অপরিবর্তিত থেকে অতিবাহিত হবে। নানা ধরণের নমুনার অস্তিত্ব থাকতে পারে যেগুলো প্রথম প্রজন্মে একটি রূপে থাকতে পারে কিন্তু পরে স্থির-জীবনে পরিণত হয়, অথবা মরে যায়, অথবা তাদের পূর্বাবস্থায় ফিরে যেতে পারে এবং এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে পারে।

কিছু কিছু নমুনা আছে যাদেরকে গ্লাইডার বলা হয়, যেগুলো অন্য আকারে রূপ নেয় এবং কয়েক প্রজন্ম পরে নিজেদের পূর্ব আকৃতিতে ফিরে আসে, কিন্তু কর্ণ বরাবর এক ঘর নিচে। আপনি যদি সময়ের সাথে এদের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন তবে মনে হবে যেনো বিন্যাস বরাবর হামাগুড়ি দিচ্ছে। যখন এই গ্লাইডারগুলো পরস্পরের সাথে সংঘর্ষ করে তখন প্রতিটি গ্লাইডারের আকারের উপর নির্ভর করে অস্বাভাবিক আচরণ করে।

এই মহাবিশ্বটি (জন কানওয়ের দ্বিমাত্রিক মহাবিশ্বটি) চিত্তাকর্ষক কারণ যদিও এই মহাবিশ্বটির মৌলিক “পদার্থবিজ্ঞান” সহজসরল, কিন্তু এর “রসায়ন” জটিল হতে পারে বৈকি। অর্থাৎ, যৌগিক বস্তুসমূহ বিভিন্ন মানদণ্ডে অস্তিত্বমান থাকতে পারে। ক্ষুদ্রতম মানদণ্ডে, মৌলিক পদার্থবিজ্ঞান মতে কেবল মাত্র সক্রিয় বা জীবিত এবং নিস্ক্রিয় বা মৃত বর্গগুলো আছে। বৃহৎ মানদণ্ডে, গ্লাইডার, ব্লিঙ্কার, এবং স্থির-জীবন ইত্যাদি ব্লক আছে। আরো বৃহৎতর মানদণ্ডে আরো জটিল বস্তু রয়েছে, যেমন- গ্লাইডার গান: (glider gun) এই স্থির নমুনাটি পর্যায়ক্রমে নতুন গ্লাইডারের জন্ম দেয়; নতুন গ্লাইডার স্থান ত্যাগ করে এবং কর্ণ বরাবর নিচে নেমে যায়।

আপনি যদি জীবনের খেলা মহাবিশ্বটিকে অনেকটা সময় ধরে যে কোনো একটি মানদণ্ডে পর্যবেক্ষণ করেন, তবে আপনি ওই মানদণ্ডে যেসব সূত্রাবলি বস্তুগুলোকে পরিচালিত করছে সেগুলোর ব্যাপারে ধারণা করতে পারবেন। উদাহরণস্বরূপ, বস্তুগুলো যে মানদণ্ডে আছে সেটিতে আপনি হয়তো কয়েক বর্গ এদিক সেদিক গেলে সূত্র বের করতে পারবেন যে “ব্লকগুলো কখনোই অবস্থান পরিবর্তন করে না,” “গ্লাইডারগুলো কর্ণ বরাবর চলে” এবং যখন বস্তুগুলো সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখনকার বিভিন্ন সূত্র। আপনি যৌগিক বস্তুগুলোর যে কোনো স্তরের জন্য একটি সমগ্র পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রাবলি প্রস্তাব করতে পারেন।  সেই সূত্রাবলির ভেতরে এমন ধারণা থাকতে পারে যেসব ধারণাগুলো মূল সূত্রগুলোতে (একেবারের প্রথমদিকের সেই তিনটি সূত্র) নেই। যেমন, মূল সূত্রগুলোতে “সংঘর্ষ” অথবা “চলাচল” ইত্যাদির উল্লেখ নেই। ওই সূত্রগুলো কেবল স্থির বর্গগুলোর জীবন বা সক্রিয়তা কিংবা মৃত্যু বা নিষ্ক্রিয়তা বর্ণনা করে। আমাদের নিজস্ব মহাবিশ্বের মতন, জীবনের খেলা মহাবিশ্বে বাস্তবতা নির্ভর করে আপনি যে মডেলটি প্রয়োগ করবেন সেটির উপর।

কানওয়ে এবং তার শিক্ষার্থীরা এই জগতটি তৈরি করেছিলেন কারণ তারা জানতে চেয়েছিলেন যে তাদের নিরূপণ করা এই মহাবিশ্বটির মতো মৌলিক নিয়ম সমৃদ্ধ একদম সহজসরল মহাবিশ্বে নিজের প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন কোনো জটিল বস্তু থাকতে পারে কি না। অর্থ্যাৎ, জীবনের খেলা জগতটিতেক যে যৌগিক বস্তুগুলো অস্তিত্বমান থাকে সেগুলো সূত্রাবলি মেনে চলে কয়েক প্রজন্ম ধরে তাদের প্রতিরূপ অন্যান্য বস্তুর জন্ম দিবে? কানওয়ে এবং তার শিক্ষার্থীরা কেবল এটি যে সম্ভব তা দেখাতেই সক্ষম হয়েছিলেন তা নয়, তারা আরো প্রদর্শন করেছিলেন যে জন্ম নেয়া বস্তুগুলো এক অর্থে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন হবে! বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বলতে আমরা কী বুঝাচ্ছি?  সঠিকভাবে বললে, তারা দেখিয়েছিলেন যে নিজ-প্রতিরূপ সৃষ্টি করতে পারা বর্গগুলোর বিশাল ঘনসন্নিবেশ আসলে একটি “বিশ্বজনীন টুরিং যন্ত্র” (universal Turing machine)। আমাদের ক্ষেত্রে এটি বোঝাচ্ছে যে আমাদের ভৌত জগতের যে কোনো গণনা যদি একটি কম্পিউটার তাত্ত্বিকভাবে সম্পন্ন করতে পারে, যন্ত্রটিকে যদি যথাযথ উপাত্ত সরবরাহ করা হয় অর্থাৎ যথাযথ জীবনের খেলা জগতের পরিবেশের যোগান দেয়া হয়- তবে কয়েক প্রজন্ম পরে যন্ত্রটি এমন এক অবস্থায় থাকবে যেটি থেকে প্রদত্ত উপাত্ত পাঠ করলে দেখা যাবে যে সেই অবস্থাটি কম্পিউটারটির গণনা করা ফলাফলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

এটি কীভাবে কাজ করে সেটি বোঝার জন্য চলুন যখন গ্লাইডারদের জীবিত বা সক্রিয় বর্গগুলোর ২ x ২ ব্লকে আঘাত করা হয় তখন কী ঘটে সেটি বিবেচনা করি। যদি গ্লাইডারগুলো সরলপথে নিকটবর্তী হয় তবে স্থির ব্লকটি ধাক্কা খেয়ে সামনের দিকে চলবে অথবা গ্লাইডারের উৎস থেকে সরে যাবে। এই ভাবে, ব্লকটি কম্পিউটারের স্মৃতি ধারণ করতে পারবে। প্রকৃতপক্ষে, আধুনিক কম্পিউটারের মৌলিক কার্যাবলি যেমন AND এবং OR গেইটকে গ্লাইডার থেকে তৈরি করা যাবে। এই পদ্ধতিতে, একটি প্রচলিত কম্পিউটারে যেমন তড়িৎ সংকেত কাজে লাগানো হয় তেমন গ্লাইডারের প্রবাহ কাজে লাগানো যাবে তথ্য পাঠানো এবং প্রক্রিয়াজাত করার জন্য।

আমাদের জগতের মতো জীবনের খেলা জগতটিতে আত্ম-পুনরুৎপাদনকারী নমুনাগুলো আসলে অনেক জটিল বস্তু। গণিতবিদ জন ভন নিউম্যানের পূর্ববর্তী কাজ অনুযায়ী, জীবনের খেলায় আত্ম-পুনরুৎপাদনকারী নমুনার সর্বনিম্ন মাপ দশ ট্রিলিয়ন বর্গ- প্রায় মানুষের একটি কোষের ভেতরে অণুর সংখ্যার সমান। আপনি একটি জীবন্ত সত্তাকে সীমিত মাপের জটিল সিস্টেম হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন- যেটি সুস্থিত এবং নিজেদের পুনরুৎপাদন করতে পারে। উপরে বর্ণিত বস্তুগুলো পুনরুৎপাদনের শর্ত পূরণ করে, কিন্তু এটি সম্ভবত সুস্থিত নয়: বাইরে থেকে অল্প গোলযোগই সম্ভবত এই নাজুক ব্যবস্থাকে বিনাশ করে ফেলবে। তবে, এটি কল্পনা করা সহজ যে আরেকটু জটিল নিয়মাবলি জীবনের সকল গুণাবলি সম্পন্ন জটিল ব্যবস্থাকে মঞ্জুর করবে। এখন কানওয়ের জগতটির বস্তুটির মতো একটি সত্তাকে কল্পনা করুন। বস্তুটি পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কিন্তু এই বস্তু বা প্রাণটি কি নিজ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকবে? এটি কি আত্ম-সচেতন হবে? এই প্রশ্নটির উত্তরে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। কেউ কেউ দাবি করেন যে আত্ম-সচেতনতা কেবল অনন্যরূপে মানুষের জন্য। এটি মানুষকে স্বেচ্ছাপ্রবৃত্তি দেয় এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিভিন্ন গতিধারা থেকে যে কোনো একটিকে বাছাই করার ক্ষমতা দেয়। কীভাবে কেউ বলতে পারবে যে কোনো সত্তার স্বেচ্ছাপ্রবৃত্তি আছে কি না? যদি আপনি কোনো ভিনগ্রহবাসীর মুখোমুখি হোন তবে কীভাবে নিশ্চিত বলতে পারবেন যে এটি যন্ত্রমানব না কি এটির নিজস্ব মন আছে? একটি যন্ত্রমানবের আচরণ হয়তো পুরোপুরিভাবে নিরূপণ করা যাবে, কোনো স্বেচ্ছাপ্রবৃত্তিসম্পন্ন সত্তার ক্ষেত্রে নয়। ফলে আপনি তাত্ত্বিকভাবে যন্ত্রমানবটির মতিগতি নির্ণয় করতে পারবেন। আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে যেমন বলেছিলিম, যদি সত্তাটি বিশাল এবং জটিল হয় তবে নিরূপণ করাটা কঠিন হবে বৈকি। আমরা এমনকি তিন বা ততোধিক কণিকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার সমীকরণ পুরোপুরি সমাধান করতে পারি না। যেহেতু মানুষের মাপের সমান একজন ভিনগ্রহবাসীর কয়েক হাজার ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কণিকা থাকবে, যদিও সেটি যন্ত্রমানবই হয়ে থাকে তবুও এটি গণনা করা অসম্ভব হবে যে পরবর্তীতে সেটি কী করবে। সুতারাং আমরা একটি কার্যকর তত্ত্ব হিসেবে বলি যে একটি জটিল সত্তার স্বেচ্ছাপ্রবৃত্তি রয়েছে- কিন্তু এটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য নয়, যেহেতু এটির ভবিষ্যৎ কার্যাবলি আমাদের পক্ষে গণনা করা সম্ভব নয়।

কানওয়ের জীবনের খেলা মহাবিশ্বটির উদাহরণ হতে আমরা দেখি যে এমনকি খুব সাধারণ নিয়মগুচ্ছ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন জীবনের মতো জটিল সত্তার উদ্ভব করতে পারে। অবশ্যই এইরকম বৈশিষ্ট্যের আরো অনেক নিয়মগুচ্ছ আছে। কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বকে পরিচালিত করা মৌলিক নিয়মাবলি (প্রত্যক্ষ নিয়মাবলির বিপরীত) কী নির্ণয় করে? কানওয়ের মহাবিশ্বের মতো আমাদের মহাবিশ্বের নিয়মাবলি যে কোনো আদি অবস্থা থেকে আমাদের বিবর্তন নির্ধারণ করে। কানওয়ের মহাবিশ্বে আমরাই হলাম সৃষ্টিকর্তা- খেলার শুরুতে বস্তুগুলো এবং তাদের অবস্থান নির্দেশ করে আমরা মহাবিশ্বটির আদি অবস্থা নির্ধারণ করি।

একটি ভৌত মহাবিশ্বে, জীবনের খেলায় গ্লাইডারকে বস্তুগুলোর প্রতিঅংশ (counterpart) বা পদার্থের পৃথক অংশ হিসেবে ভাবতে পারেন। যেকোনো নিয়মগুচ্ছ যেটি আমাদেরটির মতো একটি চলমান মহাবিশ্বকে বর্ণনা করে সেটিতে অপরিবর্তিত শক্তির ধারণা রয়েছে, অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে শক্তির পরিমাণের পরিবর্তন ঘটে না। শূন্য স্থানের শক্তির পরিমাণ ধ্রুব হবে, সময় এবং অবস্থান উভয় থেকে স্বাধীনভাবে। কেউ এই ধ্রুব পদার্থশূন্য শক্তি বিয়োগ করে বের করতে পারেন- যে কোনো আয়তনের স্থানের শক্তির সাপেক্ষে একই আয়তনের শূন্য স্থানের শক্তি পরিমাপ করে, এটিকে আমরা হয়তো ধ্রুব শূন্য বলতে পারি। যে কোনো প্রাকৃতিক নিয়মকে একটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হয় যে শূন্য স্থান দ্বারা বেষ্টিত একটি পৃথক বস্তু বা পদার্থের শক্তি ধনাত্মক হবে অর্থাৎ পদার্থটিকে সমবেত করতে আপনাকে কাজ করতে হবে। কারণ যদি একটি পৃথক পদার্থের শক্তি ঋণাত্মক হতো, তবে এটিকে গতিময় অবস্থায় নেয়া হলে এটির ঋণাত্মক শক্তির ভারসাম্য রক্ষিত হতো গতির ফলে সৃষ্ট ধনাত্মক শক্তি দ্বারা। যদি এমনটি সত্যিই ঘটতো, তবে পদার্থ অথবা কণিকা যেকোনোখানে এবং সবখানে আবির্ভূত হতো। ফলে পদার্থশূন্য বা শূন্য স্থান ভারসাম্যহীন হতো। কিন্তু যদি একটি পৃথক পদার্থ তৈরি করতে শক্তি খরচ করতে হয়, তবে এরকম ভারসাম্যহীনতা ঘটবে না, কারণ, আমরা আগে যেমন বলেছিলাম, মহাবিশ্বের শক্তির পরিমাণ ধ্রুব। এই ব্যাপারটিই মহাবিশ্ব স্থানীয়ভাবে সুস্থিত রাখে, ফলে কিছু না হতে সর্বত্র পদার্থ আবির্ভূত হয় না।

যদি মহাবিশ্বের সর্বমোট শক্তি সবসময় অবশ্যই শূন্য থাকতো এবং একটি পদার্থ তৈরি হতে শক্তির প্রয়োজন হয়, তবে কীভাবে কিছু না হতে একটি সমগ্র মহাবিশ্বের উৎপত্তি হতে পারে? এই কারণেই মহাকর্ষের মতন একটি নিয়ম থাকা দরকার। কারণ মহাকর্ষ আকর্ষণধর্মী, মহাকর্ষীয় শক্তি হচ্ছে ঋণাত্মক: মহাকর্ষীয়ভাবে বেষ্টিত একটি ব্যবস্থাকে, যেমন পৃথিবী ও চাঁদ, আলাদা করতে আপনাকে কাজ করতে হবে। এই ঋণাত্মক শক্তি পদার্থ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ধনাত্মক শক্তির সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটি অতো সহজ নয়। উদাহরণস্বরূপ, পৃথিবীর ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তি পৃথিবী গঠনকারী পদার্থকণিকাসমূহের ধনাত্মক শক্তির এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। একটি নক্ষত্রের আরো বেশি ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তি থাকবে, এবং নক্ষত্রটি যতো ছোট হবে (এটির বিভিন্ন অংশাবলি যতো কাছাকাছি থাকবে), এই ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তির মান ততো বড় হবে। কিন্তু ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তি পদার্থের ধনাত্মক শক্তির চেয়ে বেশি হয়ে ওঠার আগেই নক্ষত্রটি কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হবে, এবং কৃষ্ণগহ্বর ধনাত্মক শক্তির অধিকারী। এই কারণেই পদার্থশূন্য স্থান সুস্থিত। নক্ষত্র কিংবা কৃষ্ণগহ্বরের মতো বস্তুসমূহ শুধুমাত্র কোনো কিছু না থেকে আবির্ভূত হতে পারে না। কিন্তু একটি সমগ্র মহাবিশ্ব পারে।

কারণ মহাকর্ষ স্থান এবং কালকে আকার দেয়, এটি স্থান-কালকে স্থানীয়ভাবে সুস্থিত করে কিন্তু মহাবিশ্বব্যাপী অসুস্থিত করে। সমগ্র মহাবিশ্বের মানদণ্ডে, পদার্থের ধনাত্মক শক্তি ও ঋণাত্মক মহাকর্ষীয় শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষিত হয়, এবং ফলে একটি সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টির ব্যাপারে সীমাবদ্ধতা থাকে না। কারণ মহাকর্ষের মতো নিয়ম বা বলের কারণে, একটি মহাবিশ্ব কিছু না হতে নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে, ষষ্ঠ অধ্যায়ে বর্ণিত উপায়ে। স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিকর্মই কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু থাকা, মহাবিশ্বের অস্তিত্ব থাকা এবং আমাদের অস্তিত্ব থাকার কারণ। মহাবিশ্বকে গতিতে সক্রিয় করার জন্য ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ বা সাহায্য প্রার্থনার প্রয়োজন নেই।

আমরা যেসব মৌলিক নিয়মাবলি বর্ণনা করেছি কেনো কেবলমাত্র সেগুলোই আছে? একটি পরম বা চূড়ান্ত তত্ত্বকে অবশ্যই সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে এবং আমরা পরিমাপ করতে পারি এমন বৈশিষ্ট্য বা রাশির সসীম ফলাফল অনুমান করবে। পঞ্চম অধ্যায়ে আমরা দেখেছি যে মহাকর্ষের একটি তত্ত্বের জন্য সসীম ফলাফল অনুমান করতে হলে তত্ত্বটিতে প্রকৃতির বলগুলো এবং যে পদার্থের উপর বলগুলো কাজ করে তাদের মধ্যকার মহাপ্রতিসাম্য থাকতে হবে। এম-তত্ত্ব হচ্ছে মহাকর্ষের সবচেয়ে সাধারণ মহাপ্রতিসাম্য তত্ত্ব। এই কারণগুলোর জন্য এম-তত্ত্ব হচ্ছে মহাবিশ্ব ব্যাখ্যাকারী একমাত্র সম্পূর্ণ তত্ত্ব। যদি এটির অনুমানগুলো সসীম হয় (এখনো প্রমাণ করা বাকি) তবে এটিই হবে মহাবিশ্বের এমন একটি মডেল যেটি মতে মহাবিশ্ব নিজে নিজে নিজ থেকে সৃষ্ট। আমরা অবশ্যই এই মহাবিশ্বের অংশ, কারণ এছাড়া অন্য কোনো সঙ্গতিপূর্ণ তত্ত্ব নেই।

এম-তত্ত্ব হচ্ছে সেই একীভূত তত্ত্ব যেটি আইনস্টাইন খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদি ছিলেন। আমরা মানুষেরা- আমরা নিজেরাই স্রেফ প্রকৃতির মৌলিক কণিকাগুলোর সমষ্টি- আমাদের এবং আমাদের মহাবিশ্বকে পরিচালনাকারী নিয়মাবলি বুঝতে পারার এতো কাছাকাছি আসতে পেরেছি এটি খুবই বিরাট সাফল্য। কিন্তু সম্ভবত আসল অলৌকিকতা হচ্ছে যুক্তির বিমূর্ত চিন্তার এমন একটি স্বতন্ত্র তত্ত্বের দিকে ধাবিত করা যেটি আমাদের দেখা একটি বিস্ময়াবিভূত বৈচিত্র্যে ভরপুর বিশাল মহাবিশ্বকে বর্ণনা এবং অনুমান করে। যদি তত্ত্বটি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, এটিই হবে ৩০০০ বছরের অধিক সময় ধরে করা অনুসন্ধানের সাফল্যজনক উপসংহার। আমরা তখন মহিমান্বিত নকশাটি খুঁজে পাবো।

[বইটির সূচিপত্র তখা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

মূল: স্টিফেন হকিং ও লিওনার্দো ম্লোডিনো

অনুবাদ: -আশরাফ মাহমুদ
গবেষক, কবি ও লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

মন্তব্য করুন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.