মহিমান্বিত নকশা (The Grand Design): পর্ব-৪

0

[বইটির সূচিপত্র তখা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

চতুর্থ অধ্যায়: বিকল্প ইতিহাসসমূহ (Alternative Histories)

১৯৯৯ সালে অস্ট্রিয়ায় পদার্থবিজ্ঞানিদের একটি দল ফুটবল-আকৃতির কতকগুলো অণুকে একটি প্রতিবন্ধক লক্ষ্য করে বর্ষণ করেন। ওই অণুগুলোর প্রতিটি ষাটটি কার্বন পরমাণু দিয়ে গঠিত, এবং বাকিবল (Buckyball) নামে পরিচিত, কারণ স্থপতি বাকমিন্সটার‌ ফুলার এই আকৃতির নানা ভবন নির্মাণ করেছিলেন। খুব সম্ভবত ফুলারের জিওডেসিক গম্বুজগুলোই ছিলো পৃথিবীতে ফুটবল-আকৃতির বৃহত্তম বস্তু। তবে অস্ট্রিয়ার পরীক্ষাগারের বাকিবলগুলো ছিলো ক্ষুদ্রতম। যে প্রতিবন্ধকের দিকে বিজ্ঞানিরা তাদের লক্ষ্য তাক করেছিলেন সেটির গায়ে দুটো চিড় (Slit) ছিলো এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে বাকিবলগুলো পার হতে পারতো। চিড় পেরিয়ে আসা অণুগুলোকে সনাক্ত ও গণনা করতে প্রতিবন্ধক-দেয়ালের পিছনে বিজ্ঞানিরা পর্দার মতো একটি বস্তু স্থাপন করেছিলেন।

যদি আমরা সত্যিকারের ফুটবল দিয়ে অনুরূপ একটি পরীক্ষা চালাতাম তবে আমাদের এমন একজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হতো যিনি লক্ষ্যভেদে নিপুণ নন, কিন্তু তিনি আমাদের পছন্দ করা গতিতে একের পর এক ফুটবল ছুঁড়তে পারবেন। আমরা দুটো ফাঁকঅলা দেয়ালের সামনে আমাদের খেলোয়াড়কে দাঁড় করিয়ে দেয়ালটির অন্যপাশে সমান্তরালে বড়সড় একটি গোলপোস্ট বা জাল স্থাপন করতাম। খেলোয়াড়টির ছোঁড়া অনেক বলই দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেরত চলে আসতো, কিন্তু কিছু কিছু বল যেকোনো একটি ফাঁক গলে জালে গিয়ে ধরা দিতো। যদি ফাঁকগুলো বলের চেয়ে সামান্য বড়ো হয়, তাহলে দেয়ালের অন্য পাশে বলগুলোর দুইটি বিস্তৃত ধারা দেখা যাবে। যদি ফাঁকগুলো আরো বড়সড় হয়, তবে ধারাটি পাখার আকৃতিতে আরো আরেকটু বিস্তৃত হবে (নিচের চিত্র দ্রষ্টব্য)।

লক্ষ্য করুন যে- আমরা যদি ফাঁকগুলোর যে কোনো একটি বন্ধ করে দিই, তবে শুধু সেই ফাঁক দিয়ে বলের ধারা আর জাল পর্যন্ত যাবে না, এবং এটি অন্য ধারাটির উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। আমরা যদি আবার ফাঁকটি খুলে দিই তবে জালের যেকোনো একটি অংশে বলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, যেহেতু আগের খোলা ধারাটির সাথে নতুন করে খোলা ফাঁক দিয়ে আসা বলের সংখ্যা যোগ হবে। দুটো ফাঁকই খোলা রেখে আমরা যে বল সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করি তা মূলত প্রতিটি ফাঁক পৃথকভাবে খুলে পাওয়া পর্যবেক্ষণ দুটোর যোগফলের সমান। প্রাত্যহিক জীবনে-ও আমরা এমনটিই ঘটতে দেখি। অথচ এমন ফলাফল অস্ট্রিয়ার গবেষকদল পান নি যখন তারা তাদের অণুগুলোকে বর্ষণ করেছিলেন।

অস্ট্রিয়ার পরীক্ষায় দেখা গেলো যে দ্বিতীয় ফাঁকটি খুলে দেওয়ার পর পর্দার কিছু কিছু অংশে পৌঁছানো অণুর সংখ্যা বাড়লে-ও অন্যত্র অণুর সংখ্যা কমে গেছে, নিচের চিত্রের মতন। প্রকৃত ঘটনা হলো, পর্দার কিছু কিছু অংশে দুটি ফাঁক খোলা রাখা অবস্থায় কোনো বাকিবলই পৌঁছায় নি, অথচ কেবল যে কোনো একটি ফাঁক খোলা রাখলে ওখানটায় ঠিকই অণু পৌঁছে। ব্যাপারটি অস্বাভাবিক মনে হয়। নতুন একটি ফাঁক খোলার পরে-ও কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছানো অণুর সংখ্যা কম হয় কী করে?

পরীক্ষাটি ভালো করে খতিয়ে দেখলে আমাদের উত্তরের জন্য কিছু যোগসূত্র পেতে পারি। দেখা গেলো, যদি দুটো ফাঁকের যে কোনো একটি দিয়ে বলগুলো যায়- অনেক আণবিক ফুটবলকে যেখানে যেখানে তাদের পৌঁছানোর কথা তার মাঝপথ বরাবর পাওয়া যায় (চিত্র: বাকিবল ফুটবল দ্রষ্টব্য)। কেন্দ্রিক অবস্থান থেকে একটু সরে গেলেই অণুর সংখ্যা কমে আসে, কিন্তু আরো কিছুটা দূরে সরলে অণুর সংখ্যা বেড়ে যায়। এই নকশা (pattern) দুটো ফাঁকের প্রতিটিকে পৃথকভাবে খুলে দিলে যে নকশাগুলো পাওয়া যায় সেগুলোর যোগফলের সমান নয়, কিন্তু আপনি নিশ্চয় চিনতে পেরেছেন যে এর সাথে তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত তরঙ্গ ব্যতিচারের বৈশিষ্ট্যের মিল আছে। যেখানটায় কোনো অণু পৌঁছায় নি সেখানে দুটো ফাঁক গলে আসা দুটো তরঙ্গ বিপরীত-দশায় পৌঁছাচ্ছে, এবং ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার ঘটছে; আবার যেখানটায় বেশি অণু পৌঁছেছে সেখানে সম-দশার ফলে গঠনমূলক ব্যতিচার ঘটছে।

বৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনার প্রায় প্রথম দুই হাজার বছর ধরে প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা আর অন্তর্জ্ঞান ছিলো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার ভিত্তি। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণের পরিধি বাড়লো, এবং আমরা দেখতে শুরু করলাম যে প্রকৃতি অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে কাজ করে যেটি আমাদের প্রাত্যহিক জীবন এবং আমাদের অন্তর্জ্ঞানের সাথে খাপ খায় না- যেমন ধরুন বাকিবলের পরীক্ষাটি। সনাতনী পদার্থবিজ্ঞান বাকিবলের পরীক্ষার মতন পরীক্ষানিরীক্ষার যুতসই ব্যাখ্যা করতে পারে না, কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান কাজটি ভালোভাবেই করতে পারে। তাইতো রিচার্ড ফাইনম্যান লিখেছেন যে উপরে বর্ণিত পরীক্ষাটির মতন দ্বিচিড় পরীক্ষায় “কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের সব রহস্য লুকিয়ে আছে।”

বিংশ শতাব্দির প্রথম কয়েক দশকে নিউটনীয় তত্ত্ব যখন পারমাণবিক এবং অতিপারমাণবিক স্তরে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ হয়েছিলো তখন কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের মূলনীতিগুলো প্রকাশিত হয়েছিলো। পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বগুলো প্রকৃতির বলসমূহ এবং সেগুলোর সাথে বস্তুগুলো কীভাবে ক্রিয়া করে সেটি ব্যাখ্যা করে। সনাতনী তত্ত্বগুলো যেমন নিউটনীয় তত্ত্ব আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতালব্ধ একটি নির্মাণকাঠামোকে ভিত্তি করে গঠিত যেখানে বস্তুসমূহের একক অস্তিত্ব আছে, একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত, সুনির্দিষ্ট পথে চলে ইত্যাদি। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান প্রকৃতিকে পারমাণবিক বা অতিপারমানবিক স্তরে বোঝার জন্য একটি নির্মাণকাঠামো সরবরাহ করে, কিন্তু আমরা পরে দেখবো যে এই নির্মাণকাঠামোয় বস্তুর অবস্থান, গতিপথ, এমনকি বস্তুর ভূত-ভবিষ্যৎ কাঁটায় কাঁটায় নির্ধারিত নয়। মহাকর্ষ বল কিংবা তড়িচ্চুম্বকীয় বলের মতো বলগুলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব এই ধরণের একটি নির্মাণকাঠামোর উপর ভিত্তি করে গঠিত।

যেখানে সনাতনী পদার্থবিজ্ঞান আমাদের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতাগুলো বেশ নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, সেখানে প্রাত্যহিক জীবনে স্বভাবসিদ্ধ নয় এমন একটি নির্মাণকাঠামো ভিত্তি করে গঠিত কোয়ান্টাম তত্ত্ব কি প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতাগুলো পুরোপুরি নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে? বস্তুত তারা পারে; আমরা এবং আমাদের চারপাশ হলাম অকল্পনীয় সংখ্যক পরমাণু দিয়ে গঠিত একেকটি যৌগিক কাঠামো। যদিও এইসব গঠনকারী পরমাণুসমূহ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নীতি মেনে চলে, তারপরও পরমাণুসমূহের বিশাল সমাহার ফুটবল, শালগম, জাম্বো জেট কিংবা আমরা দ্বিচিড় দিয়ে ব্যতিচারের সম্মুখীন হই না। তাই গঠনকারী পরমাণুসমূহ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মেনে চললে-ও মোটের উপরে নিউটনের তত্ত্ব একটি কার্যকর তত্ত্ব হিসাবে আমাদের দৈনন্দিন জগত গঠনকারী যৌগিক কাঠামোগুলো কীভাবে আচরণ করে সেটি বর্ণনা করে।

এটি শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানে অনেক দৃষ্টান্ত আছে যেখানে একটি যৌগিক বস্তু তার গাঠনিক উপাদানগুলো থেকে ভিন্ন রকমের আচরণ করে। একটি মাত্র নিউরনের প্রতিক্রিয়া থেকে আপনি যেমন পুরো মানব মস্তিষ্ক সম্পর্কে ধারণা পাবেন না, তেমনি পানির একটি অণু সম্পর্কিত জ্ঞান আপনাকে একটি হ্রদের আচরণ সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা দেয় না। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপারে বিজ্ঞানিরা এখনো কোয়ান্টাম ক্ষেত্র থেকে কীভাবে নিউটনের সূত্রগুলো উদ্ভুত হয় সেটির খুঁটিনাটি জানতে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে আমরা নিশ্চিত জানি সব বস্তুর গাঠনিক উপাদানগুলো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মাবলি মেনে চলে এবং কীভাবে সেইসব কোয়ান্টাম উপাদান দিয়ে গঠিত বৃহৎ বস্তুগুলো আচরণ করে তা বর্ণনা করার জন্য নিউটনের সূত্রগুলো খুব ভালো আসন্নমান।

সংগতকারণেই নিউটনীয় তত্ত্বের অনুমানগুলো আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতালব্ধ বাস্তবতার চিত্রের সাথে মেলে যায়। কিন্তু স্বতন্ত্র পরমাণু এবং অণু আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা থেকে গভীরভাবে ভিন্ন পন্থায় কাজ করে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বাস্তবতার একটি নতুন মডেল যেটি আমাদের মহাবিশ্বের সঠিক স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করে। এই স্বরূপ বা চিত্রে বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের অন্তর্জ্ঞানলব্ধ অনেক ধারণারই বেল নেই।

দ্বিচিড় পরীক্ষাটি সর্বপ্রথম চালান ক্লিনটন ডেভিসন এবং লেস্টার জার্মার ১৯২৭ সালে বেল ল্যাবে, তারা গবেষণা করছিলেন কীভাবে ইলেকট্রন রশ্মি (গঠনে বাকিবলের চেয়ে অনেক বেশি সরল) নিকেল স্ফটিকের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে। প্রকৃতপক্ষে, ইলেকট্রনের মতো কণিকা যে জলতরঙ্গের মতো আচরণ করে এই বিস্ময়কর ব্যাপারটিই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সূচনার ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছিলো। যেহেতু বৃহদায়তনে এই রকমের ঘটনা দেখা যায় না, তাই একটি বস্তু ঠিক কতোটা বড় এবং জটিল হওয়ার পরে-ও তরঙ্গসুলভ আচরণ করে- বিজ্ঞানিরা এই ব্যাপারে বহুদিন ধরেই কৌতূহল প্রকাশ করেছেন। যদি কোনো মানুষ বা জলহস্তী ব্যবহার করে যদি এর ফলাফল দেখার চেষ্টা করা হতো তবে লঙ্কাকাণ্ড হয়ে যেতো, তবে সাধারণত বস্তু যতো বড় হয়ে থাকে তার কোয়ান্টাম আচরণ ততোই ক্ষীণ হয়ে আসে। ফলে এটি বিসদৃশ যে চিড়িয়াখানার কোনো প্রাণী তরঙ্গের মতো করে খাঁচার শিক গলে বেরিয়ে যাবে। এতদসত্ত্বেও, পরীক্ষানির্ভর পদার্থবিজ্ঞানিরা বড় বড় বস্তুগুলোতে এই ধরণের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছেন। বিজ্ঞানিরা আশা করছেন একদিন বাকিবলের বদলে একটি ভাইরাস ব্যবহার করে-ও পরীক্ষাটি করা যাবে, ভাইরাস শুধু যে বাকিবলের চেয়ে বড় তাই নয়, এটি জীবন্ত-ও বটে।

সামনের অধ্যায়গুলোতে আমরা যে যুক্তিগুলো দেবো সেগুলো বোঝার জন্য কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অল্প কিছু জিনিস বুঝলেই চলবে। অন্যতম একটি বিষয় হলো তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা। পদার্থের কণিকাও যে তরঙ্গধর্মী আচরণ করে এই ধারণা অনেককে অবাক করেছিলো। অথচ আলো যে তরঙ্গের মতো আচরণ করে সেটিতে কেউ বিস্মিত হয় না। আলোর তরঙ্গধর্মী আচরণ সবার কাছে স্বাভাবিকই মনে হয় এবং প্রায় দুই শত বছর ধরে একটি গৃহীত ব্যাপার হিসেবে গণ্য। আপনি যদি উপরের পরীক্ষাটির দুটো চিড়ে আলোকরশ্মি ফেলেন তবে দুটো তরঙ্গ উত্থিত হবে এবং পর্দায় মিলিত হবে। কোনো কোনো বিন্দুতে তাদের তরঙ্গশীর্ষ অথবা তরঙ্গপাদ পরষ্পরের ‘পরে সমাপতিত হবে এবং উজ্জ্বল ছোপ তৈরি হবে; অন্যত্র একটি তরঙ্গের তরঙ্গশীর্ষ অন্য তরঙ্গের তরঙ্গপাদের সাথে মিলবে এবং পরস্পরকে রদ করে দিয়ে কালো এলাকার সৃষ্টি করবে। ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানি থমাস ইয়াং উনবিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে এই পরীক্ষা করেন, এবং সবাইকে বোঝান যে আলো এক ধরণের তরঙ্গ, নিউটন যেরকম বিশ্বাস করতেন তেমনটি কণা দিয়ে গঠিত নয়।

কেউ হয়তো ইতি টানতে পারেন যে নিউটন আলোকে তরঙ্গ না বলে ভুল করেছিলেন, আসলে তিনি সঠিকই ছিলেন ও বলেছিলেন যে আলো কণা দিয়ে তৈরি এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করে। বর্তমানে আমরা আলোর কণাকে ফোটন বলি। আমরা যেমন অসংখ্য পরমাণু দিয়ে গঠিত, তেমনি আমরা প্রতিদিনকার জীবনে যে আলো দেখি, একভাবে বলতে গেলে, সেটিও অগণিত ফোটন দিয়ে তৈরি- এমনকি একটি এক ওয়াটের রাত-বাতিও প্রতি সেকেন্ডে বিলিয়ন বিলিয়ন ফোটন নির্গত করে। সাধারণত স্বতন্ত্র একটিমাত্র ফোটন প্রত্যক্ষ করা যায় না, কিন্তু পরীক্ষাগারে আমরা আলোর এমন এক ক্ষীণ বা সূক্ষ্ম রশ্মি তৈরি করতে পারি যেটি হবে শুধু স্বতন্ত্র ফোটনের প্রবাহ এবং সেই ফোটনগুলোকে আমরা এক একটি করে সনাক্ত করতে পারি- ঠিক যেমন করে আমরা একক ইলেকট্রন অথবা বাকিবল সনাক্ত করি। আমরা ইয়াঙের পরীক্ষাটি এতোটাই সূক্ষ্ম আলোকরশ্মি দিয়ে পুনরাবৃত্ত করতে পারি যে প্রতিটি ফোটন কয়েক সেকেন্ড পরপর প্রতিবন্ধকের সামনে গিয়ে পৌঁছায়। যদি আমরা প্রতিবন্ধকের অন্য পাশের পর্দায় প্রতিটি ফোটনের প্রভাব ধারণ করে করি, তবে দেখবো যে সেগুলো একটি ব্যতিচারী নকশার সৃষ্টি করেছে, ঠিক যেমন ফোটনের বদলে ইলেকট্রন বা বাকিবল একটি একটি করে ছুঁড়ে ডেভিসন-জার্মার পরীক্ষাটি করা হলে যে নকশা পাওয়া যায়। পদার্থবিজ্ঞানিদের জন্য এটি একটি চমকপ্রদ উদঘাটন: যেহেতু ফোটনগুলোকে কণা আকারে ছোঁড়া হয়েছে একটি একটি করে এবং একটি একক কণিকা নিজের সাথে ব্যতিচার করতে পারছে তাহলে বলা যায় আলোর তরঙ্গ প্রকৃতি কোন রশ্মি বা ফোটনের প্রবাহের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং স্বতন্ত্র একক কণার বৈশিষ্ট্য।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের আরেকটি প্রধান নীতি হলো ১৯২৬ সালে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের সূত্রবদ্ধ করা অনিশ্চয়তা নীতি (uncertainty principle)। অনিশ্চয়তা নীতি মতে, কিছু কিছু উপাত্ত যেমন একটি কণিকার অবস্থান এবং গতি যুগপৎভাবে পরিমাপ ও সংগ্রহে আমাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি কোনো কণিকার অবস্থানের অনিশ্চয়তার সাথে তার ভরবেগের (ভর ও বেগের গুণফল) অনিশ্চয়তা গুণ করেন তাহলে সেই ফলাফল কখনোই একটি নির্দিষ্ট ধ্রুব মানের চেয়ে ক্ষুদ্রতর হয় না, এই ধ্রুবকের নাম প্লাঙ্ক ধ্রুবক। ব্যাপারটি দাঁত-ভাঙা শব্দের মতন মনে হতে পারে, তবে সহজভাবে বলতে চাইলে বলা যায় যে আপনি যতো সূক্ষ্মভাবে কণিকার অবস্থান নির্ণয় করবেন সেটির গতি নির্ণয় ততোই কম সূক্ষ্ম হবে এবং বিপরীতটা-ও সঠিক। যেমন, আপনি যদি অবস্থানের অনিশ্চয়তাকে কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনেন, তবে আপনি গতির ক্ষেত্রে দ্বিগুণ অনিশ্চয়তা পাবেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো আমাদের প্রতিদিনে ব্যবহার্য একক যেমন মিটার, কিলোগ্রাম, এবং সেকেন্ডের তুলনায় প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান অতি ক্ষুদ্র। এইসব এককে প্রকাশ করলে প্লাঙ্ক ধ্রুবকের মান: ৬.৬২৬০৬৮ × ১০৩৪ জুল-সেকেন্ড। একটি বৃহদায়তন বস্তু যেমন ফুটবলের কথাই ধরা যাক। আপনি যদি একটি বড়সড় বস্তু যেমন ধরুন এক কেজির এক-তৃতীয়াংশ ভরের একটি ফুটবলের অবস্থান এক মিলিমিটার সূক্ষ্মতায় নির্ণয় করা চান তবে আমরা সেটির বেগ এক কিলোমিটার পার ঘন্টার এক বিলিয়নের বিলিয়নের বিলিয়নের এক ভাগ অনিশ্চয়তায় নির্ণয় করতে পারবো। কারণ, এই এককগুলোতে ফুটবলটির ভর ১/৩ এবং এর অবস্থানের অনিশ্চয়তা ১/১০০০, যেগুলোর কোনটাই প্লাঙ্ক ধ্রুবকের দশমিকের পরের শূন্যেগুলোর তুলনায় যথেষ্ট নয়, ফলে বেগের উপর প্রভাব পড়ে না। তবে সেই একই এককে ইলেকট্রনের ভর ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০১, তাই ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্যরকম বটে। যদি আমরা একটি ইলেকট্রনের অবস্থান একটি পরমাণুর আকারের (১০১৫ মিটার) সমান নিশ্চয়তায় মাপি, তাহলে সেটির বেগ প্রতি সেকেন্ডে কম-বেশি ১০০০ কিলোমিটার এদিক-সেদিক হবে, যেটি কিনা কোনো সূক্ষ্ম পরিমাপই না।

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মতে, আমরা যতো তথ্যই সংগ্রহ করি না কেনো কিংবা আমাদের গণনা-দক্ষতা যতোই শক্তিশালী হয়ে উঠুক না কেনো, কোনো ভৌত ঘটনার ফলাফল পুরোপুরি নিশ্চয়তার সাথে গণনা বা ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে না কারণ প্রকৃতিতেই মানগুলো নিশ্চিতভাবে সুনির্ধারিত নয়। বরং, কোনো একটি ব্যবস্থার আদি অবস্থা থেকে প্রকৃতি ব্যবস্থাটির শেষ অবস্থা নির্ধারণ করে মূলগতভাবে অনিশ্চিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি সরলতম ব্যবস্থাতে-ও প্রকৃতি কোনো প্রক্রিয়া কিংবা পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগে না। বরঞ্চ, প্রকৃতি কিছু নির্দিষ্ট সম্ভাবনা অনুযায়ী বিভিন্ন সম্ভাব্য ঘটনা ঘটাকে অনুমোদন করে। আইনস্টাইনের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বললে, যেনো ঈশ্বর প্রতিটি ভৌত ঘটনা ঘটার বা ফলাফল নির্ধারণের আগেভাগে পাশা খেলে দেখে। তবে এই ধারণা আইনস্টাইনকে এতোটাই দুশ্চিন্তায় ফেলেছিলো যে তিনি কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা হলে-ও পরবর্তীতে এর সমালোচনায় মুখর ছিলেন।

আপনি যদি ভাবেন যে প্রকৃতি কিছু নিয়ম মেনে চলে- এই ধারণাকে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান খর্ব করছে তবে সেটি ঠিক নয়। বরঞ্চ, এটি আমাদের এক নতুন ধরণের নিশ্চয়তাবাদ গ্রহণে করতে বলে: কোনো সময়ে একটি ব্যবস্থার অবস্থা দেয়া থাকলে, প্রকৃতির নিয়মাবলি একটি নিশ্চিত ভবিষ্যৎ অবস্থা নির্ধারণ করার বদলে সম্ভাব্য সকল ভবিষ্যৎ ঘটনা ঘটার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখে। কারো কারো অপছন্দের মনে হলে-ও, তাদের মন মতো না হলে-ও বিজ্ঞানিদেরকে যে তত্ত্বটা পরীক্ষণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সেটিই মেনে নিতে হয়।

বিজ্ঞান চায় একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হবে অভীক্ষাযোগ্য। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো সম্ভাবনীয়-প্রকৃতির (probabilistic nature) কারণে যদি সেগুলো যাচাই করা অসম্ভব হতো, তবে কোয়ান্টাম তত্ত্বগুলো যুক্তিসিদ্ধ তত্ত্ব হিসেবে স্বীকৃতি পেতো না। জটিলতা থাকা সত্ত্বেও, আমরা কোয়ান্টাম তত্ত্বগুলোর অনুমান বা ভবিষ্যদ্বাণী যাচাই করতে পারি। যেমন আমরা একটি পরীক্ষা বারবার করতে পারি এবং দেখাতে পারি যে বিভিন্ন ফলাফলের পৌনঃপুনিকতা তত্ত্বটির অনুমিত সম্ভাবনাকেই সমর্থন করে। বাকিবল পরীক্ষাটির কথা বিবেচনা করুন; কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মতে, কোনো কিছুরই একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নেই, কারণ সেরকম হলে ভরবেগের অনিশ্চয়তা অসীম হতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান মতে, একটি কণিকাকে মহাবিশ্বের যে কোনো জায়গায় পাওয়ার কিছু সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দ্বিচিড় পরীক্ষার একটি ইলেকট্রনকে পরীক্ষাটির যন্ত্রপাতির মধ্যে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচে’ বেশি থাকলে-ও এটিকে সদূর আলফা সেন্টরাই নক্ষত্রে কিংবা আপনার অফিসের ভোজনালয়ে একটি মাংসপুরির মধ্যে-ও পাওয়ার কিছু সম্ভাবনা আছে বৈকি। এই কারণে, আপনি যদি একটি কোয়ান্টাম বাকিবলকে ছুঁড়েন তবে আপনি আগে থেকেই কোনো উপায়েই নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না যে এটি কোথায় গিয়ে পড়বে। কিন্তু আপনি যদি বারবার এই পরীক্ষাটি পুনরাবৃত্ত করেন তবে ধারণা পাবেন যে বাকিবলটিকে কোন জায়গায় পাওয়ার সম্ভাবনা কতো কতো, এবং পরীক্ষকেরা নিশ্চিত করেছেন যে এই পরীক্ষার ফলাফল কোয়ান্টাম তত্ত্বের অনুমানের সাথে মিলে যায়।

এটি উপলব্ধি করা দরকার যে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভাব্যতা আর নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের (বা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের) সম্ভাব্যতা একই ধরণের নয়। ব্যাপারটি বোঝার জন্য আমরা পর্দায় নিয়মিত হারে বর্ষিত বাকিবলের নকশার সাথে একটি বাণফলকে খেলোয়াড়দের বাণ ছোঁড়ায় সৃষ্ট নকশার তুলনা করতে পারি। যদি না খেলোয়াড়রা বিয়ার খেয়ে মাতাল হয়ে থাকে, বাণফলকের কেন্দ্রেই বাণ বেঁধার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, কেন্দ্র থেকে যতো দূরে যাবেন ততো বাণ বেঁধার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। তবে বাকিবলের মতোই যে কোনো জায়গাতেই বাণ বিঁধতে পারে এবং একটি সময় পরে বাণে সৃষ্ট গর্তের নকশা দেখে বিভিন্ন জায়গায় ধনুক বেঁধার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব। প্রাত্যহিক জীবনে আমরা হয়তো মোটের উপর বলবো যে ধনুকের বিভিন্ন জায়গায় বেঁধার সম্ভাবনা আছে, কারণ আমরা বাণটি কী অবস্থায় ছোঁড়া হয়েছে সেটি পরিপূর্ণভাবে জানি না। কিন্তু বাণটি কীভাবে ছোঁড়া হয়েছে, কতো কোণে, ঘূর্ণন, বেগ ইত্যাদি জানা থাকলে বাণফলকের কোথায় এটির গাঁথার সম্ভাবনা কতটুকু সেটি আমরা খুব সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করতে পারতাম। সুতারাং প্রাত্যহিক জীবনে আমরা ঘটনাগুলোর ফলাফল বর্ণনা করার জন্য যে সম্ভাব্যতা ব্যবহার করি সেটি আসলে ঘটনাগুলোর অন্তর্নিহিত প্রকৃতিকে তুলে ধরে না, সেই ঘটনাবলির কোনো অংশ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাকে তুলে ধরে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের সম্ভাব্যতাগুলো ভিন্ন ধরণের। সেগুলো প্রকৃতির মৌলিক যদৃচ্ছতার (randomness) বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতির কোয়ান্টাম মডেলসমূহের মূলসূত্রগুলো শুধু আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাই নয়, বাস্তবতা সম্পর্কিত আমাদের সহজাত ধারণার-ও বিরুদ্ধে যায়। যারা এইসব মূলসূত্রকে অদ্ভুত বা বিশ্বাস করা কঠিন বলে মনে করেন, তাদের দলে আইনস্টাইন এবং ফাইনম্যানের মতো খ্যাতনামা বিজ্ঞানিরা-ও আছেন; তাদের বর্ণিত কোয়ান্টাম তত্ত্বটি নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করবো। এমনকি ফাইনম্যান একবার লিখেছিলেন, “আমি নির্বিঘ্নে বলতে পারি যে আসলে কেউই কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বোঝে না।” কিন্তু কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান আমাদের পর্যবেক্ষণের সাথে মিলে যায়। এটি আজ পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হয় নি, এবং বিজ্ঞানের অন্য যে কোনো তত্ত্বের চেয়ে এটি বেশিবার পরীক্ষিত হয়েছে।

১৯৪০ সালের দিকে রিচার্ড ফাইনম্যান কোয়ান্টাম-জগৎ ও নিউটনীয়-জগতের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে এক চমকপ্রদ বিষয় উপলব্ধি করেন। দ্বিচিড় পরীক্ষায় কীভাবে ব্যতিচারী নকশার সৃষ্টি হয়- এই প্রশ্নটা তাকে খুব কৌতূহলী করে তুলেছিলো। আপনার নিশ্চয় মনে আছে যে দ্বিচিড় পরিক্ষায় আমরা দুইটি চিড়ই খোলা রেখে কণিকা ছুঁড়ে যে নকশা পেয়েছি সেটি চিড় দুটি একটি একটি করে খুলে পাওয়া নকশার যোগফলের সমান নয়। বরং দুটি চিড় খোলা থাকলে আমরা কতকগুলো উজ্জ্বল বলয় ও কালো বলয় পাই। অর্থাৎ শুধু একটি চিড় খোলা থাকলে কালো বলয়ে যে কণিকাগুলো পৌঁছার কথা ছিলো- দুটি চিড়ই খুলে দিলে সেগুলো আর ওখানটায় যায় না। মনে হয় যেনো উৎস থেকে পর্দার দিকে যাত্রাপথের কোনো এক জায়গায় কণিকাগুলো জেনে যাচ্ছে যে দুটো চিড়ই খোলা। এই ধরণের আচরণ দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য বস্তুসমূহের আচরণের চেয়ে চূড়ান্তভাবে ভিন্ন, কারণ আমরা দেখি যে একটি বলকে ছুঁড়ে দিলে সেটি ঠিক খোপ দিয়ে যাবে, অন্য খোপে যে অবস্থাই বিরাজ করুক না কেনো।

নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান মতে, আমরা যদি কণিকার বদলে একটি ফুটবল দিয়ে পরীক্ষাটি করতাম- ফুটবলের মতো করে প্রতিটি কণিকাই উৎস থেকে পর্দা পর্যন্ত একটি সুনির্ধারিত যাত্রাপথ ধরে চলবে। অর্থাৎ, একটি কণিকার পক্ষে একটি চিড় দিয়ে যাওয়ার সময় অন্য চিড়টি খোলা আছে কি না তা দেখে আসার কোনো সুযোগই নেই। অন্যদিকে কোয়ান্টাম মডেল অনুসারে, কণিকাটি যাত্রাপথের সূচনাবিন্দু থেকে শেষবিন্দু পৌঁছানোর মাঝে কোনো নির্দিষ্ট পথ মেনে চলে না। ফাইনম্যান উপলব্দি করেছিলেন, এর মানে কিন্তু এই নয় যে কণিকাটি উৎস থেকে পর্দা পর্যন্ত যেতে কোনো পথই বেছে নিচ্ছে না। বরং এমন হতে পারে যে কণিকাটি ওই দুটি বিন্দুকে সংযোগকারী সম্ভাব্য সবগুলো পথ দিয়েই যাচ্ছে। ফাইনম্যান দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করলেন যে এটিই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সাথে নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞানের মূল পার্থক্য। এখন দুটো চিড়কেই হিসেবে ধরতে হবে কারণ যে কোনো একটি নির্দিষ্ট পথে না গিয়ে কণিকাগুলো সম্ভাব্য প্রতিটি পথেই যুগপৎভাবে যেতে পারে। ব্যাপারটিকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো মনে হলে-ও এটিই সঠিক। ফাইনম্যান একে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করেন- ইতিহাসের ওপরে ফাইনম্যানের সমষ্টি (the Feynman sum over histories) – যা পূর্বোল্লেখিত ঘটনা ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সমস্ত নিয়মকে তুলে ধরে। যদিও ফাইনম্যানের তত্ত্বে গাণিতিক ও ভৌত চিত্রাবলির রূপ মূল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান থেকে ভিন্ন ধরণের, তারপরও ভবিষ্যদ্বাণীগুলো একই।

দ্বিচিড় পরীক্ষা সম্পর্কে ফাইনম্যান বলেছিলেন যে কণিকাগুলো বিভিন্ন ধরণের পথ বেছে নেয়- একটি কণিকা হয়তো কেবল একটি চিড় দিয়েই যাচ্ছে, অন্য কোনো কণিকা পার হচ্ছে অন্য চিড় দিয়ে; হয়তো কোনোটি প্রথম চিড় দিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় চিড় ঘুরে এসে আবার প্রথম চিড় দিয়ে পার হচ্ছে; কোনোটি হয়তো চিংড়ির ঝোল পরিবেশনকারী রেস্তোরা থেকে একবার ঘুরে আসে; কোনোটি হয়তো বৃহস্পতি গ্রহের চারপাশে কয়েক পাক মেরে আসে; এমনকি কোনোটি মহাবিশ্বের এপার থেকে ওপার করে ফিরে আসে। ফাইনম্যানের মতে, এভাবেই কণিকারা জানতে পারে একটি চিড় খোলা আছে কি না। যদি একটি চিড় খোলা থাকে, তবে কণিকা সেটির মধ্য দিয়ে যায়; যদি দুটো চিড়ই খোলা থাকে, একটি দিয়ে পার হওয়া পথ অন্যটি দিয়ে পার হওয়া পথের সাথে মিলে ব্যতিচার সৃষ্টি করে। শুনে প্রলাপ মনে হলে-ও আজকালকার সবচেয়ে মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের অভীষ্ট লক্ষ্যে এবং এই বইটির জন্য- ফাইনম্যানের সূত্রবদ্ধ বিবৃতিই কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের পূর্ব ধারণার চেয়ে বেশি কার্যকরী।

শীঘ্রই আমরা যে তত্ত্বগুলো উপস্থাপন করবো সেগুলো বোঝার জন্য কোয়ান্টাম বাস্তবতা সম্পর্কিত ফাইনম্যানের ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই একটু সময় নিয়ে এটি কীভাবে কাজ করে সেটি খতিয়ে দেখা যাক। কল্পনা করুন যে একটি সরল প্রক্রিয়ায় একটি কণিকা ‘ক’ স্থান থেকে যাত্রা শুরু করলো এবং স্বাধীনভাবে চলতে থাকলো। নিউটনীয় মডেল অনুযায়ী কণিকাটি একটি সরলরেখায় চলবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পরে কণিকাটিকে ওই সরলরেখার একটি নির্দিষ্ট স্থান ‘খ’তে পাওয়া যাবে। ফাইনম্যানের মডেল অনুযায়ী, একটি কোয়ান্টাম কণিকা ক এবং খ’কে সংযোগকারী প্রতিটি পথের নমুনা সংগ্রহ করে এবং প্রতিটি পথের জন্য একটি সংখ্যা বা দশা লাভ করে। সেই দশা একটি তরঙ্গের সাপেক্ষে কণিকাটির অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে অর্থাৎ তরঙ্গ চক্রের কোথায় আছে, তরঙ্গশীর্ষে নাকি তরঙ্গপাদে, নাকি এগুলোর মাঝামাঝি কোথাও? সেই দশা গণনা করার ফাইনম্যানের গাণিতিক পদ্ধতি মতে, আপনি যখন সম্ভাব্য সবগুলো পথের জন্য প্রাপ্ত তরঙ্গগুলো (কিংবা দশা) যোগ করবেন তখন কণিকাটি ক থেকে শুরু করে খ’তে পৌঁছানোর “সম্ভাব্যতা বিস্তার” (probability amplitude) পাবেন। সম্ভাব্যতা বিস্তারের বর্গ করলে আপনি কণিকাটি ক থেকে খ’তে পৌঁছানোর সঠিক সম্ভাব্যতা পাবেন।

প্রতিটি একক পথই ফাইনম্যানের যোগফলে (সেহেতু ক থেকে খ’তে যাওয়ার সম্ভাব্যতাতে-ও) যে দশার যোগান দেয় সেটিকে একটি তীর হিসেবে কল্পনা করুন, তীরটির সুনির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য আছে এবং এটি দশা অনুসারে গতিপথের দিকনির্দেশ করতে পারে। আপনি যদি দুটো দশাকে যোগ করতে চান তবে একটি দশার তীরের শেষবিন্দুতে অন্য দশার তীরের সূচনাবিন্দু স্থাপন করুন (তীরগুলোর দিক পরিবর্তন না করে)। এরপর প্রথম তীরের সূচনাবিন্দু থেকে দ্বিতীয় বিন্দুর শেষবিন্দু পর্যন্ত আরেকটি তীর সংযুক্ত করলে সেটিই হবে দশা দুটোর যোগফলের তীর। আরো দশা যোগ করতে চাইলে, প্রাপ্ত যোগফলের তীরের সাথে যে দশা যোগ করতে চান সেটির তীরকে উপরোক্ত নিয়মে যোগ করতে থাকুন। লক্ষ্য করুন যে দশাসমূহের তীরগুলো যদি একই রেখা বরাবর একই দিকে হয় তবে তাদের যোগফল অনেক দীর্ঘ হবে। কিন্তু তারা যদি বিভিন্ন দিকে নির্দেশ করে তবে একটি অন্যটিকে কাটাকাটি করে দিতে পারে, ফলে যোগফল তেমন দীর্ঘ হয় না। পুরো ব্যাপারটি ভেক্টর পদ্ধতিতে যোগ করার মতো, নিচের চিত্র দ্রষ্টব্য।

আপনি যদি ফাইনম্যানের পদ্ধতিতে কোনো কণিকার ক থেকে খ’তে পৌঁছানোর সম্ভাব্যতার বিস্তার নির্ণয় করতে চান তাহলে প্রতিটি সম্ভাব্য পথের দশা বা দশাকে প্রতিনিধিত্বকারী তীরকে যোগ করতে হবে। অসীম সংখ্যক পথ হতে পারে বলে গাণিতিক রূপ জটিল রূপ ধারণ করে, কিন্তু ফলাফল ঠিকই পাওয়া যায়।

কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং নিউটনীয় তত্ত্ব দুটোকে আপাত ভিন্ন মনে হলেও, ফাইনম্যানের তত্ত্ব কীভাবে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান থেকে নিউটনীয় জগতধারণার উদ্ভব হতে পারে সে ব্যাপারে খুব স্বচ্ছ ধারণা দেয়। ফাইনম্যানের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি পথের সংশ্লিষ্ট দশার মান প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের ওপর নির্ভর করে। তত্ত্বটি বিবৃতি করে যে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের মান অনেক ছোট হওয়ার কারণে আপনি যখন পথগুলো (বা দশা) যোগ করবেন তখন দুটো পথ পরস্পরের খুব কাছাকাছি হলেও তাদের মধ্যকার দশার পার্থক্য বেশ বড় হয়ে থাকে, ফলে উপরের চিত্রের মতোই তাদের যোগফল শূন্য বা ক্ষুদ্র হয়। কিন্তু তত্ত্বটি আরো বিবৃতি করে যে কিছু কিছু পথের দশাগুলো প্রায়ই একটি সরলরেখা বরাবর হয়ে থাকে, সেহেতু সেই পথগুলো আনুকূল্যে কণিকাটির আচরণে বেশি অবদান রাখে। বড় বড় বস্তুগুলোর বেলায় দেখা যায় যে নিউটন তত্ত্ব অনুমিত পথগুলো এবং ফাইনম্যান তত্ত্ব অনুমিত পথগুলোর দশাগুলো একই রকমের হয়ে থাকে এবং যোগফলে বড় ধরণের অবদান রাখে। ফলে ফাইনম্যান তত্ত্ব অনুমিত কেবলমাত্র যে গন্তব্যের সম্ভাব্যতা শূন্যের চেয়ে বেশ বড় (প্রায় একের কাছাকাছি) সেটি মূলত নিউটনীয় তত্ত্ব অনুমিত গন্তব্যই। এই কারণেই বড় বস্তুগুলো নিউটনের তত্ত্ব অনুমিত পথ ধরেই চলে।

এখন পর্যন্ত আমরা দ্বিচিড় পরীক্ষার আলোকেই ফাইনম্যানের ধারণাগুলোর আলোচনা করেছি। এই পরীক্ষায় কণিকাগুলোকে চিড়ের মধ্য দিয়ে একটি দেয়াল বরাবর বর্ষণ বা ছোঁড়া হয় এবং আমরা দেয়ালের পেছনে রাখা পর্দার কোন স্থানে কণিকাগুলো পৌঁছাচ্ছে সেটির পরিমাপ করি। আরো সাধারণভাবে বললে, শুধুমাত্র একটি কণিকা নয়, ফাইনম্যানের তত্ত্ব আমাদের একটি ব্যবস্থার (হতে পারে কতকগুলো কণিকা, এমনকি পুরো মহাবিশ্ব) সম্ভাব্য ফলাফল অনুমান করতে সহায়তা করে। ব্যবস্থাটি আদি অবস্থা থেকে আমাদের পরিমাপ করা নতুন অবস্থায় পৌঁছানোর পথে যেসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয় তাকে পদার্থবিজ্ঞানিরা ব্যবস্থাটির ইতিহাস বলেন। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিচিড় পরীক্ষাতে একটি কণিকার পথই হচ্ছে কণিকাটির ইতিহাস। দ্বিচিড় পরীক্ষায় যেমন কোনো স্থানে কণিকাটির পৌঁছানোর সম্ভাব্যতা ওই স্থানে পৌঁছানোর সম্ভাব্য সকল পথের উপর নির্ভর করে, ফাইনম্যান দেখিয়েছেন তেমনিভাবে একটি সাধারণ ব্যবস্থার জন্য, যে কোনো পর্যবেক্ষণের সম্ভাব্যতা যে সকল সম্ভাব্য ইতিহাস ওই পর্যবেক্ষণের দিকে ধাবিত করে- সেই সবগুলো ইতিহাসের উপর নির্ভর করে। ফাইনম্যানের এই পদ্ধতিকে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে “ইতিহাসের সমষ্টি” (sum over histories) অথবা “বিকল্প ইতিহাস” (alternative histories) বলা হয়।

যাক এতক্ষণে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে ফাইনম্যানের চিন্তাধারা সম্পর্কে আমাদের একটি ধারণা তৈরি হলো, চলুন এবার আমরা পরবর্তীতে ব্যবহার করবো এমন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি নিয়ে কথা বলি- পর্যবেক্ষণের ফলে একটি ব্যবস্থার ঘটনাপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। আমরা কি কোনো রকম হস্তক্ষেপ না করে দুপুরের খাবারের পরে অফিস-তত্ত্বাবধায়কের চিবুকে লেগে থাকা সর্ষের চাটনি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারি? উত্তর হলো: না। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বলছে যে আপনি কোনো কিছু “কেবল” পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন না। অর্থ্যাৎ কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা মতে, পর্যবেক্ষণ করতে হলে যে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করবেন সেটির সাথে আপনাকে অবশ্যই মিথস্ক্রিয়া করতে হবে। যেমন ধরুন কোনো কিছু দেখতে চাইলে আমরা সাধারণত সেটির উপর আলো ফেলি। একটি কুমড়োর উপরে আলো ফেললে খুবই নগণ্য প্রভাব সৃষ্টি করবে, কিন্তু একটি কোয়ান্টাম কণিকার উপর যদি নিষ্প্রভ আলো-ও ফেলেন- মানে ফোটন ছুঁড়েন- তবে সেটি ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করবে। পরীক্ষা থেকে দেখা যায় যে এর ফলে একটি পরীক্ষার ফলাফলে পরিবর্তন ঘটতে পারে।

ধরুন, আগের মতো, দ্বিচিড় পরীক্ষায় আমরা কণিকার প্রবাহ প্রতিবন্ধকের দিকে ছুঁড়ে দিলাম এবং প্রথম এক মিলিয়ন কণিকা সম্পর্কে তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করলাম। যখন বিভিন্ন অংশে পৌঁছানো কণিকাগুলোর লেখচিত্র থেকে আমরা একটি ব্যতিচারী নকশা পাবো, এবং যখন ক থেকে খ পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাব্য সকল পথের দশাগুলো যোগ করে যে সম্ভাব্যতা পাবো সেটি পূর্বে পাওয়া ব্যতিচারী লেখচিত্রের সাথে মিলে যাবে।

এখন মনে করুন যে কণিকা যাতায়াত করে এমন একটি মধ্যবর্তী বিন্দু গ (গ এর অবস্থান হতে পারে যে কোনো একটি চিড়ে) এর উপর আমরা আলো ফেলে পরীক্ষাটি আবার করছি। এটিকে বলে “কোন পথ” তথ্য জানা, কারণ এই তথ্যের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে কণিকা ক থেকে ১ নং চিড় দিয়ে খ’তে নাকি ক থেকে ২ নং চিড় দিয়ে খ’তে গিয়েছে। এই তথ্য থেকে যেহেতু আমরা জানবো যে কোন পথ দিয়ে কণিকাগুলো গেছে সেহেতু আমাদের যোগফলে অন্যান্য পথগুলো (এবং সংশ্লিষ্ট দশা) যোগ হবে না। মানে, ১ নং চিড় দিয়ে যে কণিকা পার হলো তার হিসেব হবে শুধুমাত্র ১ নং পথের আলোকেই। ফাইনম্যান বলেছিলেন, ব্যতিচারী নকশার সৃষ্টি হয় একটি চিড় দিয়ে যাওয়া সম্ভাব্য পথের সাথে অন্যটি দিয়ে যাওয়া সম্ভাব্য পথের ব্যতিচারের ফলে; যদি আপনি কোন পথ দিয়ে কণিকারা পার হয় সেটি জানার জন্য আলো ফেলেন, তবে আপনি অন্যান্য বিকল্পকে বাদ দিয়ে দিচ্ছেন অর্থাৎ কণিকাগুলোর পক্ষে এখন আর অন্য কোনো পথ দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ব্যতিচারী নকশা সৃষ্টি হবে না। পরীক্ষা চলাকালীন আলো জ্বালানোর কারণে ফলাফলে বা ব্যতিচারী নকশায় পরিবর্তন ঘটে। আমরা পরীক্ষাটিতে রদবদল করতে পারি খুবই ক্ষীণ আলো ব্যবহার করে, তাহলে সবগুলো কণিকা আর আলোর সাথে মিথস্ক্রিয়া করবে না। সেক্ষেত্রে আমরা শুধুমাত্র কতকগুলো কণিকার “কোন পথ” তথ্য জানবো। আমরা যদি “কোন পথ” তথ্য জানা ও না-জানার ভিত্তিতে কণিকাগুলোকে দুটো সেটে ভাগ করি তবে দেখা যায় যে যেগুলোর “কোন পথ” তথ্য জানা নেই সেগুলো ব্যতিচারী নকশা তৈরি করছে, এবং অন্যগুলো করছে না।

এই ব্যাপারটি “অতীত” সম্পর্কিত আমাদের চিন্তাধারণার ক্ষেত্রে অনেক তাৎপর্য বহন করে। নিউটনীয় তত্ত্বে মনে করা হয় অতীত হলো সুনির্দিষ্ট কিছু বিগত ঘটনাপ্রবাহ। আপনি যে ফুলদানিটি গত বছর ইতালি থেকে কিনেছিলেন সেটি যদি দেখেন মেঝেতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে আর আপনার ডানপিটে গুট্টুসটা জড়সড় হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তখন আপনি ঘটনাপ্রবাহ পশ্চাতে অনুসরণ করে এই দুর্ঘটনার কারণ বের করতে পারবেন: ছোট ছোট আঙুলগুলো ফসকে গেলো, ফুলদানিটি পড়ে গেলো মেঝেতে এবং সহস্র চূর্ণ হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো। বাস্তবিকপক্ষে, বর্তমান সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্যউপাত্ত দেয়া থাকলে নিউটনের সূত্রগুলোর সাহায্যে সম্পূর্ণ অতীতই গণনা করে জানা সম্ভব। এটি আমাদের সহজাত ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সুখকর কিংবা দুঃখকর হোক, মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট অতীত আছে। হয়তো কেউ পর্যবেক্ষণ করছিলো না, তারপর-ও অতীতের অস্তিত্ব ছিলো- ঠিক যেমনটি আপনার ক্যামেরায় তোলা ছবির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম বাকিবলের ক্ষেত্রে বলা যায় না যে এটি উৎস থেকে পর্দা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট পথ ধরে চলে। আমরা হয়তো পর্যবেক্ষণ করে বাকিবলের অবস্থান নির্ণয় করতে পারি, কিন্তু মধ্যবর্তী সময়ে এটি সম্ভাব্য সব পথ ধরেই চলতে পারে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান তাই বলছে যে আপনার বর্তমান পর্যবেক্ষণ যতোই পূর্ণাঙ্গ হোক না কেনো, ভবিষ্যতের মতোই অতীত (অপর্যবেক্ষিত) অনির্দিষ্ট বা অনিশ্চিত, এবং শুধুমাত্র কতকগুলো সম্ভাব্যতা হিসেবে অস্তিত্বমান আছে। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মতে, মহাবিশ্বের একটি সুনির্দিষ্ট অতীত বা ইতিহাস নেই।

বাস্তবিকপক্ষে, অতীতের কোনো সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব বা ইতিহাস নেই- এর মানে হচ্ছে আপনি ব্যবস্থাটির উপর বর্তমানে যে পর্যবেক্ষণগুলো করবেন সেগুলো ব্যবস্থাটির অতীতকে প্রভাবিত করে। কোনো একটি ভৌত ব্যবস্থার উপর বর্তমানে করা কোনো পর্যবেক্ষণ সেই ব্যবস্থার অতীতকে পাল্টে দিতে পারে। এই ধারণা নাটকীয়ভাবে গুরুত্ব লাভ করে পদার্থবিজ্ঞানি জন হুইলারের “বিলম্বিত-বাছাই পরীক্ষা” (delayed-choice experiment) নামক চিন্তন পরীক্ষার কারণে। ছকবদ্ধভাবে, বিলম্বিত-বাছাই পরীক্ষাটি মূলত আমাদের বর্ণিত দ্বিচিড় পরীক্ষার মতোই, যেটি দিয়ে কণিকাটি কোন পথ ধরে চলে সেটি পর্যবেক্ষণ করা যায়, পার্থক্য হলো বিলম্বিত-বাছাই পরীক্ষাতে আপনি পর্দায় আঘাত করার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কণিকাটির গতিপথ পর্যবেক্ষণ করবেন কি না করবেন না।

আলো জ্বেলে চিড়গুলো পর্যেবক্ষণ করার মাধ্যমে “কোন পথ” তথ্যটি জানার পরীক্ষাটির মতো হুবহু একই উপাত্ত সরবরাহ করে বিলম্বিত-বাছাই পরীক্ষাটি। যদিও এই ক্ষেত্রে যে পথে প্রতিটি কণিকা চলে (অর্থাৎ এর অতীত) সেটি নির্ধারিত হয় চিড়গুলো পার হওয়ার অনেক পরে এবং পর্যবেক্ষণ করা অথবা না করার সিদ্ধান্ত কণিকাটির অতীতকে নিয়ন্ত্রন করে; মানে, কেবল একটি চিড় দিয়ে পার হতে হবে (এক্ষেত্রে ব্যতিচার ঘটে না) নাকি দুটো চিড় দিয়েই পার হতে হবে (এক্ষেত্রে ব্যতিচার ঘটে) সেটি “নির্ধারিত” হয় আমরা পর্যবেক্ষণ করবো কি করবো না তার উপর।

হুইলার এই পরীক্ষাটির একটি মহাজাগতিক সংস্করণের- অর্থাৎ কয়েক বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের শক্তিশালী কোয়াসার থেকে নির্গত ফোটনের কথা চিন্তা করেছেন। এই রকমের আলোকরশ্মিকে দুটো পথে ভাগ করা যাবে এবং মধ্যবর্তী কোনো গ্যালাক্সির মহাকর্ষিক লেন্সের মাধ্যমে পৃথিবীর অভিমুখে পুনরায় কেন্দ্রীভূত করা যাবে। যদিও এই পরীক্ষা করা বর্তমান প্রযুক্তির সাধ্যের বাইরে, তারপরও আমরা যদি এই আলো থেকে যথেষ্ট ফোটন কণা সংগ্রহ করতে পারি তবে দেখবো যে তারা ব্যতিচারী নকশা সৃষ্টি করছে। এবং আমরা যদি একটি যন্ত্র স্থাপন করি শনাক্তকরণের ঠিক আগ মূহুর্তে “কোন পথ” তথ্যটি নির্ণয় করার জন্য তবে ব্যতিচারী নকশাটি না সৃষ্টি হওয়ারই কথা। ফোটনটি একটি পথ নাকি দুটো পথ পথ দিয়ে পার হয়েছে (বা কোন পথ দিয়ে পার হয়েছে) সেটি হয়তো কয়েক বিলিয়ন বছর আগেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেছে; পৃথিবী, এমনকি আমাদের সূর্যের সৃষ্টির আগে। তারপরও পরীক্ষাগার থেকে করা আমাদের পর্যবেক্ষণ ফোটনটির অতীতকে প্রভাবিত করবে।

এই অধ্যায়ে আমরা দ্বিচিড় পরীক্ষার মাধ্যমে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করেছি। সামনের অধ্যায়গুলোতে আমরা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের ফাইনম্যানের সূত্র সমগ্র মহাবিশ্বের উপর প্রয়োগ করবো। আমরা দেখবো যে, একটি কণিকার মতো, মহাবিশ্বেরও একক কোনো ইতিহাস নেই, বরং প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট সম্ভাব্যতা সম্পন্ন সম্ভাব্য সকল ইতিহাসই রয়েছে; এবং মহাবিশ্বের বর্তমান অবস্থার পর্যবেক্ষণ এর অতীতকে প্রভাবিত করে এবং মহাবিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাসকে নির্ধারণ করে, ঠিক যেমনটি দ্বিচিড় পরীক্ষায় কণিকাটির উপর বর্তমান পর্যবেক্ষণ সেটির অতীতকে প্রভাবিত করে। এই বিশ্লেষণ আমাদের দেখাবে মহাবিস্ফোরণের ফলে কীভাবে প্রকৃতির সূত্রগুলোর উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু কীভাবে নিয়মগুলোর উদ্ভব হলো সেটি দেখার আগে আমরা আলোচনা করবো আসলে এই নিয়মগুলোই বা কী রকম এবং নিয়মগুলোর উদ্রেক করা কিছু রহস্য সম্পর্কে।

[বইটির সূচিপত্র তথা সব পর্বের লিংক দেখুন এখানে]

মূল: স্টিফেন হকিং ও লিওনার্দো ম্লোডিনো

অনুবাদ: -আশরাফ মাহমুদ
গবেষক, কবি ও লেখক
[লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল]

Share.

মন্তব্য করুন